কুরবানী কুরবানী কুরবানী আল্লাহ কি পেয়ারী হ্যায় কুরবানী

“কুরবানী কুরবানী কুরবানী আল্লাহ কি পেয়ারী হ্যায় কুরবানী”, দেশে থাকতে বেগম বাজার এলাকায় ভিডিওতে টেলিভিশনের পর্দায় একটা সিনেমা দেখেছিলাম “কুরবানী”।
আমি তখন ঢাকাতে খেলাধুলা করছি, এক ক্লাবের সাথে চুক্তিও হয়েছে ভালো তাই পকেটটাও ছিল বেশ গরম, তখন বুঝতে পারিনি যে কোরবানী শুধু সিনেমার পর্দায় কোমর দোলানো একটা গান নয় এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কিছু পরকালের বেহেস্তে যাবার এক স্বপ্ন।
মধ্যবিত্ত সমাজের হাক্কানী সাহেবের চার সন্তান, সব চাইতে ছোট ছেলেটিকে মাদ্রাসায় দিয়েছেন কোরানে হাফেজ হবার আশায় আর এই আশা পূরণ হলেই তিনি পুরো পরিবার নিয়ে বেহেস্তে টুপ করেই ঢুকে যাবেন, আর হাক্কানী সাহেব নিজেও সত্তর জন হুরের সাথে সাগর পাড়ে জলকেলিতে নেমে পরবেন।
এবারের ঈদে হাক্কানী সাহেবের ছোট ছেলেটি অষ্টম শ্রেণী অতিক্রম করার আগেই তলোয়ার হাতে নিয়ে কোরবানী উৎসবে এক্সট্রা ছওয়াব আর কিছু উপরি আয়ে নেমে যাবে, বলেন ছুবাহানাল্হা।
কিছু কিছু মাদ্রাসায় নিয়ম করা হয়েছে, কোমল মনের অধিকারী ছাত্ররা হাতে তলোয়ার নিয়ে কোরবানীর ঈদে বাড়ি বাড়ি ঘুরে পশু কোরবানীতে নিযুক্ত হবে, বেলা শেষে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত ছাত্রদের কাছ থেকে মাদ্রাসাগুলো প্রতিটা ছাত্রের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ১০০০ করে টাকা পাবে আর তা দিয়ে মাদ্রাসার ভাণ্ডারে জমা হতে থাকবে এক বিশাল পরিমান অর্থ।
কতটুকু অমানবিক হলে পরে মাদ্রাসার পরিচালক কমিটিগুলো কোমলমতি ছাত্রদের দ্বারা এমন অমানবিক কাজ করিয়ে নিতে পারে তা ভাবতে গেলেই অন্তর আত্মা কেঁদে ওঠে। এই সব মাদ্রাসা ছাত্ররা শুধু তলোয়ার হাতেই ঘুরে বেড়াবে না তারা আবার কোরবানীর পশুর চামড়া যোগাড়ে বের হবে সন্ধ্যে বেলা আর তা বিক্রি করে মাদ্রাসার হাতে তুলে দিলেই অশেষ নেকী আদায় হবে। একটি বারের জন্যেও কেউ কি চিন্তা করে দেখেছেন যে অপ্রাপ্ত কি প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষদের দ্বারা প্রকাশ্য লোকালয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি আর মহল্লা-বাসীর খেদমতের নিয়তে তলোয়ার হাতে কোরবানীর নামে এই বীভৎস চিত্র সমাজে কতটা ক্ষতি করছে।
আমি এমনও দেখেছি অনেক সম্ভ্রান্ত ঘরের প্রাপ্ত বয়স্করা তাদের ঘরের সন্তানদের দিয়ে হুজুরের সাথে পশু কোরবানীতে লিপ্ত হয়েছে এক্সট্রা ছওয়াব কামাবে বলে, সভ্যতা কি এটাকে মেনে নেবে? আসুন ব্যারিস্টার সুমন সাহেবের কাছে প্রশ্ন করি উনি কি এ বিষয়ে ইউ টিউবে একটা লাইভ ছেড়ে দেবেন কি না?
