প্রতিটি প্রত্যাখ্যানই আসলে একটা করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি- রুদ্র গোস্বামী

যখন আমি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলাম তখন আমাদের এক বান্ধবীর ব্যক্তিগত ছবি সকলের মোবাইলে ছড়িয়ে পড়েছিল। কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল তা আমি আদৌ জানতে পারি নি কিংবা আমার সাহস হয় নি বান্ধবীকে প্রশ্ন করার! সেই সময়ে তাকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। যেই যন্ত্রণা তাকে সহ্য করতে হয়েছিল তা মৃত্যুর থেকে কম নয় বলেই মনে হয়েছিল। তার কোন অপরাধ ছিল না অথচ বান্ধবীকে সহ্য করতে হয়েছিল অসহনীয় যন্ত্রণা। তার পরিবারের প্রতিটি সদস্য তাকে আত্মহত্যা করে নিজের ও পরিবারের অবশিষ্ট সম্মানটুকু রক্ষা করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিল। তার এলাকার দারোয়ান থেকে শুরু করে মুদি দোকানের কর্মচারী, ড্রাইভার, ময়লা নিতে আসা সিটি কর্পোরেশনের কর্মী, বিল্ডিং-এর শত শত ছোট, বড়, বুড়ো, তার কলেজের শিক্ষার্থীরা, শিক্ষকেরা সকলেই তাকে নানা শব্দে বিশেষিত করেছিল।

সে সময়ে আমি প্রথম লক্ষ্য করেছিলাম, মেয়েরা মেয়েদের শত্রু। ছেলেরা তো প্রতিক্রিয়াশীল এতে কোনই সন্দেহ নেই। কিন্তু যারা তার সহপাঠী, সাথী, বান্ধবী ছিল, তারা প্রায় সকলেই তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। অদ্ভুত হলেও সত্য যে, যারা তার সমালোচনা করেছিল তারাও কোন না কোনভাবে কোন ছেলের সাথে শারীরিকভাবে জড়িত ছিল। তাদের সাথে আমার বান্ধবীর পার্থক্য ছিল শুধু একটা ক্ষেত্রেই, আর সেটি হল- তাদের ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ পায় নি। এই যা।

আমরা এমন একটি কুৎসিত সমাজে বসবাস করি, যেখানে লুকিয়ে চুকিয়ে সেক্স করলে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু কেউ জেনে গেলেই সমস্যা। কী অদ্ভুত তাই না? আমাদের দেশে ধর্ষণ করলেও ধর্ষকের শাস্তি হয় না, কিন্তু সেক্সের শাস্তি ভয়ংকর।

যে দেশের মানুষ সেক্স নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পায়, অশ্লীল মনে করে থাকে- তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কীভাবে এতো দ্রুত গতিতে বেড়ে চলে, পর্ণসাইট ভিজিটে তাদের অবস্থান কীভাবে এগিয়ে থাকতে পারে, তাদের ভূমিতে ধর্ষণের হার কীভাবে এতো বাড়তে পারে, হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা থাকা সত্ত্বেও ক্রাইমের সংখ্যা কীভাবে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে যেতে পারে? না, এইসব নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। সরাসরি বলতে হবে নারীরা খারাপ!

আমার এখনও মনে আছে- যে মেয়েটি মন্তব্য করেছিলো, ‘বিয়ের আগে যে মেয়ে শুতে পারে সে কি আর ভাল মেয়ে হয়?’ অথচ কলেজ পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষেই সেই মেয়েটিকে আমি অন্তরঙ্গ অবস্থায় কোন একটি ছেলের সাথে দেখেছিলাম। এখন সেই জাজমেন্টাল মেয়েটি আরেকজনকে বিয়ে করে সংসার করছে। হয়তো সে নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছে সে ভুল ছিল কিংবা এখনও অন্যের জীবন নিয়েই তার আগ্রহ! আমরা বাঙালিরা বদ, বিনা পারিশ্রমিকে যেভাবে মানুষজনের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে উৎসাহের সাথে মন্তব্য, সমালোচনা, জাজমেন্ট শোনাতে পারি তা অবিশ্বাস্য।

কোন নারীর বিয়ে কয়টা হয়েছে, কে কতোটা প্রেম করেছে, কার সাথে কার প্রেম ছিল, কোন নারী সিগারেট খায়, কোন নারী একাধিক পুরুষের সাথে চলাফেরা করে, কোন নারী চাকুরী শেষে সন্ধ্যে বাড়ি ফিরে, কোন নারী কোন ধরণের পোশাক পরিধান করে থাকে, কোন নারী লেসবিয়ান ইত্যাদি বিষয়াদি নিয়ে আমরা যে পরিমাণ সময় ব্যয় করে থাকি, তার অর্ধেক শংতাংশ সময় যদি মানুষকে ভালোবাসার কাজে ব্যয় করে থাকতাম তাহলে আমাদের মধ্যে ঘৃণা, বিদ্বেষ এবং হিংসা অনেকটাই কমে যেতো।

বিশ্বাসঘাতকের কারণে নিজের জীবনকে মাটির নিচে বিসর্জন দেওয়া আমি সমর্থন করি না। কবি গোস্বামীর মতো করে বললে, ‘প্রতিটি প্রত্যাখ্যানই আসলে একটা করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি’।

শরীর কোন অস্পর্শনীয় পবিত্র কিছু নয়, ভার্জিন থাকাও মহৎ কিছু নয়। এগুলো সবই পুরুষতন্ত্রের প্রোপাগান্ডা। শরীরের সাথে শরীরের মিলনেই নিত্যনতুন শিল্পকলার সৃষ্টি হয়। কোন শরীর একাধিক মানুষ দেখলেই তা অপবিত্র হয়ে যায় না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

58 + = 61