মহাকবি ফেরদৌসীঃ এক কিংবদন্তীর জীবনগাথা

বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ৫ টি মহাকাব্য আছে। বাল্মীকি মুনি কর্তৃক রচিত “রামায়ন” বেদব্যাস কর্তৃক রচিত মহাভারত, হোমার কর্তৃক রচিত ইলিয়ড ও ওডিসি। পঞ্চম যে মহাকাব্যটি সেটি হল পারস্য ভাষায় রচিত শাহনামা। এটিই রচনা করেছিলেন মহাকবি ফেরদৌসি। পুরো নাম আবুল কাশেম ফেরদৌসি তুসি। জন্ম হয়েছিল তৎকালীন পারস্য (বর্তমান ইরানের) তুস নগরে ৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে। তার বাল্যকাল ও জীবনকাল সম্পর্কে তেমন নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়না। তবে ১১১৬ সালে মতান্তরে ১১১৭ সালে পারস্যের বিখ্যাত সাধক নিজাম ই আরুজি তার মাজার জিয়ারত করতে এসেছিলেন। এসময় তিনিই কবি সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করেন।

নিজামির লিখিত বক্তব্য থেকে জানা যায় কবির পারিবারিক অবস্থা বেশ স্বচ্ছল ছিল। বিস্তর জমিজমা ছিল তাদের। এইসব ক্ষেত খামার থেকে প্রচুর আয় হত। কবি বিয়ে করেছিলেন বাল্যকালেই। তার একটি কন্যাসন্তান ও ছিল। কিন্তু তার কন্যা সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি।
তিনি ছিলেন গজনীর সুলতান মাহমুদের সভাকবিদের মধ্যে অন্যতম।

কবি ফেরদৌসী বাদশাহ মাহমুদকে শাহনামা পড়ে শোনাচ্ছেন (আরমেনিয়ান চিত্রশিল্পী Vardges Sureniants এর চিত্রকর্ম)

