জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-89

গতকালকের পোস্টে আমার কৈশোরে এক পরীর সাথে কিছু সুখ, রোমান্স আর কষ্টের সত্যি স্মৃতি নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম। এ পোস্ট পড়ে আমার কোলকাতার নারী ফেসবুক বন্ধু ‘সুনয়না ব্যানার্জি’ তার জীবনের এমন কিছু রোমান্সকর অভিজ্ঞতা ইনবক্সে আর টেলিফোনে শেয়ার করলো আজ, যা আমার পাঠকদের সাথে শেয়ার না করে পারলাম না। ‘সুনয়না’র ভাষাতেই তা হুবহু বর্ণনা করছি নিচে।
:
আমার ১০/১১-বছর বয়সে একদিন ঠিক সন্ধ্যেবেলায় আমাদের ঘরের খোলা জানালায় স্পষ্ট একটা ‘গোলাপী মুখ’ দেখলাম আমি জ্বলজ্বলে চোখে। বিস্মিত হয়ে ধরতে গেলেই মুখটি ঘুরে গেল এবং আমার চোখের সামনেই উড়ে গেল আকাশে। সন্ধ্যের আবছা আলোতে স্পষ্ট দেখলাম প্রজাপতির মত সপ্তরঙা দুটো বড় পাখা নেড়ে-নেড়ে মুখটি হারিয়ে গেল দূর নীলাকাশে। ঐ মুখটি আর অনেকদিন দেখিনি আমি। সম্ভবত ওটা কিশোর পরী ছিল।
:
ইন্টারে পড়ার সময় আমার সখ হলো ফুল বাগান করার। নানাবিধ ফুলের চারা লাগিয়েছিলাম বাগানে, যার ৯০% ছিল সাদা রঙের। কেবল ১০% ফুল লাল বা অন্য রঙের ছিল। পরিচর্যার এক পর্যায়ে বাগান আলোকিত করে নানান ফুল ফুটলো আমার। বিশেষ করে সাদা রঙের রজনীগন্ধ্যায় ভরে উঠলো বাগান। রাতে রজনীগন্ধ্যার মৌ-মৌ গন্ধ্যে পাগল হতো মনটা আমার। তাই ঘ্রাণের শুভ্রতায় জানালা খোলা রাখতাম, যেন গন্ধটা আসে সরাসরি। ভোর রাতের দিকে হঠাৎ চোখ খুলে গেলো আমার। বিস্ময়করভাবে চেয়ে দেখি, সাদা ফুলের মাঝে পুরা সাদা কাপড় পরিহিত, কালো দাড়িওয়ালা, সাদা কাপড় মাথায় এক লোক দাঁড়িয়ে। সে ডাকছে আ্মায় ফুলের বাগানে। ভয়ে জানালা বন্ধ করে ফেললাম আমি।
:
এরপর প্রায় প্রতি রাতে স্বপ্নে দেখতাম ঐ মুখটি একটা লোক হয়ে ২-পাহাড়ের মাঝে একটা সরু পথে ছোট একটা কুঁড়ের সামনে দাঁড়িয়ে। কুড়েঁর বারান্দায় এক সাদা বুড়ি বসা। দুজনেই ডাকছে আমায় তাদের ঘরে যেতে। কিন্তু আমি নির্ভয়ে তাদের কুঁড়ে ডিঙিয়ে সামনে চলে যেতাম। তারা ডাকলেও বাঁধা দিতোনা আমায় আমার চলার পথে। এভাবে প্রায় প্রতি রাতেই আমি স্বপ্ন দেখতাম কুঁড়ে আর সামনে চলে যাওয়াটা। কিন্তু সাদাফুলগুলো যখন ঝরে পড়লো কিংবা ফোটা বন্ধ হলো, তখন ঐ স্বপ্নও বন্ধ হলো আমার। এমনকি পরীক্ষার জন্যে ২/১ দিন জানালা খোলা রাখলেও, ঐ সাদা লোকটাকে আর দেখতাম না তখন আমি। আবার যখন সাদা ফুল ফুটতো, তখন স্বপ্ন আর বাগানে আসতো সেই লোকটি একটা মাদকতার ঘ্রাণ নিয়ে।
:
আমার বিয়ে ঠিক হলে বিয়ের ঠিক একদিন আগে স্বপ্ন দেখি, ঐ লোকটা একটা জাহাজে করে এক অথৈ সমুদ্র দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমায় এক অচেনা দেশে। আমি মনমরা হয়েও জাহাজে তার পাশেই বসে আছি কোন অজানা গন্তব্যে যেতে। কিন্তু সামনে কেবল কালো মেঘ, আর অথৈ সমুদ্রের নীল জল। কিন্তু ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও আমি বাঁধা দিচ্ছিনা তার কাজে, বরং চলে যাচ্ছি সব ফেলে তার সাথেই এক অজানা দেশে।
:
বিয়ে হলে স্বামীর সাথে কোলকাতার কাছে একটা গ্রামে চলে আসি স্বামীর বাড়িতে। প্রথমে কোন কিছুই হয়নি বাস্তবে বা স্বপ্নে। কিন্তু একদিন স্বামী কোলকাতা থেকে অনেকগুলো রাজনীগন্ধ্যা নিয়ে এলো আমার জন্যে। সাজিয়ে রাখলাম তা ঘরে। আর সেই রাতেই অনুভব করলাম, ঠান্ডা কোমল কোন হাত যেন আমার কপাল আর ঠোঁট ছুঁয়ে গেল। তারপর আমাকে আমার স্বামীর বাড়ি থেকে কি এক কৌশলে যেন তার ঐ পাহাড়ের নিচের কুঁড়েঘরটিতে নিয়ে গেল। তাকে অনুনয় করে বললাম, তুমি কেন আনলে আমায় এখানে? স্বামী জানলে কি মনে করবে সে? কিন্তু ঐ লোককি কিছু বললো না কেবল বললো, তুমি আমার। আমি প্রচন্ড বেগে দৌঁড়ুতে থাকলাম স্বামীর বাড়ির দিকে। এক সময় মনে হলো ধপাস করে পড়লাম আমি খাটে। স্বামী বেচারাও লাফ দিয়ে উঠলো শব্দ শুনে, ঘুমের ঘোরে বললো, কি পড়লো শব্দ করে বিছানায়? বাতি জ্বালালো সে। দেখলাম ঘামে ভিজে যাচ্ছি আমি, মনে হলো অনেক উপর থেকে পড়লাম আমি এই বেডে এখনই।
:
সাদা ফুলের সাথে ঐ অশরীরি মানুষের আসার যোগ আছে তা তখনো বুঝিনি আমি বা আমার স্বামী। আরেকদিন আমাদের বিয়ে বাষির্কীতে অনেক সাদা ফুল উপহার পেলাম আমি। ঐ রাতেও সেই লোকটি আসলো। সারারাত আমার বেডের চারদিকে রজনীগন্ধ্যার মৌমৌ গন্ধ ছিল, তার খাটে ওঠা আর নেমে যাওয়া স্পষ্ট অনুভব করলাম আমি। রাত ৩টার দিকে ওয়াশরুমে গেলে লোকটিকে কার্নিশ গলে বাইরে যেতে দেখলাম আমি, তারপর স্পষ্ট শুনলাম তার গান বাইরে থেকে। ভয় পেয়ে সব সাদা ফুলগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলাম বাইরে। বিস্ময়করভাবে সকালে উঠে আর একটা ফুলও পাইনি ওখানে আমি। এখন সাদা ফুলের সংস্পর্শে এলেই ঐ লোকটি আসে আমার স্বপ্নে কিংবা বাস্তবে। আমি জানিনা সে কি পরী, জীন নাকি অন্য কিছু? এখনো এক রোমান্স আর ভীতির মাঝে কাটে আমার দিন। কিন্তু সব সময় দুরে থাকি সাদা ফুল আর ঘ্রাণ থেকে ।
:
কোলকাতা থেকে আ্জ ফোনে এ কাহিনি বিষদভাবে যখন বললো সুনয়না, তখন তার কণ্ঠে এক প্রেমময় যন্ত্রণাদগ্ধ জীবনের আত্তাহুতি খুঁজে পেয়েছি আমি। স্বপ্নময় ছকবাঁধা জীবন প্রহরীর গান গাইতে গাইতে সুনয়না সম্ভবত ঐ লোকটিকে অনুভব করে এখনো। তাই লজ্জাশীল বালিকার বৃষ্টিতে ছুঁয়ে যাওয়া অন্তর্বাসের মত সুনয়না এক সময় আমায় বলেই ফেললো, স্বামী সন্তান যখন কেউ থাকবে না ঘরে, তখন সাদাফুল রাখবো আমি আমার শিয়রে, যাতে অন্তবিহীন সীমাহীন ভাললাগারা অন্তত একবার নিঝুম আকাশে ঘুমুতে পারে আমার গলা ধরে। আমি দেখতে চাই ঐ সাদা লোকটিকে আমার হৃদমননের খুপরি ঘরে অবশেষে কি চায় সে? কথা বলতে বলতে সুনয়নার কণ্ঠে বিসর্জনের করুণ বেহালার সুর শুনতে পাই আমি, যা আমার হারিয়ে যাওয়া পুরণো পরীটির প্রেমজ পোড়োবাড়ির স্মৃতির মতো দগ্ধ করে আমায় আবার অনেকদিন পর
:
[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 90]
 
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

55 − 45 =