১৮৪: মুতার যুদ্ধ -১: কে ছিল আক্রমণকারী?

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

ওহুদ যুদ্ধের চরম পরাজয়, আল-রাজী ও বীর মাউনায় অনুসারীদের হত্যা, খন্দক যুদ্ধের চরম বিপর্যয় ও হুদাইবিয়াই অবমাননাকর সন্ধি-চুক্তি স্বাক্ষরের পর হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সংঘাতময় ঘটনাবহুল নবী জীবনের পরবর্তী বিপর্যস্ত ও বিষাদময় ঘটনাটি হলো ‘মুতা হামলা।’ হিজরি ৬ সালের জিলকদ মাসে হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তি শেষে মদিনায় প্রত্যাবর্তনের পর থেকে হিজরি ৮ সালের জুমাদিউল আওয়াল মাসে ‘মুতা হামলার’ পূর্ব পর্যন্ত, হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তি পরবর্তী সতেরো মাস সময়ে, স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অবিশ্বাসী জনপদের ওপর একের পর এক কমপক্ষে চৌদ্দটি সশস্ত্র হামলা সংঘটিত করেন। আদি উৎসে মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, এই প্রত্যেকটি হামলায় আক্রমণকারী ব্যক্তিটি ছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)! প্রথম তিনটির নেতৃত্বে ছিলেন নবী মুহাম্মদ স্বয়ং। পরবর্তী এগারোটি হামলার কোনটিতেই মুহাম্মদ নিজে অংশগ্রহণ করেন নাই; তাঁর প্রত্যক্ষ নির্দেশে এই হামলাগুলো কার্যকর করেছিলেন তাঁর অনুসারীরা। আক্রান্ত অবিশ্বাসী জনপদ-বাসী করেছিলেন তাঁদের জান-মাল রক্ষার চেষ্টা। এ বিষয়ের আলোচনা ‘আল ফাতহ বনাম আঠারটি হামলা (পর্ব-১২৪)’ পর্বে করা হয়েছে। ‘মুতা হামলার’ বিস্তারিত আলোচনা শুরু করার আগে মুহাম্মদের এই সব আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের আর একবার আলোকপাত করা যাক; অতি সংক্ষেপে: [1] [2]

হিজরি ৭ সাল:
১) খায়বার হামলা – হামলাকারী নবী মুহাম্মদ স্বয়ং:
>> হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তি (মার্চ-এপ্রিল, ৬২৮ সাল) শেষে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করার মাত্র দেড়-মাস পর, হিজরি ৭ সালের মহরম মাসে (মে-জুন, ৬২৮ সাল) মুহাম্মদ মদিনা থেকে ৯৫ মাইল দূরবর্তী খায়বার নামক স্থানের ইহুদি জনপদের ওপর অতর্কিত আগ্রাসী আক্রমণ চালান। অমানুষিক নৃশংসতায় তিনি তাঁদের পরাস্ত করেন ও তাঁদের সমস্ত সম্পত্তি ও মা-বোন-স্ত্রী-কন্যাদের যৌনদাসী-রূপে ভাগাভাগি করে নেন। এক পঞ্চমাংশ তাঁর নিজের, বাঁকি চার-পঞ্চমাংশ হামলায় অংশগ্রহণকারী অনুসারীদের (কুরআন: ৮:৪১)।

