ভালোবেসে যদি সুখ নাহি

সময়টা ছিল দুর্গাপুজোর আর গল্পটা, দুই প্রেমিক মানুষের। নাঃ, তারা একে অপরের প্রেমিক-প্রেমিকা ছিল না ঠিকই, তবে তাদের হাড়ে-মজ্জায়-মস্তিষ্কে ভালোবাসতে পারার গুণটা ছিল ১৬ আনা খাঁটি।
দিনটা বোধহয় ছিল নবমীর। ৯-১০ মাস আগে শুরু হওয়া বন্ধুত্ব তখন একেবারে চরম পর্যায়! কোথায় সেই আড়ষ্ঠতা? কোথায় সেই লজ্জা-লজ্জা ভাব? মনে আছে, এক সপ্তাহ আগে থেকে চ্যাটে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনার পর যখন সবশেষে সত্যিই দেখা হল, কেউ কারোর চোখে চোখ রেখে দুই মিনিট কথা পর্যন্ত বলতে পারল না! বড় জোর ১মিনিট, ওই ৬০ সেকেন্ড কোনো রকমে কষ্ট করে এদিক ওদিক তাকিয়ে, বাজারে হঠাৎ দেখা হওয়া দুই প্রতিবেশীর মতো অস্বস্তির হাসি হেসে দুজনেই বলে উঠলো,”এই আসি রে, নইলে আবার পড়তে যেতে দেরি হয়ে যাবে..”। সেইসব এখন অতীত! পাঁচতলা মন, এখন পুরোটাই পাগলামী। ওহ, বলতেই ভুলে গেলাম, ছেলেটার নাম ছিল মেঘ, আর মেয়েটি বর্ষা।

যাইহোক, সেদিন ঠিকই করা হয়েছিল শুধুমাত্র তারা দুজন মিলে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়াবে রাস্তায় রাস্তায়, সে এমনই এক ঘোরা, যা দেখে যেনো প্রত্যেকটি অলি-গলির সব ইট-কাঠ-পাথরও মনে রেখে দেয় তাদের, চিরদিনের মতো। যদিও মেয়েটার এক দন্ড হাঁটতেই গায়ে জ্বর আসতো, তবুও তারা দুজন মিলে ঠিক করলো বিকেল ৪টে থেকে ৯টা অব্দির সময়টা শুধু তাদের হবে। যেমন কথা তেমনি কাজ, ঠিক সময় মতো বেরোনো হলো। কিন্তু দু-ঘন্টার মধ্যেই পায়ে চিনচিনে ব্যাথা শুরু হয়ে যায় বর্ষার, সারা বছর শুয়ে বসে পড়ে থাকলে যা হয় আর কি! শুধু একবার বোধহয় মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল, “আরে, পায়ে ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে রে, ধুর ভাল্লাগেনা..”, তারপর তাকে আর কিছুই বলতে হয়নি; প্রথমবারের জন্য মেঘের ব্যবহারে হয়তো সে এতটা অবাক আর আপ্লুত হয়েছিল। ১০-১৫ বার পরপরই ওই একই প্রশ্ন, “কিরে, এখন কি পা-ব্যাথা আরো বেশি করছে? রিকশা ডাকি? ওই সামনের পান্ডেলটায় কিছুক্ষন বসবি চল”, বর্ষাকে কিছুটা হলেও ঘোরের মধ্যে ঠেলে দেয়, এত যত্নে যে সে অভ্যস্ত নয়! মুখে কিছু না বললেও সে তাকিয়ে ছিল মেঘের দিকেই, হয়তো বোঝবার চেষ্টা করছিল তার গভীরতা; কিন্তু একবারের জন্যও সে অভিনয়ের ছিটেফোঁটা খুঁজে পেলো না তার মধ্যে কোথাও।

ঘুরতে ঘুরতে তখন রাত প্রায় পৌনে আটটা বাজে। স্টেশন চত্বরের কাছেই এক মণ্ডপে ঢোকার অভিপ্রায় নিয়ে এগোচ্ছিল তারা। কিন্তু সারা রাজ্যের ভিড় কি আর তাদের ইচ্ছা মেনে চলে? সব জটলা পাকলো ওই এক জায়গায়, রেলগেটের কাছেই; আর সে এমনই ভিড় যে হাঁটা দায়। ঘটনা ঘটল তখনই, ভিড়ের ঠেলায় যখন মণ্ডপে ঢোকা হবেনা জেনে হতাশায় উল্টো দিকে হাত লাগিয়েছে দুজন, তারা তখন আর ফুটপাথে নেই, প্রায় মাঝরাস্তায় গাড়িদের মাঝে। এমনই এক সময়ে হঠাৎ ধাক্কা লাগলো বর্ষার সাথে এক অটোর, কিন্তু ভাগ্য জোরে শুধু এক পাশ দিয়ে গা ঘেঁষে বেরিয়ে যায় সেই অটো। তবু ধাক্কা তো, তাই আর টাল সামলাতে পারেনি বর্ষা। নাঃ, তাই বলে মাঝরাস্তায় পরে গিয়ে হাত-পা ছড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা হয়নি! তাকে সামলানোর মতো ওই ভরসাদায়ক হাতের ছোঁয়া পেয়েছিল যে ঠিক সময়ে। সবটাই এতো আচমকা হয়েছিল যে কেউ অবাক হওয়ার সময়টাও পায়নি। তাই কারোর আর তখন হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার কথাটাও মনে হয়নি। কিন্তু হঠাৎ যখন হাটতে হাটতে রেলগেট পার করে অনেকটা রাস্তা ওইভাবে চলার পর সম্বিৎ ফেরে, হয়তো তখন দুজনেই বেশ চিন্তিত, কে আগে হাত ছাড়াবে এই ভাবনায়! তবে এমনই অবস্থা, নিজে থেকে হাত ছাড়িয়ে নেওয়াও তো যায়না। তাই অপেক্ষা চলছিল কখন অন্যজন নিজে থেকে হাতটা ছাড়াবে, আর ততক্ষণ ওই আলতো করেই হাতটা ধরে থাকা। ওই সময় আর কে কি ভেবেছিল জানা নেই, কিন্তু বর্ষা যে কি পরিমাণ উচ্ছ্বসিত হয়েছিল সেদিন, তা হিসাবের বাইরে। উচ্ছাসের কারণ এটা ছিল না যে কেউ প্রথমবার এত যত্নে তার হাতটা ধরেছিল, কারণ এটা ছিল যে প্রথমবার কারোর মধ্যে সে তার বাবাকে খুঁজে পেয়েছিল; যে কখনো মুখে ভালোবাসার কথা না বললেও তার প্রত্যেকটা কাজে সবটাই প্রকাশ করে দিত, দশ গুণ বেশি আন্তরিকতার সাথে।
“তোমার জন্য ফুল কিনবো না,
রাখবো দু-হাত ফাঁকা;
আমার জমিনে চাষ হবে শুধু
গোলাপ-পদ্ম চারা।।”

