প্রথম প্রথম

যখন আমি প্রথম প্রথম প্রেম করি, তখন পৃথিবীর সব কিছুই তুচ্ছ মনে হতে থাকে। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, পড়াশোনা, কোলাহল, রাজনীতি, অর্থনীতি সব কিছুই যেন আমার কাছে তুচ্ছ। নিজের জীবনের মধ্যে আরেক জীবনের সন্ধান পাই, একই মানুষের দুটি জীবন! প্রেম একটি নতুন জগত তৈরি করতে শেখায়, সে জগতে সে ও নিজে বাদে বাদবাকি সকলেই অবাঞ্চিত ও অস্বস্তিকর।

আমরা মুঠোফোনে কথা বলতাম। টিউশনির টাকা দিয়ে মুঠোফোনে প্রেম চালাতাম। আমাদের সরাসরি দেখা হতো না। আমরা দুজন দুজনের বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে অল্পসল্প চোখাচুখি করতাম। তার বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে দু’ সেকেন্ডের চাহনি দু’মাসের শক্তি যোগাতো আর ক্ষণিকের মিষ্টি হাসি সারাদিনভর ভাবিয়ে রাখতো। আমরা চিঠি লিখতাম। তার চিঠিগুলিতে প্রেম, আবেগ, বেদনা, আতংক, দশমিক শূন্য দুই শতাংশ কামের উপস্থিতি খুঁজে পেতাম। আর আমার পত্রে অপরিপক্ক কিশোরের অযৌক্তিক সাধ, বাসনা, আকাঙ্ক্ষা লিপিবদ্ধ হতো।

আমরা নয়টি মাস ফোনে চুটিয়ে প্রেম করার পর সিদ্ধান্ত নেই পাশাপাশি হেঁটে চলার এবং পরবর্তীতে পাশাপাশি রিকশাতে চড়ে ইতিহাস রচনা করার।

আমরা রমনা পার্কে দেখা করি। মেয়েটি আগেই উপস্থিত হয়। আমি যতোই মেয়েটির দিকে অগ্রসর হই, ততোই আমার পা অবশ হতে থাকে। আমার হৃদয়ে উত্তম কুমারের গান বাজতে থাকে। আমার চোখ মেঘে ঢাকতে থাকে। আমার ঠোঁট শুকিয়ে পশ্চিমবঙ্গে রূপ নিতে থাকে।

মেয়েটি যখন আমার দিকে দৃষ্টি দেয়, তখন মনে হয় আমি গঞ্জিকা সেবন করে এসেছি। এতো নেশা তার চোখে, সেই নেশা আমার চোখেও ভর করেছে। আমরা পাশাপাশি অনেকক্ষণ বসে থাকি। কেউ কোন কথা বলি না। সাড়াশব্দ নেই। আমি একটু লুকিয়ে লুকিয়ে তাকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করি।
আমার পকেট থেকে বেলি ফুলের মালা বের করে তার হাতের উপরে রাখি।
মেয়েটি খুশি হয়ে যায়। বেলি ফুলের গন্ধ যেন তার মিষ্টি হাসির কারণে সুগন্ধি ছড়াচ্ছিল।

মেয়েটি বলে, চল রিকশাতে উঠি।
আমরা পাশাপাশি হাঁটতে থাকি, দু’একবার আমাদের শরীরের সাথে শরীরের সংঘর্ষ হয়। আমরা দুজনই কেঁপে উঠি। কিন্তু কোন কথা বলি না।
আমরা রিকশাতে উঠি। মেয়েটি বলে, রিকশার হুড তুলে দিতে।
মেয়েটির শরীরের সঙ্গে সেঁটে থাকতে হয় আমাকে। আমাদের শরীরের ভিতরেই বজ্রপাত হতে থাকে।

বাতাস বইছিল। বাতাস চাইছিল তার ওড়না যেন আমার মুখ ঢেকে দেয়। মনে হচ্ছিলো, নীল ওড়নাতেই যেন আজীবন লেপটে থাকতে পারি। তার শরীরের ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিলো, মায়ের শরীরের ঘ্রাণের থেকেও উত্তম। মেয়েটির চুল বারবার আমাকে স্পর্শ করছিল। মনে হচ্ছিলো, চুলের ভিতরেই বসত গড়ে তুলি।

মেয়েটি কিছু না বলেই আমার হাত ধরে বসে। হঠাৎ করেই নিম্নচাপ থেকে উচ্চচাপে মাত্রা বাড়তে থাকে। আমার বাম হাত অবশ হতে থাকে। তারপরও আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি তার হাতটি শক্ত করে ধরার। হাতটি ধরতে গিয়ে মনে হয়, বেশি জোরে ধরা যাবে না। ভেঙে যেতে পারে। এতো নরম হাত আগে কখনও ধরা হয় নি। মেয়েটি আমার ঘাড়ে মাথা দিয়ে থাকে। মনে হয়, আমার ঘাড়টি পবিত্র হয়ে উঠেছে।
হঠাৎ করেই মেয়েটি আমার গালে চুমু খায়। আমি ঢোক গিলি।
উত্তেজনার মাত্রা বাড়তেই থাকে।
মেয়েটি বলে, সব কিছু কি আমারই করতে হবে? কীসের ছেলে হলে?
আমি জনি লিভারের মতন খুশিদুষ্টু মিশ্রিত একটি হাসি দেই।
গল্প চলছিলো ভালই, সব গল্পের সমাপ্তি জরুরী নয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 1 =