২) ‘ফাদাক’ আগ্রাসন – হুমকিদাতা নবী মুহাম্মদ স্বয়ং:
>> খায়বার হামলা শেষে মদিনায় প্রত্যাবর্তন-কালে মুহাম্মদ খায়বারের নিকটবর্তী ফাদাক নামক স্থানের ইহুদি জনপদের মানুষদের হুমকি প্রদান করেন, এই বলে, “যদি না তাঁরা” তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে তাঁকে নবী হিসাবে মেনে নেয়, কিংবা তাঁকে তাঁদের সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক মালিকানা দিতে রাজী হয়; তবে তাঁদের ওপরও ‘খায়বারের অনুরূপ’ নৃশংস হামলা সংঘটিত করা হবে।” ভীত সন্ত্রস্ত ফাদাক-বাসী তাঁদের নিজেদের ও পরিবারের নিরাপত্তার মূল্য বাবদ মুহাম্মদের চাহিদা মোতাবেক তাঁকে তাঁদের সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক মালিকানা দিতে রাজী হোন। ‘আল্লাহর’ নামে মুহাম্মদ দাবী, তিনি যেহেতু তাঁদের এই সমস্ত সম্পদ কোনরূপ হামলা ছাড়াই হস্তগত করেছিলেন, তাই এই সম্পত্তির মালিক শুধুই তাঁর ও তাঁর আল্লাহর! আর যেহেতু আল্লাহ-কে লুটের মালের (গণিমত) ভাগ পৌঁছে দেয়া কখনোই সম্ভব নয়, অর্জিত সমস্ত সম্পত্তির প্রকৃত মালিক “শুধুই মুহাম্মদ!” এই ‘গণিমত’ উপার্জনের অর্থে চলতো নবী মুহাম্মদের পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনদের জীবিকা ও ভরণ পোষণ। আর তিনি তা আরও ব্যয় করতেন অভাবগ্রস্ত আদি মক্কাবাসী অনুসারী (মুহাজির), ইয়াতীম ও মুসাফির অনুসারীদের কল্যাণে (কুরআন: ৫৯:৬-৭)। তাঁর মতবাদ প্রচার ও প্রসারের প্রয়োজনে।

৩) ওয়াদি আল-কুরা হামলা – হামলাকারী নবী মুহাম্মদ স্বয়ং:
>> খায়বার ও ফাদাক আগ্রাসন শেষে মদিনায় প্রত্যাবর্তন-কালে পথিমধ্যে ওয়াদি আল-কুরা হামলা শেষে মুহাম্মদ মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন হিজরি ৭ সালের সফর মাসে (জুন-জুলাই, ৬২৮ সাল)।

৪) তুরাবা হামলা – হামলাকারী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ:
>> নেতৃত্বে উমর ইবনে খাত্তাব।

৫) নাজাদ আক্রমণ – আক্রমণকারী নবী মুহাম্মদ:
>> শাবান মাস (ডিসেম্বর-জানুয়ারি, ৬২৮ সাল), নেতৃত্বে আবু বকর ইবনে কুহাফা।

৬) বানু মুরাহ আক্রমণ – আক্রমণকারী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ:
>> শাবান মাস, নেতৃত্বে বশির বিন সা’দ।

৭) বানু আল-মুরাহ আক্রমণ – আক্রমণকারী মুহাম্মদ:
>> নেতৃত্বে গালিব বিন আবদুল্লাহ।

৮) আল-মেফায় আবদ বিন থালাবা গোত্র আক্রমণ – আক্রমণকারী নবী মুহাম্মদ:
>> রমজান মাস (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি, ৬২৯ সাল), নেতৃত্বে গালিব বিন আবদুল্লাহ।

৯) য়ুমুন ও আল-জিনাব আক্রমণ – আক্রমণকারী নবী মুহাম্মদ:
>> শওয়াল মাস, নেতৃত্বে বশির বিন সা’দ।

অতঃপর, হিজরি ৭ সালের জিলকদ মাস। মুহাম্মদ তাঁর সাথে ঠিক এক বছর আগে হুদাইবিয়া যাত্রায় অংশগ্রহণকারী সকল জীবিত অনুসারীদের সঙ্গে নিয়ে ‘ওমরাহ’ পালনের নিমিত্তে মক্কায় গমন করেন। আর তিনি তা সমাধা করে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন জিলহজ মাসে (পর্ব: ১৭৪)। অতঃপর ঐ মাসেই, [3]

১০) বানু সুলায়েম হামলা – আক্রমণকারী নবী মুহাম্মদ:
>> জিলহজ মাস, নেতৃত্বে ইবনে আবি আল-আওজা আল-সুলামি।

হিজরি ৮ সাল:
১১) আল-কাদিদে বানু মুলায়িহ গোত্রের ওপর হামলা – হামলাকারী মুহাম্মদ:
>> সফর মাস (মে-জুন, ৬২৯ সাল), নেতৃত্বে গালিব বিন আবদুল্লাহ আল কালবি (পর্ব- ১৭৫)। [4]

১২) আল মুনধির বিন সাওয়া আল-আবদি গোত্র হামলা – হামলাকারী নবী মুহাম্মদ:
>> নেতৃত্বে আল-আলা বিন আল-হাদরামি।

১৩) বানু আমির গোত্র হামলা – হামলাকারী নবী মুহাম্মদ:
>> রবিউল আওয়াল মাস (জুন-জুলাই, ৬২৯ সাল), নেতৃত্বে শুজা বিন ওয়াহাব।

১৪) ধাত আতলাহ আক্রমণ – আক্রমণকারী নবী মুহাম্মদ:
>> নেতৃত্বে কাব বিন উমায়ের আল-গিফারি।

অতঃপর, মুতা হামলা: কে ছিল আক্রমণকারী?

