কোরানের মধ্যে বিজ্ঞান, এবং জাকির নায়েকের অজ্ঞতা!

জাকির নায়েক অনেক বড় মাপের একজন মানুষ, আমার মত তুচ্ছ একজন নাস্তিক তার কাছে কিছুই না। সারা পৃথিবীতে তার লক্ষ কোটি ফলোয়ার আছে। মুসলমানদের কাছে মোহাম্মদের পরে সম্ভবত জাকির নায়েকই সর্বশেষ্ঠ পন্ডিত।

জাকির নায়েকের এই অবস্থান তৈরি হওয়ার একটি মাত্র কারণ, আর সেটা হলো বিজ্ঞানের আলোয় যখন ধর্মগুলো হারিয়ে যেতে শুরু করেছে, তখন জাকির নায়েক এই ধর্মটাকেই বিজ্ঞানের সাথে মিলানোর চেষ্টা করেছেন। এজন্যই ধর্মান্ধ এবং ধার্মিকদের কাছে তিনি শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হয়েছেন।

জাকির নায়েক একটা ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের যুক্তি দেখিয়ে ধর্মগুলোকে সত্য বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করে। এবং সর্বশেষে একটা ধর্মকেই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে মানুষের সামনে তুলে ধরেন। আমি জাকির নায়েকের বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে যুক্তি দেখানো হাস্যকর গল্পগুলোর সাথে সম্পূর্ণ একমত।

কারণ সকল ধর্মই মিথ্যা, অন্ধকার আর কুসংস্কারে আবদ্ধ, তাই একটা ধর্মের সাথে আরেকটা ধর্মের গভীর একটা সম্পর্ক রয়েছে। কেননা সকল ধর্মই অন্ধবিশ্বাসে বিশ্বাসী। ধর্মগুলোর উৎপত্তির একটি মাত্র কারণ, আর সেটা হলো ভয় এবং মানুষের অজ্ঞতা।

জাকির নায়েক বোকা ধর্মান্ধ মানুষদের যেভাবে আরো বোকা বানায়, সেটার নাম হচ্ছে লজিক্যাল ফ্যালাসি। যখন মানুষের কাছে ধর্মগ্রন্থ এবং মানুষের উৎপত্তি সম্পর্কে সঠিক কোন জ্ঞান থাকে না, তখনই মানুষ কুযুক্তি দিয়ে সেটাকে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করে। আর জাকির নায়েক সহ পৃথিবীর সকল ধর্মগুরুরা সেটাই করতেছে।

লজিক্যাল ফ্যালাসি কি তার ছোট্ট একটা উদাহরণ আপনাদের দিয়ে রাখি। মোহাম্মদ কে বলা হয় (উম্মি) তার কাছে প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা ছিল না, এরকম অশিক্ষিত একজন মানুষের কাছে এত বড় একটা কোরআন শরীফ কিভাবে আসলো? এতেই প্রমাণ হয় কোরান স্রষ্টার বাণী, এবং মুহাম্মদ আল্লাহর প্রেরিত দূত।

এটাই হচ্ছে লজিকাল ফ্যালাসির ছোট্ট একটি উদাহরণ।

আসল সত্য হলো, কোরান মোহাম্মদ নিজে নিজে নিয়ন্ত্রণ করেননি, কোরআন বিভিন্ন সাহাবীদের মুখে মুখে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, পরবর্তীতে এটাকে একত্রিত করে সংস্কার করা হয়, এখানে মোহাম্মদ জাস্ট একটা মাধ্যম মাত্র। মোহাম্মদকে সামনে বসিয়ে রেখে অন্যান্য সাহাবীরা আগের ধর্মগ্রন্থগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে, নতুন ভাবে কোরআন শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন। তার সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে সাহাবী আবু বক্কার।

হাদিসে আছে, আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী(স)-কে বলতে শুনেছি, চার ব্যক্তির নিকট থেকে তোমরা কোরআনের পাঠ গ্রহণ করঃ (১) ইবনে মাসউদ (২) আবু হুযাইফার মুক্ত গোলাম সালিম (৩) উবাই (ইবনে কা’ব) ও (৪) মুয়ায ইবনে জাবাল।” (সহীহ আল-বোখারী। এখানেই পরিষ্কার হয়ে যায় মোহাম্মদ বলে দিয়েছেন কুরআনের গল্পগুলো তাদের মধ্যে ছিল, তাদের থেকে তোমরা জেনে নাও।

জাকির নায়েকের অজ্ঞতার আরেকটি বড় দিক হচ্ছে তিনি প্রশ্ন পুরাপুরি বুঝার আগেই উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। যেটা নিতান্তই হাস্যকর। আমার ধারণা এইরকম মূর্খতা ইসলামের স্রষ্টা মোহাম্মদ নিজেও করেননি। একটা মানুষ সকল বিষয়ে কখনোই পারদর্শী হতে পারে না, পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই যার কাছে সকল প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। কিন্তু উত্তর না জানা মানুষরাও যে উত্তর দিতে পারে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে লজিকাল ফ্যালাসি। লজিক্যাল ফ্যালাসি মাধ্যমে উত্তর না জেনেও উত্তর দিয়ে থাকে, আর বোকা ধর্মান্ধরা সেটাই বিশ্বাস করে।

