জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-83

আমার গাঁ যেখানে সূর্যালোকিত সব সিন্ধু-পাখিদের শব্দ শুনি

:

খরস্রোতা মেঘনার তীরেই আমার গাঁয়ের বাজার। মূল বাজারটি নেই এখন, বাজারের বুক চিরে এখন বড় বড় জাহাজ আর নৌকো চলাচল করে, মাছেরা সম্ভবত সুখের সংসার পেতেছে আমার কৈশোরের বাজারের মাঠে। এখন বাজার অনেকটাই ট্যাম্পোরারি, প্রতি বছর নদীর ভাঙনে বাজার স্থানান্তরিত হয় লোকালয়ে। তাই সব দোকানই এখন অস্থায়ী বাঁশের খুটিতে তৈরি। বিকেল থেকেই স্থানীয় কৃষক আর জেলেরা জলস্রোতের পাশের বাজারে গিজগিজ করে। কারণ কোথাও্ যাওয়ার যায়গা নেই তাদের। তাই রাত নটা পর্যন্ত বাজারেই বসে নানাবিধ গল্প করে তারা। অন্ধকার আর আলোর সপ্তপদি জীবনের গল্প। কেউ সোলারে লাগানো সাদাকালো টিভি দেখে, কেউবা শহর থেকে আনা একদিনের পুরণো খবরের কাগজ পড়ে শোনায় অন্ধকারাচ্ছন্ন কৃষাণ-ধিবরদের। ইসলাম ধর্মে বাজারকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থান বলেছেন ইসলামের নবী, শয়তান নাকি বাজারে ডিম পাড়ে! তা স্মরণ করি আমি নিভৃতে!

 

আমি ঢাকা থেকে দ্বীপগাঁয়ে গেলেই সারাদিন ঘুরে বেড়াই খেত খামার আর নদীর তীর ঘেষে কৃষাণ আর জেলেদের ঘরে ঘরে। গোধুলিলগ্লে নদীতীরের নানারঙের নৌকো আর ঢাকাগামি লালনীল রঙের আলোক মালায় সজ্জিত বিলাশবহুল ত্রিতল লঞ্চ চলে যায় আমাদের স্বাপ্নিক বাজার ঘেষে। একটা চায়ের দোকানে বসি আমি মানুষের মাঝে। আমাকে ঘিরে থাকে আমার চিরচেনা বয়স্ক আর নতুন কিশোরেরা, যারা রাতে টর্চের আলোতেও ধান কাটে, খেতে কাজ করে, মাছ ধরে মেঘনায় ঝড় জলে। তাদের শোনাই বৈশ্বিক মানুষের গল্প, জীবন উন্নয়ন আর শিক্ষার কথা, কম শিশু নেয়ার সুফলতা। মৌলভী টাইপের দুজন আমার অবস্থান থেকে উঠে অন্য দোকানে বসে বিরক্তিসহ, যারা এতোক্ষণ শোনাচ্ছিলেন ধর্মীয় পবিত্র বাণী কৃষাণদের।

 

আমি নানাদেশ নানা মানুষের গল্প বুনে যাই জীবন বুননে গ্রামীণ মানুষের সামনে। গভীর আগ্রহে শোনে তারা চীন, তাইওয়ান, বাহামা, হাওয়াইর গল্প। মহিষের ঘন দুধের চা মাত্র ৩ টাকা প্রতি কাপ ওখানে, একটা “লাঠি বিস্কুট”সহ ৫ টাকা। আমি সবাইকে বিস্কিটসহ চা দিতে বলি। গ্রামীণ অস্থায়ী দোকানে এতো কাপ-গ্লাস থাকে না, তাই কয়েক দফায় চা দিতে হয় সবাইকে পালা করে, কেউবা পানির গ্লাসে চা খায়। গ্রামীণ জনপ্রিয় লাঠি বিস্কুটের সর্ট পড়ে যায়, অন্য বিস্কুট দিয়ে কাজ সারেন দোকানি। ৯৩ জনের চা বিস্কিটের দাম ৪০০ টাকার মত হয়। অনেক টাকা আমি ঠকেছি জীবনের সর্বত্র, কত টাকা নিয়েছে প্রতারকরা স্বদেশ বিদেশে। তার মাঝে এ ৪০০ টাকা খরচ পৃথিবীর সবোত্তম খরচ বলে মনে হয় আমার। প্রতিটা গরিব মানুষের শব্দ করে চা-পান আমার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত মুখরতায় ঐকতান লহর তোলে কানে। কৃষকের কামড় দিয়ে বিস্কিট ভাঙার প্রতিটি শব্দ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অক্ট্রেষ্ট্রাকে হার মানায়। পোশাকহীন জেলেশিশুর রিণরিণে কান্না আমার কাছে ভায়োলিন কিংবা সেক্সোফোনের সুরকেও ধোয়াশা করে।

 

নদীতীরের শীতল রাত গভীরতর আর ঘন হয়। আমার স্বজনরা সব অঘোরে ঘুমোয় নদীতীরের দোতলা কাঠের পাটাতন ঘরে। রাতের নিস্তব্দতা ভেদ করে প্যাঁচারা ডেকে ওঠে, মাছেরা কেলি করে জলতলে, শিশিরেরা টুপটাপ কথা বলে নিশুতি রাতে ঘাসের পাতায়। আমি বন্ধ জানালা খুলে নদীর দিকে তাকাই। জলের নাচনে হঠাৎ জীবনানন্দ দাশের কবিতা ভেসে উঠে জলের ওপরে। জলেরা জোৎস্নাভেজা রাতে করুণ কোরাসে গাইতে থাকে-

 

“কোথাও পাখির শব্দ শুনি;
কোনো দিকে সমুদ্রের সুর;
কোথাও ভোরের বেলা র’য়ে গেছে – তবে।
অগণন মানুষের মৃত্যু হ’লে – অন্ধকারে জীবিত ও মৃতের হৃদয়
বিস্মিতের মতো চেয়ে আছে;
এ কোন সিন্ধুর সুর:
মরণের – জীবনের?
এ কি ভোর?
অনন্ত রাত্রির মতো মনে হয় তবু।
একটি রাত্রির ব্যথা সয়ে –
সময় কি অবশেষে এ-রকম ভোরবেলা হয়ে
আগামী রাতের কালপুরুষের শস্য বুকে ক’রে জেগে ওঠে?
কোথাও ডানার শব্দ শুনি;
কোন দিকে সমুদ্রের সুর –
দক্ষিণের দিকে,
উত্তরের দিকে,
পশ্চিমের পানে?

সৃজনের ভয়াবহ মানে;
তবু জীবনের বসন্তের মতন কল্যাণে
সূর্যালোকিত সব সিন্ধু-পাখিদের শব্দ শুনি;
ভোরের বদলে তবু সেইখানে রাত্রি করোজ্জ্বল
ভিয়েনা, টোকিও, রোম, মিউনিখ – তুমি?
সার্থবাহ, সার্থবাহ, ওইদিকে নীল
সমুদ্রের পরিবর্তে আটলাণ্টিক চার্টার নিখিল মরুভূমি!
বিলীন হয় না মায়ামৃগ – নিত্য দিকদর্শিন;
যা জেনেছে – যা শেখেনি –
সেই মহাশ্মশানের গর্ভাঙ্কে ধূপের মত জ্ব’লে
জাগে না কি হে জীবন – হে সাগর –
শকুন্ত-ক্রান্তির কলরোলে”।

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 84]

 

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 4