লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ও বামেদের ভবিষ্যৎ:- প্রথম পর্ব-

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে 2019 সালের লোকসভা নির্বাচন বিভিন্ন দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ও বটে! এই নির্বাচন ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যাবে, কারণ এই প্রথম এই নির্বাচনে একদিকে অতি দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী চেতনা সম্পন্ন ডান ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি গুলির মধ্যে সরাসরি লড়াই দেখা যায়। এত দিন যে আদর্শগত লড়াই ছদ্মবেশে দেখা যেত তা এবার প্রকাশ্যেই দেখা যাচ্ছে। তাই প্রকৃতপক্ষে এই নির্বাচন এসে দাঁড়িয়েছে অস্তিত্বের সংগ্রাম স্বরূপ! আগামী দিনে দেশের গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকবে; না দেশে ধর্মান্ধ, ফ্যাসিস্ট, একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে সেটার উত্তর পাওয়ার জন্যই এই নির্বাচন বহু অংশে ঐতিহাসিক!

এই নির্বাচনে আশ্চর্যজনক ফল হিসাবে আমরা দেখতে পায়, বিজেপি 303 টি ও বিজেপি সমর্থিত এনডিএ জোট 353 টি আসনে জয়লাভ করে। অন্যদিকে, কংগ্রেস 52 টি আসনে ও কংগ্রেস সমর্থিত ইউপিএ জোট 91 টি আসনে জয়যুক্ত হয়। সেইসঙ্গে অন্যান্য দলগুলি মোট 98 টি আসনে জয়লাভ করে। ভোটের শতাংশের হিসাবে দেখা যায় বিজেপি 37.36% ও এনডিএ 45% ভোট পায়। অন্যদিকে কংগ্রেসের ভোট ব্যাঙ্ক 19.49% ও ইউপিএর ভোট ব্যাঙ্ক 26% এ নেমে আসে। তাই এই নির্বাচনে কংগ্রেসের ফলাফল যথেষ্ট খারাপ হয়েছে এটা বলাই যায়, তবে এই প্রথম কংগ্রেসের ফলাফল এত খারাপ হয়নি! এর আগে ও 2014 সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়! ওই নির্বাচনে বিজেপি 282 টি আসনে ও এনডিএ 336 টি আসনে জয়যুক্ত হয়েছিল। অন্যদিকে কংগ্রেস 44 টি ও ইউপিএ 60 টি আসনে সীমাবদ্ধ রয়ে যায়। শতাংশের বিচারে দেখা যায় 2014 সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি 31.34% ও এনডিএ 38.50% ভোট পেয়েছিল। অন্যদিকে কংগ্রেস ওই নির্বাচনে 19.52% ও ইউপিএ 23% ভোটে সীমাবদ্ধ রয়ে যায়।

এখানে উল্লেখ্য 2019 সালের লোকসভা নির্বাচনে সর্বাধিক 67.47% ভোট প্রদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়; এথেকেই বোঝা যায় ভারতীয় গণতন্ত্র কত শক্তিশালী ভীতের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় 2014 সালের লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে বিজেপির ভোট ব্যাঙ্ক 6.02% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এনডিএর ভোট প্রায় 6.5% বৃদ্ধি পেয়েছে। আসন সংখ্যার নিরিখে বলা যায় বিজেপির 21 টি ও এনডিএর 17 টি আসন বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে দেখা যায় কংগ্রেসের 0.03% ভোট কমেছে অন্যদিকে ইউপিএর প্রায় 3% ভোট বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও 2014 সালের লোকসভা নির্বাচনের আসন সংখ্যার নিরিখে দেখা যায় কংগ্রেসের 8 টি ও ইউপিএর 31 টি আসন বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোটের সংখ্যার নিরিখে দেখা যায় বিজেপি মোট 22,90,78,261 টি ভোট পেয়েছে, অন্যদিকে কংগ্রেস মোট 11,94,94,885 টি ভোট পেয়েছে।

