কৈশোর থেকে যৌবনের অপ্রতিরোধ্য শিল্পকলা

বৃষ্টি কথা রাখে নি। তেমনই আমিও তার কাছে আর ফিরতে পারি নি। যখন আমরা ঝুমঝুম বৃষ্টিতে স্নান করছিলাম, তখন বৃষ্টি আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। আমি বৃষ্টির কাছে নিজেকে উজাড় করে দিতে চাচ্ছিলাম অথচ বৃষ্টি আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। সবুজ গাছগাছালি মাঝে সবুজ ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটাকে সাক্ষী রেখে বৃষ্টিকে আমি আলিঙ্গন করেছিলাম। বৃষ্টি ঠাণ্ডাতে জমে যাচ্ছিলো, একটু উষ্ণতা আমাদের প্রয়োজন ছিল। তুমুল বৃষ্টিপাত, হঠাৎ করেই পাখির কিচিরমিচির শব্দ আমাদের কর্ণে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আশেপাশে কোন মানুষজনের খোঁজ নেই; শুধু হাওয়া আমাদের মিলনের সাক্ষী, আমাদের দূরত্ব ক্রমশই কমে আসছে।

বৃষ্টির শরীরের সাথে আমার শরীর এমনভাবে লেপটে আছে যেন আমাদের জন্ম শুধু দুজন দুজনের জন্যেই। হাওয়া যতোই বইছিল, বৃষ্টির সাথে আমার প্রেম ততোই গভীর হচ্ছিল। বৃষ্টিবাদল দিনে বৃষ্টির সাথে আমার অমন ঘনিষ্ঠতা কিশোরকিশোরী কিংবা যুবকযুবতীদের স্বপ্নে প্রায়ই বাসা বাঁধে। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া প্রেমের কর্ম। এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রেয়সপ্রেয়সীরা কখনোই পিছুপা হয় না।

যখন বৃষ্টির অধরের সাথে আমার ওষ্ঠের মিলন হয় তখন সেখানে জন্ম নেয় শিল্পকলার। শিল্পের সাথে লেপটে আমরা সৃষ্টি করতে থাকি একের পর এক ঊর্ধ্ব দেড় দশকের জমানো বাসনা, আমাদের সৃষ্টিশীলতা আমাদের ওষ্ঠ আর অধরে, আমাদের হস্তে ও বাহুতে। আমরা শিল্প সৃষ্টি করে’ই চলছিলাম আমাদের চোখে, ঠোঁটে, কর্ণে, গ্রীবায়।

বৃষ্টি বলে, আমার এই কিশোরী শরীরটা শুধু তোমার। আজ থেকে আমি অন্য কারো নই।

বৃষ্টির ফোঁটাকে সাক্ষী রেখে আমার কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয়- আমাদের শিল্পকলার সৃষ্টির পর এই পৃথিবী, এই জগত, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, এই ক্ষুব্ধ আকাশের মেঘ থেকে বিতাড়িত জলপ্রবাদ এবং এই সবুজ ঘাস-সহ সবাইকে সাক্ষ্য দিচ্ছি- এই ওষ্ঠ ও অধরের প্রস্থান তখনই হবে, যখন আমাদের মৃত্যু হবে।

সময় যেতে থাকে, ইস্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে প্রবেশ করি। প্রেমের সীমা পুকুরকে অস্বীকার করে বর্তমানে নদীকে তিরস্কারের স্পর্ধা দেখানোর সাহস সঞ্চয় করে নিয়েছে। নতুন এক জগতের সাথে পরিচয় হয় আমাদের। এতো মানুষ, এতো ছেলেমেয়ে, এতো এতো শহরের সুন্দরী মেয়ে ও সুদর্শন ছেলে। আমাদের শিল্পকলা নতুন শিল্পের খোঁজে সারারাত ছটফট করে। এক শিল্পে আমি আর সন্তুষ্ট থাকি না। কিন্তু বলতেও পারি না। হয়তো সেও থাকে না, কিন্তু নিত্যনতুন শিল্পকলা সৃষ্টির আগ্রহ প্রকাশ করা মেয়েদের জন্য সহজ নয়। তারা যে চায় না তা কিন্তু নয়। কিন্তু সমাজব্যবস্থায় এমন যে মুখ ফুটে বলতে গেলেই বিপদ। এ-কারণে তারা কখনও কখনও নাটকীয়তার জন্ম দেয়। তাতে দূরত্ব বাড়তে থাকে। প্রথমে আমরা দুজন দুজনের জন্যে কষ্ট পাই। হয়তো কেউ একটু বেশি আর কেউ একটু কম। এটাই নিয়ম। কিন্তু আমরা থেমে থাকি নি। তার সম্বন্ধে আমি অবগত, আমার সম্বন্ধে সে।

আমরা নিত্যনতুন শিল্পকলার সাথে পরিচিত হই, সৃষ্টি করতে থাকি অবাধ সৃষ্টিশীলতার। আমরা আঠারো থেকে উনিশে উত্তীর্ণ হই। আমরা অদম্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠি। এ-এক-নতুন বিশ্ব! যেখানে মধু সংগ্রহে সকলেই ছোটাছুটি করে। বড় ভাইয়েরা ছোট মেয়েদের কখনও নগরায়ণ করে, আবার কখনও শিল্পায়ন। বড় আপুরা ছোট ছেলেদের কখনও কেয়ার টেকার বানায়, আবার কখনও কথিত ভাই বানায়। চারিদিকে শুধু শিল্পের সৃষ্টি হতে থাকে, এখানে কেউ কারো নিজস্ব নয়। সকলেই শিল্প সৃষ্টিতে ব্যস্ত ও বিভোর।

তৃতীয় বর্ষে বৃষ্টি ফিরে আসে। আর বলে, আমি ক্লান্ত। আগের জগতটাই মধুর ছিল, তাই না?

আমি অনেকক্ষণ চুপ থাকি। তারপর বলি, কেউ কারো জন্য বেঁচে থাকে না, কেউ কারো জন্য মারা যায় না। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সাক্ষী- শরীর একজনের জন্যে নয়।

বৃষ্টি নামে জোরেশোরে। আর এই বৃষ্টি আকাশ থেকে অভিমানে ঝরে পড়া বৃষ্টি নয়। নয়ন থেকে বের হয়ে আসা পদ্মা নদীর ঢেউয়ের মতোন ভুল সিদ্ধান্তের অনুশোচনার বৃষ্টি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =