জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-84

অলৌকিক টাকার মটকা

:

আমাদের বাড়ি সংলগ্ন একটা পরিত্যক্ত বেশ পুরনো পুকুর ছিল। যার জল ছিল কালো কুচকুচে! কোন মানুষ সেটাতে নামতো না ভয়ে। কারণ অনেক দিন আগের কথা! ঐ পুকুরে ছোট বাচ্চার পায়খানার কাপড় ধোয়ার সময কে নাকি তা হাত থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। যে নারীর হাত থেকে পায়খানার নোংরা কাপড় ছোঁ মারা হয়, তিনি ভয়ে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারান। নানাবিধ তেলপানিতে তার জ্ঞান ফেরার পর তিনি জানান যে, সোনার তবলা বা মটকা জাতীয় কোন প্রাণি তার হাত থেকে তার ছেলের কাঁথা কেড়ে নেন। রাতে ঐ নারী সপ্নে দেখেন যে, তার ঘর সোনা রূপার পানি দিয়ে পবিত্র করতে বলা হয়েছে, যাতে ঐ সোনার মটকা তার ঘরে আসতে পারে। পরদিন মহিলা তাই করেন এবং রাতে অপেক্ষা করতে থাকেন মটকাদের আগমনের। গভীর রাতে পুকুর থেকে পর পর সাতটি মটকা তার ঘরে চলে আসে, যার একটিতে ঢাকনা দেয়া ছিল তার কথিত কাঁথা। এ কাহিনি কাউকে না বলার জন্য অলৌকিক মটকারা তাকে নির্দেশ দেন। কিন্তু মেয়ে মানুষ বলে কথা। তিনি পরদিন রাতের সকল ঘটনা স্বামীসহ সকলকে বলে দেন। এর পর থেকেই ঐ নারী “রক্ত কাটার” এক জটিল রোগে আক্রান্ত হন এবং নানাবিধ কবিরাজ দেখানোর পরও সে ঐ রক্তকাটার রোগেই মারা যান। মার মুখে ঘুমের আগে অনেকবার এ গল্প শুনেছি আমি!

:

ঐ নারীর মৃত্যুর পর সকলের ধারণা হয় যে, কথিত ৭টি অলৌকিক মটকার অভিশাপে ঐ নারীর মৃত্যু হয়েছে। আর কথিত মটকাগুলো এখনো ঐ পুকুরে বহাল তবিয়তে বিদ্যমান। কেউ কেউ পুকুরের ঘাটে কখনো দেখেছেন বা রাতে ঝুম ঝুম আওয়াজ তুলে তাদের চলার শব্দও শুনেছেন। এবং ঐ ঘটনার পর থেকেই বড় পুকুরটি মূলত পরিত্যক্ত হয়। কালক্রমে ব্যবহার না করাতে পুকুরটিকে কচুরীপাড়ার জন্ম হয়। যা কয়েক বছরে তাদের বংশ বিস্তার করে একটি ব্যবহার উপযোগী পুকুরকে ব্যবহারের অনুপযোগী পুকুরে পরিণত করে। এমনকি শিশুরা ঐ পুকুরে ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে গেলেও পর্যন্ত নিষেধ করতো বড়রা। দূরন্ত আমিও কখনো মার কড়া নির্দেশে ঐ পুকুরে ছিপ ফেলতে পারিনি।

:

পুকুর ছাড়াও নানা বাড়ির পেছনে বড় বাগানে “ব্রাহ্ম দৈত্য” আর “পাতাল বসকি” নামে দুটো প্রাণি বাস করতো বলে নানাবাড়ির সকলে বিশ্বাস করতে। তাই বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কিংবা রাত বিরাতে ঐ বাগানে প্রবেশ করতোনা কে্উই। বরং ওঝা এনে প্রতিবছর বাড়ি বন্ধক দিতো নানাবাড়ির লোকজন, যাতে তাদের বাড়ি মুক্ত থাকে কথিত “ব্রাহ্ম দৈত্য” আর “পাতাল বসকি” থেকে। কৈশোরে ঐ বাগানে একবার গেলে মাও আমাকে ভয় দেখান “ব্রাহ্ম দৈত্য” আর “পাতাল বসকি” আমাকে ধরবে বলে। একদিন জয়নাল নামে আমাদের গ্রামের এক যুবকের লাশ পাওয়া যায় ঐ বাগানে। গ্রামে রেটে যায় যে, তাকে “ব্রাহ্ম দৈত্য” আর “পাতাল বসকি” মেরে ফেলেছে একাকি বাগানে প্রবেশ করার কারণে। জয়নালের স্বজনরা কোন থানা পুলিশ পোস্টমর্টেম ইত্যাদি না করিয়ে তাৎক্ষণিক কবরস্থ করেন জয়নালকে। বাগানের এককোনে একটা পুরনো কবরস্থান ছিল। সেই কবরের ওপর শাহজাহান নামে এক লোকের লাশ পাওয়া গেল এক ভোরে। গ্রামে রটে গেল “ব্রাহ্ম দৈত্য” আর “পাতাল বসকি” হত্যা করেছে শাহজাহানকে। ঐ বাগানের একদম শেষ মাথাতে একটা খাল ছিল। একদিন দেখা গেল একটা গরুর মুখ কাদার মধ্য ঢুকানো। গরুটি মৃত। রটে গেল এটা “ব্রাহ্ম দৈত্য” আর “পাতাল বসকি”র কাজ! পরবর্তীতে আমার ধারণা হয়েছিল জয়নাল, শাহজাহান বা গরুকে হত্যা করে হত্যাকারীরা রটিয়ে দেয় এটা পাতাল বসকির কাজ!