হিজরি ৭ সালের জিলহজ মাসে ‘ওমরাহ’ পালন শেষে মদিনায় ফিরে আসার চার মাস পর, হিজরি ৮ সালের জমাদিউল আউয়াল মাসে (আগস্ট-সেপ্টেম্বর, ৬২৯ সাল) মুহাম্মদ সিরিয়ার উদ্দেশ এক আক্রমণকারী দল প্রেরণ করেন। দলটি মুতা নামক স্থানে চরম বিপর্যস্ত অবস্থার সম্মুখীন হয়। ইসলামের ইতিহাসে যা ‘মুতার যুদ্ধ’ নামে অবিহিত। মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ), মুহাম্মদ ইবনে সা’দ (৭৮৪-৮৪৫ খৃষ্টাব্দ), আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ) প্রমুখ আদি উৎসের প্রায় সকল মুসলিম ঐতিহাসিক তাঁদের নিজ নিজ ‘সিরাত গ্রন্থে’ বিভিন্নভাবে এই ঘটনার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনায় [কবিতা পঙক্তি পরিহার] ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ: [5]
(আল-ওয়াকিদি, ইবনে সা’দ ও আল-তাবারীর বর্ণনা ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ): [6] [7] [8] [9]

তিনি জিলহজ মাসের অবশিষ্ট সময় এবং মহরম, সফর ও রবির দুই মাস [রবিউল আওয়াল ও রবিউস সানি] সেখানে অবস্থান করেন। সেই সময়টিতে মুশরিকরা ছিল তীর্থযাত্রীদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে। জুমাদিউল আওয়াল মাসে তিনি সিরিয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর সেনাদল প্রেরণ করেন, যা মুতা নামক স্থানে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। [10]

উরওয়া বিন আল-যুবায়েরের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মুহাম্মদ বিন জাফর বিন আল-যুবায়ের বলেছেন: আল্লাহর নাবী হিজরি ৮ সালের জুমাদিউল আওয়াল মাসে মুতায় যুদ্ধ-অভিযান প্রেরণ করেন; নেতৃত্বে যায়েদ বিন হারিথা, যদি যায়েদ বিন হারিথা নিহত হয় তবে নেতৃত্বে থাকবে জাফর বিন আবু তালিব, আর সে যদি নিহত হয় তবে আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা। এই অভিযানে যোগদানকারী অনুসারীদের সংখ্যা ছিল ৩০০০, তারা যাত্রার প্রস্তুতি নেয়।

তারা রওনা হওয়ার প্রাক্কালে লোকেরা আল্লাহর নবীর নিযুক্ত সেনাপ্রধানদের বিদায় জানায় ও তাদের স্যালুট করে। আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা তাঁর বিদায়ের সময়টিতে কেঁদে ফেলে। লোকেরা যখন তার কারণ জানতে চায়, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কসম, এটি এই জন্য নয় যে আমি এই দুনিয়াকে ভালবাসি, কিংবা তোমাদের প্রতি আমি অতিশয় অনুরক্ত। এটি এই কারণে যে আমি আল্লাহর নবীকে আল্লাহর গ্রন্থ থেকে জাহান্নাম বিষয়ে এমন একটি আয়াত পাঠ করতে শুনেছি, যেখানে তিনি উদ্ধৃত করেছেন:

“তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তথায় পৌছবে না। এটা আপনার পালনকর্তার অনিবার্য ফায়সালা [কুরআন: ১৯:৭১]।” [11]
আমি জানি না, সেখানে প্রবেশ করার পর আমি কীভাবে সেখান থেকে ফিরে আসতে পারবো।’

মুসলিমরা বলে, ‘আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে আছে, সে তোমাদের রক্ষা করবে ও নিরাপদ ও অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসবে।’ — অতঃপর লোকেরা যাত্রা শুরু করে, আল্লাহর নবী তাদের সঙ্গে ছিলেন; তাদের বিদায় জানানোর পর তিনি ফিরে আসেন। —

