বন্ধু রবীন্দ্রনাথ হাইত ও কুরপাই স্কুল !

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হলো। অনেক রাতে হিন্দমোটর সমীন্দ্রের বাড়ি ঘুমিয়েছিলাম। ঘুমানোর আগে বন্ধু রবীন্দ্রনাথ হাইথের সাথে প্লান করলাম, তার বাড়ি যাবো আগামিকাল ভোরে। রবীন্দ্রনাথ হাইত আমার ফেসবুক বন্ধু। মার্ক জুকারবার্গের কল্যাণে ফেসবুকে দেশে বিদেশে অনেক বন্ধু জুটেছে আমার। রবীন্দ্রনাথ হাইত তাদের মাঝে অন্যতম। মুক্তমনা মানুষ। শুধু মুক্তমনা নয়, বেশ সাহসী মুক্তমনা বলা যেতে পারে। তমলুকের কাছের কুরপাই হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক তিনি। এটি পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত! স্কুল থেকে তিন/চার কিলোমিটার দূরে তাঁর বাড়ি। প্রত্যহ বাড়ি থেকে স্কুল আসা যাওয়া করেন নিজের বাইকে। আমাকে পথ বাতলে দিয়েছেন তিনি। প্র্থমে হাওড়া যেতে হবে। সেখান থেকে মেচেদার লোকাল ট্রেনে মেচেদা নামতে হবে। বন্ধু রবীন্দ্রনাথ থাকবেন মেচেদা স্টেশনে আমাকে চিনিয়ে নিতে।
:
হিন্দমোটর স্টেশন থেকেই টিকেট করলাম মেচেদা পর্যন্ত। কিন্তু বাংলাদেশের তুলনায় ভাড়া এতো কম যে, বিশ্বাসই হয়না অন্য একটা জেলাতে যাবো মাত্র ২৫-টাকা ভাড়াতে। কিন্তু এখান থেকে যেতে হবে প্রথমে হাওড়া জংশনে। সেখান থেকে মেচেদার ট্রেনে উঠতে হবে। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে সমীন্দ্রের মেয়ে পুটি বলে দিয়েছে ওটা কর্ড লাইন। বাব্বা! ভারতের স্কুল বালিকারাও কর্ড ফর্ড কতো কিছু চিনে। আর আমি এসব কিছুই চিনিনা। হিন্দমোটর থেকে হাওড়া পৌঁছতে বেশি সময় লাগেনা। বলতে গেলে খালি ট্রেন পেলাম হাওড়া জংশনে। সুতরাং একদম জানালার পাশে সিট নিলাম, যাতে নানাবিধ স্টেশন আর সপ্তপদী মানুষজন দেখতে পারি! আমার গল্পের পাঠকরা জানেন ট্রেন জার্নি খুব প্রিয় আমার। হোক তা লোকাল ট্রেন কিংবা এক্সপ্রেস। কাটায় কাটায় ৮টা ৩২ এ ছাড়লো ট্রেন। ভারতীয় ট্রেনগুলো খুব টাইম মানে। অনেকটা চীনাদের মত। অথচ আমার মনে আছে, নওগাঁ থেকে ঢাকা ফেরার পথে সান্তাহার স্টেশনে প্রথম শ্রেণির টিকেট কেটে বসে আছি তো আছি ট্রেনের নাম গন্ধ নেই! ট্রেন আসার কথা ছিল ১০টা ১০-এ। কিন্তু তা এলো বেলা ৩টায়। তারপরো ট্রেনে উঠে দেখি আমার সিটে অন্য লোক বসা! যাক সে গল্প আরেক দিন বলা যাবে।
:
