জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-90

নদী ভাঙনে আমাদের স্কুলটি প্রায় নদীর কাছাকাছি হলে, অনেকগুলো বেদে নৌকো আমাদের স্কুল সংলগ্ন ঘাটে নৌকা বেঁধে রাখতো রাতে। সারাদিন তারা নদীতে ইলিশ ছাড়া অন্য ছোট-ছোট পাঁচ-মেশালি মাছ ধরতো। অন্য এলাকার বেদেরা সাপের খেলা, চুড়ি বিক্রি, শিঙা টানার মতো কাজ করলেও, আমাদের স্কুল ঘাটে লাগানো নৌকোর বেদেরা কেবল মাছ ধরার কাজই করতো। নৌকা বাওয়া, নদীতে জাল ও বড়শি ফেলে সারাদিন মাছ ধরা ইত্যাদি প্রায় সব কাজ বেদে নারীরাই করতো। বেদে পুরুষরা কেবল নৌকা মেরামত, আর বাজারে মাছ বিক্রির জন্যে নিয়ে যেতো। কোন কোন নৌকার পুরুষ অসুস্থ্য বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে, ঐ নৌকার বেদে নারীরাই বাজারে উঠতো মাছ বিক্রির জন্যে মাঝে মধ্যে। প্রায় ৫/৬ মাস বেদে নৌকো আমাদের স্কুল ঘাটে থাকার কারণে অনেকে বেদে বেদেনির সাথে পরিচয় হয়ে গিয়েছিল আমাদের।
:
আমি যখন ৯ম শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমাদের স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়তো আমাদের চেয়ে বয়সে বেশ বড় “বাকু ভাই”। আমি টেনে উঠলে ‘বাকু ভাই’ প্রমোশন না পেয়ে আমাদের সাথে টেনেই পড়তে থাকে। যদিও তার বয়স আমাদের চেয়ে অন্তত ৬/৭ বছর বড় ছিল। কিন্তু মেধা বেশ কম থাকাতে সে প্রায় পরীক্ষায়ই ফেল করতো। পড়ালেখায় কিছুটা কাঁচা হলেও, বাকু ভাই মানুষ খুব ভাল ছিল। তার বাপ-দাদার অনেক সম্পত্তি থাকাতে সে বাজারে প্রায়ই আমাদের ১২-জনের বন্ধু গ্রুপকে এটা-ওটা কিনে খাওয়াতো টাকা খরচ করে। চাইতো আমাদের ১২-জনের বন্ধু গ্রুপে তাকে যেন নেই। কিন্তু সে বয়সে আমাদের বেশ সিনিয়র হওয়াতে আমরা তার সাথে সহজ হতে পারতাম না।
:
প্রায় ৩০/৪০-টি বেদে নৌকার একটিতে থাকতো ১৪/১৫-বছরের বেদে তরুণি “রাফিজা”। নদী আর নৌকাতো জন্ম নেয়া ও বড় হওয়া রাফিজা নৌকা বাওয়া, জাল ফেলা, মাছ ধরাতে বেশ পারদর্শী ছিল। সাধারণত বেদে নারীরা গাঁয়ের সাধারণ নারীর মত পোশাক না পরে বেশ খোলামেলা শাড়ি পরতো এবং অনেক সময়ই সেজেগুজে থাকতো। রাফিজার বাবার অসুস্থ্যতার কারণে কখনো সে নদীর ঘাটের বাজারে বসতো মাছ বিক্রির জন্যে। ঘন শ্যামলা কাঠপোড়ার দেহাতি শক্ত চেহারার রাফিজার প্রতি প্রেম জাগলো আমাদের সহপাঠী বাকু ভাইর। কিন্তু সাহস করে রাফিজাকে এ কথা বলতে পারতো না সে। শেষে একদিন আমাদের পেট ভরে ছানার রসগোল্লা খাওয়ানোর পর আমরা ১২-বন্ধু দায়িত্ব নিলাম রাফিজাকে পটানোর। সুযোগ বুঝে রাফিজাকে খুলে বললাম বাকু ভাইর আসক্তির কথা । প্রথমে আপত্তি করলেও, আমাদের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস; আর বাকু ভাইর ধান, জমি, মহিষ বাথান ইত্যাদিসহ তার ধনবান পরিবারের কথায় পটে গেল রাফিজা। বললো, সন্ধ্যার পর যেন নদীর ঘাটে তার সাথে দেখা করে বাকু ভাই। এবং সত্যিই মাস খানেকের মধ্যে রাফিজা আর বাকুভাইর ভালবাসা প্রবল প্রণয়ে পরিণত হলো। আমরা ঘনঘন আরো ছানার রসগোল্লাসহ নানাবিধ জিনিস খেতে থাকলাম বাকু ভা্ইর টাকায়। বাকু ভাইর টানে রাফিজা তার বাবাকে নৌকায় বসিয়ে প্রায়ই নিজে মাছ বিক্রি করতে বসতো নদীর ঘাটের বাজারে।
:
এসব ঘটনা যেহেতু গোপন থাকেনা। তাই বাকু ভাইর রাগি বাবার কানে এ খবর পৌঁছতে দেরি হলোনা। তিনি বাকু ভাইকে ঘরে বেঁধে মহিষ পেটানোর ‘পাইচন” দিয়ে পেটালেন। আমাদের সহায়তাকারী হিসেবে চোখ রাঙালেন, আর রাফিজাকে রীতিমত ভয় দেখালেন তার ছেলের পিছু ছাড়তে। চোখ রাঙানোর কারণে আমাদের আত্মসম্মানে লাগলো খুব। তাই রাফিজা আর বাকু ভাইকে পুন. পটালাম আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে। কিন্তু বাবার ২৪-ঘন্টা নজরদারির কারণে দুজনের দেখা সাক্ষাৎ প্রায় বন্ধ হলো। শেষে মরিয়া হয়ে আমরা বাকু ভাই আর রাফিজাকে উপদেশ দিলাম ‘দেশান্তরি হতে’। কিন্তু কই যাবে তারা? আমাদের অল্প বয়েসি মাথায় বুদ্ধি এলো, জেলেদের ৪০/৫০-টি নৌকার যেটিতে কোন মানুষ রাতে থাকে না, সেটি নিয়ে বাকু ভাই আর রাফিজা চলে যাবে সোজা দক্ষিণ বরাবর। মাছ ধরায় যেহেতু দক্ষ রাফিজা, তাই নৌকাতে নতুন সংসার করবে তারা। আমরা গভীর রাতে তাদের বিয়ে পড়াবো, নানাবিধ জিনিসপত্রসহ নৌকায় তুলে দেব এবং নির্বিঘ্নে ঘাট না ছাড়া পর্যন্ত নদীর ঘাটে থাকবো আমরা ১২-জনেই।
:
বর্ষা ঋতুর এক অন্ধকার রাতে সত্যিই বেদে বহরের একটু দুরে রাফিজা বাকুভাইর বিয়ে পড়ালাম আমরা মুসলিম রীতিতে। আমাদের প্রতিজ্ঞা ও কথা মত বন্ধু ছত্তার তার ঘর থেকে চুরি করে আনলো তার মায়ের বিয়ের পুরণো শাড়ি ও সোনার গহণা। তাই পরানো হলো রাফিজাকে। আমাদের বাজারের মুদি-মনোহরী দোকানে ঘুমানোর কথা বলে চাবি নিয়ে রাতে দোকান খুলে তেল সাবান আলতা পাউডার সব অন্ধকারে হাতিয়ে নিয়ে এলাম এ বিয়েতে উপহার হিসেবে। বেদে বহরের “স্পেয়ার নৌকা” হিসেবে ব্যবহৃত ছৈ-ওয়ালা নৌকাটি সঙ্গোপনে খুলে আনলো বন্ধু সেলিম আর কৃষ্ণ। অন্য নৌকা থেকে জাল আর গাথা বড়শিও ওদের সাথে দিতে ভুললাম না আমরা। যেন ওরা মাছ ধরে খেতে পারে নতুন সংসারে। ডাব, চাল, ডাল নানাবিধ জিনিসপত্র দিলাম আমরা নৌকাতে যেনো ৪/৫ দিনে কোন প্রবলেম না হয় এদের দুজনের। এসব করে নতুন বর-বধুকে সাজিয়ে বিদায় দিতে অনেক রাত হয়ে গেল আমাদের। ফর্সা হওয়ার আগেই প্রবল স্রোতে নৌকা ভাসিয়ে দিয়ে আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম মেঘনার প্রবল স্রোতের দিকে তাকিয়ে।
:
কালো গভীর রাতের উতলা বাতাসে হারিয়ে যাওয়া নৌকোটি অদৃশ্য হলো ক্রমান্বয়ে। ভয়ঙ্কর ঝুকিপূর্ণ এমন কাজ করার পরও, এক স্নিগ্ধ মনোরম সুরক্ষিত সরবরের মত মনটা সুখাতুর বাতাসে নাচলো আমাদের। প্রেমের জন্যে সিদ্ধার্থের মত ওরা ঘর ছেড়েছে এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে। ওদের দুজনের প্রেম যেন ভূল গণিতের সমাধি শৌধের মত, তারপরও আমাদের সবার কিশোর মনে এক আনন্দসুখের ইচ্ছেরা শিখা জ্বালিয়ে দিলো যেন, যাতে আমরা ওদের ভালবাসার শুক্লপক্ষের আগুন রঙা ঝলমলে চাঁদে যেন স্নাত হতে থাকলাম এ ঘনান্ধকারে। আমরা জানতাম না এরপর কি হবে! এক দু:খাতুর রাত্রির নিধান হাতে কেবল ওদের এগিয়ে যেতে দিয়েছি আমরা। সব ভয়কে তুচ্ছ করে ভোর না হওয়া পর্যন্ত আমরা নদীর ঘাটে দাঁড়িয়েই রইলাম, ওদের ভালবাসার কেশদানিতে অগ্রাহণি ফুল হয়ে। জীবন রৌদ্রের চিৎকারে সময়ের সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে ওরা গিয়েছিল অনেক দুর! কিন্তু ওরা কি সুখী হয়েছিল জী্বন নৌকোতে?

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 91]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

95 − 92 =