যানবাহনে নারীদের সংরক্ষিত আসন, লজ্জার, নাকি গৌরবের?

বাসের মধ্যে লেখা থাকে, মহিলা এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন! (মহিলা এবং প্রতিবন্ধী) বিষয়টা বুঝতে হবে। এই লেখা দেখার পরেও যারা বলবেন বাংলার নারীরা স্বাধীন, বাংলার নারীরা স্বাবলম্বী, বাংলার প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী, স্পিকার নারী, সব জায়গায় নারীরা সমানভাবে কাজ করে।

সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষগুলোর জন্য, বাসের মধ্যে লিখে দেওয়া উচিত, প্রতিবন্ধী এবং পুরুষের জন্য সংরক্ষিত আসন। তাহলেই তারা বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য দিনদিন বাংলাদেশ নারীদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। এটার প্রধান কারণ ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে নারী বিদ্বেষী মনোভাব পুরুষদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। ওয়াজ মাহফিলগুলোতে সরাসরি বলা হয়, নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়া উচিত নয়। বাইরে চাকরি করা নারীদের কাজ না, নারীদের কাজ কেবলমাত্র ঘরের মধ্যে থাকা। এইধরনের ওয়াজ মাহফিল শুনে শুনেই পুরুষের মধ্যে নারী বিদ্বেষী মনোভাব বাড়তে থাকে।

পৃথিবীর কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়, তবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ১৫টি রাজধানী এবং যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল শহর নিউ ইয়র্কের ৬ হাজার তিনশ নারীর মধ্যে জরিপ চালিয়ে আশ্চর্যজনক এই তথ্য পেয়েছে টমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন ৷ জরিপে দেখা গেছে, নিউ ইয়র্কের পরিবহন ব্যবস্থাই নারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ৷ অথচ ২৫ বছর আগেও নিউ ইয়র্কের রাস্তাঘাট ছিল মহা আতঙ্কের৷ ১৯৮৯ সালে সেন্ট্রাল পার্কে দৌড়াতে গিয়ে ধর্ষিত হন এক তরুণী ব্যাংকার৷

নারী ও শিশুদের ভোগান্তি কমাতে ২০০৮ সালে ঢাকায় মিনিবাসে ৬টি, বড় বাসে ৯টি এবং বিআরটিসি বাসে ১৪টি আসন ‘নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণের’ শর্ত দেয় ঢাকা মহানগর পরিবহন কমিটি। এরপর থেকে বাসের নির্দিষ্ট সিটের ওপরে লেখা হয় ‘নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত’। রাজধানীতে চলাচল করা মিনিবাসগুলোয় অলিখিতভাবে চালকের বাঁ পাশের লম্বা আসন নারীদের জন্য বরাদ্দ। সেখানে চারজনের আসনে গাদাগাদি করে বসানো হয় পাঁচজন। নারীদের সংখ্যা আরো বেশি হলে তাদের বসতে হয় ইঞ্জিনের ওপর তপ্ত বনেটে। অথচ রুট পারমিটে শর্ত হিসেবে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষিত রাখতে বলা হয়েছে চালকের পেছনে। কিন্তু তাতেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ক্ষ্যান্ত হয়নি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বাংলার নারীদেরকে, প্রতিবন্ধীদের মতই দুর্বল মনে করে। বাসে নারীদের সংরক্ষিত আসনের কোন প্রয়োজন নেই, নারীরাও পুরুষদের মত দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে পারে। অন্তত পুরুষরা তাদের কুদৃষ্টি দিয়ে নারীদের দিকে না তাকালেই চলবে। সুযোগ পেলেই নারীদের শরীরে হাত ঢুকিয়ে না দিলেই হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে নারীদের গায়ের সাথে গা ঘষাঘষি না করলেই হবে।

বাসের মধ্যে নারীদের আলাদা আসন দেওয়ার একটি মাত্র কারণ, গর্ভবতী নারী, শিশু এবং বয়স্ক নারীরা যেন নিরাপদ যাতায়াত করতে পারে। অন্তত বাসের মধ্যে যেন নারীদেরকে পুরুষের সাথে ধাক্কাধাক্কি করতে না হয়, বাসের মধ্যে পুরুষের সাথে গা লাগিয়ে যাওয়া নারীর জন্য খুবই বিব্রতকর, কারণ পুরুষরা সেই সুযোগে নারীদের সাথে অশালীন আচরণ করতে শুরু করে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা এইভাবেই যৌন হয়রানির শিকার হয়। তাই নারীদের বাসের মধ্যে আলাদা আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যতদিন এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা চালু থাকবে এবং পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর পরিবর্তন না আসবে, ততদিন নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন হবে।

আপনার পাশে বসে থাকা পুরুষের সাথে যেভাবে আপনি আচরণ করবেন, ঠিক একইরকম আচরণ একজন নারীর সাথে করুন। নিশ্চয়ই আপনার পাশে বসে থাকা পুরুষের গায়ের সাথে আপনি গা ঘষাঘষি করেন না? নিশ্চয়ই আপনার পাশে বসে থাকা পুরুষের দিকে আপনি খারাপ দৃষ্টিতে তাকাবেন না? নিশ্চয়ই সুযোগ পেলে বাসের মধ্যে একজন পুরুষকে আপনি ধাক্কা দিবেন না? অন্তত সেই একইরকম আচরণ নারীদের সাথে করুন!

অন্তত নারীকে যৌন বস্তু মনে করবেন না, অন্তত ভাববেন না নারীরা পুরুষের থেকে আলাদা, ভাববেন না নারীদেরকে স্রষ্টা আলাদা করে সৃষ্টি করেছেন। ভাববেন না নারীদের কাজ হচ্ছে ঘরের মধ্যে থাকা, বাচ্চা জন্ম দেওয়া, রান্নাবান্না করা, সংসারের কাজ করা, আর পুরুষের সেবা যত্ন করা।

বাসের মধ্যে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন কখনোই গৌরবের না। তারপরেও পুরুষরা এই বিষয়টাকে নিয়ে বাসের মধ্যে হট্টগোল শুরু করে দেয়। হাজার বছর ধরে পৃথিবীর নারীরা পুরুষের দাসত্বের শিকার হয়ে এসেছে! মনে রাখবেন পুরুষের কর্মচারী হয়ে, দাসত্বের জীবন কাটানোর জন্য নারীর জন্ম হয়নি। নারী এবং পুরুষ উভয়েই মানুষ, সবারই সমানভাবে বাঁচার অধিকার আছে। তাই নারীকে যৌনবস্তু না ভেবে মানুষ ভাবার চেষ্টা করুন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 20 = 28