370 ধারা বিলোপ ও তার প্রাসঙ্গিকতা

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে ঘটনাগুলির চিরস্থায়ী প্রভাব রয়ে গেছে তারমধ্যে ‘কাশ্মীরের ভারতভুক্তি অন্যতম’! স্বাধীনতার সময় যে দেশীয় রাজ্যগুলি নিয়ে সর্বাধিক সমস্যা তৈরী হয়েছিল তার মধ্যে ‘কাশ্মীর’ হল অন্যতম। কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ‘স্বাধীন কাশ্মীর’ চেয়েছিল কিন্তু পরবর্তীকালে পাক হানাদার বাহিনী আক্রমণ করার ফলে ‘ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশ্যান’ স্বাক্ষর করে কাশ্মীর ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়। সেই সময় কাশ্মীরের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন শেখ আব্দুল্লা তিনি ভারত ভুক্তির পক্ষেই রায় দেন। হরি সিং ভারত ভুক্তির পর লন্ডন চলে যায়। এখানে একটি কথা উল্লেখ্য এই সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে হারিয়ে ভারতীয় সেনা কাশ্মীর পুনরুদ্ধার করেছিল, মাউন্ট ব্যাটেনের কথায় নেহেরু সম্পূর্ণ কাশ্মীরকে মুক্ত না করে একপক্ষীক ভাবে যুদ্ধ বিরতির ঘোষণা করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে এই ঘটনা ভারতের বিপক্ষে যায় নেহরুর এই নীতি পাক অধিকৃত কাশ্মীরের জন্ম দেয় যা ভারতের ইতিহাসে চিরস্থায়ী ক্ষত হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে!

আসলে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু মাউন্ট ব্যাটেনের কথায় ও শেখ আব্দুলার প্রতি বিশ্বাস রেখে বলেছিলেন- ‘কাশ্মীরে শান্তি ফিরলে আমরা রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে সেখানে জনমত গ্রহণ করতে প্রস্তুত’। কারণ নেহরু নিশ্চিত ছিলেন সমস্ত কাশ্মীরিরা ভারতের পক্ষে ভোট দেবে। অনেকের মতে 1948 সালে কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেহরুর ভুল ছিল, এরফলে দীর্ঘস্থায়ী কাশ্মীর সমস্যার সূত্রপাত হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জের নির্দেশে যে দেশের সেনা যেখানে অবস্থিত ছিল সেখানেই যুদ্ধ বিরতির কথা ঘোষণা করা হয়। এরফলে পাকিস্তান কাশ্মীরের কিছু অংশ দখল করে রাখতে সমর্থ হয় যা ‘POK’ নামে পরিচিত। এই সীমান্ত বরাবর ‘লাইন অফ কন্ট্রোল বা LOC’ তৈরী হয়। পাকিস্তান দখলদারি ছাড়েনি তাই ভারত ও শেষ পর্যন্ত গণভোটের দাবি মানেনি।

অন্যদিকে কাশ্মীরে শেখ আব্দুল্লার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। তিনি অনেক কঠিন শর্ত আরোপ করতে চাইছিলেন যেমন কাশ্মীরের চিরস্থায়ী ‘অটোনমি’, নিজস্ব সংবিধান, নিজস্ব পতাকা ইত্যাদি। ভারতের মতো একটি দেশে দুটি সংবিধান, দুটি পতাকা এবং সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের কোন আইন মানব না এরূপ মনোভাব ভারতের মধ্যে স্বতন্ত্র একটা দেশ তৈরীর সামিল। ঠিক এই কারণেই সংবিধানের প্রাণ পুরুষ ডঃ বি আর আম্বেদকর সংবিধানে 370 ধারা সংযুক্তির বিরোধী ছিলেন। 370 ধারায় যে বিষয়গুলি বলা হয়েছিল তা হল- ‘আগামীদিনের ভারতীয় সংবিধান কাশ্মীরের মানুষরা মানবে না’ (তখনও ভারতীয় সংবিধান তৈরী হয়নি) এবং ‘কাশ্মীরের সার্বভৌমত্ব বজায় থাকবে’। এই সুবিধা না প্রদান করলে শেখ আব্দুল্লা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলতেন।

তাই শেষ পর্যন্ত নেহরু গোপাল স্বামী আয়াঙ্গারকে এই বিল তৈরী করতে বলেন। নেহেরু শেখ আব্দুল্লার ‘চিরস্থায়ী সুযোগের’ দাবি মানেননি তবে সংবিধানে 370 ধারা তৈরী করা হয় ‘সাময়িক সুবিধা’ প্রদানের উদ্দেশ্যে, এটি চিরস্থায়ী আইন ছিল না। নেহরু মনে করতেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আইনের প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়ে যাবে। এই ধারার সঙ্গে 35-A ধারা ও সংযুক্ত হয় এর ফলে কাশ্মীরের জমি অন্য ভারতীয়রা কিনতে পারবে না। অবশ্য সংবিধান অনুসারে এই 370 ধারা রদ করতে হলে, 370 (3) ধারা অনুসারে রাষ্ট্রপতি, কনস্টিটিউন্ট অ্যাসেম্বলির সাহায্যে রদ করতে পারতেন। তবে কনসিটিউন্ট অ্যাসেম্বলি (কাশ্মীরের সংবিধান রচনার জন্য তৈরী হয়, 1957 সালে তা শেষ হয়ে যায়) আগেই রদ হয়ে যায় তাই এই 370 ধারা স্থায়ী আইনের সমান মর্যাদা লাভ করে।

এই 370 ধারার ফলে ভারতীয় সংবিধান প্রদত্ত বহু আইন জম্মু কাশ্মীরে কার্যকর হত না। যেমন- আইপিসি, সিআরপিসি, আরটিআই, ইত্যাদি আইনগুলি জম্মু কাশ্মীরে কার্যকর হত না এর ফলে দেশের সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হতো। অন্যদিকে ভারতের অন্যপ্রান্তের মানুষরা জমি কিনতে পারতো না, এর ফলে কোন বিনিয়োগ হত না, সংখ্যালঘু ও দলিতদের সংরক্ষণ প্রদান করা হত না। এই সমস্ত বিভিন্ন কারণে কাশ্মীর যেন ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। অন্যদিকে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ না থাকায় এবং বিভিন্ন এজেন্সি কাশ্মীরে প্রবেশ করতে না পারার ফলে কাশ্মীরে জেহাদিদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়। তাঁরা স্বপ্ন দেখে কাশ্মীরকে এক ইসলামী খেলাফতের অংশে পরিণত করবে। তাই সমস্ত দিক বিবেচনা করলে এটা সুস্পষ্ট দেশ ও দশের মঙ্গলে 370 ধারার বিলোপ আশু প্রয়োজন ছিল।

বর্তমানে মোদী সরকার রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করে এবং যেহেতু বর্তমানে কাশ্মীরে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি ছিল তাই রাষ্ট্রপতির সহযোগিতায় কাশ্মীর বিধানসভার সমস্ত ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে আসে। রাষ্ট্রপতির আদেশ ও পার্লামেন্টের সহায়তায় 370 ধারা বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে দেশের সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরের আর কোন বাধা রইল না। কারণ এবার সরাসরি ভারত সরকারের আইন সেখানে কাজ করবে। এরফলে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা আর রইল না এবং সেই সঙ্গে ‘জম্মু কাশ্মীর ও লাদাখ’ নামে দুটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের সৃষ্টি হল। অনেকে এর বিরোধিতা করছে কিন্তু সরকারের যুক্তি ও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সরকারের মতে এখন এই ব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্য কারণ না হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারত। কাশ্মীরের অবস্থা স্থিতিশীল হলে যথা সময়ে কাশ্মীরকে পুনরায় রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে!

এই 370 ধারার বিলোপের ফলে কাশ্মীরে ও অন্যান্য রাজ্যের মত ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা চলবে। এরফলে মানুষের মধ্যে দূরত্ব দূরীভূত হবে, বিভিন্ন পূঁজির প্রবেশ ঘটবে, নতুন কারখানা তৈরী হবে, মানুষ কাজ পাবে, বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ হবে, সংখ্যালঘু ও আদিবাসীরা সংরক্ষণের সুযোগ পাবে, উচ্চমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে উঠবে, নারীরা অন্য রাজ্যে বিয়ে করলে সম্পত্তির অধিকার পেত না, এবার থেকে তাঁরা সাংবিধানিকভাবে সম্পত্তির অধিকার পাবে (যদিও হাইকোর্টের রায়ে আগেই এই অধিকার নারীরা পেয়েছে)। সর্বোপরি বলা যায় এরফলে কাশ্মীরের সার্বিক উন্নয়ন ঘটবে এবং সেখান কার মানুষের সঙ্গে ভারতবাসীর আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হবে। তাই এটা কোন দমনপীড়ন মূলক ব্যবস্থা নয় বরং তা কাশ্মীরের সুদিনের দীপশিখা!