ট্রেন ছেড়েই অল্প সময়ে পৌঁছে গেলো সাঁতরাগাছি! সাঁতরাগাছির নাম শুনেছি অনেকবার। এই প্রথম চোখে দেখলাম। কারণ মেদিনিপুর লাইনে ট্রেনে যাইনি আগে কখনো। জানালায় চোখ রেখে বসে আছি আর কোন কোন স্টেশন আসছে তা গুণছি। সেখানের মানুষ, ট্রেনে তাদের ওঠানামা দেখছি। ক্রমে মৌড়িগ্রাম, আন্দুল. সাকরাইল, আবাদা, নলপুর, বাউড়িয়া, চেঙ্গাইল, ফুলেশ্বর, উলুবেড়িয়া, বীরশিবপুর, মৈথিপাড়া, বাগনান, টেপুর, বারুন্দা, দেউলটি পার করে ট্রেন উঠে গেল এক ব্রিজে। জানলাম এটা রূপনারায়ণ নদী। বাহ! নামটা চমৎকার! আমাদের গাঁয়ের নদীর মতই! তার ওপরে ব্রিজ। কোলাঘাট পৌঁছলে ফোন দিলাম বন্ধু রবীন্দ্রনাথকে। কাকডিহির পরই এসে গেল মেচেদা। যোগাযোগ হলো মোবাইলে। উনি স্টেশনের টিকেট কাউন্টারের সামনে দাঁড়ানো। লিচু কিনতে একটু দেরী হলো আমার। বের হয়ে প্রথম দেখা বন্ধু রবীন্দ্রনাথ হাইতের সাথে। কোলাকুলি করলাম দুজনে। তারপর দোকানে মেচেদার চা লুচির ব্রেকফাস্ট!
:
মেচেদা থেকে নানা চড়াই উৎরাই পার হয়ে অবশেষে শিমুলিয়া গাঁয়ে পৌঁছলাম। যে গাঁয়ে বাড়ি বন্ধু রবীন্দ্রনাথ হাইতের। বলা যেতে পারে গাঁয়ের শেষপ্রান্তে বাড়ি তাদের। মনে হলো, পূর্ববঙ্গের কোন গ্রামে ঢুকেছি যেন। তেমন বিল, তেমন মাঠ, তেমন সবুজ বৃক্ষঘেরা গ্রাম। একান্নবর্তী বড় পরিবার তাঁর। মা, ভাই, ভাইর পরিবার, নিজ স্ত্রী সন্তানসহ একই ঘরে থাকেন রবীন্দ্রনাথ হাইত। দেখে ভাল লাগলো। আমাদের পরিবারও এমনটাই বড় ছিল গ্রামে। ৩০/৩৫ জনের রান্না হতো প্রতিবেলা ঘরে। সারাদিন রান্নাঘরে চলতো খাওয়া দাওয়া। ৩ মহিলা কাজ করতো রান্না করে সারাদিন! আমরা স্কুলগামী শিশুরা খাওয়া শেষ করলে, বসতো গরু মহিষের রাখাল আর জমির কামলারা। কামলারা একেকজনে আধা কেজি চালের ভাত খেতো। তারা শেষ করলে, বসতো ঘরের পুরুষ মহিলাদের খাবার। সবার খাওয়া শেষ হলে, আবার বসতো নতুন রান্না। শিমুলিয়া গাঁ প্রত্যন্ত হলে কি হবে, রবীন্দ্রনাথ হাইতের ঘরে ঠিকই পেয়ে গেলাম আধুনিক প্রযুক্তির ওয়াই-ফাই। কিভাবে সিম দিয়ে যেন চালায় তারা। বৃষ্টি নেই কদিন ধরে, তাই খা-খা রোদ্দুরে প্রচন্ড গরমে কিছুক্ষণ রেস্ট করেই আমরা বের হলাম কুরপাই স্কুলের দিকে।
:
আমি বাংলাদেশ ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, স্কুল পাঠ্যক্রম, অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা নিয়ে একটা গবেষণা করছি বিধায় কুরপাই স্কুলে যাই নানাবিধ তথ্য সংগ্রহে। তখন গ্রীস্মের ছুটি চলছে স্কুলে, তারপরো স্কুলে যাই আমরা অন্তত অবকাঠামো আর সুযোগ সুবিধে দেখতে। স্কুলের সর্বত্র অসাম্প্রদায়িকতার ছাপ। মনীষিদের “ধর্মমোহের” কথা যেমন দেয়ালে লিখে রাখা হয়েছে, তেমনি পোপের ভয়ে দেশান্তরী হওয়ার কথাও উৎকীর্ণ রয়েছে স্কুল ভবনে। এমনকি স্কুল সিলেবাসের পাতায় পাতায় বিদ্যাসাগর, প্রফুল্লচন্দ্র আর আইনস্টাইনের ছবি ছাপানো রয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে মেয়েদের কমনরুম এলাকায় “স্যানিটারী প্যাড” কেনার ভেন্ডিং মেসিন। টিনএজ মেয়েরা যেখানে লজ্জায় দোাকানে যেতে চায়না তাদের প্রয়োজনীয় প্যাড কিনতে, সেখানে তা তাদের কমনরুমের এক কোনে বসানো হয়েছে। বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে এমনটা হলে কি ভালই না হতো। স্কুল ভবনে থাকতেই কলকাতা থেকে ফোন আসে রবীন্দ্রনাথ হাইতের কাছে। তার ধর্মছাড়ার হলফনামার ব্যাপারে একটি পত্রিকা রিপোর্ট করবে সে ব্যাপারে সাক্ষাৎকার। টেলিফোনে ইন্টারভ্যুতে তিনি অবলীলায় বললেন, কেবল তিনি নন, তার পুরো পরিবার ধর্ম পরিচয় রাখতে চাননা। মানে তারা বাঁচতে চান ধর্মহীন হিসেবে, মানুষ হিসেবে। মহৎ আর সাহসী এসব সপ্তপদি কথা শুনে স্কুল ম্যাগািজন “উন্মেষ” নিয়ে বিদায় হলাম স্কুল থেকে।
:
দাদা বিশ্বাস করেন No Religion – No Caste-এ। এর আইনি স্বীকৃতি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার কয়েকজন মুভমেন্ট করছে কলকাতাতে। দাদাও তাদের একজন। তার কথা হচ্ছে “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”। তার মতে, “ধর্মের আধিপত্য যে সমাজে যত বেশি, বিজ্ঞানভিত্তিক মননের চাষাবাদ সেখানে তত কম । ফলে সেখানে প্রথাগত শিক্ষা সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে পিছিয়ে পড়া চিন্তাভাবনার রাজত্ব চলতে থাকে । আর যে সমাজে মুক্তচিন্তার কদর নেই সে সমাজ কখনও সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চায় উচ্চ মান অর্জন করতে পারে না”। তিনি বলেন, “শিশুরা কোন প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস নিয়ে জন্মায় না । আমরাই ওদের মধ্যে ধর্মীয় ভেদাভেদ ও বিদ্বেষের বিষ ঢুকিয়ে দিই । আমরাও যদি শিশুদের মত হতে পারতাম, তবে পৃথিবীটা অনেকটাই বসবাসের উপযুক্ত স্থান হয়ে উঠতো”!