তাই বলাই বাহুল্য কংগ্রেস এখন ও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি দেশের প্রায় 12 কোটি মানুষ এখন ও কংগ্রেসের উপর আস্থাশীল তাই কংগ্রেসের এই দুরবস্থা থেকে উত্তরণ একান্ত প্রয়োজন। পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় গণতন্ত্রের সুস্থিতির জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল প্রয়োজন। ঐতিহাসিক আঙ্গিকে দেখা যায় এর থেকেও খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে কংগ্রেসের গেছে, তাই আমরা আশাবাদী শতাব্দী প্রাচীন এই দলটি নিশ্চয়ই তাঁর ভুলত্রুটি বিচার বিশ্লেষণ করবে ও নিজেদের পুরো শক্তি নিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে ফিরে আসবে। দেশ ও দশের মঙ্গলে কংগ্রেসের মত সর্বভারতীয় বিরোধী দলের শক্তিশালী অবস্থান একান্ত কাম্য।

এখন প্রশ্ন হল নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপির এই বিরাট জয়ের কারণ কি? বিজেপির এই বিরাট জয়কে বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়গুলি উঠে আসে তা হল-

প্রথমত- নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিত্ব এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ব্যক্তিগত ভাবে আপনি মোদীকে পচ্ছন্দ করতে পারেন বা অপচ্ছন্দ করতে পারেন কিন্তু নরেন্দ্র মোদীকে আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। ব্যক্তি মোদী তাঁর অসাধারণ বাগ্মিতা ও অমিত শাহের কৌশলে নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আঙ্গিনায় নিয়ে যায়, যেখানে দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় হয়ে ওঠে। আর ব্যক্তি মোদী তাঁর অনেক ভক্তের কাছে ভগবানের অবতার স্বরূপ, উল্লেখ্য দেশের কিছু কিছু জায়গায় মোদীর নামে মন্দির ও প্রতিষ্ঠা হয়েছে। যেখানে এ পরিমাণ ভক্তির উপস্থিতি সেখানে স্বভাবতই যুক্তি, বুদ্ধি লোপ পায়, তাঁর প্রভাব এই নির্বাচনে সুস্পষ্ট ভাবে লক্ষ্য করা গেছে।

দ্বিতীয়ত- বিজেপির ঘোষিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে কে দাঁড়াচ্ছেন শেষ পর্যন্ত তা নিশ্চিত ছিল না। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী মুখ হিসেবে রাহুল গান্ধী সেভাবে মানুষের মনে দাগ কাটতে পারেনি। অন্যদিকে কখনও মায়াবতী, কখনও মমতা ব্যানার্জি বা চন্দ্রবাবু নাইডুর মতো বিরোধী পক্ষের নেতাদের প্রধানমন্ত্রীত্বের আকাঙ্ক্ষা বিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরায়। তাই নিজেদের অন্তদ্বন্দের ফলস্বরূপ বিরোধীরা বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়াই করতে পারেনি, এরফলে বিজেপির জয়যাত্রা অনেক সহজ হয়েছে।

তৃতীয়ত- কর্পোরেট মিডিয়া গোটা দেশে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করে যেখানে সাধারণ মানুষের মনে হওয়া স্বাভাবিক বিজেপি ও মোদীর বিরুদ্ধে যেন কোন দলের অস্তিত্ব নেই। বিভিন্ন মিডিয়া, নমো টিভি, মোদীর বায়োপিক, সোশ্যাল মিডিয়ায় যেভাবে মোদীর স্বপক্ষে হাওয়া তৈরী করা হয় তা এক কথায় অভূতপূর্ব। মিডিয়া মোদীকে ‘লার্জার দেন লাইফ’ ইমেজে পরিণত করে। স্বভাবতই মোদীর এরূপ ভাবমূর্তি অবশ্যই বিজেপির পক্ষে ভোট আনতে সুবিধা হয়।