তারা তাদের যাত্রা অব্যাহত রাখে ও সিরিয়ার মা’আন (Ma’an) নামক স্থানে এসে শুনতে পায় যে হিরাক্লিয়াস ১০০,০০০ গ্রীক সৈন্যসহ আল-বালগার (‘al-Balga/Balqa’) মা’ব নামক স্থানে এসে পৌঁছেছে এবং ইরাশার বালি নামক স্থানের মালিক বিন যাফিলা নামের এক লোকের নেতৃত্বে তার সাথে যোগদান করেছে লাখম, জুধাম, আল-গায়ান ও বাহরার (আল-তাবারী: ‘গোত্রের’) ১০০,০০০ লোক।

যখন মুসলমানরা এই খবর শুনতে পায়, এমত পরিস্থিতিতে তাদের কী করা উচিত এই চিন্তায় তারা মাআনে দুই রাত্রি অবস্থান করে। তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে তারা আল্লাহর নবীর কাছে শত্রুর সংখ্যার খবর জানিয়ে চিঠি দেবে; যদি তিনি তাদের সাহায্যের জন্য অতিরিক্ত সৈন্য পাঠান তবে তো ভালোই, নতুবা তারা তাঁর হুকুমের জন্য অপেক্ষা করবে।

আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা লোকদের উৎসাহ প্রদান করে, এই বলে: “তোমারা অপছন্দ করো সেই বিষয়টি যার সন্ধানে তোমরা এসেছ, অর্থাৎ ‘শহীদ হওয়া’। শত্রুদের সঙ্গে আমারা যে লড়াই করছি তা কোন সংখ্যা বা শক্তি বা সংখ্যাধিক্যের মাপকাঠিতে নয়, বরং আমরা তাদের মোকাবিলা করছি (তাবারী: ‘যুদ্ধ করছি’) আমাদের এই ধর্মের জন্য, যার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছে। সুতরাং এগিয়ে চলো! উভয় সম্ভাবনায় আমাদের জন্য উত্তম: বিজয়ী হওয়া, কিংবা শহীদ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করা।” লোকেরা বলে, “আল্লাহর কসম, ইবনে রাওয়াহা ঠিকই বলেছে।” অতঃপর তারা সম্মুখে অগ্রসর হয়। —-

লোকেরা সম্মুখে অগ্রসর হয় ও যখন তারা বালগার সীমান্ত এলাকায় এসে পৌঁছে, হিরাক্লিয়াসের গ্রীক ও আরব সৈন্যরা মাশারিফ (Masharif) নামের এক গ্রামে তাদের সম্মুখীন হয়। যখন শত্রুরা নিকটবর্তী হয়, মুসলমানরা পিছু হটে মুতা নামের এক গ্রামে সরে আসে। সেখানে সৈন্যদল একে অপরের সম্মুখীন হয় ও মুসলমানরা অবস্থান নেই এই ভাবে যে, তাদের ডান পাশের নেতৃত্বে থাকে বানু উধরা গোত্রের কুতবাহ বিন কাতাদা ও বাম পাশের নেতৃত্বে থাকে উবায়া বিন মালিক নামের এক আনসার।’

আল-ওয়াকিদি (ও মুহাম্মদ ইবনে সা’দ) এর অতিরিক্ত বর্ণনা: [7]

‘আল-ওয়াকিদি আমাদের বর্ণনা করেছেন, এই বলে: উমর বিন আল-হাকামের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রাবিয়া বিন উসমান আমাকে যা বলেছেন তা হলো, তিনি বলেছেন:

‘আল্লাহর নবী বানু লিহিব গোত্রের আল-হারিথ বিন উমায়ের আল-আযদি নামের এক লোক-কে এক ডকুমেন্ট সহকারে বুসরার [সিরিয়া] শাসনকর্তার নিকট প্রেরণ করেন। যখন তিনি মুতা নামক স্থানে এসে পৌঁছান, শুরাহবিল বিন আমর আল-ঘাসানি (Shurahbïl b. ‛Amr al-Ghassānī) নামের এক লোক তার মুখোমুখি হয় ও বলে,

“তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
তিনি জবাবে বলেন, “আল-শাম [সিরিয়া-প্যালেস্টাইন অঞ্চল]।”
সে বলে, “তুমি সম্ভবত: আল্লাহর নবীর পত্রবাহকদের একজন।”
তিনি বলেন, “হ্যাঁ। আমি আল্লাহর নবীর একজন পত্রবাহক।”

