ইসলামিক বিজ্ঞান চর্চা – ০১

মাদ্রাসার পাঠ্যসূচী যতই আধুনিক করা হোক, আমরা কি কোনদিন পারবো আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত  বিজ্ঞানমনস্ক একটি প্রজন্ম উপহার দিতে?  যারা ধর্মগ্রন্থ খুলে দেখার সুযোগ পান না, পুরো ধর্মগ্রন্থ খুলে পড়ার সময় করতে পারেন না, তাদের জন্যেই এই লিখা।

ইসলামিক বিজ্ঞান চর্চা: ০১

আমরা জানি, পৃথিবীর দুই ধরণের গতি আছে। একটির নাম আহ্ণিক গতি, অপরটির নাম বার্ষিকগতি। ঋতু পরিবর্তনের কারণ হচ্ছে বার্ষিকগতি। পৃথিবী একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরছে, শুধু তাই নয়, পৃথিবীর তার অক্ষের সাপেক্ষে ২৩.৫ ডিগ্রী কোণে হেলে থেকে এই উপবৃত্তাকার পথ অতিক্রম করে থাকে। এই কারণে, বছরের বিভিন্ন সময়ে গোলার্ধগুলিতে ভিন্ন ভিন্ন ঋতুর আবির্ভাব ঘটে থাকে। এখানে জটিল কোন কথা নেই। কথাগুলি সহজ-সাবলীল বক্তব্য।

আপনি যদি ঈশ্বর মনোনীত ধর্মপ্রচারক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার কাছে এই সাধারণ তথ্যটুকু থাকা বাঞ্ছনীয়। যেহেতু আপনি দাবি করেছেন যে, আপনার সাথে ঈশ্বরের দৈব বাণী আদান-প্রদান হয়, কাজেই আপনার কাছে ঠিক তথ্যটি আসা জরুরী।

ইসলাম ধর্মের ধর্মপ্রচারক হযরত মুহম্মদ(দ) কে যখন শীত-গ্রীষ্মের কারণ জিজ্ঞেস করা হল, তিনি বললেন, জাহান্নাম যখন শ্বাস ফেলে তখন গরম লাগে বা গ্রীষ্মকাল আসে, আর জাহান্নাম যখন নি:শ্বাস নেয় তখন শীতকাল আসে বা জাহান্নাম পৃথিবীর সব গরম নিজের মধ্যে টেনে নেয়! এই ধারণা তার কেন হল? আমরা যখন শ্বাস ফেলি সেটা কিছুটা উষ্ণ থাকে, জাহান্নামের শ্বাস ফেলার সংগাটা তাই উনার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া বানানো গল্প মাত্র।

কথার কথা যদি ধরে নিই, এই শিশুতোষ বক্তব্যটি সত্যি, তাহলেও থেকে যাবে বড়সড় তথ্যগত ত্রুটি। জাহান্নাম শ্বাস ফেললে পৃথিবীর সর্বত্রই বছরের একই সময়ে শীত-গ্রীষ্ম থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে পৃথিবীর সবস্থানে গরম-শীত একই সাথে হয় না। বরং পৃথিবীর ২৩.৫ ডিগ্রী কোণে হেলে থাকার কারণে বছ‌রের এক‌টি নি‌র্দিষ্ট দি‌নে পৃ‌থিবীর ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ঋতু দেখা যায় (গুগল থেকে নেয়া ছবি দ্রষ্টব্য)। কাজেই জাহান্না‌মের কথিত শ্বাস-প্রশ্বাসের শিশুতোষ গল্পের সাথে শীত-গ্রীষ্ম বা ঋতু পরিবর্তনের কোন সম্পর্ক নেই।

হাদীস: ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত, সহীহ মুসলিম, ২য়খন্ড, পৃ: ৪০৮

এখন, হাদীস-কোরানকে বিজ্ঞান বইয়ের পাশে রেখে সম্পূর্ণ দুই ধরণের বক্তব্যকে সামনে রেখে কীভাবে একটি মাদ্রাসার ছাত্র আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিবে?

জাহান্নামের কাঁটাযুক্ত যাককুম গাছ, আগুনের ছ্যাঁকা, রুটিবেলার মতো ডলা দেয়া, গরম পানির ছিটিয়ে বা চুবিয়ে দেয়া, ইত্যাদি শাস্তির ’ব্ল্যাকমেইলিং’ সূচক গল্পের ভয়ে একটি শিশু হয়তো শেষ পর্যন্ত হাদীসের পাশেই থাকবে! কিন্তু এটা কি একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া হতে পারে? পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ঋতু পরিবর্তন এর বিজ্ঞানসম্মত যে কারণ আছে, তা জানার পরও মাদ্রাসার একটা শিক্ষার্থীকে ধর্ম রক্ষার খাতিরে বিজ্ঞানকে অস্বীকার করতে হবে? সবচেয়ে বড় কথা এই দেশের একজন শিক্ষার্থী কেন ভুল কথা শিখবে? আমরা কী করে ভুল তথ্যযুক্ত শিক্ষাকে সমর্থন করতে পারি! এভাবে কি অজ্ঞতার চোরাবালিতে তলিয়ে যেতে থাকবে একটা প্রজন্মের বিরাট একটা অংশ?