চতুর্থত- যে কোন নির্বাচন লড়াইয়ের ক্ষেত্রে অর্থ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমান দিনে বিনা অর্থে নির্বাচন জেতা এক কথায় অসম্ভব। তাই যে রাজনৈতিক দলের কাছে যত বেশি অর্থ রয়েছে তাঁদের পক্ষে ভোটে জেতার সম্ভাবনা তত বেশি। ভোটের আগে বিভিন্ন ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে বিজেপি প্রায় 1,000 কোটি টাকার অধিক অর্থ সংগ্রহ করে যা তাঁরা নির্বাচনে দেদার খরচ করে। সেইসঙ্গে কর্পোরেট সংস্থাগুলির কাছ থেকে হেলিকপ্টার, বিভিন্ন সমাবেশ, মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার কৌশল প্রভৃতির জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়।

বিজেপি যে পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে, অর্থের নিরিখে বলা যায় সমস্ত বিরোধী দল একত্রিত হয়েও তাঁর অর্ধেক অর্থ ও সংগ্রহ করতে পারেনি। তাই স্বভাবতই অর্থের এই অসম লড়াইয়ে বিরোধীরা অনেক আগেই পিছিয়ে পড়ে। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলা যায় বিজেপির চমকের রাজনীতিতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছে। এখন এটা ধ্রুব সত্য যেখানে কর্পোরেট সংস্থাগুলি এত কোটি কোটি টাকা বিজেপির তহবিলে দান করছে সেখানে স্বভাবতই দেশের নীতি নির্ধারণ করা হবে কর্পোরেটদের স্বার্থ সুরক্ষিত করার জন্যই। একথা দেশের প্রান্তিক মানুষ বুঝে উঠতে পারেনি। এর ভয়ংকর পরিণতি আগামী দিনে দেশকে দেখতে হবে।

তাই বর্তমানে মোদীর উন্নয়ন মানে বিএসএনএল কে বন্ধ করে দাও এবং জিও কে সুযোগ দাও, এয়ার ইন্ডিয়াকে বিলগ্নিকরণ কর, রেল বেসরকারি করণ কর, বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থা গুলিকে দুর্বল ও বিক্রি করে দাও, সরকারি ব্যাঙ্ক বেসরকারি করণ কর, কর্পোরেটদের ট্যাক্স ছাড় দাও, শ্রমিক আইন দুর্বল কর, তাঁদের ইউনিয়নের অধিকার কেড়ে নাও, জল জঙ্গল ভূমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ কর ও এগুলি কর্পোরেটদের বিক্রি করে দাও। অর্থাৎ দেশ হবে বড়লোকদের সেখানে গরীব প্রান্তিক, খেটে খাওয়া মানুষদের জীবনের কোন দাম নেই! আর চারিদিকে ঢক্কানিনাদ ‘মোদী হেয় তো মুমকিন হ্যায়’! তাই এই অসম প্রচার কৌশলে দেশের সাধারণ বেকার, খেটে খাওয়া গরীব মানুষেরা বিভ্রান্ত হয়; তাই আগামীতে আরও চরম দুর্দিন আসছে একথা বলায় যায়!

পঞ্চমত- মোদীর নেতৃত্ব ও অমিত শাহের কৌশল ও সাংগঠনিক দক্ষতা বিজেপির এই বিরাট জয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অমিত শাহ প্রতিটি লোকসভা আসন ও প্রতিটি রাজ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন এবং প্রতিটি রাজ্যের জন্য আলাদা আলাদা রণকৌশল তৈরী করেন। যা বিজেপিকে এই নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা প্রদান করে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্ব ও অমিত শাহের সাংগঠনিক দক্ষতা বহু খেলা ঘুরিয়ে দেয়। বিজেপি এত দিন সাংগঠনিক দিক থেকে আরএসএসের উপর নির্ভরশীল ছিল কিন্তু মোদীর নির্দেশে অমিত শাহ তৃণমূল স্তর থেকে একদম দেশের সর্বোচ্চ স্তরে বিজেপির মজবুত সংগঠন গড়ে তোলেন। অতীতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আরএসএস ও বিজেপি নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ দেখা গেছে।

