সারাভাইর শততম জন্মদিনে গুগলের শ্রদ্ধা

গতকাল ছিলো ভারতের প্রথম মহাকাশ গবেষক বিক্রম সারাভাই’র শততম জন্মদিন। ভারতের গুজরাট প্রদেশের আহমেদাবাদে  বাবা আম্বালাল সারাভাই ও মা সরলা দেবীর সন্তান হিসেবে ১৯১৯ সালের ১২  অগাস্ট জন্মগ্রহণ করেন এই মহাকাশ গবেষক। তাই এই মহামানবকে সন্মান জানাতে গতকাল অর্থাৎ ১২ আগস্ট গুগল ডুডলটি ছিলো কয়েকটা স্পেসের সাথে সারাভাইর ছবি। তাঁকে সম্মান জানিয়েই ঐতিহাসিক চন্দ্রযাত্রায় ‘বিক্রম’ নামটা যোগ করেছে ইসরো। ল্যান্ডার তৈরি হয়েছে প্রয়াত বিক্রম সারাভাইয়ের নামেই। পদার্থবিদ, গবেষক, উদ্ভাবক ডঃ বিক্রম সারাভাইকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর জন্মদিনকে সেলিব্রেট করছে গুগল ডুডল। এটা নুতন কোন বিষয় নয়। এর আগেও বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ বা ঐতিহাসিক দিনকে স্মরণ করার জন্য গুগল তাদের হোমপেজে লোগো পরিবর্তন করে সেই বিশেষ দিনের সঙ্গে মানানসই বিশেষ একটি লোগো তৈরি করে থাকে৷

পুরো বিশ্বের মানুষ ভারতের প্রথিতযশা এ বিজ্ঞানীকে বিক্রম সারাভাই নামেই চেনেন; কিন্তু ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর প্রাণপুরুষ এ মানুষটির পুরো নাম ডঃ বিক্রম আম্বালাল সারাভাই। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মহাকাশ গবেষক এবং সে বিচারে তাকে ভারতের অন্তরীক্ষ গবেষণার জনক বলাটাও অত্যুক্তি হবে না। গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করেন তিনি বাড়িতে বসেই। পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের জন্য ব্যবহারিক পরীক্ষাগারও ছিল তাঁদের বাড়িতে।  নেহেরু পরিবারের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ ছিল সারাভাই পরিবার। মতিলাল এবং জওহরলাল নেহেরুর মত মানুষও সারাভাইদের পরিবারে ছিলেন নিয়মিত অতিথি। ইন্দিরা গান্ধী যখন পুনায় পড়াশোনা করতেন তখন আম্বালাল ও সরলা দেবিই ছিলেন তাঁর অভিভাবক। রবীঠাকুরও যখন এলাহাবাদে আসতেন তখন সারাভাইদের বাড়িতেই থাকতেন। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী, সিভি রামন, মৌলানা আজাদ সহ সমকালীন বহু ভারতীয় ব্যক্তিত্বই আম্বালাল সারাভাইদের পরিবারের ঘনিষ্ট ছিলেন। গান্ধীর সান্নিধ্যে সেদিনের সেই বালক বিক্রম সারাভাই ১৯৩০ সালেই গান্ধীর লবণ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন । প্রচলিত স্কুল-ব্যবস্থায় পড়াশোনা করতে হয়নি বলে বিক্রম নিজের পছন্দমতো বিষয়গুলোর অনেক গভীরে ঢুকতে পেরেছিলেন অনেক কম বয়সেই। মাধ্যমিক পর্যন্ত বাড়িতে পড়াশোনার পর বিক্রম ভর্তি হলেন আহমেদাবাদের গুজরাত কলেজে। উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করার পর ১৯৩৫ সালে ১৯ বছর বয়সে কেমব্রিজের সেন্ট জোন্‌স কলেজে ভর্তি হন বিক্রম। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে লেখা প্রশংসাপত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উল্লেখ করেন-

“বিক্রম সারাভাই এবং তার পরিবারের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় অনেকদিনের। বোম্বের একটি সম্ভ্রান্ত ও সংস্কৃতিবান পরিবারে তার জন্ম। বিক্রমের এক ভাই ও এক বোন বর্তমানে কেমব্রিজে পড়াশোনা করছে” ।

