জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-86

২০১০ সালে ঢাকা বদলীর আগে একটা জেলা শহরে ছিল আমার পোস্টিং। ঐ শহর থেকে আমার গ্রামের চরে চলে যেতাম প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে, আর ফিরতাম রোববার সকালে। চরাঞ্চলের মানুষের মাঝে জীবন কাটাতাম সপ্তাহের দুদিন সকল ভাললাগাদের নিয়ে। ওদের সুখদু:খের ভাগ নিতাম নিজের জীবনে।‌ প্রতিসপ্তাহে নদী পার হয়ে চরে আসা-যাওয়াতে স্পিডবোটে ২+২=চার হাজার টাকা ভাড়া গুণতে হতো আমায়। শেষে এক বন্ধুর পরামর্শে খুব সুন্দর স্পিডবোট টাইপের একটা ৪-সিটের বোট বানালাম প্রায় ৪৫,০০০ টাকা খরচ করে। তাতে লাগালাম আধুনিক দ্রুতগামি ইঞ্জিন। সুন্দর রঙকরা বোটটা যখন চলতো ঢেউ আর জলকেটে জেলে নৌকার মাঝে, সবাই চেয়ে থাকতো তার দিকে পরম বিস্ময়ে । ইউরোপ থেকে আনা একটা প্লাস্টিক রঙিন বোটও বাঁধা থাকতো ঐ অভিজাত বোটে। নিজেকে তখন জেলে রাজ্যের রাজা মনে হতো আমার, আর বোটটাকে সিংহাসন। একটা অহংবোধও চলে আসতো কখনোবা মনে ডুপ্লিকেট ঈশ্বরের মত।
:
বড় নদীতে খেয়া ছিল পারাপারের। একবার ফেরিঘাট থেকে আমার বোটে ওভারলোড করে উঠলো ১০-দলিত মানুষ, তাদের সখ ঐ বোটে পার হবে নদী। কিন্তু আপত্তি তুললো খেয়া মাঝিরা, ১০-জনকে পারাপারে তারা পাবে ২০০ টাকা, তা হারাতে চায়না মাঝিরা। দলিতরাও টাকা দেবেনা কারণ তারা পার হবে আমার বোটে। কি আর করা! নিজ পকেট থেকে ২০০ টাকা মাঝিদের দিয়ে ১০-জেলেকে নিলাম নিজের বোটে। বিকেলে গাঁয়ের বাজারে ঐ ১০-দলিত + ৪-মাঝি এ যুগের গ্রাম্য ” হাতেমতাঈ”কে ধরলো চা-খাওয়াতে। সকালের গল্প প্রচার করতে থাকলো দু-গ্রুপই গলা ফাটিয়ে। শ্রোতা জড়ো হলো প্রায় দুশর মতো। অবশেষে সবার আবদার মহিষের দুধের ঘন চা। এতো মানুষের চা তৈরি হচ্ছে গ্রাম্য চুলোয় তখন। সামনে দিয়ে যাচ্ছিল আমার কৈশোরের পরিচিত বুড়ো ২-কাঁঠাল নিয়ে। নামালো সবাই ধরে আমাকে দেবে বলে। কিনলাম ভাল কাঁঠাল ভাল দামে, খুশিতে হাসলো বুড়ো ফোকলা দাঁতে, হাসলো অপেক্ষমান চা-গ্রুপের সবাই। কিন্তু আনতে পারলাম না কাাঁঠল বাড়ি পর্যন্ত। গাঁয়ের চা প্রত্যাশি স্বজনরা বললো, এবার কাঁঠাল খায়নি তারা। তাই ভাঙলো কাঁঠাল ঐ দোকানেই্, অনেক ক্ষুধিত; তাই ১/২ কোয়ার বেশি পেলোনা কেউ ভাগে। আমিও খেলাম একটা। অবশেষে চা। অনেক সুখকর ছিল সে কাঁঠাল কাম টি পার্টি। অনাবিল সুখের স্বাদে ভরা ছিল ঐ কাঁঠাল আর চা।
:
ঢাকা চলে আসার প্রাক্কালে এক গরির আত্মিয়ের অনুরোধে তাকে দিলে এলাম ৪-সিটের লাখ টাকার বোটটি। কথা ছিল বৌ আর ৩-ছেলেমেয়ের সংসার চালাবে সে ঐ বোট ভাড়া দিয়ে কিংবা এপারওপার পারাপার করে। প্লাস্টিক বোটটি রেখে দিলাম নিজের ফিউচার-সখ হিসেবে। গত বছর গাঁয়ে গিয়ে জানলাম, দুরের কোন এক মাছ ব্যবসায়ীর কাছে ৫০,০০০ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে সোলায়মান আমার সখের বোটটা। আর বোট বিক্রির টাকায় একটা বিয়ে করেছে গাঁয়ের ১৮ বছরের মা হারা তামারঙা জেলেকন্যা পারুলকে । আমার খবর পেয়ে ৩-দিন গাঁ ছেড়ে পালিয়ে রইলো নদীতে জেলে নৌকোয় সোলায়মান।
:
নতুন বর সোলায়মানকে না পেয়ে ধরলাম পারুলকে। কেন বিয়ে করেছে সে ৩-সন্তানের জনককে। চোখ ভিজিয়ে পারুল বলে, “মা হারিয়েছে ছোটবেলায়; বাবা প্রায়ই থাকে নদীতে নদীতে; একা ঘরে সম্ভব ছিলনা তাকে রক্ষা করার; আর চেহারা গায়ের রং সুন্দর নয় বলে কোন যুবকও রাজি হয়নি বিয়ে করতে তাকে; ২/৩ জনে কেবল ফাও লটরপটর করতে চেয়েছিল। তাই বাধ্য হয়ে সোলায়মানকে ধরেছে সে নিজেকে বাঁচাতে”। গ্রামীণ নারী পারুলের এ দার্শনিক তত্ত্বকথা শুনে বিব্রত হই আমি। ভেবে পাইনা কি করবো এখন। ৩-দিন ধরে পুরোণো বউ ঘুরছে আমার পেছনে ৩-সন্তানসহ সুবিচারের আশায়। শেষে উপায়ান্তর না দেখে মায়ের চিহ্ন হিসেবে গ্রামে বর্গা হিসেবে গচ্ছিত একটা দুধেল গাই দিয়ে দিলাম সোলায়মানের পুরণো বউকে। বললাম, গরুর দুধ বিক্রি করে সংসার চালাও তোমার, ও গরু আর ফেরত নেবনা আমি। বাছুরসহ গরু পেয়ে সতীন দু:খ ভুলে আল্লাহর কাছে আমার পরমায়ু কামনা করে গরুর দড়ি হাতে বিদায় নেয় মিসেস সোলায়মান সিনিয়র।
:
মার্ক জুকারবার্গের শপথ করে বলছি, আমার গাঁয়ের দলিত এসব দরিদ্র মানুষদের এই যে সামান্য দেয়া, তাতে কখনো বিরক্ত বা (অ)সুখ ঘিরে ধরেনি আমায়, বরং এই তুচ্ছতর সুখের লম্বা রোঁয়াগুলো দেয়ার পর, এক চমকপ্রদ ভাললাগার বৈরাগী বাউলমন সুখের প্রজাপতি হয়ে ওড়ে টলটলে জলের উপরে সারাদুপুর । প্রেমিকার আঁচলভরা সতেজ কলমি ডগার প্রাণময়তার মতো এক সুখনেশার ভুলভুলাইয়ায় বিভোর থেকেছি আমি। সূর্যকরোজ্জ্বল হেমন্তের দিনে ওদের অশ্রুময় শুষ্ক চোখে নিখাঁদ ভালবাসার বৈঠা হাতে দাঁড়িয়েছি ওদের জলমগ্ন নৌকায়। জীবনের চিহ্নবাহী বিবিধসূচকে ভাললাগার মৃন্ময়ী গদ্যশহর পাড়ি দিয়ে আমি বারবার ফিরে যাই আমার গাঁয়ে, যেখানে সারাক্ষণ জলকেলি করে দীর্ঘশ্বাসের হাস্নাহেনার গন্ধেরা, জলসিক্ত সুখদ লজ্জারা, আর মৌমৌ লেবুগন্ধে ভরে ওঠে গাঁয়ের দুপুরের রোদ, ক্লান্ত ঘুঘু আর শিশিরভেজা মেঠোপথেরা।

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 87]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 77 = 87