বাজপেয়ীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আরএসএসের মতবিরোধ দেখা যেত। বর্তমানে মোদী সরকারের সঙ্গে ও আরএসএসের বহু বিষয়ে মতবিরোধ দেখা যায়। যেমন- নির্বাচনের ঠিক আগে দেখা যায় আরএসএস ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠন দাবী করে সুপ্রিম কোর্টকে অগ্রাহ্য করে মোদী সরকার রাম মন্দিরের সপক্ষে অর্ডিন্যান্স জারি করুক কিন্তু মোদী সরকার তা করেনি। এই সমস্ত কারণে আরএসএসের সঙ্গে বিজেপি নেতৃবৃন্দের দুরত্ব তৈরী হয়। তাই আরএসএস মোদীকে সরিয়ে নীতিন গডকড়ির মত মানুষকে প্রধানমন্ত্রীত্বের দাবীদার হিসাবে দেখাতে শুরু করে। তাই এবারের নির্বাচনে আরএসএসের শাখা সংগঠন সেভাবে বিজেপির পক্ষে প্রচার করেনি কিন্তু অমিত শাহের নেতৃত্বে বুথ পর্যায়ে যে সংগঠন তৈরী করে তাঁরা সেই অভাব পূরণ করে। তাই প্রকৃতপক্ষে এটা বলা অসঙ্গত হবে না যে এই বিরাট জয়ের ফলে আরএসএসের পক্ষে মোদীকে পরিচালনা করা আর সম্ভব নয়!

ষষ্ঠত- লোকসভা নির্বাচনের পূর্বে দেশ জুড়ে বিজেপির অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। একদিকে তীব্র বেকারত্ব, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের ক্রমবর্ধমান ব্যার্থতা, দেশজুড়ে গোরক্ষকদের তান্ডব, সমাজের সর্বস্তরে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি দেখা যায়, সেইসঙ্গে তিন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে- রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্রিশগড়ে বিজেপির পরাজয় দেশজুড়ে কংগ্রেসের মধ্যে এক নতুন প্রাণ শক্তির সঞ্চার করে। মোদী-শাহ জুটি যে অপরাজেয় নয় এটা প্রমাণিত হয়। বিজেপির ঠিক সেই চরম সংকটজনক মুহূর্তে ঘটে গেল এক অভাবনীয় ঘটনা গত 14 ই ফেব্রুয়ারি, 2019 তারিখে জম্মু-শ্রীনগর জাতীয় সড়ক ধরে জাওয়ানদের এক কনভয় যাচ্ছিল মধ্যপথে পুলওয়ামা জেলায় বিস্ফোরক বোঝায় একটি গাড়ি নিয়ে এই কনভয়ে আত্মঘাতী হন জইশ-ই-মহম্মদের আত্মঘাতী জঙ্গি আদিল আহমেদ দার! এই ঘটনায় প্রায় চল্লিশ জন সিআরপিএফ জাওয়ানের মৃত্যু হয়!

এই ঘটনার কিছুক্ষণ পর এই ঘটনার দায় স্বীকার করে জইশ-ই-মহম্মদ নামক জঙ্গি সংগঠনটি। এই পাক প্রভাবিত জঙ্গি সংগঠনটি দায় স্বীকার করার পরই ভারত সরকার সরাসরি এই ঘটনার জন্য পাক সরকারকে দায়ী করতে থাকে। এখানে উল্লেখ্য জঙ্গি হামলা ঘটলেও তা জঙ্গিদের নিজস্ব বিষয় পাক সরকার এই বিষয়ে সরাসরি জড়িত এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনে এর থেকে বড় নির্বাচনী ইসু মোদী আর পায় কোথায়? তাই শুরু হল দেশরক্ষা ও যুদ্ধ উন্মাদনার খেলা। এরই প্রক্রিয়া স্বরূপ ভারত সরকার বালাকোটে এয়ার স্ট্রাইক করে। ভারত সরকার দাবি করে এই এয়ার স্ট্রাইকে বহু সংখ্যক জঙ্গিদের মৃত্যু হয় অন্যদিকে পাকিস্তান দাবী করে ভারতীয় বায়ুসেনার এই আক্রমণে কেউ হতাহত হয়নি। এরপর পাকিস্তান ও পাল্টা এয়ার স্ট্রাইক করে, এতে বলা হয় পাকিস্তান একটি এফ-16 বিমান হারায়, অন্যদিকে ভারত একটি মিগ-21 বিমান হারায় এবং ভারতীয় পাইলট ‘অভিনন্দন বর্তমান’ পাকিস্তানের হাতে ধরা পড়ে যদিও পরবর্তীকালে পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান অভিনন্দন বর্তমানকে মুক্তি দেন।

