জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-88

ঐ পরীটি আর আসেনি কোনদিন
:
কিশোর বয়স থেকে বস্তুবাদি আর যৌক্তিক ছিলাম আমি। তুকতাক অলৌকিকত্বে বিশ্বাস ছিলনা আমার মোটেও। কিন্তু তারপর একটা ‘পরী’র সাথে দেখা হয়েছিল আমার স্কুলে পড়তাম যখন। যদিও প্রথমে জীন-পরী, ভুত-প্রেতেও বিশ্বাস ছিলনা আমার একটুও। কিন্তু প্রায়ই আমার জীবনে অলৌকিক ঘটনা ঘটতো। আমার পড়ার টেবিলে মাঝে মাঝে বিবিধ জিনিসপত্র পেতাম আমি কিন্তু কিভাবে তা এলো বুঝতাম না কখনো। তখন চিন্তিত থাকতাম সারাদিন ব্যাপারটা নিয়ে।
:
একবার মায়ের সাথে তার বাবার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম আমি। খুব গরমের দিন থা্কাতে মা-সহ অনেকেই নদীর তীরে ঘুমুতে গিয়েছিল অন্য নারীদের সাথে। আমি নানাবাড়ির দোতলা ঘরের একটা রুমে সব জানালা খুলে ঘুমিয়েছিলাম। কিন্তু এক সময় আমার ঘুম ভেঙে গেলো কার স্পর্শে যেন। ভয় পেয়ে চিৎকার করতে গিয়েও করতে পারলাম না আমি। মনে হলে একটা অদৃশ্য হাত আমার মুখ চেপে ধরে কানে কানে বললো, “ভয়ে পেওনা। আমি পরী। তোমাকে ভালবাসি। কোন ক্ষতি করবো না তোমার”। বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়ে একসময় সামনে এলো ঐ কিশোরি পরীটি। কেবল আলোর মত ঝলকানি বের হচ্ছিল তার শরীর থেকে। ভয় কাটলে তাকে ছুঁয়ে দেখতে চা্ইলাম আমি। কিন্তু তুলোর মত নরম খুব হালকা মনে হলো তাকে আমার। কেমন যেন বায়বীয়। সে কিন্তু আমাকে চারদিক দিয়ে কিভাবে যেন জড়িয়ে ধরেছিল।
:
এরপর আমার বাড়িতে গভীর রাত হলে প্রায়ই আসতো সে সবাই ঘুমালে। আমি একা ঘুমালেই পরীটি আসতো, অন্য কারো সাথে ঘুমালে আসতো না। এসএসসি পরীক্ষার আগে অনেক রাত জেগে পরতাম আমি, তখন প্রায় প্রতি রাতেই পরীটি আসতো। এরপর আমার আর ভয় করতোনা তাকে। বরং তার প্রতিক্ষায় থাকতাম আমি। একরাতে আমাকে সুন্দর একটা কলম দিয়েছিল পরীটি। বলেছিল, ‘এটি দিয়ে পরীক্ষায় লিখবে, তাহলে কোন উত্তর ভুল হবেনা তোমার’। বিস্ময়করভাবে এসএসসি পরীক্ষা্ ভাল হয়েছিল আমার। এমনকি যে গণিতে ভয় করতাম আমি, তাও ভাল হয়েছিল। ঐ কলমের কারণে কিনা জানিনা আমি! ঐ কলমটা পরবর্তীতে চুরি হয় শহর থেকে।
:
একবার পরীটি জানতে চাইলো আমি তার সাথে ঘুরতে যেতে চাই কিনা? আমি হ্যা বললে অনেকক্ষণ পরীটি আমার নিয়ে আকাশে কিংবা কিভাবে যেন উড়লো। আমি উপরে জ্বলজ্বলে তারাগুলোকে, আর নিচে আমাদের বাড়ি আর নদীর জল দেখেছিলাম। সে কোথায় গিয়েছিল আমাকে নিয়ে আমার মনে নেই এখন। হয়তো এ পৃথিবীর কোন এলাকায় কিংবা অন্যত্র কিনা জানিনা আমি। তবে ওদের সাথে থাকলে এসব প্রশ্ন কেন যেন মনে আসেনা তখন। একটা বিমুগ্ধতার মধ্যে সময়টা কেটে যায়। পরীরা কি মানুষের মন পড়তে পারে কিংবা মনকে আটকে দেয় তাদের মত করে? হয়তো !
:
যতক্ষণ পরীটির সাথে ছিলাম আমি, ততক্ষণ তা অন্য এক জগত মনে হয়েছিল আমার কাছে। আমাদের চারপাশের মানুষের মত দেখিনি তাদের। প্রচলিত ঘর বাড়ির বাইরে অন্য জগতে উড়ন্ত আর ক্ষীয়মান অষ্পষ্ট ধূসর সব শান্তিময় প্রাণি মনে হয়েছিল তাদের। তবে আমাকে যে পরীটি নিয়ে উড়ছিলো, সে সম্ভবত চাইছিলোনা অন্য পরীদের দেখি আমি বা জানি তাদের জগত সম্পর্কে। তাই একটা জলাধারের কাছে অনেক অচেনা ফুলের মাঝেই কেবল পরীটি ঘুরেছিল আমায় নিয়ে। যেটা ছিল মুলত অন্য কারো আনাগোনার বাইরে। কতক্ষণ ছিলাম ঐ পরীর সাথে তা জানিনা আমি। কারণ তখন আমার মাসহ পরিবারের অন্যদের কথা প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম আমি। কিন্তু এক সময় পরীর দেয়া ফল আর মিস্টি খেতে গিয়ে ক্ষীণতর মায়ের কথা মনে পড়লো আমার। তখন কিশোরি পরীটির কাছে কিভাবে যেন বললাম, ‘মা কই আমার’?
:
আবার পরীটি হাসতে হাসতে উড়লো আমায় নিয়ে। ভোর রাতের দিকে যখন একট বুড়ো তালগাছের মাথায় রেখে পরীটি চলে গেল তার গন্তব্যে, তখন ভোর রাতের আলো আঁধারিতে আতঙ্কিত হয়ে আমি ডাকতে থাকলাম মাকে। আমাদের ঘর থেকে তাল গাছটি বেশ দুরে হলেও, ভোর রাতের নিস্তব্দতার কারণে মা ঠিকই শুনতে পেলো আমার ডাক। অবশেষে এলাকার সবাই সমবেত হয়ে বাঁশ আর রশির সাহায্যে অনেক কষ্টে নামালো আমায় ঐ বুড়ো তালগাছ থেকে। ঘরে এসে জানলাম, পুরো দুদিন নিখোঁজ ছিলাম আমি। সবাই খুঁজেছে আমাকে নদী, বিল, চর সর্বত্র। কিন্তু কিছুই মনে করতে পারলাম না আমি এ দুদিন কি কি করেছি আর কই ছিলাম, কি খেয়েছি কই ঘুমিয়েছি ইত্যাদি।
:
আমাদের ঘর থেকে কিছুটা দক্ষিণে একটা বড় তালগাছ ছিলো। যাকে আমার বাবাও নাকি অমন বুড়োই দেখেছে। ঘটনাক্রমে জন্মসূত্রে তালগাছটি কিছুটা বাকা আর জটিল থাকাতে ওটাতে কখনো কেউ উঠতে পারতো না। আমি অনেক বড় বড় গাছে চড়লেও, ঐ তালগাছে অনেক চেষ্টা করেও নিজে একাকি বা সম্বিলিতভাবে কখনো উঠতে পারিনি। কিন্তু ভোর রাতে কিভাবে ঐ তালগাছে ছিলাম আমি তার কিনারা এখনো করতে পারিনি আমি। এটা কি সত্যি ছিল আমার জীবনে? তা এক বিস্ময়কর প্রশ্ন এখনো আমার কাছে!
:
ঐ তালগাছের ঘটনার পর আর পরীটি আসেনি আমাদের বাড়ি। কারণ মা নানাভাবে বাড়িটি ‘প্রটেক্ট’ করেছিল তার ছেলেকে বাঁচাতে। তারপর থেকে আর কোনদিন একা ঘুমুতে দেয়নি আমায় মা। সে নিজে, বোনদের সাথে কিংবা ভাগ্নে থাকতো আমার বেডে। মা বলতো, একা থাকলে আমাকে নাকি আবার নিয়ে যাবে পরীতে। কিশোরি সুন্দরি পরীটিকে আমার ভাল লাগলেও, কখনো চাইতাম না, মাকে ছেড়ে ঐ পরী নিয়ে যাক আমায়।
:
এর প্রায় দুবছর পর ইন্টার পরীক্ষার আগে ঘটনাক্রমে ফুফাতো বোনের এক বিয়ে বাড়িতে একাকি তন্দ্রার মত কিছুটা ঘুমিয়েছিলাম আমি একটা খালি রুমে। হঠাৎ অন্ধকারের মাঝেও রুমটি আলোকিত হয় এবং ঐ পরীটি আসতে চায় আমার কাছে। কিন্তু কি এক ‘অবোধ্য কারণে’ পরীটি আমায় ছুঁতে পারছিলোনা। তারপরো দুরে দাঁড়ানো নেচে চলা ছিপছিপে তন্বী নারীর মত কেমন এক ভাললাগার উচ্ছ্বাসের কোলাহলে পূর্ণতর হই আমি তাকে দেখেই। কিন্তু পরীটি মনের আগুনে কপাট-খোলা জীবন চুল্লিতে পুড়তে থাকে যেন। প্রায় দুবছর পর ঐ পরীটির জন্যে কষ্টের ভেজা পৌষের ধানহীন মাঠে শিশিরে স্নাত হই আমি পুনরায়।পরীটি অনেকক্ষণ কষ্টের আজানুকেশে মুখ ঢেকে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে দূর থেকে। অবশেষে ভাঙা হৃদয়ের অনাবিল প্রেমজ ঘ্রাণ রেখে পরীটি কি এক করুণতার শব্দ তুলে উড়ে যায় দুরে। বেদনায় নুয়ে পরে ভাললাগার এক বসতির মাঝে তাকিয়ে থাকি আমি উড়ে যাওয়া পরীটির দিকে। এতো বছর পর এখনো ঐ পরীটির স্মৃতি বুকের মধ্যে বেদনার রিমঝিম বৃষ্টি নামায় আমার। যদিও বস্তুবাদি আমাকে ঐ পরীটির গল্পটাকে এখন অরঙা কাঠখোট্টা অশুভাসিত এক কল্পিত ঘ্রাণের গল্প বলে মনে হয় মাঝে মাঝে। তারপরো ঐ নাম না জানা পরীটি এখনো আমার জীবনের কষ্টের দিঘীতে জেগে থাকে সারারাত সারাদিন সারাক্ষণ!
:
[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 89]
 
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

49 − 42 =