জি হ্যা, সুইডেনে হালাল কোরবানীর মাংশ বিভ্রাট।
গত পরশুদিন সন্ধ্যে বেলা সেল ফোনটা বেজে উঠলো :- হ্যালো কে বলছেন,
– জি আমি, ইয়ে মানে, অসালামুলেকুম, আমি মুহাম্মদ ইসলাম হাক্কানী, কেমন আছেন।
আমি;- অলাইকুম আসসালাম , জি বলুন।
– আপনাদের বাসার কাছে একটা দোকান আছে নাহ, হুনছি ঐখানে খুব সস্তায় হালাল গরুর মাংস বিক্রি হইতাছে তা আপনি বাসায় থাকলে আসতে চাই আপনার ওখানে বেড়াইয়া গেলাম আর সামনেই তো কোরবানি, ভাবছি দশ কেজি পরিমাণ হালাল মাংস কিনবো।
কিছুক্ষণের জন্যে হতভম্ব হয়ে গেলাম কারণ আমাদের এখানে একটা খুব বড় টার্কিশ দোকান আছে বটে, সেখানে প্রচুর পরিমাণে মাংস বিক্রি হয় কিন্তু সে দোকানে যে হালাল মাংস বিক্রি হয় সেটা আমার জানা ছিল না। বেশ কিছুক্ষণ নেটে ঘাটাঘাটি করে বিষয়টি নিয়ে একটু অনুসন্ধান করে বোঝার চেষ্টা করেছি।
১৯৩৭ সাল থেকেই সুইডেনে এনেস্ত্যাসিয়া ছাড়া যে কোন পশু জবাইয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। এক্ষেত্রে অসুস্থ ও আঘাত প্রাপ্ত কোন প্রাণীকে যথা সম্ভব দ্রুততার সাথে মৃত্যু নিশ্চিত করার তাগিদে গলার রক্ত নালী কেটে পশুটির ব্যথা লাঘব করে জবাই করার বিষয়ে আদেশ দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে প্রায় সমগ্র ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে সেই একই আইনের ভিত্তিতেই গৃহপালিত পশু বা যে কোন প্রাণী বধ করার নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে। প্রথমত, হঠাৎ অসুস্থতা বা আঘাতজনিত ক্ষেত্রে (জরুরি জবাইয়ের) ব্যতিক্রম ব্যতীত কেবলমাত্র স্বাস্থ্যকর প্রাণীই জবাই করা যায় আর তা অবশ্যই প্রাণীদের যে কোনও “অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা বা অস্বস্তি” রক্ষা করতে হবে, যার অর্থ জবাইয়ের সময় তাদের অবশ্যই অজ্ঞান থাকতে হবে গরুর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম মেনে চলার নির্দেশ দেয়া আছে। কোন কোন জরুরী ক্ষেত্রে কপালে সরাসরি রাইফেল বা পিস্তলের গুলি ব্যবহার করা যেতে পারে যাতে প্রাণীটি দ্রুততার সাথেই মৃত্যু বরণ করতে পারে। কিছু কিছু ইহুদি এবং মুসলিমরা হালাল মাংস আমদানি করে এটিকে সমাধান করার চেষ্টা করলেও এদেশের নিয়মে প্রাণীর পরিচয়, জন্মস্থান এবং স্বাস্থ্যের সম্পূর্ণ রেকর্ড দাখিল করা বাধ্যতামূলক করার কারণে ইহুদি এবং মুসলিমরা এই মাংস হালাল নামে বাজার জাত করার চেষ্টা করে, যেন সাধারণ মুসলিম ও ইহুদিরা ভুলে যায় যে “হালাল” শব্দটি এখানে ব্র্যান্ডিং হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউ কেউ আবার বিষয়টি জেনেও না জানার ভান করে ধরে নিচ্ছে যে হালাল মাংস যখন হালাল নয় তবে যে বিক্রি করছে বিধাতা দোষটা শেষ বিচারের দিনে বিক্রেতাকেই দায়ী করবেন আর ক্রেতা হিশেবে তিনি অনায়াসেই স্বর্গের দরজা ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাবেন।
২০০৯ সালেই মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন অফ সুইডেন (এসএমএফ) এর পক্ষ থেকে সুইডেন সরকারের কাছে চিঠিতে এসএমএফের চেয়ারপার্সন মাহমুদ আলদেবে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে যে সুইডেনের মুসলমানদের তাদের “ধর্মীয় স্বাধীনতা” প্রয়োগের এবং “অনুশীলনের অনুমতি দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করার” গণতান্ত্রিক অধিকারগুলির প্রতি সম্মান জানানোর আবদার জানিয়েও এর কোন প্রতিকার পান নাই। তিনি উল্লেখ করেছেন যে অন্যান্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভুক্ত দেশগুলি বেশিরভাগ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের মতে এমনভাবে ধর্মীয় বধ করার অনুশীলনের অনুমতি পাওয়ার একটি উপায় খুঁজে পেয়েছে আর তা হচ্ছে হালাল জবাই পদ্ধতিটি একটি ধারালো ছুরির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, ত্বক, গুটি শিরা এবং শ্বাসনালী কাটা হয় এবং ফলস্বরূপ ইসলামিক নির্দেশিকাগুলি অনুসারে শবকের শরীরের পুরো রক্তপাত করানো হয়, কিন্তু একটি মূল সমস্যা হ’ল কখন এবং কীভাবে ব্যথার ঘাটতি কমিয়ে প্রাণী বধ করতে হবে আইন সেটার বাইরে যেতে নারাজ কাজেই প্রাণীটিকে অজ্ঞান করার বিষয় থেকে সরকার বা আদালত কেউই সরে আসে নাই।
মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন অফ সুইডেন (এসএমএফ) এর প্রতিবেদনের সুপারিশ নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
আমি সেল ফোনটা হাতে নিয়ে কিছু একটা চিন্তা করছি,
:- হ্যাল্লো অসালামালায়কুম জনাব মুহাম্মদ ইসলাম হাক্কানী বলছেন _
– হ আমি তা কন কয়টার দিকে আমু, আমি তো মাগরিবের নামাজটা পইরা রওনা দিমু ভাবছি আপনে কি বাসায় আছেন?
:- জি আমি বাসায়, আপনি যদি হালাল মাংস পেয়েই যান তবে আমিও আমার জন্যে বিশ কেজি কিনে নেব, তা আপনি আসেন আমি অপেক্ষায় রইলাম।
– আইতাছি, হুনছি আপনাগো এলাকার ঐ দোকানে নাকি হালাল গোসলের সাবানও পাওয়া যায়, আমার বউ আবার হালাল সাবান ছাড়া গোসল করে না।
জি আসুন বলেই ফোন কেটে দিয়ে ভাবছি ভদ্রলোক একটা ভুল জগতে এসে পড়েছেন আর এই অন্ধকার জগৎ থেকে বেড়িয়ে আসাটা উনার পক্ষে হয়তো আর কোন দিনই সম্ভব হচ্ছে না, বিষয়টা উনার জন্যে মদের দোকানে গিয়ে এক গ্লাস দুধ চাইবার মত অবস্থা।
সবাই ভালো থাকবেন।
— মাহবুব আরিফ কিন্তু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

61 + = 62