এই এয়ার স্ট্রাইক দেশব্যাপী এমন এক বার্তা প্রেরণ করে- মোদীই একমাত্র পারে পাকিস্তানকে উপযুক্ত জবাব দিতে। অর্থাৎ ‘পাকিস্তান ম্যে ঘুসকার মারনে কে লিয়ে মোদী হি চাহিয়ে’। এইরকম উগ্রজাতীয়তাবাদী চিন্তা চেতনায় দেশের মানুষ নিজেদের দৈনন্দিন সমস্যা, বেকারত্ব ইত্যাদিকে ত্যাগ করে ও এই উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনায় মোদীর সপক্ষে বিরাট জনমত গড়ে ওঠে, যা স্বভাবতই নির্বাচনে বিজেপিকে বিরাট সুবিধা প্রদান করে। তাই একথা বলাই যায় পুলওয়ামার এই জঙ্গি হামলা ও বালাকোটের এয়ার স্ট্রাইক মোদী সরকারের পক্ষে ‘সঞ্জীবনী সুধা’ হিসাবে কাজ করে!

সপ্তমত- এই নির্বাচনে উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ববাদী চেতনার বিরাট প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। দেশের বিরাট অংশে একথা প্রচার করা হয় “হিন্দু খাতরেমে হ্যে”, পাকিস্তানকে শায়েস্তা করতে ও মুসলমানদের হাত থেকে রক্ষা পেতে বিজেপিকে দরকার। অন্যদিকে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াংঙ্কা গান্ধী এই বিষয়গুলির তীব্র বিরোধিতা না করে তাঁরা বিভিন্ন মন্দির দর্শনে করেন। ফলে কংগ্রেসের এই ‘সফট হিন্দুত্বের’ লাইন তাদের রাজনৈতিক ক্ষতি করে। কারণ এর ফলে প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ ভোট ব্যাঙ্কের এক বিরাট অংশ কংগ্রেসের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়ে যার ফল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যায়। অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদীরা স্বভাবতই হার্ড লাইনার হিন্দুত্ব অর্থাৎ বিজেপির দিকে ঝুঁকে।

অষ্টমত- সেইসঙ্গে মোদী সরকারের বেশকিছু কাজ যেমন- জনধন যোজনা, বিদ্যুতের প্রসার, উজ্জ্বলা যোজনা (গ্যাসের কানেকশন বৃদ্ধি), শৌচালয় নির্মাণ, তিন তালাকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান এগুলি তাঁদের ভোটব্যাঙ্ক বৃদ্ধি করে। বিশেষত তিন তালাক নিয়ে মোদী সরকারের যে অবস্থান তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে যে মুসলিম মৌলবাদীদের তোষণ সেই ঘৃণ্য নীতি থেকে মুসলমান সমাজের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ হিসাবে এই তিন তালাক নীতিকে দেখা যায়। এর ফল স্বরূপ এক বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত মুসলিমদের ভোট বিজেপির পক্ষে যায় যা তাদের এই বিরাট জয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নবমত- বিরোধী দলগুলির ছন্নছাড়া মনোভাব এবং বিরোধী প্রচারে মোদীর দোষ নিয়ে বেশি কথা বলা হয় কিন্তু আগামী দিনে তাঁদের সরকার এলে তাঁরা কি কাজ করবেন এনিয়ে বিশেষ কথা বলা হয়নি, যা বিরোধী দলগুলির বিপক্ষে গেছে। রাহুল গান্ধী শেষ মূহুর্তে গরীবদের বছরে 72 হাজার টাকা প্রদানের ‘ন্যায় প্রকল্পের’ কথা বললে ও তা সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় নি।

