জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-85

একবার শীতের সিজনে এক প্লান করলাম কাঙালিনি সুফিয়া ও তার দলবলসহ আমাদের গ্রামের বাড়ি যাবো। সে ও তার দলবল আমাদের বাড়িতে দুতিন দিন থেকে গান শোনাবে গ্রামের মানুষদের বিনে পয়সায়। প্লান অনুসারে এক বিকেলে চেপে বসলাম রকেট স্টিমানে। বৃটিশ নির্মিত প্যাডেলচালিত ঐ স্টিমানে কখনো যায়নি তারা, তাই তাদের ইচ্ছেনুসারে স্টিমারে উঠে বসলাম কেবিন ছাড়াই। কারণ ওদের গ্রুপ মেম্বার মোট ২২-জন। তাতে কমপক্ষে এগারোটা কেবিন নিতে হয়। স্টিমারে ১১-টি কেবিন পাওয়া চাঁদে যাওয়ার মত কঠিন কাজ বিধায়, ডেকে বিশাল যায়গা নিয়ে বিছানা করে বসলাম আমরা অন্তত ২৫-জন মানুষ। তাদের ঢোল তবলা তথা বিবিধ জিনিসপত্র দেখে জাহাজের সব মানুষ ঘিরে ধরলো তাদের গান শোনাতে। হায়দর নামে বাঁশিওয়ালা যখন টান দিলো তার বাঁশিতে, তখন জাহাজের ৮০% প্যাসেঞ্জার ঘিরে ধরলো কাঙালিনি তথা আমাদের গ্রুপকে।

:

জাহাজে বরিশাল নেমে ভোলার ছোট একতলা লঞ্চে উঠতে হলো আমাদের। শ্রীপুর ঘাটে আমার ট্রলার রিজার্ভ করাই ছিল। সবাই লঞ্চ থেকে নেমে ট্রলারে উঠলাম আমার দ্বীপগাঁ যেতে। পথে নদীর মাঝে ট্রলার থামিয়ে তাজা ইলিশ কিনলাম বাইশটি। বাড়ি গিয়ে ডাব আর আম-কাঁঠাল খেয়ে পুকুরে নামলো গ্রুপের ইয়াং সদস্যরা। সপ্তপদি মাছ ধরলো তারা আমাদের জেলেদের সহযোগিতায়। দুপুরে সবাই ইলিশ ও অন্যবিধ মাছ ভাজা দিয়ে গরম ভাত খেলো পেট পুরে। দুপুরে একটু রেস্ট করে বিকেলে নদীর চরে গেল ঘুরতে তারা। আমাদের খেতের তরমুজ আর বাংগি খেলো ইচ্ছেমত। পুরুষরা সন্ধ্যা পর্যন্ত বাজারে ঘুরলো। সন্ধ্যার পর বাঁশি আর ঢোলের বারি শুরু হলে, আমাদের উঠোন লোকে লোকারণ্য হলো। স্থান না পেয়ে পরিচিত স্বজনরা সব ঘরে ঢুকলো। মানুষের ভারে একটা খাট ভেঙে পড়লো আমাদের। রাত ১১-টা পর্যন্ত নানাবিধ গান গেয়ে কালকের জন্য বিরতি দিলো কাঙালিনির দল।

:

পরদিন নাস্তা খেয়ে আবার চরে গেলো তারা। সারাদিন ঘুরলো জেলে আর কৃষাণ পল্লীতে। আগ্রহী তরুণরা মাইকিং করলো সন্ধ্যার পর কাঙালির গান হবে বলে। বাড়িতে স্থান সংকুলান হবেনা বলে, নিকটবর্তী প্রাইমারি স্কুল মাঠে প্যান্ডেল বানালো গ্রামের কিশোররা। জেনারেটর ভাড়া আনা হলো আলোকসজ্জার জন্য। প্লান করা হলো, সন্ধ্যার পর থেকে সারারাত গান বাজনা হবে। কিন্তু প্রাক সন্ধ্যায় আকস্মিক এক ঘুর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড হলো স্টেজ। কাঠমোল্লারা ছড়িয়ে দিলো গানবাজনার কারণে এ ঝড়বৃষ্টি। আমরা দমলাম না। হেডটিচারকে ডেকে এনে পাকা স্কুলভবনে গানের ব্যবস্থা করা হলো। ঝড়বৃষ্টি সত্বেও প্রায় দুহাজার মানুষ হলো। চারটে ট্রলার ভরে লোকজন এলো পাশের ৪টা চর থেকে।

:

রাত ৮টার দিকে জেনারেটরের আলোতে ঝকমক করে উঠলো গ্রামের স্কুল মাঠ। তখনো বৃষ্টি পড়ছে। তাই সবাইকে ঢোকানো হলো স্কুল গৃহে। প্রথমেই ঢোলক, বাঁশি, হারমোনিয়াম ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের অকেষ্ট্রায় নেচে উঠলো পুরো স্কুল এলাকা। আগ্রহী কিশোররা নাচতে শুরু করলো মিউজিকের তালে। যখন কাঙালিনির গলায় ভেসে উঠলো “বুড়ি হইলাম তোর কারণে, পরাণের বান্ধব রে…..” তখন সমবেত হাজারো মানুষ কণ্ঠ মেলালো কাঙালিনির কন্ঠে। গানটি শেষ হতেই কাঙালিনি শুরু করলো “কোনবা পথে নিতাই গঞ্জ যাই” গাননি। গ্রামের নারী পুরুষরা বিস্মিত হলো যে গান এতোদিন তারা শুনে এসেছে মাইক বা মোবাইলে, তাই এখন সরাসরি গাইছে ঐ গানের শিল্পী কাঙালিনি সুফিয়া। সারারাত টিপটিপ বৃষ্টির মাঝেও নারী পুরুষরা গান শুনলো কাঙালিনির প্রাণ ভরে।

:

বাড়িতে আমাদের একটা বিদেশ থেকে আনা বাজি ছিল। রাত দুটোর দিকে তা আকাশো ছুঁড়লো ভাইপো তুহীন। বাজিটি আকাশে উঠে একটা সাপের ডিজাইন ধরে অন্তত এক মিনিট ধরে ফুটলো তথা তার আলোক বিচ্ছুরিত হলো আকাশ জুরে। নদীতে মাছ ধরারত ছেলেরা এতো রাতে সাপের ডিজাইন ধরা অমন বাজি দেখে মনে করলো “কিয়ামত এসে গেছে” তথা পৃথিবীর আজই শেষদিন। তারা জেলে নৌকোতে ইস্তেখারার নামাজ পড়া শুরু করলো। রাত ৩টার দিকে গানের অনুষ্ঠান শেষ হলে পাশের চর থেকে আসা ৪টা ট্রলার ভর্তি মানুষ রওয়ানা করলো। আমরা ঘরে ফেরার একটু পরই নদীতে আকস্মিক বিকট বজ্র্পাতের শব্দ শুনে সবাই কেঁপে উঠলাম। ভোরে খবর এলো গান শুনে ফেরার পথে একটি নৌকাতে বজ্রপাত হয়েছে, যাতে নৌকাটি ডুবে যায় ও দুজন মানুষ মারা যায়। খবর নিয়ে জানতে পারলাম, পাশের “পখখী মারার চরে”র আমিনুদ্দিন ও জব্বর আলী বজ্রপাতে নিহত হয়েছে। বাকিদের কেউ আহত হলেও মারা যায়নি।

:

কাঠ মোল্লারা এবার ব্যাপক প্রচার শুরু করলো যে, মেয়ে ছেলেদের এমন অবাধ মেলামেশার গানের কারণে প্রথমে ঘুর্ণীঝড় হয়। তাতেও গানওয়ালারা বিরত না হলে রাতে আল্লাহ ফেরেস্তা দিয়ে বজ্রপাত নিক্ষেপ করেন। আমরা চেয়েছিলাম নিহতদের বাড়িতে যাবো, আমরা সমবেদনা জানাতে। কিন্তু অশিক্ষিত লোকের মাঝে এতো বেশি প্রপাগান্ডা চালানো হয় যে, ঐ চরের লোকজন গানের দলকে “পাপের কান্ডারী” হিসেবে গণ্য করে। এমনকি রাতে ভাউপোর ছোঁড়া বাজিকেও তারা আসমানী গজব বলে অপপ্রচার করতে থাকে। গ্রামে রটে যায় যে, কাঠ মোল্লারা যাদের লোক মারা গেছে তাদের আত্মীয়স্বজনসহ আজ রাতে গানের দলের ওপর আক্রমণ করতে পারে। তাই শুভাকাংখীদের পরামর্শে ঐদিন বিকেলেই বিশেষ ট্রলার ভাড়া করে আমরা ত্যাগ করি আমাদের দ্বীপগাঁ। যাতে নিরাপদে কাঙালির দলকে পৌঁছাতে পারি ঢাকা তাদের আবাসস্থলে।

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 86]

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 25 = 35