এই কিংবদন্তির জীবন নিয়ে প্রচলিত আছে অসংখ্য কিংবদন্তি। সুলতান মাহামুদের রাজদরবারে কেমন করে তিনি এলেন তা নিয়ে যে কিংবদন্তি টি প্রচলিত আছে তা নিম্নরূপ:
কবি যখন গজনী তে আসেন তখন গজনীর কোনো কিছুই চিনতেন না। কারো সাথে পরিচয় ও ছিলনা। তিনি কন্যার হাত ধরে রাজপথে হাটছিলেন। এমন অবস্থায় একলোক তাকে রাজকবিদের বাসভবন দেখিয়ে দিলেন। এও বলে দিলেন রাজদরবারে কবি হিসেবে মনোনয়ন পেতে হলে আগে রাজকবিদের সুপারিশের প্রয়োজন হবে। তাই আগে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করাই শ্রেয় হবে কবির।
সাহসে ভর করে কবি প্রবেশ করলেন রাজকবিদের বাসভবনে। তখন সুলতান মাহামুদের প্রধান তিন কবি আনসারি, আসজাদি ও ফররুখী বসে কাব্যলোচনা করছিলেন। কবি ফেরদৌসি তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে সবিনয়ে বললেন “আমি এক ভীনদেশী কবি। আমি এসেছি সূদূর তুস নগর থেকে। আমি এসেছি সুলতান মাহামুদের সাথে সাক্ষাৎ করতে। শুনেছি তিনি কবি, জ্ঞানী গুনিদের সমাদর করেন “।
কিন্তু কবিরা তাকে সহজে গ্রহন করতে রাজি হলেন না বরঞ্চ শর্ত দিলেন তিনি যদি নিজের যোগ্যতা প্রমান করতে পারেন তবেই তারা সুলতান মাহামুদের কাছে তার জন্য সুপারিশ করবেন।
কবি তার যোগ্যতার প্রমান দিতে রাজি হলেন। পরিক্ষার পদ্ধতি হবে এমন যে কবিরা ৩ টি কবিতার চরন বলবেন কবি ফেরদৌসি কে তৎক্ষণাৎ ৪র্থ চরন পুরন করতে হবে। এভাবেই তার যোগ্যতা প্রমাণিত হবে।
শুরু করলেন রাজকবি আনসারি। বললেন কবিতার প্রথম চরন :
চু আরযে তু শাহ নাবাশাদ রৌশন
(অনুবাদ- শশাঙ্কও সুন্দর নয়, তব মুখসম)
সাথে সাথে আসজাদি ২য় লাইন উপস্থাপন করলেন :
সানন্দে রোখৎ গুল না, বুযাদ দর গুলশান
(অনুবাদ- বিমলিন তার কাছে পুষ্প মনোরম)
এবার ফররুখী বললেন ৩য় চরন :
মেজ্বগানৎ হামি গুজর কুনাদ যে জৌশন
(অনুবাদ- ভ্রূ পাতি তীরের ন্যায় মর্মভেদ করে)
সঙ্গে সঙ্গে কবি ফেরদৌসি ৪র্থ লাইন পুরন করে দিলেন:
সানন্দে সিনানে গেও, দরজঙ্গে পশন
(অনুবাদ- গেওবীর অস্ত্র যথা পশম সমরে)
আসলে রাজকবিরা একটু চালাকি করেছিলেন। ফার্সী ভাষাতে রৌশন,গুলশান, জৌশন জাতীয় মিল দেয়ার মাত্র তিনটিই শব্দ আছে। তাদের ধারনা ছিল ভীনদেশি কবি তাই চতুর্থ শব্দ ও পাবেন না আর ৪র্থ লাইন ও পুরন করতে পারবেন না। কিন্তু কবি ফেরদৌসি অপূর্ব দক্ষতার সাথে একটি জায়গায় পশন দিয়ে মিল দিয়ে দিলেন।
তখন শর্ত মোতাবেক কবিকে রাজদরবারে উপস্থিত করান হল ও কবি তার রচিত আরো অনেক কবিতা শুনিয়ে সুলতান মাহামুদ কে মুগ্ধ করলেন। এভাবেই সুলতান মাহামুদের রাজদরবারে সভাকবি হিসেবে প্রবেশ ঘটে মহাকবি ফেরদৌসির।
ফেরদৌসি নামটি নাকি সুলতান ই দিয়েছিলেন কবিকে। ফেরদৌসি অর্থ স্বর্গীয়। তিনি কবির কবিতা শুনে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে খুশি হয়ে তিনি কবিকে স্বর্গীয় কবি উপাধি প্রদান করেন। সেই থেকে তিনি কবি ফেরদৌসি নামেই অধিক পরিচিত।
কবির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি শাহনামা নিয়েও প্রচলিত আছে নানা কিংবদন্তী।
কথিত আছে কবি তুস নগরে বসেই শাহনামা রচনা করেন। এবং এই কাব্যটি রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহন করানোর জন্যই তিনি গজনী তে আসেন। এখানে তিনি সুলতান মাহামুদের মন্ত্রী আহমদ ইবনে হাসান মায়মন্ড এর সহায়তায় রাজদরবারে প্রবেশ করেন।