তাই বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে বলা যায় বিজেপির এই অভূতপূর্ব জয় শুধু একটি কারণে হয়নি এটি বিভিন্ন ঘটনার সমাহারের ফল। তবে যে কথাটি বিশেষ উল্লেখ্য তা হল উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনা ও উগ্র হিন্দুত্বের সংমিশ্রণে মোদী বর্তমান দিনে এক ‘অতিমানবে’ পরিণত হয়েছেন। অনেকের কাছে তিনি ‘ভগবানের অবতার’ স্বরূপ। এরূপ ভক্তি যেখানে দেখা যায় সেখানে কোন যুক্তি কাজ করেনা তাই মানুষ তাঁর দৈনন্দিন জীবন যন্ত্রণা ভুলে এই রকম শাসককে নির্বাচন করে!

ইতিহাস সাক্ষী এরূপ মনোভাব থেকে নির্বাচিত কোন শাসক মানুষের ভালো করতে পারে না, বরং দেখা যায় অতিরিক্ত ক্ষমতা সম্পন্ন শাসক মানুষকে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, যা গণতন্ত্রের পক্ষে অশনি সংকেত! এগুলি ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যবস্থার লক্ষণ স্বরূপ, আগামী দিনে ভারতীয় গণতন্ত্র কোন দিকে যাবে সেটাই দেখার! দেশ ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র থাকবে না হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হবে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন?

ভারতীয় ও বিশ্ব ইতিহাসের আঙ্গিকে আমরা দেখি এইরকম সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী শাসক দেশের গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ কর হয়নি। 1971 সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়ের পর ইন্দিরা গান্ধী দেশের সর্বেসর্বা তে পরিণত হন। বিরোধী নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ী পর্যন্ত ইন্দিরা গান্ধীকে ‘দেবী দূর্গার অবতার’ রূপে অভিহিত করেন! এইরূপ চরম জনপ্রিয়তার পর একটি পর্যায়ে কংগ্রেসের সভাপতি দেবকান্ত বড়ুয়া বলেন- ‘Indira is India, India is indira’. শাসকের এই নির্লজ্জ চাটুকারিতা দেশের গণতন্ত্রের পক্ষে মঙ্গলকর হয়নি। এই ইন্দিরাই ক্ষমতা হারানোর ভয়ে দেশ জুড়ে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করেন এর ফলে দেশের গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়!

আবার অন্যদিকে জার্মানিতে ও একইভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হিটলার ক্ষমতা দখল করে। পরবর্তীকালে তিনি জার্মানির সর্বাধিনায়ক ‘ফুয়েরারে’ পরিণত হন। হিটলারের এরূপ লাগামহীন ক্ষমতা বৃদ্ধির পরিণতি কি হয়েছিল তা বিশ্ববাসী জানে এবং তাঁর চরম মূল্য দিতে হয়েছিল সমগ্র মানব সভ্যতাকে! তাই কোন দল বা নেতৃত্বকে সমর্থন করেন তাঁতে কোন সমস্যা নেই কিন্তু আপনি যখন তাঁকে দেবত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করবেন তখন থেকেই যত সমস্যার সূত্রপাত। এগুলি গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে অশনি সংকেত স্বরূপ! আশাবাদী ভারতবাসী ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবেন!

চলবে…

তথ্যসূত্র:-

1. উইকিপিডিয়া।
https://en.m.wikipedia.org/wiki/2019_Indian_general_election

2. ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যসূত্র ও বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে পাওয়া তথ্য।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

24 − = 18