——————————————-
জাকির নায়েক সবসময় কোরআনের মধ্যেই বিজ্ঞান খুঁজে পান, তিনি ঘুরিয়ে পেচিয়ে কোরানকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান বলে দাবি করেন। আসুন কুরআন এবং বিজ্ঞান নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেখা যাক। বিশেষ করে পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য এবং প্রাণী জগতের উদ্ভবের ইতিহাস আমাদের জানা দরকার।

সৃষ্টির শুরু সম্পর্কে বিজ্ঞান যা বলে।

ঠিক কখন পৃথিবী তৈরি হয়? একেবারে শুরুর কোনো পাথর টিকে নেই, তাই সঠিক করে বলা যায় না। তবে ধারণা করা হয় সৌরজগৎ সৃষ্টির মোটামুটি ১০০ মিলিয়ন বছর পর একগুচ্ছ সংঘর্ষের ফল হলো পৃথিবী। আজ থেকে ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী নামের গ্রহটি আকৃতি পায়, পায় লৌহের একটি কেন্দ্র এবং একটি বায়ুমণ্ডল।

কোরান যা বলে!

– সত্য প্রত্যাখানকারীরা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমন্ডলি ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে; অত:পর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম’ (সূরা আম্বিয়া:৩০)।

– আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তিনি-ই আকাশমন্ডল ও পৃথিবী ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন; অত:পর আরশের ওপর সমাসীন হলেন। যা কিছু তা থেকে বের হয় আর যা কিছু আকাশমন্ডল থেকে অবর্তীণ হয় ও যা কিছু তাতে উত্থিত হয়, তা সবই তাঁর জানা আছে। (সূরা আল-হাদীদ: ৪)

————————————-
প্রাণী জগতের উৎপত্তি সম্পর্কে বিজ্ঞান যা বলে!

পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে। প্রথমে ছিল অতিক্ষুদ্র অকোষীয় প্রাণি, পরে ধীরে ধীরে বৃহৎ বৈচিত্রের প্রাণিদের উৎপত্তি ঘটে।

– প্রাণের প্রথম নিঃশ্বাস

মোটামুটি ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে সালোকসংশ্লেষণ থেকে আসে প্রথম অক্সিজেন। পাথরের ওপরে জন্মানো সায়ানোব্যাকটেরিয়া বা নীলচে সবুজ শ্যাওলা থেকে প্রথম অক্সিজেন আসে। তবে এটা আসলে ভালো কিছু করেনি। এই অক্সিজেনের উপস্থিতির কারণে এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া মরে যায় যারা অক্সিজেন এর উপস্থিতি সহ্য করতে পারে না। আর এভাবে ২.৪ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে অক্সিজেন অনেক বেশি বেড়ে যায় যাকে বলে হয়ে থাকে “Great Oxygenation Crisis”।

– নিরুপদ্রব এক বিলিয়ন বছর

প্রথম মহাদেশ তৈরি হবার পর এক বিলিয়ন বছর তেমন কিছুই হয়নি পৃথিবীতে। একেবারে একঘেয়ে একটা সময় গেছে। মহাদেশগুলো আটকে ছিলো একটা ট্রাফিক জ্যামে অর্থাৎ তেমন একটা নড়াচড়া করেনি। প্রাণের তেমন কোন উন্নতিও ঘটেনি এ সময়ে।

– ভয়ংকর শীতকাল

৭৫০ মিলিয়ন বছর আগে হঠাৎ করেই একটা বড় মহাদেশ অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে বের হয়ে যায়। এ সময়ে পৃথিবী একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে একটা বিশাল বরফের গোলায় রূপান্তরিত হয়। এ সময়ে হিমবাহ দিয়ে ঢাকা ছিলো ভূপৃষ্ঠ। এমনকি বিষুবীয় অঞ্চলেও ছিলো হিমবাহ।

– মহা-মহাদেশ

মহা-মহাদেশের মাঝে একটি হলো প্যানগায়া। এখানে পরবর্তীতে উৎপত্তি ঘটবে ডায়নোসরের। অন্যটি হলো ইউরেশিয়া। এখনো বিভিন্ন পর্বতমালা দেখে গবেষকেরা বের করতে পারেন ঠিক কিভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকা একত্রে যুক্ত থেকে এসব বিশাল মহা-মহাদেশের সৃষ্টি করেছিলো।

– প্রাণের বিস্ফোরণ

৬৫০ মিলিয়ন বছর আগে বায়ুমণ্ডলে আবারো বাড়তে শুরু করে অক্সিজেন এবং এ সময়ে বিভিন্ন প্রাণীর উদ্ভব হতে থাকে। এককোষী প্রাণীর পাশাপাশি এসে পড়ে বহুকোষী প্রাণী। এই সময়সীমার মাঝেই শিকার এবং শিকারির উদ্ভব হয়।

প্রাণের উৎপত্তি সম্পর্কে কোরান যা বলে!

– আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন, যা ছিল ধূম্রপুঞ্জবিশেষ। অতঃপর তিনি ওকে (আকাশকে) ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় এসো। ওরা বলল, আমরা তো অনুগত হয়ে এলাম।’ (সূরা হামিম : ১১)

– আল্লাহ সব জীব সৃষ্টি করেছেন পানি থেকে, ওদের কতেক পেটে ভর দিয়ে চলে (সাপ), কতেক দুই পায়ে চলে (মানুষ) এবং কতেক চলে চার পায়ে (জন্তু-জানোয়ার), আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্ব শক্তিমান।’ (সূরা নূর : ৪৫)

– যে জিনিসই তিনি সৃষ্টি করেছেন উত্তম রূপে সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষ সৃষ্টির সূচনা করেছেন কাদামাটি থেকে।
( সূরা সাজদাহ : ৭)

– মানুষের সৃষ্টি শুরু করেন মাটি থেকে তারপর তার বংশ-ধারা চালান একটি নির্যাস থেকে যা বের হয় তুচ্ছ পানির আকারে।
(আস সাজদাহ : ৮ আয়াত)

– মাটির শুকনো ঢিলের মত পচা কাদা থেকে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।
সূরা আর রাহমান : ১৪)

– যখন তোমার রব ফেরশ্‌তাদেরকে বললো, “আমি মাটি দিয়ে একটি মানুষ তৈরি করবো।
(সূরা সদঃ : ৭১)

– তারপর তার বংশ উৎপাদন করেছেন এমন সূত্র থেকে যা তুচ্ছ পানির মতো।’
(সূরা আল ফুরকান : ৫৪)

কোরানের আয়াতগুলো দিয়ে স্পষ্ট প্রমাণ হয়ে যায়, প্রাণীজগত এবং মানবজাতি সৃষ্টির তত্ত্বে কোরআন একেক জায়গায় একেকরকম তথ্য দিয়েছে। এখানে কোরআনের অসঙ্গতি গুলো আমাদের সামনে চলে আসে। এই আয়াতের সঠিক বিশ্লেষণ না করতে পেরে ধর্মগুরুরা অন্যরকম এক কুযুক্তি দাঁড় করিয়ে দেয়। যেমন ধর্মগুরুরা বলে থাকেন কোরআন বোঝার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের কখনো হবে না, কোরআনের শানে নুযুল তরজমা আয়াতের বিশ্লেষণ করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব না, তারমানে বোঝাই যায় চৌদ্দশ বছর আগের মানুষ গুলো নিশ্চয়ই অসাধারণ ছিল?কিন্তু কোরআন নিজেই বলে দিয়েছে, কোরআনকে সহজ করা হয়েছে।

আমি কোরআনকে বোঝবার জন্যে সহজ করে দিয়েছি। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?
(সূরা আল ক্বামার: ৪০)

———————————————

ডাক্তার জাকির নায়েক সহ পৃথিবীর সকল ধর্মগুরুরাই একটা জায়গায় গিয়ে থেমে যায় আর সেটা হলো জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস। সারা পৃথিবীতে জাকির নায়েকের ফলোয়ার অগণিত। তাদের মধ্যে অন্ধবিশ্বাসী অশিক্ষিতরা যেমন আছে, ঠিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষরাও আছে। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলেই একজন মানুষ সুশিক্ষিত হয়ে যায় না। তবে সুশিক্ষা আয়ত্ত করার জন্য অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দরকার।

আমরা মুক্ত পৃথিবীতে বসবাস করি, আপনি আমি চাইলেও কাউকে বন্দীকরে রাখতে পারবো না। আর ধর্ম এবং ধর্মগ্রন্থগুলো হাজার বছর ধরে মানুষকে বন্দীকরে রেখেছে, হয়তো অদূর ভবিষ্যতেও বন্দী করে রাখবে। মানুষ জানতে চায়, মানুষ বুঝতে চায়, কিন্তু ধর্ম মানুষকে জানতে দেয়না, বুঝতে দেয়না। মানুষ আলোতে আসতে চায়, তবে ধর্ম মানুকে অন্ধকারে রেখে দিতে চায়। আর জাকির নায়েকের মত ধর্ম গুরুরা সেটার বাস্তবায়ন করার চেষ্টায় আছে।

তবে একদিন অন্ধকার কেটে গিয়ে এই পৃথিবীতে আলো আসবেই। মানুষ মুক্তি পাবে, এই পৃথিবী ভালোবাসায় ভরে উঠবে। কেবলমাত্র মানুষে মানুষে ভালোবাসা নয়, সকল প্রাণী জগতের সাথে মানুষের ভালোবাসা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

41 + = 47