:

আমি যে বছর ক্লাস এইটে পড়ি, তখন আমাদের পুরো বাড়িতে মাটি দিয়ে উঁচু করার একটা প্রস্তুাব তোলেন আমার ইঞ্জিনিয়ার ভাই! যাতে বর্ষা ঋতুতে নদীর জোয়ার বাড়িতে না ঢুকতে পারে। কিন্তু সংকট দেখা দেয়, এতো মাটি পাবো কই। মাকে প্রস্তাব দিলাম, আমাদের বাড়ি সংলগ্ন পরিত্যক্ত হাজামজা পুকুরটি কাটিয়ে তা থেকে মাটি আনলে কেমন হয়? মা কথা বললেন পাশের বাড়ির পুকুর মালিকদের সাথে। তারা সম্মতি দিলেন এ শর্তে যে – পুকুর থেকে জল, কচুরীপানা সব তুলে ফেলবো আমাদের খরচে। তাতে কোন মাছ থাকলে তাও আমাদের। মাটি কাটার পর ভাল পুকুরটি তাদের বিনা খরচে ফিরিয়ে দিতে হবে। সাথে এও শর্ত ও সতর্ক করলো যে, যেহেতু পুকুরটাতে কথিত “টাকার মটকা’ বা এ জাতীয় অলৌকিক প্রাণি আছে, তাই ঐ প্রাণিরা যদি কোন ক্ষতি করে আমাদের, তাহলে তার দায় তাদের নয়।

মাকে বললাম –

– মা! এসব ফালতু কথা বিশ্বাস করোনা। এমন কোন প্রাণি জগতে নেই! তুমি পুকুর থেকে পানি তোলার ব্যবস্থা করো।

:

কৈশোর থেকেই মা আমার বুদ্ধিদীপ্ত কথাতে গুরুত্ব দিতেন। তাই দুটো জল তোলার ডিজেল পাওয়ার পাম্প ভাড়া করে পুকুরের ২-পাড়ে লাগানো হলো। একদিন একরাত জল তোলার পর শেষ হলো পুকুরের সব জল। কিন্তু মাটি কাটবে যারা সেই কোদালিরা, কেউ ভয়ে নামলো না কচুরীপানা তুলতে। পাছে কথিত “মটকা” তাদের আটকে ধরে। আমি আমার স্কুলের ১১-বন্ধুকে নিয়ে নামলাম পুকুরে প্রথম। কিছু কচুরীপানা তুলতেই প্রচুর মাছের সন্ধ্যান পাওয়া গেল। মা তাড়া দিয়ে আমাদের ৩ রাখালকে নামালেন। সাহস পেয়ে অপর ৪-জন মজুরও নামলো কচুরিপানা তুলতে। পুকুরের ২ তীরে স্তুপ করলো তারা অনেক বছরের বড় হওয়া কচুরিপানার দলগুলো। যেহেতু অন্তত ৩০-বছর এ পুকুরে কোন মানুষ নামেনি। তাই শোল, গজাল, শিং, মাগুর আর কই মাছের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল এ পুকুর। একেকটা কই মাছ পেকে লাল হয়ে অন্তত ৬/৭ ইঞ্চি লম্বা হয়েছিল। শোল গজার মাছুগুলো বয়সের ভারে একেকটা পেকে ১০/১২ কিলোতে পরিণত হয়েছিল। গাজার মাছের শরীরে এক ধরণের পোকা হয়েছিল। কারণ বেশি বয়স্ক গজার মাছে নাকি এমন পোকা হয়। এতো মাছ উঠানো হলো যে, আমাদের ঘরের সকল বড় ছোট পাত্র ব্যবহৃত হলো মাছ সংরক্ষণে।

:

যদিও পাশের বাড়ির সাথে চুক্তি মোতাবেক সকল মাছ আমাদের। তা ছাড়া মাছ ধরার লেবার কষ্ট ইত্যাদিও আমাদের ছিল। তারপরো বর্তমানের মত মানুষ এতোটা বৈষয়িক ছিলনা বলে, মা অর্ধেক মাছ ভাগ করে দিয়ে দিলেন পাশের বাড়ির পুকুর মালিকদের। ভাড়া করা লেবাররাও টাকার বদলে মাছ নিলো। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার, পুকুরে কথিত সোনার মটকার আর কোন খোঁজ মিললো না। মাকে বললাম

– মা! সম্ভবত এ পুকুরের বড় বড় শোল, গজাল মাছগুলো ঐ মহিলার গুর ত্যানা কামড়ে দৌঁড় দিয়েছিল। কারণ মানুষের গু শোল গজালের খুব প্রিয় খাবার!

আমার বুদ্ধিদীপ্ত কথা মার মনে ধরেছিল খুব। এবং ঐ বাড়ির লোকদের বোকামিতে আমরা হেসেছিলাম অনেকদিন অনেক আলোচনাতে। আজ এ পরিণত বয়সে এসব কথা মনে করে হাসি একাকি। হায়রে মানুষের মনন! আর তার বিশ্বাস!

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 85]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 3 =