১৯৩৯ সালে ন্যাচারাল সায়েন্সে প্রথম শ্রেণীর স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন বিক্রম সারাভাই। তারপর কেমব্রিজেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার কারণে কেমব্রিজে বিক্রমের পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। ১৯৪০ সালের শুরুতে যুদ্ধ ইউরোপে ছড়িয়ে পড়লে সারাভাই দেশে ফিরে আসেন। তবে দেশে আসার আগে তিনি বিক্রম কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে ব্যবস্থা করে আসেন যেন ভারতে বসেই গবেষণার কাজ করে যেতে পারেন। কেমব্রিজ থেকে পিএইচডি শেষে দেশে ফিরে পরিবার ও বন্ধুদের সাহায্যে আহমেদাবাদে ১৯৪৭ সালের ১১ নভেম্বর তিনি গড়ে তোলেন ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি যা সংক্ষেপে “পিআরএল” নামে পরিচিত।

সারাভাই তার একটি উদ্ধৃতিতে মহাকাশ কর্মসূচির গুরুত্বকে জোর দিয়েছিলেন এভাবে-

“এমন কিছু লোক আছে যারা একটি উন্নয়নশীল দেশে মহাকাশ তৎপরতার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আমাদের কাছে উদ্দেশ্যটির কোনও দ্বিপাক্ষিকতা নেই। চাঁদ বা গ্রহগুলির অন্বেষণে আমরা অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলির সাথে প্রতিযোগিতা করার কল্পনা বা কল্পনাও করি না। মহাকাশ-বিমান। “” তবে আমরা নিশ্চিত যে আমরা যদি জাতীয়ভাবে এবং জাতিসমূহের সম্প্রদায়ের মধ্যে অর্থবহ ভূমিকা পালন করতে হয় তবে মানুষ ও সমাজের বাস্তব সমস্যার উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগে আমাদের অবশ্যই কারও চেয়ে পিছনে থাকতে হবে না। “

১৯৬৬ সালে আমদাবাদে কমিউনিটি সায়েন্স সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন যা এখন বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে অ্যাটোমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন তিনি। পিআরএল ছাড়াও আমদাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট, কমিউনিটি সায়েন্স সেন্টার, দর্পণ অ্যাকাডেমি-সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁরই অনুপ্রেরণায় ১৯৭৫ সালে রুশ কসমোড্রোম থেকে ভারতের প্রথম উপগ্রহ ‘আর্যভট্ট’-এর সফল উৎক্ষেপণ হয়। তাঁর সহকর্মীরা জানিয়েছিলেন, সারাভাই নাকি প্রায়ই বলতেন, ‘‘উন্নয়নশীল দেশের মহাকাশ গবেষণা নিয়ে অনেকেই আঙুল তুলবেন। তবে ভারতের লক্ষ্য প্রতিযোগিতা নয়। চাঁদে পাড়ি দেওয়া ভারতবাসীর স্বপ্ন। মহাকাশ অভিযানে অন্য দেশের উপর নির্ভরশীল হয়ে কেন থাকব আমরা!  লক্ষ্য ও এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহ দেশবাসীর মধ্যে তৈরি করাই আমার মূল উদ্দেশ্য।’’ ১৯৬৬ সালে পদ্মভূষণ ও ১৯৭২ সালে মরণোত্তর পদ্মবিভূষণ খেতাব দেওয়া হয় তাঁকে।

ডঃ এপিজে আবদুল কালামের ইন্টারভিউ তিনিই করেছিলেন। কালামের মেন্টর, গুরুও ছিলেন তিনিই।

আবদুল কালাম বলেছিলেন-

 ‘‘ডঃ বিক্রম সারাভাইয়ের মুখোমুখি যখন বসেছিলাম আমি তখন সবে কাজ শিখছি। নবীন বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি আমাকে সুযোগ দেন। বলেন, আমার মধ্যে প্রতিভা আছে। উন্নতি করতে পারলে নিজের চেষ্টাতেই করব, আর ব্যর্থ বলে তার দায়িত্বও আমার।’’

ভারতীয় মহাকাশ গবেষণাকে সাফল্যের চূড়া চিনিয়েছিলেন যিনি তাঁর মৃত্যু রহস্যের উপর থেকে আজও যবনিকা সরেনি। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে কোভালামে নিজের পছন্দের সরকারি রিসর্টে ছিলেন সারাভাই। একটি রুশ রকেটের উৎক্ষেপণ দেখতেই কোভালামে গিয়েছিলেন তিনি। হামেশাই যেতেন। থাকতেন ওই সরকারি রিসর্টের নিজের পছন্দের ঘরে। ৩১ ডিসেম্বর সকালে ওই ঘর থেকেই ডঃ বিক্রম সারাভাইয়ের প্রাণহীন দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জানা গিয়েছিল, দেহে কোনও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। বাইরে থেকে কোনও অস্বাভাবিকতাও নজরে পড়েনি। ঠাকুমা সরলাদেবীর অনুরোধে মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়নি। তাই মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশাও কাটেনি।

তদন্ত শুরুও হয়েছিল। তবে ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে। বিক্রম সারাভাইয়ের সহকর্মী কমলা চৌধুরীর দাবি ছিল, মৃত্যুর কয়েকদিন আগে থেকেই নাকি সারাভাই তাঁকে বলছিলেন, আমেরিকা ও রাশিয়া তাঁর ওপর কড়া নজর রাখছে। কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপেও রাখা হয়েছিল বিজ্ঞানীকে। তবে শেষরক্ষা হয়নি।

ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেবার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মহাসড়ক তৈরির কাজে যাঁরা আত্মনিয়োগ করেছিলেন, পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক বিক্রম সারাভাই তাঁদের অন্যতম। ভারতে মহাকাশ গবেষণা ও রকেট প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে বিক্রম সারাভাই’র অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এবং সুদূরপ্রসারী নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায়। আজকের ভারত টেলিযোগাযোগে যে এত উন্নতি করেছে, টেলিভিশন সম্প্রচারে পরিমাণগত দিক থেকে বিশ্বের প্রথম দিকে স্থান করে নিয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পূর্ব-সতর্কীকরণ সহ চব্বিশ ঘন্টা প্রকৃতির ওপর নজর রাখছে – ষাটের দশকের শুরুতেও এসব কিছুই ছিল না। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে সেদিন যেসব সুবিধে ছিল তা ভারতের মত স্বল্প-আয়ের দেশে প্রয়োগ করার চিন্তাও ছিল অসম্ভব। কিন্তু মাত্র এক দশকের মধ্যেই যিনি এই অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলেছেন তিনি বিজ্ঞানী বিক্রম সারাভাই। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত মাত্র বাইশ জন নবীন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর উদ্যম ও অক্লান্ত পরিশ্রম কাজে লাগিয়ে বিক্রম সারাভাই মহাকাশ গবেষণা ও রকেট প্রযুক্তির বিশ্বসভায় ভারতকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে উপমহাদেশের দরিদ্র মানবগোষ্ঠীর দারিদ্র্যমোচনে বিশাল ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিজ্ঞান গবেষণাগার – ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাব। বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে দেবার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন “কমিউনিটি সায়েন্স সেন্টার”। বিক্রম সারাভাইর হাত দিয়ে তৈরি হয়েছে ভারতের প্রথম পেনিসিলিন তৈরির কারখানা। ভারতে ইলেকট্রনিক্স শিল্পের বিকাশ ঘটেছে তাঁর হাতে। পারিবারিকভাবে শিল্প-কারখানার মালিক হওয়া এবং অনেকগুলো কারখানা নিজে তৈরি করা সত্ত্বেও বিক্রম সারাভাই কখনো ব্যক্তিগত লাভের কথা ভাবেন নি। এমনকি পারমাণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ও পারমাণবিক শক্তি বিভাগের সচিব হবার পরও রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে কোন ধরণের ব্যক্তিগত সুযোগ সুবিধে নেন নি। আর বাৎসরিক বেতন নিয়েছেন মাত্র এক রুপি।এর কারণ হিসেবে তিনিবলেছেন-

 “পারিবারিকভাবে আমার যা কিছু অর্জন তার সবই তো এ দেশ থেকেই পেয়েছি। আমাদের মত যারা যথেষ্ট সম্পদশালী তাদের উচিত নিজের দেশের জন্য বিনা বেতনে কাজ করা”

প্রখ্যাত রকেটবিজ্ঞানী ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের মতে-

“বিক্রম সারাভাই ছিলেন ভারতীয় বিজ্ঞানের মহাত্মা গান্ধী, যিনি তাঁর দলের প্রত্যকে কর্মীর মধ্যে সঞ্চালন করেছেন নেতৃত্বের গুণাবলী”।

 

তথ্যসূত্র:

  1. K. Kasturirangam, Dr Vikram Sarabhai – The light that leads the indian space program. Resonance, 2001. December
  2.  Robert Anderson, Nucleus and Nation. 2010
  3.  A. P. J. Abdul Kalam, Wings of Fire, ed. Translated by Promit Hosen. 2002
  4. Pradip Dev, Writer, Mukto-mona

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

82 − 73 =