অতঃপর, শুরাহবিল হুকুম জারী করেন যে তাকে যেন দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয় ও হত্যা করা হয়। শুধু তাকেই হত্যা করা হয়েছিল, আল্লাহর নবীর ব্যাপারে। । খবর-টি আল্লাহর নবীর কাছে এসে পৌঁছে, ও তা তাঁকে ভীষণ আবেগ-আপ্লুত করে। তিনি তাঁর লোকদের ডেকে পাঠান ও তাদেরকে আল-হারিথের খুনের খবর ও কে তাকে হত্যা করেছে তা অবহিত করান। লোকেরা দ্রুত সমবেত হয় বের হয়ে এসে আল-জুরফ নাম স্থানে শিবির স্থাপন করে। আল্লাহ নবী তাদেরকে বিষয়টি স্পষ্ট করেননি। —–‘

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

>>> ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ও আল-তাবারী এই হামলার প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে কোন ঘটনার উল্লেখ করেন নাই। অন্যদিকে আল-ওয়াকিদি এই হামলার প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে শুরাহবিল বিন আমর আল-ঘাসানি নামের এক লোক কর্তৃক মুহাম্মদের এক পত্র-বাহককে হত্যার উপাখ্যান বর্ণনা করেছেন। আর তার ছাত্র মুহাম্মদ ইবনে সা’দ তাঁর ‘কিতাব আল-তাবাকাত আল-কাবির’ গ্রন্থে ‘মুতা হামলা’ উপাখ্যানের চার পৃষ্ঠার বর্ণনায় এই হত্যা-ঘটনাটির “উল্লেখ করেছেন” লাইন দুই-তিনের এক বাক্যে, ঘটনার কোনরূপ বর্ণনা ছাড়াই।

আল-ওয়াকিদির এই বর্ণনায় যা সুস্পষ্ট তা হলো, শুরাহবিল বিন আমর আল-ঘাসানি নামের এই লোকটি কিংবা তার দলবল পূর্বপরিকল্পিত-ভাবে মুহাম্মদ কিংবা তাঁর কোন অনুসারীকে আক্রমণ করেন নাই। তিনি মুহাম্মদের এই পত্র-বাহককে আক্রমণ করেছিলেন পথিমধ্যে, লোকটি যে মুহাম্মদের পত্র-বাহক এই তথ্যটি জানার পর। সুতরাং, নিঃসন্দেহে এই ঘটনাটি দিগ্বিদিকে বহু মাস ও বছরব্যাপী মুহাম্মদের আগ্রাসী আক্রমণের বিরুদ্ধে একজন মানুষের তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া; মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে কোন গোত্র-নেতা বা শাসকের পরিকল্পিত আগ্রাসী-আক্রমণের কোন উদাহরণ নয়। সে কারণেই, আল-ওয়াকিদির এই উপাখ্যান যদি শতভাগ সত্যও হয়, আর মুহাম্মদ যদি এই ঘটনাটির পরিপ্রেক্ষিতে, তাঁর পত্রবাহক হত্যার প্রতিশোধ স্পৃহায়, সেই জনপদের সমস্ত মানুষের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে তিন-হাজার সশস্ত্র অনুসারীর এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন, তবে তা নিঃসন্দেহে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের চরম অসহিষ্ণুতা ও আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিচয়ই বহন করে; বিপরীতটি নয়।

প্রাচীন আরবে ‘আল-বালগা (Al-Balga)’ এলাকাটি ছিল আধুনিক জর্ডানের বেশীর ভাগ অংশ। মোটামুটিভাবে, উত্তরে ওয়াদি আল-যারকা (Wadi al-Zarqa’ or Jabbok) থেকে দক্ষিণে ওয়াদি আল-মুজিব অথবা আরনোন (Wadi al-Mujib or Arnon) পর্যন্ত বিস্তৃত মালভূমি অঞ্চল। বাইজানটাইন শাসন আমলে, আরনোন ছিল আরব ও প্যালেস্টাইন অঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকা।’ [12]

