জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-87

৩০ বছরের সেলিম বাস করে আমার দ্বীপগাঁয়ের নতুন চরে। ওর কোন জমি, নৌকো বা আর কোন সম্পদ নেই কেবল দুটো মহিষ ছাড়া। নিজের পৈত্রিক ভিটে নদীগ্রাসে বিলিন হওয়াতে এখন চরের মাঝে রাস্তাঘাটহীন একটা বিলের মাঝে বাস করে সে আর তার স্ত্রী ছোট শিশুসহ। যে ঘরের চারদিকে বর্ষায় থৈ থৈ করে মেঘনার পলিময় ঘোলাজল। কদিন আগে ঐ চরে গিয়েছিলাম আমি আমার পুরণো জীবনের স্বজনের খোঁজ নিতে। চরে সাধারণত মহিষকে ছাড়া রেখে ঘাষ খাওয়াতে হয়, কারণ বেঁধে রাখলে মহিষেরা তেমন ঘাষ খায়না এবং তাদের স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। অনেক আগে অন্যের জমিতে মজুরি দিয়ে সঞ্চিত টাকায় দুটো মহিষ শিশু কিনেছিল সেলিম, যা পালন করে বড় করবে এ ছিল তার স্বপ্ন কিন্তু কৈশোর অবস্থায়ই একটা মহিষশাবক মারা গেলে দিশেহারা হয় সেলিম। আমিসহ অন্য কিছু স্বজনের থেকে ধার করে ২য় আরেকটি শাবক কিনে সেলিম। দুরের লক্ষ্মির চরে মহিষ শিশুর সাথেই কাটতো তার জীবন দিনে ও রাতে। কারণ নোয়াখালির চরাঞ্চলের কোন কোন মহিষ চোরেরা রাতে ট্রলার নিয়ে চুরি করে মহিষ নিয়ে তা বিক্রি করে কসাইদের কাছে। তাই সেলিমের মত জীবন ঘষে আগুন জ্বালা সংগ্রামিরা রাতেও টং ঘরে চরে চরে ঘুমোয় নিজেদের মহিষের পাশেই।
:
এখন সেলিমের মহিষ দুটো পূর্ণ যুবা। তাদের হাল বিক্রি করে সে। মহিষের হাল খুব গভীর হয়, তাই সেলিমের হালের আদর কম নয় চরাঞ্চলের কৃষাণদের কাছে। বিশেষ করে বর্ষার কর্দমাক্ত মাটিতে। এখন তার পরিকল্পনা, এ মহিষ দুটোকে ভাল দামে বিক্রি করে আবার চারটে কমদামি মহিষ শাবক কিনবে সে। যার দুটো হবে পুরুষ, আর দুটো ফিমেল মহিষ। পুরুষ দুটোকে বানাবে দক্ষ হালটানার জন্যে, আর দুধ বা শিশু জন্ম দিয়ে তার মহিষ একদিন বড় “বাথানে” পরিণত হবে এ স্বপ্নে কিনতে চায় সে নারী মহিষ। অন্য কোন কাজে দক্ষ নয় সেলিম। তাই বলে হেসে, ‘মহিষ পালন ছাড়া আর কিছু জানিনা আমি’। তাই মহিষের সাথে সেলিমের প্রেমময় এক ছান্দিক জীবন। বর্তমানে তার যুবক মহিষ দুটো সেরা চরাঞ্চলে। গত শুকনো মৌসুমে মহিষ দৌঁড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল সেলিমের মহিষ। আর দুমাস পর আমার কোলকাতার এক ফেসবুক বন্ধু পরিবার যখন বেড়াতে আসবে আমার চরাঞ্চলে, তখন সেলিম তার মহিষের দৌঁড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে দেখাবে আমায়, এ দৃঢ়তা তার ভাঙা দৃঢ় চোয়ালে ফুটে উঠেছিল বারবার।
:
জীবনে খুব কম রাতই সে কাটিয়েছে স্ত্রীর ওমে। মাসের ২৮/২৯ দিনই সে মহিষের সাথি হয়ে চরাঞ্চলের টংঘরে ঘুমোয়, যাতে তার এই দুর্লভ সম্পদ চোরেরা হাতিয়ে তাকে শূন্য করে না দিতে পারে। কেবল দিনে ভাত খেতে আসে তার ঘরে। দুর চরে গেলে মুরি বা আটাররুটি সাথে নিয়ে যায়, অনেকদিন ফেরেও না, সময় বাঁচানোর জন্যে। বলতে গেলে দিনের ২৪-ঘন্টার ২২-ঘন্টাই থাকে মহিষের সাথে। আমি যখন সেলিমের চরের ভাঙা ঘরে ঢুকি, তখন তার স্ত্রী নিজপালিত হাঁসের ডিম ‘অমলেট’ করে আনে আমার সামনে। তরতরে লাউ ডগারা দুলতে থাকে সেলিমের ঘরের চালে ওদের জীবনের প্রতিক হিসেবে। ওর হোগলা পাতার বেড়া দেয়া “টয়লেট” দেখে বারিধারার আধুনিক কোটি টাকায় নির্মিত অভিজাত টয়লেটের কথা মনে করে চোখ অশ্রুশিক্ত হয় আমার। তারপরো সেলিম কিংবা তার স্ত্রী আকলিমার জীবনে এক দুখহীন সুখের ঝিলিক দেখে ফিরি আমি।
:
আমি সেলিমের অবোধ শিশুর পাপহীন জ্যোতির্ময় শরীর স্পর্শ করে পৃথিবীর সুক্ষ্মতম সুখ বলয়ে ঘুরতে থাকি। সুখহীন মানুষ হয়তো অজান্তে আশ্রয় চায় ঘুমের কাছে কিন্তু সেলিম মহিষের চরে কাটায় তার ঘুমহীন দিনরাত। তারপরো ওর স্ত্রী আকলিমা শূন্য বিছানায় চৈত্রের খাঁ খাঁ রৌদ্রের মতো হাসে এক ভবিতব্যের গানে। সেলিমের সংসারের স্বাপ্নিক ভালবাসার উর্ধ্বগামী সূচক দেখে আমি বিস্মিত হই। ওদের সুখ দেখে চরের ফুঁপিয়ে কাঁদা ঘাসশিশুরাও দোল খায় জলের দোলনায়। তারপরো সেলিমের এ সংগ্রামময় বলিকৃত মুকবধির পশুর মতো ক্লেদময় জীবন দেখে দলিত হই আমি। অনেকক্ষণ ঘুরে ক্লান্তিময় জীবনের ছন্দহীন সারিবদ্ধ দুপুর সরিয়ে ফিরে আসি আমরা মূল গাঁয়ে। আমি স্বাপ্নিক চোখে দেখতে থাকি সেলিমের ছন্দায়িত জীবন দোলায় ভাঁটফুল ফোটে, মহিষের চরের দুপুরের রোদের রোঁয়াকে ঝিলিক তোলে এক অনন্যতা। হয়তো এসব সেলিমদের জীবনের অমৃতে মিলবে একদিন প্রত্নগন্ধের উজ্জ্বলতার জলসিঁড়ি।
:
[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 88]
 
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 9 = 1