কখনো কখনো মনে হতো দুজনের একজন বোধহয় হলুদ পাতা আর একজন সবুজ পাতা, আর যখন দুজন একসাথে থাকতো, লাগতো যেন “হলুদ পাতার বুকে দিলো সবুজ পাতা চুম!” কিন্তু এইসব তো না হয় হল কাব্যিক কথাবার্তা, কিন্তু বাইরের পরিবেশ তখন এক্কেবারে অন্যরকম। কে কখন কার হাত আগে ছাড়াবে, এমন হাজার ভাবনা নিয়ে যখন দুজনেই এগিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎই এক লোক usian bolt-এর মতো এগিয়ে এলো, আর গেলো তো গেলো, ঠিক দুজনের হাতের মাঝখান দিয়েই গেল! ব্যাস, সেদিনের মতো গপ্পো ওখানেই শেষ।

তারপর? না ভাই, তার আর কোনো পর নেই। সব গল্পের কি আর উপসংহার জোটে? এখানেও ঠিক তাই, এরপরে আরো বহুবার হাত ধরাধরি করে বহুবার বহু জায়গায়, বহু রাস্তায় ঘুরে বেরিয়েও প্রেম, প্রণয় কোনোটাই হয়নি। একজন অন্য কারোর প্রেমে পড়েছে, আরেকজনের মন ভেঙেছে; মান-অভিমান, ঝগড়াও হয়েছে প্রচুর। বর্ষা পড়েছিল তখন ঝড়ের প্রেমে, মেঘের শান্ত-শীতল অনুভূতি বুঝে উঠতে উঠতে তখন তার ঢের দেরি হয়ে গিয়েছিল। তখন আর ফিরে তাকানোর জো নেই। কিন্তু মেঘ-বৃষ্টির সম্পর্কের ভীত যে আরো অনেক গভীর! সেখানে বন্ধুত্ব আছে, একে অপরের প্রতি আছে অগাধ ভরসা আর মর্যাদা। তাই ঝড়ের টানে ক্ষনিকের কিছু দুরত্ব তৈরি হলেও ওই ভীত নষ্ট হয়নি কখনো। মেঘ ছিল স্বভাবে ভীষণ অঙ্ক-পাগল ছেলে, যেকোনো হিসাব করায় তার চেয়ে পাঁকা হাত কারোর ছিল না। তবে বন্ধুত্বের কাটাকুটি খেলা চলার সময় তাকে কখনো কেউ লাভ-লোকসানের হিসেব কষতে দেখেনি। তাইতো বোধহয় যখন বর্ষার ঝরে পড়তে মন চাইতো প্রবল বেগে, সবুজের সাথে মিশে যেতে, তখন আর মেঘ মুখ ফিরিয়ে দূরে থাকতে পারতো না, ঠিক চলে আসতো তার কাছে। তেমনই আবার যখন কষ্ট হতো মেঘের, আর তার অর্তনাদগুলো যখন সবার কাছে অসহ্যকর গর্জন মনে হতো, তখন বর্ষা ঠিক তার সঙ্গী হয়ে ভিজিয়ে দিতো চারিপাশ।

তাদের হয়তো একসাথে সবসময় ঘুরে বেড়ানো হবেনা, হয়তো দুজনেরই জন্যে অপেক্ষা করছে অন্য কোনো সঙ্গী; যাদের সাথে জীবনের বাকিটা পথ চলার কথা দেবে দুজনেই। কিন্তু ওই যে সেই মনখারাপের রাতগুলোতে, যখন ঘরের ভিতর দম বন্ধ হয়ে আসবে আর তারা এক ছুটে চলে যাবে ছাদে, ওই এক আকাশ তারার নীচে একটু স্বস্তির শ্বাস নিতে, তখন হয়তো এই পুরোনো অথচ জীবন্ত স্মৃতিগুলোই নতুন করে বেঁচে থাকার তাগিদ তৈরি করে দিয়ে যাবে তাদের রক্তে-বর্ণে। আর পাশ থেকে হয়তো কোন এক অদৃশ্য বাউল গানের সুর শোনাতে শোনাতে হেটে চলে যাবে দিগন্তে —

“মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাইনা
কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে,
তোমারে দেখিতে দেয় না,
অন্ধ করে রাখে, তোমারে দেখিতে দেয় না….”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + = 7