জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-92

পরিবহণ পুলের সরকারি মাইক্রোবাস থেকে নেমে ১৮-তলার লিফট ধরতে লাইনে দাঁড়িয়ে রইলাম অন্তত ১০-মিনিট। অফিসে ঢুকতেই ‘বস যুগ্মসচিব’ বললেন, “আসতে এতো দেরি করলেন কেন? সচিব স্যার খুঁজেছেন আপনাকে জরুরী কাজে বেশ কবার”! ঘাম না মুছেই দৌড়ালাম কবিতা প্রেমিক সচিব স্যারের দিকে! মুখ গম্ভীর আর গলার স্বর ততোধিক গম্ভীরতায় ভরে বললেন, “এতো দেরী করেন কেন অফিসে আসতে”? বিনীতভাবে হাসার চেষ্টা করে বললাম, “সরকারি মাইক্রোতে এসেছি স্যার, ওটা আসতেই দেরী করলো”।
– কেন সরকার বেতন দেয়না আপনাকে? গাড়ি কেনেন না কেন? শুনেছি কজন পিওনেরো গাড়ি আছে। ডেপুটি ডিরেক্টর আপনি! আর গাড়ি নেই?
– সরকারি বেতনে কি গাড়ি কেনা যায় স্যার! বললাম পৌণপৌণিক বিনয়ের স্বরে!
– অন্যেরা কেনে কিভাবে? শুনলাম এও সোবাহান মিয়া একুশ লাখ টাকায় গাড়ি কিনেছে? আর আপনি পারেননা? আসলে এ্যাডমিন ক্যাডার ছাড়া আপনারা অযোগ্য প্রশাসনে। আপনাদের স্কুল কলেজে মাস্টারি করাই মানায়, সেক্রেটারিয়েট আপনাদের জন্য না!
:
সারাদিন মন খারাপ করে কাটালাম অফিসে। পাঁচটায় ছুটির প্রাক্কালে সরকারি মাইক্রো ড্রাইভার ছিদ্দিক মোবাইলে বললো, স্যার গাড়িটা স্টার্ট হইতাছে না, আইজ জনপ্রশাসনের বাসে চইলা যান!
পাঁচটা দশে দৌঁড়ে বাসে উঠতে গিয়ে দেখি সব সিট ‘হাউজফুল’। আমাকে দেখে সংরক্ষিত মহিলা সিটে বসা সহকারী প্রোগ্রামার নাজনিন উঠে দাঁড়িয়ে বসার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকলো। একজন মহিলাকে উঠিয়ে তার সিটে বসতে মন সায় দিলোনা আমার! তাই সারাপথ নাজনিন দাঁড়িয়ে রইলো, আামি দাঁড়িয়ে রইলাম। ঠাসা মানুষ আর প্রচন্ড গরমে জবজবে ভিজে একাকার হলাম পুরো পথ! ঘরে ফিরেও ঘুমোনোর আগ পর্যন্ত মনটা খারাপ রইলো আমার, যতক্ষণ না ঘুমের মাঝে মা এসে কপালে হাত রাখলো!
:
– কি রে বাবা মন খারাপ খুব?
– হবেনা? তুমি থাকলে জবাব দিতে পারতে সচিব স্যারের মুখের ওপর! কিভাবে অপমান করলো আমাকে দেখলে তো!
– তো গাড়ি কিনে ফ্যাল !
– ধুর টাকা কই! ব্যাংকে মাত্র ছিয়াশি হাজার ছশ বাইশ টাকা আছে মা! যা জমা রেখেছি আগামি মাসে ‘লাওস’ ঘুরতে যাবো বলে। আর গাড়ি কি এ টাকাতে হয় মা? মিনিম্যাম ষোল/সতেরো লাখ লাগে তো! ইন্ডিয়ান টাটা ন্যানোও নাকি সাড়ে আট লাখ ঢাকাতে!
– কেন তোকে গাড়ি কিনে দেবো এমন কথা কি বলিনি দুহাজার তিনে?
– বলেছিল তো! কিন্তু কথা না রেখেই চলে গেলে যে মা!
– তোর নানার জমি ছিল মনসার চরে মনে আছে তোর? যেখান থেকে কৈশোরে তুই নৌকো ভরে তিল, সরিষা, তরমুজ, মরিচ, রসুন কত কি আনতি ভুলে গেলি?
