জার্মানীর হয়েও ভাষা বাংলা হওয়াতেই কি সুর পুরুষতান্ত্রিক?

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই সমাজে যে কোনো বিষয়ে মিডিয়ার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সমাজকে প্রগতির দিকে এগিয়ে নিতে তাই আমরা জনপ্রিয় এবং আধুনিক মনস্ক মিডিয়াগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। আমরা আশা করি, সমাজে চলমান কোনো বিষয়ে প্রগতিশীল মিডিয়াগুলো বস্তু নিষ্ঠ সংবাদ এবং কলাম প্রকাশ করে সঙ্কট নিরসনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

জার্মানীর ডয়েচে ভেলে তেমনি একটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মিডিয়া। পৃথিবীর তেত্রিশটি ভাষায় এটি সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনে ইতিবাচক ভুমিকা পালন করে আসছে, এর মধ্যে বাংলাও উল্লেখযোগ্য একটি প্রকাশনা। বাংলাভাষী পাঠক হিসেবে আমরা আশা করি, ডয়েচে ভেলে বাংলাও বাংলাদেশের চলমান কোনো বিষয়ে বস্তুনিষ্ট সংবাদ এবং দায়িত্ব পূর্ণ কলাম পরিবেশনের মাধ্যমে বরাবরের মতো ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

কিন্তু, দুঃখের সাথে লক্ষ্য করা গেছে যে সমসাময়িক কিছু বিষয় নিয়ে ডয়েচে ভেলের দু’টি লেখার সাথে মৌলবাদী মনস্তত্বের তেমন কোনো পার্থক্য নেই। এ কথা বলা বাহুল্য যে বাংলাদেশের সমাজ এখনও পশ্চাদপদ এবং রক্ষনশীল মৌলবাদী চিন্তাকে ধারণ করতেই বেশি আগ্রহী। বাংলাদেশের সমাজে এখনও বিয়ের আগে ছেলে মেয়ের পারস্পরিক সহজ সম্পর্ককে স্বাভাবিকভাবে নেয়া হয় না, প্রেম বা ভালোবাসার সম্পর্ক তো অনেক দূরের কথা। এহেন পরিস্থিতিতে ডয়েচে ভেলের মতো পত্রিকাও যদি সেই পশ্চাদপদ সমাজের সুরেই কথা বলে, ছেলে মেয়ের স্বাভাবিক সম্পর্ক কিংবা প্রেম বা ভালোবাসার সম্পর্ক এবং মেলামেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কোনো খবর প্রকাশ করে তাহলে তা যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয় বৈকি। জার্মানীর মতো উদার মনোভাবের একটি দেশ থেকে প্রচারিত পত্রিকাটির ভূমিকা এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রশ্ন স্বাপেক্ষ।

পৃথু স্যন্যাল, সম্পাদক, নারী নিউজ

গত ১৯.০৩.২০১৯ তারিখে ডয়েচে ভেলের ব্লগ বিভাগে ঐ পত্রিকাতেই কর্মরত সাংবাদিক আরাফাতুল ইসলামের প্রকাশিত একটি রিপোর্টের (ব্লগটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন) শিরোনাম ছিলো “শিশুদের পার্ক নাকি ‘শিশু তৈরির পার্ক’!” এই শিরোনাম দেখে যে কেউ ধারণা করবে যে পার্কটির কথা বলা হয়েছে, সে পার্কে ছেলে মেয়েরা প্রকাশ্য যৌনতায় লিপ্ত হয়। কিন্তু খবরের ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, যৌনতায় লিপ্ত থাকার কোনো তথ্য তাতে নেই, আছে শিশু পার্কটির নানাবিধ অব্যবস্থাপনার খবর। আর ছেলে মেয়েদের মেলা মেশার কথাটি পাওয়া যায় একটি প্যারায় (অনুবাদ) এবং সাংবাদিকের ভাষ্য মতে “জোড়ায় জোড়ায় তরুণ-তরুণীদের পার্কের নানা কোনায় অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে” বসে থাকতে দেখা যায় এবং পার্কটি একটি “ডেটিং স্পট”। বাংলাদেশের মতো সামাজিক পরিস্থিতিতে ছেলে মেয়েরা যখন সহজ স্বাভাবিকভাবে মেলামেশার সুযোগ পায় না, তখন তারা দেখা স্বাক্ষাত করার জন্য পার্কের মতো নির্জন স্থান বেছে নেবে, এটাই স্বাভাবিক। আর প্রাপ্ত বয়স্ক কিংবা টিনেজরা যদি জোড়ায় জোড়ায় বসে থাকে, তা তো অপরাধের কিছু না।

জানি না, ডয়েচে ভেলের এই খবর থেকে উৎসাহিত হয়েই কিনা, তবে গত ১৬.০৭.২০১৯ তারিখে জনাব একরামুল হক নামের জনৈক সংসদ সদস্য একটি পার্কে অভিযান চালান। তিনি পার্কেরে ভেতরে থাকা ছেলে মেয়েদেরকে মেলামেশা করার অপরাধে অভিযুক্ত করে অপমান করে বের করে দেন। ডয়েচে ভেলের মতো পত্রিকা যদি ছেলে মেয়েদের মেলা মেশাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে, তাহলে বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্যের এহেন অভিযান একেবারেই অবান্তর নয়।

অন্যদিকে, “জেগে উঠুক মানুষ, খসে পড়ুক ট্যাবু” শিরোনামে ডয়েচে ভেলেতে ১২.০৭.২০১৯ তারিখে জনাব তানজীর মেহেদী একটি ব্লগ (পড়তে এখানে ক্লিক করুন) প্রকাশ করেন ধর্ষণ নিয়ে। ব্লগটিতে তিনি ধর্ষণ সংক্রান্ত নানাবিধ বিষয় তুলে ধরে ধর্ষণ প্রতিরোধে নানান দাওয়াই দিয়েছেন। স্বীকার করতেই হবে তাঁর দিক নির্দেশনাগুলো চমৎকার। কিন্তু বাধ সাধে, যখন তিনি ধর্ষণ কমানোর জন্য পতিতালয় স্থাপন কিংবা বৃদ্ধির মতো প্রস্তাব করেন। লেখকের মতে, (অনুবাদ) পতিতালয় বাড়াতে পারলে ধর্ষণ অনেকাংশে কমে যাবে। আমি মনে করি, ধর্ষণের সাথে যৌন চাহিদার যতো না সম্পর্ক তার চেয়ে বেশি সম্পর্ক ক্ষমতার, তার চেয়ে বেশি সম্পর্ক পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্বের বহিঃপ্রকাশের।

যদি ধরেও নেয়া হয়, ধর্ষণের সাথে যৌনতার সম্পর্ক আছে এবং পতিতালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে ধর্ষণ কমানো যেতে পারে তাহলে, প্রশ্ন এসেই যাবে পতিতালয়গুলোতে সেবা দেবে কারা? জার্মানীতে আমার আড়াই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, পতিতাবৃত্তি আইন স্বীকৃত পেশা হলেও সমাজ স্বীকৃত নয়। একজন পতিতা তার নিজের সমাজে নিজের পেশার পরিচয় দিতে পারেন না, দিলে সমাজে কোনঠাসা হয়ে পড়েন। কিছু পতিতালয়ে ঘুরে পতিতাদের সাথে কথা বলে দেখেছি, তারা এই পেশাতে আসার আগেও ইচ্ছুক ছিলেন না। কালচক্রে অথবা ট্রাফিকিং-এর শিকার হয়ে তারা এই পেশাতে এসেছেন যা তারা আবার কর্তৃপক্ষের কাছে শিকার করেন না। এই যদি হয় জার্মানীর অবস্থা, তাহলে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের যৌনকর্মীদের অবস্থা কী তা সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশের পতিতালয়গুলোতে সকল যৌনকর্মীই পাচারের শিকার এবং মানবেতর জীবনযাপন করে। আমরা কি সমাজের কিছু মানুষকে মানবেতর জীবন যাপনের জন্য উৎসাহিত করতে পারি?

না হয়, ধরেই নেয়া হলো, ধর্ষণরোধে কিছু পতিতালয় করলে ভালই হবে। করাও হলো, এরপরও নানান প্রশ্ন এসে যায়। পতিতালয়ে যেসব পুরুষ যাবে, তাদের অর্থের যোগান দেবে কারা? কারণ, আমরা ধর্ষণ বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ না করে, বিকল্প তৈরী করছি। এখন কোনো ধর্ষনেচ্ছু পুরুষের যদি টাকা না থাকে, তাহলে সে কী করবে? সে কি পতিতালয়ে না গিয়ে আবার ধর্ষণ করবে?

এরপর, আশংকার খবর হচ্ছে, ধর্ষণের শিকার দুই তৃতীয়াংশই হচ্ছে অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু। শিশুকামী বা পেডোফিলিক পুরুষদেরকে যখন ধর্ষণের বিকল্প হিসেবে পতিতাপল্লিতে গমনের কথা বলা হবে, তখন তাদের জন্য কি কিছু শিশু যৌনকর্মীও রাখতে হবে? কারণ, শিশুকামি তো আবার প্রাপ্তবয়স্কের সাথে যৌনতায় তৃপ্ত হয় না।

পতিতালয়ের বিপক্ষে আরও অনেক যুক্তি দেয়া যাবে। কিন্তু সেদিকে দৃষ্টিপাত না করলেও সবচে বড়ো বিপজ্জনক দিকটি হলো এই লেখাটি লেখক এমন এক সময়ে প্রকাশ করেছেন যেখানে বিগত ছয়মাসে বাংলাদেশে ৭৩০ জনেরও বেশি নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এই রকম উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা না বলে যদি পতিতালয় বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়, তাহলে তা ধর্ষককে ধর্ষণে উৎসাহ দেবারই নামান্তর এবং আমি মনে করি ধর্ষণের জন্য এটি একটি উস্কানি।

ডয়েচে ভেলের মতো একটি পত্রিকায় আদতে এমন কোনো লেখা প্রকাশ করতে পারে কিনা যা সমাজে অপরাধকে উস্কে দিতে পারে, তা আমার জানা নেই। জার্মান আইন কী বলে সে ব্যপারে আমি এখনও অজ্ঞ। আইন যাই বলুক, আমি মনে করি, ডয়েচে ভেলে বাংলা বিভাগ এই দুইটি লেখা দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে এ ধরণের লেখা প্রকাশ থেকে বিরত থাকবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

82 + = 87