নবীর দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কথাকে ”রূপক” বলে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করবেন না যেন!
রোমান সাম্রাজ্যের কোল ঘেঁষে আরবদের ব্যবসা-বাণিজ্যের খাতিরে অল্প-বিস্তর বিজ্ঞান চর্চার সংস্পর্শ তারা পেয়েছিল, ফলে আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে খুব সামান্য কিছুর মিল যখন পাওয়া যায় তখন চেঁচিয়ে বলেন যে, ”দেখছেন ভাই! ১৪০০ বছর আগেই বলা আছে”, অথচ হজভট লাগলে আমতা আমতা করে বলবেন “ এটা ভাই রূপক কথা”; তা তো হয় না রে ভাই! নবীর কি ঠেকা পড়েছিল যে, সহজ কথাকে পাশ কাটিয়ে ”রূপক” নামের উদ্ভট গল্প শোনানোর?

দয়া করে এমন ভাব দেখাবেন না যে, ১৪০০ বছরের আগের মানুষটা পৃথিবীর বার্ষিকগতির খবর জানতো, এতবড় চমকপ্রদ একটা নিউজ জানার পর নিশ্চয়ই তিনি উনার দলবলকে কোন না কোনদিন শেয়ার করতেন। যেহেতু তিনি জানতেন না, তাই “জাহান্নামের শ্বাস-প্রশ্বাস” নামের উদ্ভট গল্প দিয়ে পাবলিকের কৌতূহলকে সামাল দিয়েছেন মাত্র, এর বেশি কিছু নয়।

কাজেই মাদ্রসাগুলিকে  সাধারণ স্কুল-কলেজে রূপান্তরিত করা প্রয়োজন এই জন্যে যে, একটি উন্নত বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনের কোন বিকল্প নেই। এমনকি, স্কুল-কলেজের ধর্ম-শিক্ষাকেও করে দিতে হবে ’ঐচ্ছিক বিষয়’ হিসেবে।

 

 

ফেসবুক মন্তব্য

১ thought on “ইসলামিক বিজ্ঞান চর্চা – ০১

  1. হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের (সাঃ) নাকের সামনে মুশরিকার ‘মুলা’ ঝুলিয়ে ছিল, ১৪০০ বছর আগে। ‘মুলাটা’ ছিল ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, ক্ষমতা, নারী ইত্যাদি। এখনেও দেখছি ‘মুলা’ ঝুলানো হয়েছে! আর ‘মুলাটা’, ‘বিজ্ঞান’। আমার, শাহ আব্দুল আজিজ (র:) একটা ঘটনা মনে পড়ছে। একদিন তিনি তাঁর মাদ্রাসায় বসেছিলেন। তখন তাঁর কছে এক লোক এল, যার বিজ্ঞানের উপর যথেষ্ট দক্ষতা ছিল। সাথে তার পাঁচ ছয় বছরের একটি ছেলে ছিল। সে বলল, হযরত, আপনারা আপনাদের ছেলেদের আরবি, কুরআন, হাদীস, ফিকহ ইত্যাদি শিক্ষা দেন। কেন তাদেরকে বিজ্ঞান, অংক, ভূগোল ইত্যাদি শিক্ষা দেন না, যাতে তাদের চিন্তার জগতটা বিস্তৃত হয়? শাহ আব্দুল আজিজ (র:) তখন তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কিভাবে তাদের চিন্তার জগতটা বিস্তৃত হবে? লোকটি বলল, আমার ছেলেকে দেখুন। মাত্র পাঁচ বছর বয়স, সে বিজ্ঞান, অংক, ভূগোল পড়ে এবং তার চিন্তার জগতটা বিস্তৃত। শাহ আব্দুল আজিজ (র:) ছেলেটিকে বলল, তুমি কি পুকুরটা দেখতে পাচ্ছ? ছেলেটি বলল, হ্যাঁ। তখন হযরত তাকে বললেন, বলত ঐ পুকুরে কত কাপ পানি আছে? প্রশ্নটি শুনে ছেলেটি স্তব্ধ গেল। বলল, আমি জানি না। হযরত বলল ঠিক আছে। তারপর তিনি তাঁর মাদ্রাসার এক ছাত্রকে ডাকলেন। একই বয়সের, একই লেভেলের এবং জিজ্ঞাসা করলেন, বলতো ঐ পুকুরে কত কাপ পানি আছে? তখন ছেলেটি উত্তর দিল, হযরত কাপের আকার যদি পুকুরের সমান হয়, তবে এক কাপ। আর অর্ধেক হলে, দুই কাপ।

    আমরা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে সবচেয়ে উন্নত হিসেবে যে জাতিটিকে জানি তা হচ্ছে ‘আমেরিকান’। এরা এদের দলনেতা মানে প্রেসিডেন্ট হিসেবে যাকে নির্বাচিত করেছে ,স্রেফ ‘আহাম্মক’। ডোনাল্ড ট্রাম্প। জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত আমেরিকানরা দলনেতা বানিয়েছে, একটা ‘আহাম্মককে’! ‘সায়েন্টিফিক গাধা’ বা ‘জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত গাধা’ বা ‘শিক্ষিত সার্টিফিকেটধারী গাধা’ আরকি!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 4 =