সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ

আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে চাই বাঙলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে থাকে। যেখানে কারো ধর্ম বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে সামাজিক মর্যাদা ও জীবিত থাকার নিশ্চয়তা ও অনিশ্চয়তা কোনটাই নির্ভর করে না। যেখানে কেউ কাউকে কুৎসিত শব্দে সম্বোধন করে না। ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী হওয়ার কারণে, ভিন্ন ধর্মালম্বী হওয়ার কারণে, ভিন্ন মতাদর্শের কারণে কেউ কাউকে দোষারোপ, মারপিট, রক্তারক্তি করে না। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পৃথিবীর যে সকল দেশ অগণতান্ত্রিক, সেই সকল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল সত্যকে মাটির নিচে চাপা দিয়ে সেই মাটির উপরে দাঁড়িয়ে মিথ্যে প্রতিষ্ঠা করা।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বলতে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বেচ্ছাচারিতাকে বুঝিয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই বাঙলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য ভূমি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মানে কী? সংখ্যাগরিষ্ঠ যখন তখন যাকে তাকে ধরে নির্যাতন করবে, নিপীড়ন চালাবে, অত্যাচার করবে, পহেলা বৈশাখকে হিন্দুয়ানী উৎসব বলবে, মালাউন বলবে, কাফের বলবে, নাস্তিক ঘোষণা দিয়ে হত্যা করবে, অমুসলিম ঘোষণা করবে? এটা কীভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদাহরণ হতে পারে?

বাঙলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ সাম্প্রদায়িকতার বিষ লালন পালন করে থাকে। যদিও এদের সংখ্যা মানুষের সংখ্যার থেকে কম, তারপরও এদের শক্তি, সামর্থ, কুটনীতি, অরাজগতা, ধ্বংসলীলা, উন্মাদনা পুরো দেশের মানুষকে ভোগ করতে হয়। সহ্য করতে হয়। অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে রাত্রিযাপন করতে হয়। এই সাম্প্রদায়িকতার বিষ ধারণকারী গোষ্ঠী এতটাই ভয়ংকর যে রাষ্ট্র এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস পায় না এবং ক্ষমতা ও অর্থের জোরে এরা সহবস্থানে থাকে। সাম্প্রদায়িকতা পোষণ করা জনগোষ্ঠী ভয়ভীতি প্রদর্শন করে উচ্চস্বরে বলে ‘ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের বৈষম্য করা হয় না’ অথচ এই গোষ্ঠী বৈষম্য, পার্থক্য ছাড়া আর কিছুই বুঝে না। অর্থাৎ সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে মিথ্যে প্রতিষ্ঠায় এদের ভূমিকা অদ্বিতীয়।

  • Image result for হিন্দু নির্যাতন

বাঙলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হলে মন্দির ভাঙার হিশেব কি জানা আছে?
বাঙলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্বাসীরা কতোটা সহিষ্ণু কিংবা অসহিষ্ণু হতে পারে!
১৯৯২ সালে ভারতে বাবরী মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছিলো। আর বাঙলাদেশের মুসলমানেরা সেই ক্ষোভ বাঙলাদেশের হিন্দুদের উপর ঝেড়েছিল। সে-সময় ৩৫২ টি মন্দির আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয় এর পাশাপাশি সংখ্যালঘু পরিবার গুলোর উপর ধর্ষণ ও লুটতরাজের ঘটনাও ঘটে। এতো আহাম্মক বিশ্বাসীদের নিয়ে জাতির কোন লাভ কী আছে?

২০০১-২০০৫ সালের কাহিনী কি জানা আছে?
স্বাধীনতা উত্তরকালে সবচেয়ে ভয়ানক গণহত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, জোড় করে বিয়ে, ধর্মান্তরিত করা, চাঁদা আদায় ও সম্পত্তি দখল কোন কিছুই যেন বাদ ছিল না সে সময়ে। মায়ের সামনে মেয়েকে, বাবার সামনে মেয়েকেও স্ত্রীকে, ছেলের সামনে মাকে ও বোনকে ধর্ষণের বীভৎস ঘটনাও সংখ্যাগরিষ্ঠরা করেছিলো। শিশু ধর্ষণ, শিশুর সামনে মাকে ধর্ষণ এগুলো প্রতিদিনের ঘটনা ছিল। বিধবা নারীকে দিয়ে গরু জবাই করে মুসলমানদের খাওয়ানোর ঘটনাও ছিল। ৮৭ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষণ করে পুরুষ বুঝিয়েছিল লিঙ্গের কাছে ৩ মাস আর ৮৭ বছরের কোন পার্থক্য নেই। সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীর পুরুষদের উপর চলেছিল অমানবিক নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা। আর মন্দির ভাঙচুরের সংখ্যা অগণিত।

আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসে গত ১০ বছরে কি কোন পরিবর্তন এনেছে?
২০১২ সালে জামাতীরা রাস্তায় নেমে প্রকাশ্যে পুলিশদের উপর আক্রমণ চালানো শুরু করে। সেইসাথে হিন্দুদের নিশানা বানানো হয়।
২০১৩ সালে রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হওয়ার পর সারা দেশে জামায়াত-শিবির যে তাণ্ডব চালায়, তারও অন্যতম টার্গেট ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।
২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল হিন্দুদের জন্য আতংকের।
২০১৫ সালে ২৩৫টি মন্দির ভাঙা হয়। ২০১৫ সালেই সংখ্যালঘুদের ওপর ২৬২টি হামলার ঘটনা ঘটে, এ ছাড়া ২৪ জন নারী অপহরণ ও ২৫ জন ধর্ষণের শিকার হন।২০১৫ সালে বরগুনায় সংখ্যালঘু উচ্ছেদের ঘটনা তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
২০১৬ সালে মোট ৭৭টি মন্দিরে হামলা-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ২৫ জনকে জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে৷
২০১৭ সালে ১০৭ জন হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে৷
২০১৮ সালে প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে ৩৭৯টি, প্রতিমা চুরি হয়েছে ৯টি।

এতোগুলো মন্দির ভাঙচুর ও সংখ্যালঘু নির্যাতন করেও যদি বলতে হয় বাঙলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল ভূমি তাহলে মিথ্যে ও সত্যের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 1