গুজবের ডানা (প্রবন্ধ-৮)

বাঙালি আরামপ্রিয় জাতি, বাঙালি প্রতিবাদী জাতি, বাঙালি সংগ্রামী জাতি; সত্য। আরো বেশি সত্য বাঙালি অসৎ, চোর, দুর্নীতিপরায়ণ, পরচর্চাপ্রিয় এবং গুজবপ্রবণ জাতি! সেন থেকে শেখ হাসিনা- সবার শাসনামলেই বঙ্গদেশে গুজব ডানা মেলে উড়েছে, উড়ছে। গ্রামের আটপৌরে অশিক্ষিত নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে নগরের শিক্ষিত বহু মানুষ যুগে যুগে এই গুজবের শামিয়ানার নিচে শামিল হয়েছে, এখনও হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বলাবাহুল্য যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এইসব গুজবের পিছনে লুকিয়ে থাকে মিথ্যা। কখন কখনো হয়তো থাকে কিছু সত্য। কিন্তু সে সত্য হয় শুক্রাণুসম, কান থেকে কানান্তর হতে হতে তাতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জোড়া লাগে, আর ক্রমাণ্বয়ে মানুষের অজ্ঞতা মিথ্যা গুজবকে করে তোলে মহাশক্তিধর এবং তাকে সত্য বলে ইতিহাসে স্থান দেয় ! কানাডিয়ান লেখক L.M. Montgomery বলেছেন-“Gossip, as usual, was one-third right and two-thirds wrong.”

বোধকরি, পৃথিবীর সকল জাতি, সকল ভাষার মানুষ-ই কমবেশি গুজবপ্রবণ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গুজবের নাম-ঈশ্বর, আল্লাহ বা গড। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য শত শত কোটি মানুষ এই গুজবটি বিশ্বাস করেছে, এখনো করে! এই গুজবটির হাত ধরে পৃথিবীতে আরো বহু গুজবের জন্ম হয়েছে। ধর্ম গ্রন্থগুলি গুজবের আঁতুরঘর!

Bildergebnis für rumors

হিন্দুধর্মে বলা হয়েছে-পৃথিবীর পাপভার মোচন, অধর্ম নাশ এবং ধর্মসংস্থাপনের জন্য ঈশ্বর বিভিন্ন সময়ে অবতাররূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। হিন্দু ধর্মে ঈশ্বরের দশ অবতার হচ্ছে- মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ ও কল্কি। হিন্দুরা বিশ্বাস করে যে প্রথম নয়জন পৃথিবীতে অবির্ভূত হয়েছিলেন, কলিকালের শেষে পৃথিবী যখন পাপে পূর্ণ হবে, তখন দশমজন আবির্ভূত হবেন। এসব ঋষিদের কল্পনাপ্রসূত গল্প, কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। আদতে রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ এরা ভালো-মন্দ গুণের অধিকারী আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন। অথচ মানুষ এই কল্পকাহিনীগুলো যুগে যুগে বিশ্বাস করেছে আর গুজব ছড়িয়েছে, অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে যে আজকের এই বিজ্ঞানের যুগেও মানুষ এইসব কল্পকাহিনী বিশ্বাস করে!
ধর্ম গ্রন্থের এরকম হাজারো গুজব এখনো হিন্দুরা বিশ্বাস করে। বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাক বা না থাক তারা বিশ্বাস করে যে দূর্গার দশ হাত ছিল, রাবণের দশ মাথা ছিল; রাবণের সঙ্গে যুদ্ধকালে লক্ষ্মণ আহত হলে তার জন্য ঔষুধি আনতে গিয়ে হনুমান ঔষধিবৃক্ষ চিনতে না পেরে আস্ত পর্বতটি-ই তুলে হাতে করে নিয়ে এসেছিল; পঞ্চপাণ্ডবের মা কুন্তী কান দিয়ে প্রসব করেছিলেন অঙ্গরাজ কর্ণকে ইত্যাদি।
আসলে এসবই গুজব!

খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে মাতা মেরি পবিত্র আত্মার প্রভাবে অলৌকিক উপায়ে যিশুকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন। বিজ্ঞান কি বলে, শুক্রাণু আর ডিম্বানুর মিলন ব্যতিত গর্ভধারণ সম্ভব? আজ থেকে দুই হাজার বছর আগে টেস্টটিউব বেবির ধারণা, জ্ঞান এবং প্রযুক্তি কোনোটাই ছিল না যে আমরা বিশ্বাস করবো মাতা মেরীর ডিম্বানু এবং কোনো পুরুষের শুক্রাণু নিষিক্তকরণের পর তা মেরীর জরায়ুতে সংস্থাপন করার ফলে যিশুর জন্ম হয়। তখনকার দিনে সন্তান উৎপাদনের একমাত্র উপায় ছিল নারী-পুরুষের যৌনমিলন। একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে কুমারী মেরী কোনো পুরুষের সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছিলেন, যার ফলে তিনি গর্ভ ধারণ করেছিলেন এবং যিশুকে জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু মেরী কুমারী ছিলেন তাই সমাজে কলঙ্ক হবে ভেবে মিথ্যে গুজব ছড়ানো হয় যে মেরী অলৌকিকভাবে গর্ভবতী হয়েছিলেন। একজন নারী একজন পুরুষের সঙ্গে শুয়েছিলেন, গর্ভবতী হয়েছিলেন এবং সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। এতে কলঙ্ক বা দোষের কিছু নেই, এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। একজন মানুষ বিয়ের আগে সন্তানের জন্ম দেবে, নাকি বিয়ের পরে সন্তানের জন্ম দেবে, নাকি সন্তানের পিতা-মাতা হয়েও আজীবন তিনি অবিবাহিত থাকবেন, সেটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে পাপ বা অপরাধ খোঁজা অসভ্য-মূর্খের কাজ। অথচ এই সহজ সত্যটি লুকিয়ে খ্রিষ্টানরা আজও পবিত্র আত্মার প্রভাবে মেরীর গর্ভধারণ এবং যিশুর জন্মদানের মিথ্যা গুজব বিশ্বাস করে এবং প্রচার করে!

যিশুর জন্ম নিয়ে যেমনি গুজব ছড়ানো হয়েছে, তেমনি মৃত্যু নিয়েও রয়েছে গুজব। যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছিল শুক্রবারে, পরবর্তীতে যিশুর অনুসারীরা গুজব ছড়ায় যে এর দুইদিন পর অর্থাৎ রবিবারে যিশু পুনর্জীবন লাভ করে তাদের মাঝে ফিরে এসেছিলেন এবং চল্লিশদিন ব্যাপী যিশু তার অনেক শিষ্যকে দেখা দেন। এরপর যিশু স্বর্গে চলে যান এবং ঈশ্বরের দক্ষিণ হস্তের পাশে অধিষ্ঠান করেন। এই মিথ্যা গুজব বিশ্বাস করে খ্রিষ্টানরা এখনো যিশুর পুনরুত্থান দিবস হিসেবে ‘ইস্টার সানডে’ পালন করেন।

মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে কোরান আল্লাহ প্রদত্ত ঐশ্বরিক গ্রন্থ! ডাঁহা মিথ্যা কথা। কোরান কোনো ঐশ্বরিক গ্রন্থ নয়, এগুলো মুহাম্মদের নিজের কথা, তিনি নিজেকে নবী হিসেবে প্রতিষ্ঠার লোভে সমাজের মানুষের কাছে এই মিথ্যা গুজব রটিয়েছিলেন। তার আরও একটি উল্লেখযোগ্য মিথ্যা গুজব হলো-বিবাহিত চাচাতো বোন উমহানির ঘর থেকে একরাতে তিনি মেরাজে গিয়েছিলেন, অর্থাৎ তিনি বোরাকে চেপে ঊর্ধ্বাকাশে আল্লাহ’র সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। বাস্তবে যা অসম্ভব। মুহাম্মদ হয়তো এই ধরনের দৃশ্য কল্পনা করতেন যে কোনো একদিন আল্লাহ তার কাছে ফেরেশতা প্রেরণ করবেন, ফেরেশতারা বোরাক নিয়ে তাকে আমন্ত্রণ জানাবেন আল্লাহ’র কাছে যাবার জন্য আর তিনি বোরাকের পিঠে চেপে আল্লাহ’র সাথে দেখা করতে যাবেন। কুরাইশরা যখন তাকে নবী হিসেবে অস্বীকার করে তার প্রবর্তিত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছিল না, তখন তিনি তার কল্পনাকে বাস্তব বলে কুরাইশদের কাছে প্রচার করেন যাতে কুরাইশরা তাকে নবী হিসেবে মেনে নেয়।
শতাব্দীর পর শতাব্দী মুসলিমরা মুহাম্মদের এই মিথ্যা গুজব অন্ধভাবে বিশ্বাস করেছে এবং এই বিজ্ঞানের যুগে এখনো বিশ্বাস করছে! ইসলাম ধর্মগ্রন্থগুলোতে এরকম আরো অনেক গুজব আছে। বর্তমান পৃথিবীতে মুসলিমদের ছড়ানো বহুল প্রচারিত একটি মিথ্যা এবং হাস্যকর গুজব হচ্ছে-‘ইসলাম শান্তির ধর্ম !’

গুজবের জন্ম সম্পর্কে বৃটিশ লেখক Paul Scott বলেছেন- “Rumors began with the whispered gossip of native servants and spread quickly to the rest of the population.”

Paul Scott এর কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বেশিরভাগ ধর্মই শুরুতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সমাজের নিন্মশ্রেণির মানুষের দ্বারা। তারপর ক্রমশ তা ছড়িয়েছে সমাজের অন্যান্য শ্রেণিতে। এখনো মাজারের পীর-ফকির বা সাধুরা শুরুতে গ্রহণযোগ্য হয় সমাজের নিন্মশ্রেণীর মানুষের কাছে, পর্যায়ক্রমে গৃহীত হয় সমাজের অপেক্ষাকৃত উঁচু শ্রেণির মানুষের কাছেও।
আবার উল্টোচিত্রও আছে, সমাজের বিত্তবান শ্রেণি থেকেও গুজব ছড়ানো হয়। এক্ষেত্রে গুজব ছড়ানোর মাধ্যম সংবাদপত্র বা টেলিভিশন। রাজনীতিবিদরা তাদের পোষ্য সাংবাদিক দিয়ে নিজেদের অপরাধগুলো আড়াল করে সুনাম ছড়ায়, যা আসলে গুজব, মিডিয়ার মাধ্যমে এই গজব ছড়িয়ে পড়ে সমাজের নিন্মবিত্ত মানুষের মাঝেও। এছাড়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে রঙ ফর্সা করা ক্রিম কিংবা ভেজাল খাবারের সুনাম করে গুজব ছড়ায় সমাজের উচ্চবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এক্ষেত্রে মাধ্যম হিসেবে কাজ করে ইতরশ্রেণির অর্থপিশাচ সিনেমা-টিভির অভিনেতা বা মডেল নামক গর্ধভগুলো! এরা খুব সুললিতভাবে গুজব ছড়ায় আর মানুষ এদের বিশ্বাস করে ঠকে।

যারা গুজব ছড়ায় তারা ব্যক্তিগতভাবে সবসময়ই যে খুব একটা লাভবান হয় তা নয়। তবে অন্যের ক্ষতি হয়, সমাজের ক্ষতি হয়। উদ্দেশ্য যদি তাই হয়, তবে তারা অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়। কেউ কেউ অন্যের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে গুজব ছড়ায়-‘এই জানিস…..তুই কিন্তু আবার কাউকে বলিস না।’ ‘এই জানিস’ বলে শুরু হলো…হেঁশেল থেকে চায়ের দোকান, বেডরুম থেকে কর্মস্থল, সব জায়গায় চলতে থাকে গুজব।

অনেকে গুজব ছড়ায় নিজে আলোচনায় থাকার জন্য। ভাল কাজ করে এরা আলোচনায় আসতে পারে না কখনও। তাই যে ভাল কাজ করছে বা করার চেষ্টা করছে তাকে নিয়ে গল্প ফাঁদে। তার কাজ নিয়ে মনগড়া আখ্যান রচনা করে (যথার্থ সমালোচনা নয়) রটিয়ে দেয় বাজারে। এগুলো মানুষ বিশ্বাস করে, কেউ কেউ ভাবে হলেও হতে পারে। গুজবে কান না দেওয়ার মানুষের সংখ্যা নিতান্ত কম! অতএব কান থেকে কানান্তর হয়ে গুজব আরো বিস্তীর্ণ হতে থাকে। যার সম্পর্কে গুজব রটানো হয়, সে যে-সমাজের মানুষই হোক না কেন, ক্ষতি হয় তার। আমাদের শহুরে সমাজে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বিনোদন জগতে গুজব এক অতিপ্রজ বিষয়! আর কিছু সাংবাদিক সারাক্ষণ গুজবের সুতো খোঁজে। সুতোর আলটা পেলেই তা দিয়ে মোক্ষম এক দড়ি বানিয়ে ফেলে! মানুষ তা ভয়ানকভাবে বিশ্বাস করে!
আয়্যায়ল্যান্ডের কবি, নাট্যকার, সাহিত্যিক Richard Brinsley Sheridan বলেছেন-“Tale-bearers are as bad as the tale-makers.”

আর আজকাল গুজব ছড়ানোর এক সুলভ মাধ্যম হয়েছে ফেসবুক-ইউটিউব। কেউ একজন তার ব্যক্তিগত অপছন্দের জায়গা থেকে কোন বিখ্যাতজন কিংবা সাধারণ কারো সম্পর্কে একটা কিছু লিখে দিলেই হলো, আগামাথা কিছু না বুঝে, যার সম্পর্কে বলা হয়েছে তার সম্পর্কে না জেনে, পটা পট লাইক দিতে শুরু দেয়। নির্বোধ মন্তব্য করে এবং তা আরো হাজার জনের মধ্যে শেয়ার করে। শত শত লাইক আর কমেন্টের বন্যা বয়ে যায়। কেউ একবার তলিয়ে দ্যাখেনা, কথাটা কতোটুকু সত্য! যে লোকটির সম্পর্কে লেখা হয়েছে এহেন পরিস্থিতিতে তার কতোটা ক্ষতি হতে পারে! বৃটিশ লেখক Richard Llewellyn বলেছেন- “Bad news has good legs.” আগে দুইটা ভাল পা থাকলে, এখন প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে হাজার পা হয়েছে!

বলা বাহুল্য, যে সমাজ যতো পশ্চাৎপদ, অশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সেই সমাজে গুজব ছড়ানো এবং তা বিশ্বাস করার লোকও বেশি। ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি মানুষ গুজবের পিছনে কীভাবে ছুটছে এবং অকাতরে টাকাও ঢালছে। অমুক জায়গার অমুক মূর্তি দুধ পান করে, ছোটো তার পিছনে। অমুক পীরের পানিপড়ায় রোগমুক্তি হয়, দৌড়ে যাও সেখানে। চাল পড়া, বাটি চালান, চটা চালান আরো কতো কী! ১৯১৫ সালে রোগমুক্তির আশায় রাজবাড়ীর (তখন ফরিদপুর জেলা) মাছপাড়ার একটা পুকুরের জল পান করার জন্য নানা জায়গা থেকে লোকজন ছুটে আসতো। একপর্যায়ে লোকজনের ভিড় সামাল দিতে রেল কর্তৃপক্ষকে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। পুকুরটির নাম মালো ভাগ্যবানের পুকুর। সে ইতিহাস বলতে গেলে লেখা দীর্ঘতর হবে।

আমাদের জাতীয় জীবনেও আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থেকেছে গুজব। সেই পাকিস্থান আমল থেকে আজ অব্দি ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা সাধারণ মানুষের মধ্যে নানান রকম গুজব রটিয়েছে। প্রগতিবাদী, মুক্তিকামী মানুষকে বানিয়েছে নাস্তিক, কম্যুনিস্ট, কাফের, ভারতের চর। এক্ষেত্রে অবশ্য তারা সাময়িকভাবে বেশ সফলও হয়েছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা বিরোধীরা বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদকে বানিয়েছিল ত্যাজারাম সিং। কখনও তাঁকে বলেছে হিন্দু, কখনও বলেছে শিখ, কখনো বলেছে-তাজউদ্দিন ভারতীয়। এই মানসিকতা আজও চলছে। অনেকেই বিশ্বাস করে শেখ হাসিনা ভারতের দালাল, এদেশের বহু মানুষকে ভারতের দালাল বলে মিথ্যা গুজব রটানো হয়।

আমার এক বন্ধুর বাসার কাজের বুয়া বলতো, ‘হাসিনা তো হিন্দু।’
বন্ধুর মা বলেছেন, ‘হাসিনা কখনও হিন্দুদের নাম হয়?’
‘হইবো না ক্যান? সবাই তো তাই কয়।’
‘হাসিনা হিন্দু’ এই মিথ্যা গুজব আজও ছড়ানো হয় অশিক্ষিত নিন্মবিত্ত মানুষের মাঝে!

উন্নত দেশের বিজ্ঞানমুখী মানুষ মহাকাশে- চাঁদে যাচ্ছে। আর আমাদের দেশে এমন লোকও আছে যারা বিশ্বাস করে কুখ্যাত খুনি-রাজাকার দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে। তা নিয়ে হাতাহাতি-মারামারিও হয়েছে। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে পুরো ’১৩ সাল, এক ভয়ঙ্কর গুজবপাখি উড়েছে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে। আর সেই পাখির মুখনিস্রিত আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে কক্সবাজারের অসংখ্য বৌদ্ধমন্দির, সারা বাংলাদেশের অসংখ্য হিন্দুর মন্দির, ভিটে-মাটি, তুলসীতলা। গুজবপাখির হাত থেকে নিস্কৃতি পায়নি মুসলমানও। ঝরেছে মানুষের জীবন। সাতকানিয়ায় মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে গেছে অসংখ্য মোটরসাইকেল, গাড়ি। জীবন বিপন্ন হয়েছে। ’১৩ সাল জুড়ে এমন আরো কতো ঘটনা।

আর গণজাগরণ মঞ্চের কথাই বা বাদ দিই কেন! গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে যে সমস্ত গুজব ছড়ানো হয়েছে তা নিয়ে ভাবীকালের কবি সাহিত্যিকেরা মহাকাব্য লিখতে পারবে। হয়তো লিখবেও। তবে তা যেন হয় গুজবের আগ্রাসন মুক্ত। নিপাট সত্য।

গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে একটা শ্রেণি রাজনৈতিক স্বার্থে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে গুজব রটিয়েছে। তাদের কথা বাদ দিলাম। কিন্তু শিক্ষিত কিছু মানুষ, তারাও এই গুজব বিশ্বাস করেছে এবং গুজবের বিস্তৃতি বাড়িয়েছে! তারা একটিবারও ভেবে দেখলো না, তাদের মনে প্রশ্ন জাগলো না, শুধু বিরিয়ানী খাবার লোভে এতোগুলো ছেলে-মেয়ে দিন-রাত ওখানে পড়ে থাকবে কেন? ওদের শরীরের পোশাক দেখেও তো বোঝা যায়, ধনীর দুলাল না হোক, সামান্য বিরিয়ানী খাবার সামর্থ্যটুকু ওদের যথেষ্ট-ই আছে। বোধিবৈকল্যের কারণে এই প্রশ্নগুলো অনেকেরই জাগে না মনে।

আমি যেহেতু সাহিত্যের মানুষ, সাহিত্য দিয়েই শেষ করি। বাংলা সাহিত্যেও সবসময়েই কমবেশি গুজব হয়েছে। অমুক কবি, তমুক কবিকে নিয়ে, তমুক লেখক অমুক লেখককে নিয়ে। তবে ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে সজনীকান্ত দাসের ‘শনিবারের চিঠি’। জীবনানন্দ, নজরুল কেউ-ই রেহাই পাননি সজনীকান্ত’র হাত থেকে। কুৎসা রটনা ছাড়াও তাঁদের কবিতার প্যারোডি করে ছাপতেন শনিবারের চিঠিতে। যা একরকম গুজব-ই। এ থেকে আমরা সজনীকান্তের অত্যন্ত নিন্ম রুচির পরিচয় পাই।

গুজব রটাতে সময়ের অপচয় হয়, মেধারও খরচ হয়। সময়ের আবর্তে বিখ্যাত গুজব রটনাকারীরও স্বরুপ উন্মোচিত হয় মানুষের মাঝে, অতঃপর নিক্ষিপ্ত হয় ইতিহাসের আস্তাকুড়ে! জীবন খুব ছোট, সময় অতি মূল্যবান, গুজব ছড়িয়ে সময়ের অপচয় না করে নিজকর্ম করাই শ্রেয়।

গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন- “Strong minds discuss ideas, average minds discuss events, weak minds discuss people.”

এখন আপনি নিজেকে কোন শ্রেণির মানুষে উন্নীত অথবা পতিত করতে চান, সেটা নির্ভর করছে আপনার নিজেরই ওপর।

শেষ করবো আমাদের কবি শামসুর রাহমানের কবিতা দিয়ে। গুজব বিষয়ে কবি তার অসাধারণ ভাবনা তুলে ধরেছেন ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতায়-

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা গেল উড়ে,
কান না পেলে চার দেয়ালে মরব মাথা খুঁড়ে।
কান গেলে আর মুখের পাড়ায় থাকল কি-হে বল?
কানের শোকে আজকে সবাই মিটিং করি চল।
যাচ্ছে, গেল সবই গেল, জাত মেরেছে চিলে,
পাঁজি চিলের ভূত ছাড়াব লাথি-জুতো কিলে।
সুধী সমাজ! শুনুন বলি, এই রেখেছি বাজি,
যে-জন সাধের কান নিয়েছে জান নেব তার আজই।

মিটিং হল ফিটিং হল, কান মেলে না তবু,
ডানে-বাঁয়ে ছুটে বেড়াই মেলান যদি প্রভু!
ছুটতে দেখে ছোট ছেলে বলল, কেন মিছে
কানের খোঁজে মরছ ঘুরে সোনার চিলের পিছে?
নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে;
কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে।
ঠিক বলেছে, চিল তবে কি নয়কো কানের যম?
বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম।

মিশু মিলন
ঢাকা,
নভেম্বর, ২০১৪

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 5