আবার অন্য একটি কিংবদন্তী হতে জানা যায় যে সুলতান নাকি নিজেই বলেছিলেন কবিকে শাহনামা কাব্য রচনা করতে। কথিত আছে শাহনামা রচনা করতে ও তা সুন্দর হস্তাক্ষরে কপি করতে কবির মোট ৩৫ বছর লেগেছিল। ও শাহনামা কাব্যের শ্লোক সংখ্যা ৬০০০০।
কবি “শাহনামা কাব্য শেষ করেন ১০১০ খ্রিষ্টাব্দে।
কথিত আছে কবি শাহনামায় লিখিত প্রতিটি শ্লোকের বিনিময়ে সম্মানি হিসেবে পাবেন একটি করে স্বর্নমুদ্রা। মতান্তরে একটি দিহরাম। সেই হিসেবে কবি ৬০০০০ শ্লোকের জন্য ৬০০০০ স্বর্নমুদ্রা পেতেন। কিন্তু সুলতান তার রাজদরবারের কতিপয় ঈর্ষাপরায়ন আমলার কথা শুনে কবিকে নায্য পাওনা হতে বঞ্চিত করেন।
কেউ কেউ বলেন কবিকে ৬০০০০ স্বর্নমুদ্রার পরিবর্তে দেয়া হয়েছিল ৬০০০০ রৌপ্যমুদ্রা। কেউ বলেন ৬০০০০ দিহরামের পরিবর্তে কবিকে দেয়া হয়েছিল মাত্র ২০০০০ দিহরাম। এতে কবি ভীষনভাবে অপমানিত হন। ও দিহরামগুলো ফকিরদের মাঝে বিতরন করে রাজধানী ত্যাগ করেন।
তিনি পালিয়ে আসার আগে সুলতান মাহমুদকে গালমন্দ করে একটি কবিতা লিখেন এবং রাতের অন্ধকারে তা মসজিদের দেয়ালে টানিয়ে রাখেন। তারপর হেরাত শহরে এসে ৬ মাস লুকিয়ে থাকেন সুলতানের ভয়ে।
এরপর তিনি স্বদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। তুস নগরে ফিরে আসার আগে তিনি মাজানদেরান রাজ্যের সেপাহবাদ শাহরিয়ারের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেন। শাহরিয়ারের রাজদরবারে কবি বেশ কিছুদিন ছিলেন।
কিন্তু তিনি তখোনো সুলতান মাহামুদের প্রতারনার কথা ভুলতে পারেননি। কবি এখানে আরো একটি কান্ড করে বসেন। তিনি সুলতান মাহামুদ কে উপহাস করে একটি কাব্য রচনা করে বসেন ও কাব্যটি শাহরিয়ারের নামে উৎসর্গ করেন। কাব্যে তিনি মনের ঝাল মিটিয়ে সুলতানকে গালমন্দ করলেন ও শাহরিয়ার কে তা পড়ে শোনালেন। শাহরিয়ারের সাথে সুলতান মাহমুদের ভাল সম্পর্ক ছিলনা তথাপি তিনি সুলতানের শক্তিকে ভয় করতেন। তিনি কাব্যটির প্রতিটি শ্লোকের বিনিময়ে ১০০০ দিনার দিয়ে কাব্যটি কিনে নেন ও পুড়িয়ে ফেলেন। উল্লেখ্য কাব্যটিতে ১০০ টি শ্লোক ছিল।
এরপর তিনি পশ্চিম পারস্যের বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়ান। এসময় তিনি কিছুদিন বাগদাদে ও ছিলেন বাদশাহ বায়জিদের আশ্রয়ে। বাগদাদে অবস্থান কালেই তিনি বাদশাহের অনুরোধে ইউসুফ-জুলেখ নামে ১০০ শ্লোকের একটি প্রেমের কাব্য রচনা করেন।
এরপর তিনি ফিরে আসেন জন্মভূমি তুস নগরে। এখানেই তিনি ১০২০ মতান্তরে ১০২৬ খ্রিষ্টাব্দে পরলোকগমন করেন। কবির মৃত্যুর পর সুলতান মাহামুদ স্বর্নমুদ্রা মতান্তরে দিহরাম পাঠিয়ে দেন কিন্তু ততদিনে কবি আর ইহকালে নেই।
শাহনামা সম্পর্কিত কিছু তথ্য:
শাহনামা রচিত হয়েছে পারস্যের প্রাচীন কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে। কবি ফেরদৌসির জন্মভূমি তুস নগরেও এমন সব কাহিনী প্রচলিত ছিল যার নামও ছিল শাহনামা বা খতায নামা। এগুলো ছিল ইসলামপূর্ব বহু প্রাচীন রাজাদের কাহিনী। শেষ হয়েছে ইসলামপরবর্তী যুগের ২য় খসরু(khawsro 590-628) এ এসে!

কবি মারা গেছেন হাজার বছর হয়ে গেছে কিন্তু তার অমর কাব্য শাহনামা আজও বেচে আছে।

” width=”20″ height=”20″>

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 2