:
দাদা রবীন্দ্রনাথ হাইত, তার স্ত্রীসহ আমরা দীঘা গেলাম পরদিন। দাদা যদিও দীঘা সি বিচে গিয়েছেন অনেকবার, এমনকি তার স্কুলের স্টুডেন্ট নিয়ে, তবে আমাদের এটাই প্রথম। তার বাড়ি থেকে ঘন্টা দেড়েক লাগে দীঘা পৌঁছতে। সৈকত দেখার পর দাদা আর বৌদির আগ্রহে আমার যাই কাসুরিনা ঝাউবন, ওয়ান্ডারল্যান্ড কাজল দিঘীতে, দীঘা হিজলি গার্ডেন আর অমরাবতী পার্কে। দীঘা “বিজ্ঞান কেন্দ্র” চমকপ্রদ একটা জ্ঞানমূলক বিজ্ঞানাগার। পুরো হলটি ঘুরে বেশ আনন্দ পেলাম আমরা সবাই। এমনকি ছবিও তুললাম। দুপুরে দীঘা সি-বিচ হোটেলে খেলাম আমরা ৪-জনে। এবার ফিরতে হবে। দাদারা যাবেন তাদের গ্রাম শিমুলিয়াতে, আর আমরা আসবো প্রথমে হাওড়া তারপর হিন্দমোটর ট্রেনে। দীঘা থেকে ৫-টা ৫০-এ ট্রেন।
:
এবার বিদায়ের পালা। একদিনের পরিচয়ে বড়ই অন্তরঙ্গ হাইতের পরিবার। একদম পূর্ববঙ্গীয় মানুষের মত আতিথেয়তা। আমরা দুটো গ্রুপ দুদিকে যাচ্ছি বুকে একটা ব্যথা নিয়ে। দাদা বৌদি যাচ্ছেন তাদের বাসের দিকে। আমরা দীঘা ট্রেন স্টেশনে বসে বসে তখন আবৃত্তি করছি অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা –

“তোমারও নেই ঘর
আছে ঘরের দিকে যাওয়া।
সমস্ত সংসার হাওয়া
উঠছে নীল ধূলোয় সবুজ অদ্ভূত;
দিনের অগ্নিদূত
আবার কালো চক্ষে বর্ষার নামে ধার।
কৈলাস মানস সরোবর
অচেনা কলকাতা শহর—
হাঁটি ধারে ধারে
ফিরি মাটিতে মিলিয়ে
গাছ বীজ হাড় স্বপ্ন আশ্চর্য জানা
এবং তোমার আঙ্কিক অমোঘ অবেদন
আবর্তন
নিয়ে
কোথায় চলছে পৃথিবী।
আমারও নেই ঘর
আছে ঘরের দিকে যাওয়া।।
:
রাত নটার দিকে হাওড়া পৌঁছার কথা এক্সপ্রেস ট্রেনটির। দীঘা থেকে টিকরা, রামনগর, বাদলপুর, আশাপূর্ণাদেবী, উত্তর তেতুলতলা, বেতুল্যা, সুজালপুর, শীতলপুর, শশানিয়া, কাঁথি, নাচিন্দা, হেঁড়িয়া, সাদিপুর, লাভান সত্তাগর, সন্দলপুর, নন্দকুমার, তমলুক, শহীদ মাতঙ্গিনী, রাজগোদা, রঘুনাথবাড়ি, নারায়ণ মুড়াইল, ভোগপুর, নন্দাইগাজন, মেচেদা, কোলাঘাট, দেউলটি, বারুন্দা, টেপুর, বাগনান, উলুবেড়িয়া, মৈথিপাড়া, বীরশিবপুর, ফুলেশ্বর, চেঙ্গাইল, বাউড়িয়া, নলপুর, আবাদা, সাকরাইল, আন্দুল, মৌড়িগ্রাম এরপর সাঁতরাগাছি এসে থেমে গেল ট্রেন। কি কারণে যেন আর এগোয়না। রাত পৌনে বারটায় যখন হাওড়া পৌঁছলো আমাদের দীঘা এক্সপ্রেস, তখন হিন্দমোটর যাওয়ার শেষ ট্রেনটিও নেই। অবশেষে ট্যাক্সি ধরতে গভীররাতে হাওড়ার রাজপথে।
:
ছবি পরিচিতি

১। বন্ধু রবীন্দ্রনাথ হাইত’
২। ধর্ম ছাড়ার হলফনামা (পত্রিকা কাটিং);
৩। রবীন্দ্রনাথ হাইতের কন্যা অহনা হাইত;
৪। দীঘা সমুদ্র সৈকতে;
৫। কুরপাই হাইস্কুল ভবন;
৬। স্কুল ভবনের দেয়ালের গায়ে;
৭। মেয়েদের জন্য প্যাড ভেন্ডিং মেশিন এবং
৮। মৌড়িগ্রাম স্টেশন!

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “বন্ধু রবীন্দ্রনাথ হাইত ও কুরপাই স্কুল !

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

19 − 13 =