আদি উৎসে মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট তা হলো: বাইজেনটাইন সম্রাট কিংবা তার সৈন্যরা মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের কখনোই আক্রমণ করতে আসেন নাই। মুহাম্মদের আদেশে তাঁর তিন হাজার সশস্ত্র অনুসারী সুদূর মদিনা থেকে ৬০০ মাইলেরও অধিক পথ পাড়ি দিয়ে জর্ডানের ‘আল বালগা’ এলাকায় এসেছিলেন আগ্রাসী আক্রমণের নিমিত্তে। মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের এই আগ্রাসী আক্রমণ প্রতিহত করার প্রচেষ্টায় আত্মরক্ষার নিমিত্তে বাইজেনটাইন সম্রাটের গ্রীক সৈন্যরা ও ঐ অঞ্চলের বিভিন্ন আরব গোত্রের লোকরা সম্মিলিতভাবে ‘মাশারিফ’ নামক স্থানে তাদের মোকাবিলার জন্য সমবেত হয়। তাদের সেই প্রতিরোধের মুখে মুহাম্মদ অনুসারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয় ও মুতা নামক স্থানে এসে যুদ্ধ-প্রস্তুতি গ্রহণ করে। অতঃপর শুরু হয় যুদ্ধ।

“অর্থাৎ, অন্যান্য সকল হামলাগুলোর মতই ‘মুতা যুদ্ধেও’ আগ্রাসী আক্রমণকারী দলটি ছিল মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা; অবিশ্বাসীরা ছিলেন তাদের আক্রমণের লক্ষ্যস্থল।”

ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ও আল-ওয়াকিদির বর্ণনার অতিরিক্ত বিশেষ অংশটির মূল ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করছি। আল-তাবারীর রেফারেন্স: বিনা-মূল্যে ডাউন-লোড লিংক তথ্য-সূত্র [6]:

The narratives of Muhammad Ibn Ishaq: [5]
‘He remained there for the rest of Dhu’l-Hijja, while the polytheists supervised the pilgrimage, and throughout al-Muharraman and Safar and the two Rabi’s. In Jumada’l-Ula he sent to Syria his force which met with disaster in Mu’ta.

Muhammad b. Ja’far b.al-Zubayr from ‘Urwa b.al-Zubayr said: the apostle sent his expedition to Mu’ta in Jumada’l-Ula in the year 8 and put Zayd b. Haritha in Command; if Zayd were slain then Ja’far b.Abu Talib was to take command, and if he were killed then, ‘Abdullah b.Rawaha. The expedition got ready to the number of 3000 and prepared to start. When they were about to set off they bade farewell to the apostle’s chiefs and saluted them. When ‘Abdullah b. Rawaha took his leave of the chiefs he wept and when they asked him the reason he said, ‘By God, it is not that I love the world and am inordinately attached to you, but I heard the apostle read a verse from God’s book in which he mentioned hell: “There is not one of you but shall come to it; that is a determined decree of your Lord,” and I do not know how I can return after I have been to it.’ The Muslims said, ‘God be with you and protect you and bring you back to us safe and sound.’ —- Then the people marched forth, the apostle accompanying them until he said farewell and returned. —

They went on their way as far as Ma’an in Syria where they heard that Heraclius had come down to Ma’ab in the Balqa’ with 100,000 Greeks joined by 100,000 men from Lakhm and Judham and al-qayn and Bahra and Bali commanded by a man of Bali of Irasha called Malik b. Zafila. When the Muslims heard this they spent two nights at Ma’an pondering what to do. They were in favour writing to the apostle to tell him of the enemy’s numbers; if he sent reinforcements well and good, otherwise they would await his orders. ‘Abdullah b. Rawaha encouraged the men saying, ‘Men, what you dislike is that which you have come out in search of, viz. martyrdom. We are not fighting the enemy with numbers, or strength or multitude, but we are confronting (T. fighting) them this religion with which God has honoured us. So come on! Both prospects are fine: victory or martyrdom.’ The men said, ‘By God, Ibn Rawaha is right.’ —– The people went forward until when they were on the borders of the Balqa’ the Greek and Arab forces of Heraclius met them in a village called Masharif. When the enemy approached, the Muslims withdrew to a village called Mu’ta. There the forces met and the Muslims made their dispositions, putting over the right wing Qutbah Quatada of the B.’ Udhra, and over the left wing an Ansari called ‘Ubaya b. Malik.’