– আরে মা সে জমিতো মেঘনায় নিলো তুমি বেঁচে থাকতেই। ঠিক তেমনই ভাঙছে এখন শরিয়তপুরের নড়িয়া মা। তুমি থাকলে দেখতে! ঘর মসজিদ হাসপাতাল সব ভেঙে পড়ছে আমাদের সেই জমির মতই! সিঁদুর পরা এক হিন্দু নারীকে দেখলাম নদীর পারে বিলের মাঝে ভাত রা্ন্না করছে মা!
– মনসার চরের জমি বিক্রি করে দে সব!
– ধুর নদীর মাঝের জমি আবার কেউ কেনে নাকি? মাছেরাও কিনবে না ঐ জমি মা! ফ্রি ঘর সংসার করে তোমার জমিতে ইলিশ আর বোয়াল মাছেরা এখন!
– ফাজলামো করিস না! ঐ জমি চর পড়ে উঁচু হয়েছে তার খবর রাখিস? পুরো জমি বিক্রি করে গাড়ি কিনে দেখাবি আমায়!
:
ভোর হতেই ফোন দিলাম দ্বীপগাঁয়ের বাজারের দোকানের সাইফুলকে। মায়ের আমলে আমাদের জমি জিরাত দেখভাল করতো এমন বৃদ্ধ হাবি খাঁর সাথে কথা বলালো সে ঘন্টা পর। পরদিনই ট্রলার নিয়ে জমির খোঁজ নিতে গেল হাবিখাঁ মনসার চরে এবং বিস্ময়কর খবর দিলো পরদিন বিকেলেই! হ্যাঁ, ১০/১২ বছর আগে ঐ চরের জমি জেগেছে আমার মায়ের। যার খবর রাখিনি আমরা ভাইবোনেরা কেউ। কারণ সবাই এখন দ্বীপান্তরিত অন্যত্র। আমাদের এলাকারই নদীভাঙা লোকজন ঐ চরে ঘরবাড়ি বানিয়ে, কলা নারকেল গাছ লাগিয়ে, তা দখল করেছে তারা মালিকহীন ফাউ জমি হিসেবে!
:
সাত ভাইবোনের সবাই সম্মতি দিলো দূরবর্তী চরের মায়ের ঐ জমি বিক্রিতে। এবং মায়ের নির্দেশমত জমি বিক্রির টাকাতে প্রথমে গাড়ি কিনে, তারপর টাকা থাকলেই নেবে তাদের ভাগেরটা! এমন কথাও দিলো আমাকে কেউ জোরালো ভাষাতে কেউবা ক্ষীণস্বরে! হাবিখাঁ ক্রেতা ঠিক করলো পুরোজমি পয়ষট্টি লাখ টাকাতে কিন্তু ক্রেতার শর্ত, দখলদার তুলে দিতে হবে আমাকে! ত্রিশ হাজার করে মাথাপিছু ‘ক্ষতিপুরণ’ দেয়াতে ৩-দখলকার চলে গেল চরে তাদের নিজ জমিতে। কিন্তু চরের ডাকাত ষন্ডামার্কা মোশারেফ চৌকিদার পাত্তা দিলোনা আমাকে। সে ক্রয়সূত্রে জমির মালিক বলে দাবী করে বসলো। থানায় কথা বলে ১০-পুলিশ আর গ্রাম থেকে শখানেক লোক ট্রলার ভরে হাজির হলাম ডাকাত দখলকার মোশারেফকে উচ্ছেদ করতে। একটা রেজিষ্ট্রি দলিল বের করলো আমার মায়ের জমির অবৈধ দখলকার। জমিটা ২০১৩ সনে আমার মায়ের বিক্রিত হিসেবে সইমোহরকৃত। পুলিশ অফিসারকে বললাম, মা মারা গেছেন ২০০৮ সনে, সুতরাং দলিলটা অবশ্যই ১০০% জাল। আমার কথার দৃঢ়তায় পুলিশ ‘হ্যান্ডকাপ’ পরালো ডাকাত মোশারেফকে। বললো, এই দলিল জাল এ সত্য স্বীকার করে মাফ চাইলে তোকে ছেড়ে দেব। না হলে এ জাল দলিলসহ কাল কোর্টে চালান দেব তোকে নতুন মামলাসহ।
:
ভয় পেয়ে মোশারেফ বলে ফেললো, জাঙ্গালিয়ার আবুল হোসেন চেয়ারম্যান ১০-হাজার টাকা নিয়ে এ জাল দলিল তৈরি করে দিয়েছে তাকে। এবং সে-ই নিষেধ করেছে তাকে এ দখল ছাড়তে। আমার সাথে যাওয়া শখানেক গ্রামীণ লোকজন উত্তেজিত হয়ে তখনই পুরোটা ভেঙে ফেললো ডাকাত মোশারেফের ঘর। ৩টা বড় রামদা ‘সিজ’ করলো পুলিশ ওর ঘর থেকে। উপায়ান্তর না দেখে সে বললো, অন্যদের যেভাবে ৩০-হাজার টাকা করে ক্ষতিপুরণ দেয়া হয়েছে, তাকেও সেটা দিতে হবে। আমি কিছুটা নমনীয় হলেও আমার পক্ষের লোকজন ঐ ডাকাতকে ছাড় দিতে অনমনীয় হলো সবাই। লোকজনের চাপে অবৈধ রামদা ঘরে রেখে রাতে রাতে নৌকোয় ডাকাতির সন্দেহভাজন আসামী হিসেবে গ্রেফতার করা হলো মোশারেফকে।
:
সারাদিন নানাবিধ ধকলের পর গ্রামের বাড়ির দোতলা বারান্দার মায়ের খাটে শুলাম অনেকদিন পর। যেখান থেকে জানালা খুললে মার কবরের লাল দেয়াল চোখে পড়ে জারুল গাছের ফাঁকে। ফুরফুরে বাতাসে মা বাস্তবে এলেন কিংবা স্বপ্নে জানিনা আমি! সারাদিনের রোদে পোড়া হৃদয়ের আকাশটা দুহাতে ছুঁয়ে মা বললো, গাড়ি কিনবি কবে বাবা !
আঁধারের ঘুটঘুটে অন্ধকার ভরা কুঁচিগুলো পাশে সরিয়ে বললাম – “মা! মরে গিয়েও তুমি গাড়ি কিনে দিচ্ছো তোমার বিল্টুকে”!
এবার ভালবাসার মায়াবি ঘাতকের শান দেয়া ছুরি আমার বুকে এপার ওপার করে দিয়ে মা বললো – চারদিকে পুজোর ঢাক কিংবা কাশরের শব্দের মত প্রভাকর রাত হয়ে সারাক্ষণ তোর আকাশে জেগে থাকি আমি বাবা! তোর পিত্তথলির ঘুলঘুলিতে বাসাবাঁধা নিকষ হলুদাভ পাথর হয়ে আমিই অবস্থান করি সারাক্ষণ! দুরাকাশে ক্ষীয়মান তারাদের জ্বলানেভার কালচক্রে আমিই সারাদিন তোর দিকে চেয়ে থাকি রে বাবা! রূপোলি আভাময় ঘন তুষারের ব্রাহ্মি লিপিতে লিখে যাই আমি আমার সন্তানের নাম! তোর পিচ্ছিল কর্দমাক্ত হৃদয়পুরের ঘাটে বাঁধা মা মাঝির নৌকো হয়ে সারারাত ঘাটে বাঁধা থাকি আমি রে বাবা! তোর হৃদয়দিঘির হাজারো নীল পদ্মডুবির বিলে সপ্তরঙা শাপলা হয়ে ভেসে থাকি আমি প্রতিনিয়ত!
:
বৃক্ষাদির চুড়ান্ত বিষন্নতার স্বরে কিংবা কান্নার মত বললাম, আর বলোনা মা! আমার জীবনে স্বর্ণপ্রভা ধানের মত ভূমিমাতা হয়ে জেগে থাকো সারাক্ষণ তুমি মা! জীবনের এসব বিন্দাস বৃক্ষপাতার ফাঁকে মৌটুসী পাখির মত সারাক্ষণ তোমার ঘ্রাণে বেঁচে আছি মা! তোমার জ্যোৎস্নাজলে নাইতে নেমে আকাশলীনায় সাঁতার কাটা জীবন আমার তা কি ভুলে গেছো তুমি?
আকস্মিক উড়ন্ত কোন বুনো পাখি অভুক্ত কোন ফল ফেলে দেয় টিনের চালে। গভীর রাতের নিস্তব্দতায় ঘনপাতার শ্যামলিমা বৃক্ষদের জনারণ্যে হারিয়ে যায় মা! মায়ের ফেলে যাওয়া ঘ্রাণে ঘুমজাগা সন্তর্পন প্রতিক্ষার প্রহর গোণা সময় আর শেষ হয়না যেন! শেষ রাতের ছায়াভাঙা বেগুনরঙা এক জারুল বিকেলের গন্ধে ভাসতে থাকি আমি বুনো বাতাসে!
:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 93]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

55 + = 59