অনেকে বলবেন 370 ধারা বাতিল হল ঠিক আছে কিন্তু 371 ধারায় যে বিশেষ সুবিধা গুলি প্রদান করা হয়েছে তার বেলায় কি হবে? 371 ধারা অনুসারে বিশেষ কিছু অঞ্চলে বাইরে থেকে মানুষরা জমি কিনতে পারে না এই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে কিন্তু এখানে বিচার্য বিষয় হল 371 ধারায় সুবিধা প্রাপ্ত রাজ্যগুলি ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী চলে। এখানে পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ন করতে পারে, ভারত সরকারের আইন দ্বারা এই রাজ্যগুলি চলে, ভারত সরকার এখানে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে, সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর হয়। তাই কাশ্মীরের 370 ধারা ও অন্যান্য রাজ্যগুলির 371 ধারা এক বিষয় নয়। বরং এটা বলা যায় 371 ধারার মূল বিষয় হল পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চল, কম জনবসতি, ভৌগলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা ইত্যাদির জন্য এই বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। কতকগুলি বিশেষ রাজ্য হল- অসম, নাগাল্যান্ড, জম্মুও কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, মণিপুর, মেঘালয়, ত্রিপুরা, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম এবং উত্তরাঞ্চল। এর ফলে এইসমস্ত রাজ্যগুলি কেন্দ্রের কাছ থেকে উদার শর্তে অধিক অর্থিক সাহায্য লাভ করে।

তাই বলা অসঙ্গত হবে না 370 ও 371 ধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় তাই এই বিষয় নিয়ে কোন বিভ্রান্তি সৃষ্টি কাম্য নয়। 370 ধারা বাতিলের ফলে কিছু মানুষ যারা কাশ্মীর নিয়ে রাজনীতি করেন তাঁদের একটু অসুবিধা হবে কিন্তু আপামর কাশ্মীরি ও ভারতবাসীর সম্পর্ক সুন্দর হবে এবং দেশের ঐক্য সুরক্ষিত হবে। কদিন এই উতপ্ত পরিস্থিতি বজায় থাকবে পরে ধীরে ধীরে সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে! তাই যে 370 ধারা ভারতের গণতন্ত্রকে বিভক্ত করত। তা এতদিনে ভারতের অন্যান্য অংশের সঙ্গে ভারতকে যুক্ত করবে। ভারতের ইতিহাসে এটি এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এই ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে!

অন্যদিকে বাম, কংগ্রেসের মতো রাজনৈতিক দলেরা ভোটের নোংরা রাজনীতির জন্য 370 ধারাকে সমর্থন করছে এটা লজ্জাজনক! এই সমস্ত কাজকর্মের ফলে বাম বা কংগ্রেসের ভোট ব্যাঙ্ক আরও ধস নামবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যে দলই 370 ধারা হাটানোর বিরোধীতা করবে ভারতের রাজনীতি থেকে তাঁদের চিরতরে মুছে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখানে একটি কথা উল্লেখ্য ভারত সরকার কৌশলে 370 ধারা যেটিতে ‘কাশ্মীরকে ভারতের অভিন্ন অঙ্গ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে তা রেখে দিয়েছে, তবে কাশ্মীরের বিশেষ অধিকারকে সমাপ্ত করে দেয়। তাই 370 ধারা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে তা সঠিক নয় বরং এর বিশেষ অধিকার গুলিকে বিলুপ্ত করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ একে 370 ধারা বিলুপ্তি হিসাবেই দেখে। তাই যারা বলছেন 370 ধারার বিলুপ্তির ফলে ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তাঁরা ভুল কথা বলছেন। তাই কংগ্রেস ও বামেদের প্রতি আবেদন ভন্ড ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি না আওড়ে দেশের সপক্ষে কাজ করুন, তবেই আপনারা প্রসঙ্গিকতা ফিরে পাবেন। কারণ দেশের স্বার্থ সবার উপরে দেশের অস্তিত্ব যদি বিপন্ন হয় সেখানে দলের অস্তিত্ব থাকবে কি?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

48 − = 39