Al-waqidi added: [7]
‘Al-Wāqidī related to us saying: Rabīa b. ‛Uthmān related to me from ‛Umar b. al-Hakam, who said: The Messenger of God sent al-Ḥārith b. ‛Umayr al-Azdī, one of the Banū Lihb, to the king of Buṣrā with a document. When he came down to Mu’ta, Shurahbïl b. ‛Amr al-Ghassānī confronted him and said, “Where are you going?” He replied, “Al-Shām.” He said, “Perhaps you are one of the messengers from the Messenger of God?” He said, “Yes. I am a messenger from the Messenger of God.” Then, Shuraḥbīl commanded that he be tied with rope, and executed him. Only he was killed for the Messenger of God. [Page 756] The news reached the Messenger of God and affected him badly. He summoned the people and informed them of the death of al-Ḥārith and of who killed him. The people hastened and went out and camped at al-Jurf. The Messenger of God did not clarify the affair. —-‘

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:
[1] ওহুদ যুদ্ধ, আল-রাজী ও বীর মাউনা হত্যাকাণ্ড ও খন্দক যুদ্ধের বিশদ বর্ণনা:
https://drive.google.com/file/d/0BwbIXqxRzoBOT3l5NmpOR3VwWEE/view

[2] হুদাইবিয়া-সন্ধি এবং খায়বার-ফাদাক ও ওয়াদি আল-কুরা আগ্রাসনের বিশদ বর্ণনা:
https://drive.google.com/file/d/0BwbIXqxRzoBOUVBOUnlRUXkxX0E/view

[3] নবী মুহাম্মদের ‘ওমরাহ’ ও কুরাইশদের সহিষ্ণুতা (পর্ব: ১৭৪):
http://www.dhormockery.org/2017/10/blog-post_6.html

[4] আল-কাদিদে আল-মুলায়িহ গোত্রে ডাকাতি (পর্ব- ১৭৫):
http://www.dhormockery.org/2017/10/blog-post_30.html

[5] সিরাত রসুল আল্লাহ: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, সম্পাদনা: ইবনে হিশাম, ইংরেজি অনুবাদ: A. GUILLAUME; ISBN 0-19-636033-1; পৃষ্ঠা ৫৩১- ৫৩৪
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[6] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী, ভলুউম ৮; ইংরেজী অনুবাদ: Michael Fishbein, ISBN 0-7914-3150—9 (pbk), পৃষ্ঠা ১৫২- ১৫৬
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21292&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[7] অনুরূপ বর্ণনা: আল-ওয়াকিদি; ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৭৫৫- ৭৬০; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; ISBN: 978-0-415-86485-5 (pbk); পৃষ্ঠা ৩৭২- ৩৭৪
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-

[8] অনুরূপ বর্ণনা: কিতাব আল-তাবাকাত আল-কাবির – লেখক: মুহাম্মদ ইবনে সা’দ (৭৮৪-৮৪৫ খৃষ্টাব্দ), অনুবাদ এস মইনুল হক, প্রকাশক কিতাব ভবন, নয়া দিল্লি, সাল ২০০৯ (3rd Reprint), ISBN 81-7151-127-9 (set), ভলুউম-২, পৃষ্ঠা ১৫৮-১৬২
https://kitaabun.com/shopping3/sads-kitab-tabaqat-kabir-print-a-920.html

[9] Ibid আল-তাবারী, নোট-৬৪১: ‘মুতা ছিল একটি গ্রাম, যার অবস্থান ছিল আল-বালগা নামে পরিচিত এলাকায়। জর্ডানের আধুনিক মুতা শহরটি কারক নামের স্থানটি থেকে থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে ও মৃত সাগরের (the Dead Sea) দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ২০ কিলোমিটার পূর্বে।’

[10] Ibid আল-তাবারী, নোট-৬৪৩: ‘তিনি মোটামুটিভাবে ৬২৯ সালের ২৯শে জুন থেকে ২৬শে অগাস্ট পর্যন্ত মদিনায় অবস্থান করেন ও মুতা অভিযান সংঘটিত করেন ঐ মাসে যার শুরু হয়েছিল ২৭শে অগাস্ট, ৬২৯ সাল।’

[11] কুরআনের উদ্ধৃতি ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক বিতরণকৃত তরজমা থেকে নেয়া। অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। http://www.quraanshareef.org/ কুরআনের ছয়জন বিশিষ্ট ইংরেজি অনুবাদকারীর ও চৌত্রিশ-টি ভাষায় পাশাপাশি অনুবাদ: https://quran.com/

[12] Ibid আল-তাবারী, নোট ৬৫৮

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =