রেন্টালের সাতকাহন

রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো আমাদের অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে। এই কথা অনেকদিন থেকেই আমরা বলে আসছি। এই কেন্দ্রগুলোর স্থাপন ব্যয় বেশি। এগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় চড়া দামে। এগুলোতে ভর্তুকি মূল্যে তেল সরবরাহ করা হয়। যন্ত্রপাতি পুরনো হওয়ায় এই কেন্দ্রগুলো তেল টানে বেশি। ফলে ব্যয় বাড়তেই থাকে। এই কেন্দ্রগুলো করতে কোনো টেন্ডার হয় না। বোঝাই যায়, এতে সরকার সংশ্লিষ্টদের আয় রোজগারের ব্যবস্থা হচ্ছে ভালো মতোই।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকারের কোনো জবাব ছিল না। একটা জবাবই তারা দিয়ে এসেছে। আমাদের বিদ্যুতের ঘাটতি আছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলতে ২/৩ বছর সময় লাগে। এই সময়ে বিদ্যুৎ সঙ্কট সামাল দেয়ার জন্যই রেন্টাল আনা হয়েছে। রেন্টাল স্থাপনে ৩ মাসের মতো সময় লাগে। পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভাড়ায় বা কিনে এনে বসিয়ে দেয়া হয়। সরকার বলেছিল, দ্রুত বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতেই রেন্টাল আনা হচ্ছে। এগুলো হবে সাময়িক। নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো গড়ে তোলার মধ্যবর্তীকালীন সময়ে অর্থাৎ ৩ বছর এগুলো চলবে।

আমরা রেন্টালের সমর্থন করি না। বিকল্প ফর্মুলা আমাদের হাতে আছে। সেই আলাপে পরে যাই। প্রথমে ধরে নিলাম, ৩ বছরের জন্য রেন্টাল দরকার। এবার দেখে নেই সরকার কি করছে। সরকার কোয়ান্টাম পাওয়ারের নোয়াপাড়া ১০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সঙ্গে ৫ বছরের চুক্তি করেছে। দেশ ক্যাম্ব্রিজের কুমারগাঁও ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সঙ্গে চুক্তি করেছে ১৫ বছর মেয়াদি। এরকম আরো আছে। শুধু তাই না। যে কেন্দ্রগুলো ৩ বছর মেয়াদি ছিল সেগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। মেয়াদ বাড়াতে গিয়ে আগের চেয়ে বেশি ব্যয় পড়ছে সব কিছুতেই। যদিও হওয়ার কথা ছিল উলটো।

একটা উদাহরণ দেয়া যাক। এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার প্রজেক্টের খুলনা ৪০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের সঙ্গে তিন বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরো এক বছর তিন মাস বিদ্যুৎ কেনার জন্য ২৩ অক্টোবর, ২০১১ নতুন চুক্তি করে পিডিবি। তিন বছরে পিডিবি ওই কেন্দ্রটির জন্য জ্বালানির মূল্য বাবদ ১৪৮ কোটি ৪৭ লাখ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছিল। কিন্তু নতুন চুক্তিপত্রে এক বছর ৩ মাসের ব্যয় ধরা হয় ৫০০ কোটি টাকা। যা কিনা দ্বিগুণেরও বেশি। এর কারণ হচ্ছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির যন্ত্রপাতি পুরনো হওয়ায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর তেলের চাহিদা বেড়ে গেছে। হিসেবের চেয়ে বেশি তেল টানছে এটি। ফলে সরকারের ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ।

এ থেকে স্পষ্ট হয় রেন্টালের মেয়াদ বাড়ানোটা বিপজ্জনক। পাশাপাশি সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল এগুলো হবে তিন বছর মেয়াদি, সাময়িক। সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাও বটে। সরকার শুধু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে না। রেন্টাল নিয়ে তুঘলুকি সব কায় কারবার চালাচ্ছে। একদিকে নিজের ঘনিষ্ঠদের কেন্দ্রগুলো চালু রাখা হচ্ছে মেয়াদ শেষ হলেও। অন্যদিকে মেয়াদ বাড়ানোর জন্য চলছে বিশেষ কমিটির কাজ।

বর্তমানে সরকারের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ আছে রেন্টাল ৩ বছর মেয়াদি ১০টি, ৫ বছর মেয়াদি ২ টি এবং ১৫ বছর মেয়াদি ৩টি। অন্যদিকে কুইক রেন্টাল ১৪টি ৩ বছর মেয়াদি ও ৩টি ৫ বছর মেয়াদি। এই মোট ৩২টি কেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে চালুর তারিখ ধরে হিসেব করলে ৬টি কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ। যার মধ্যে মাত্র ১টি কেন্দ্রকে বন্ধ দেখানো হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ বলে।

আশুগঞ্জ ৫৫ মেগাওয়াট ৩ বছর মেয়াদি রেন্টাল কেন্দ্রটি চালু হয় ০৭ এপ্রিল, ২০১০। হিসেব অনুযায়ী এই কেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ। কিন্তু পিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদন তালিকায় দেখা যায়, ২৭ জুন এই কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। কেন্দ্রটি প্রিসিশন এনার্জি লিমিটেডের। অন্যদিকে শিকলবাহা ৫৫ মেগাওয়াট ৩ বছর মেয়াদি রেন্টাল কেন্দ্রটি চালু হয় ৬ মে, ২০১০। এই কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে না। চুক্তি শেষ হয়ে গেছে বলা হচ্ছে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এনার্জিস পাওয়ার করপোরেশনের। এটা কেন হচ্ছে, তার কোনো উত্তর থাকলেও তা সদুত্তর হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। স্পষ্টতই এটা বেআইনি।

এর চেয়েও বড় বেআইনি কাজটা সরকার করার চেষ্টা করছে খুব গোপনে। দ্রুতই রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের বিবর্তন ঘটাতে যাচ্ছে তারা। বর্তমান সরকার মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে গেছে। নতুন সরকার এলে অনেক রেন্টাল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এসব বিবেচনা করে বড় রেন্টাল ব্যবসায়িদের সুরক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে।

নানা ধরণের সুবিধা দেয়ার পর এখন সব দায় থেকে মুক্ত করে রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে স্বাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারের (আইপিপি) আদলে এসব কেন্দ্র থেকে ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদে বিদ্যুৎ কেনার পরিকল্পনা চলছে। যার মূলনীতি হবে বিদ্যুৎ নেই, বিল নেই।

এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গত এপ্রিলে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোফাজ্জেল হোসেনকে প্রধান করে আট সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি ঠিক করবে কোন কোন কোম্পানি এই বিশেষ সুবিধা পাবে। অর্থনীতিবিদ, জ্বালানী বিশেষজ্ঞ ও আমরা যারা বিদ্যুৎ, গ্যাস, জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন করছি, সবার মতেই রেন্টালের এই স্থায়ীকরণ হবে আত্মহত্যার শামিল।

কিসের ভিত্তিতে বলছি? এবার সেই হিসেবগুলো একটা একটা করে দেই। কথা ছিল রেন্টালের তিন বছরের মধ্যে সরকার নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলবে। সেগুলো উৎপাদনে এলেই বাতিল হবে রেন্টাল। কিন্তু বর্তমান সরকার একটাও বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শেষ করতে পারেনি। কেন? সরকার বলছে, টাকা নেই।

সরকার ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৬টি বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করতে পারছে না। এজন্যই বড় পুকুরিয়া ২৫০ মেগাওয়াট, ঘোড়াশাল ৩০০-৪৫০ মেগাওয়াট, বিবিয়ানা ৪৫০ মেগাওয়াট, শাহজীবাজার ৩০০ মেগাওয়াট, আশুগঞ্জ ৪৫০ মেগাওয়াট এবং সিরাজগঞ্জ ৪৫০ মেগাওয়োট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালকে লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নির্ধারণ করলেও এখনো কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

টাকা যাচ্ছে কোথায়? প্রতি বছরই তো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার ছড়াছড়ি। আসুন দেখি, টাকা কোথায় যাচ্ছে। এ বছর প্রথম প্রান্তিকে সরকার পিডিবিকে ভর্তুকির যে টাকা দিয়েছিল সরকার তার পুরোটা রেন্টালে দিতে নির্দেশ দিয়ে দেয় অর্থ মন্ত্রনালয়। ৫০৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ছাড়ের শর্ত ছিল, ১৫টি রেন্টাল ও ১৭টি কুইক রেন্টালের বিল পরিশোধ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এ অর্থ ব্যবহার করা যাবে না।

বিদ্যুৎ খাতে কি পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছি আমরা? তা যাচ্ছে কোথায়? পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে প্রতিবছর ভর্তুকির প্রায় শতভাগই যাচ্ছে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। গত অর্থবছরে (২০১২-১৩) রেন্টালে ব্যয় হয়েছে ভর্তুকির ৯৯ দশমিক ৮২ শতাংশ অর্থ। ৫ হাজার ১৭২ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয় গত বছর।

শুধু কি তাই? আরো আছে। একটা হিসাব দেই। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছিল ৩৩ লাখ মেট্রিক টন। আমাদের গড় চাহিদা তখন পর্যন্ত ৩০ লাখের একটু এদিক ওদিক। তখন মাত্র তিনটি রেন্টাল চালু হয়েছিল। ২০০৯ থেকে বর্তমানে দেশে জ্বালানির চাহিদা গড়ে ৬০ লাখ মেট্রিক টন। তেলের চাহিদার কেন্দ্রে আছে ডিজেল- ৩৮ লাখ মেট্রিক টন। এরপরই ফর্নেস অয়েল- ১৫ লাখ মেট্রিক টন। তেলের চাহিদা এক বছরে দ্বিগুণ হলো কেন? রেন্টালের কারণেই।

ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কারণে কিনে আনতে হচ্ছে প্রচুর পরিমাণ তেল। যা প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টনের কাছাকাছি। আর যেহেতু আমাদের মাত্র ১৩ লাখ মেট্রিক টন তেল শোধনের ব্যবস্থা আছে তাই কম দামে অপরিশোধিত তেল কেনার সুযোগ নেই। পরিশোধিত তেল কিনতে হয় চড়া দাম দিয়ে। গত বছর ১৫ হাজার ২৩০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয় জ্বালানির জন্য। স্বাভাবিকভাবেই অর্ধেকের বেশি টাকা গেছে রেন্টালে। এ থেকে দেখা যায় শুধু গত বছরেই বিদ্যুৎ ক্রয় ও তেলে ভর্তুকি বাবদ সরকার রেন্টালে গচ্চা দিয়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।

রেন্টালে একটা কথা খুব চালু। চললে লাভ, না চললে বেশি লাভ। রেন্টালের সঙ্গে সরকারের চুক্তিগুলো এমনই। রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চললে সরকার তার কাছ থেকে চড়া দামে বিদ্যুৎ কিনবে। চড়া দামটা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৬ টাকা প্রতি ইউনিট। যেখানে আমরা কিনি ৪ টাকা দরে। আর যদি কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকে তাহলে ওই একই দাম তাকে পরিশোধ করতে হয়।

অবাক হচ্ছেন? পরিসংখ্যান দেখেন একটা। দেশ এনার্জি লিমিটেডের ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গত বছরের এপ্রিলে ২৮ দিন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ওই মাসে উৎপাদন চালু থাকা দুই দিনের মধ্যে ২২ এপ্রিল সন্ধ্যার পর ৫১ মেগাওয়াট ও ২৬ এপ্রিল দিনে ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় কেন্দ্রটিতে। এ সময় পিডিবি বিদ্যুৎ কিনেছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৪৮০ ইউনিট। আর দেশ এনার্জিকে মাসিক বিল পরিশোধ করেছে ১৬ কোটি ১৪ লাখ ৮৪ হাজার ৮৫৫ টাকা।

অর্থাৎ কেন্দ্রটি থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে পিডিবির ব্যয় হয়েছে ৩৭৩ টাকা ৩৯ পয়সা। চুক্তি অনুযায়ী এর মূল্য ১৩ টাকা ৩৩ পয়সা। গত বছরের নভেম্বরেও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়েছে ৯৮ টাকা ৬২ এবং ডিসেম্বরে ৬৩ টাকা ২০ পয়সা। এ বছরের জানুয়ারিতে পড়েছে ৫০ টাকা ৮৬ পয়সা। এই দেশ এনার্জি লিমিটেডের মালিক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আনিসুল হক। তাহলে টাকা কোথায় যায় হিসেবটা কি মিললো?

এবার আসি আরেকটা প্রশ্নে- এতসব ক্ষতি জেনেও সরকার কেন এই পথে হাঁটছে? উত্তরটা পরিষ্কার। আমাদের দেশে বড় বড় অনেক সিদ্ধান্ত আসে উন্নত দেশগুলো থেকে। তারা চায় আমরা তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকি। আমদানি বেশি করি। এতে তাদের ব্যবসা ও ক্ষমতা দুটোই সুসংহত হয়। এজন্য তারা আমাদের যে কোনো ঋণ বা সহযোগিতা দিতে গেলে কিছু শর্ত আরোপ করে। এর মধ্যে মূল শর্তটা হচ্ছে বেসরকারিকরণ ও ভর্তুকি প্রত্যাহার। এই দুটো করলেই অনুন্নত একটি রাষ্ট্রকে সহজে বেঁধে ফেলা যায়। এই কাজটা করে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের মতো নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা।

একটা উদাহরণ দেই। দোহা এজেন্ডা অনুযায়ী বাংলাদেশ কৃষিতে ৫ শতাংশের বেশি ভর্তুকি দিতে পারছে না। অথচ যুক্তরাষ্ট্র নিজে কৃষিতে ১৯ শতাংশের বেশি ভর্তুকি দিয়ে তাদের কৃষি ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দিচ্ছে। এতে আমাদের পণ্যের দাম বেশি পড়ছে। ওদেরটা পড়ছে কম। তারা বিশাল শিল্পোন্নত দেশ। তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা উন্নত ও বড়। ভর্তুকি দিলে তাদের উৎপাদন ব্যয় আরো কমে যায়। আমাদের উৎপাদিত অনেক পণ্যই সেই তুলনায় বেশি খরুচে। বাজারে টিকতে হলে তাই আমাদের ভর্তুকি দিতেই হবে।

বিদ্যুতে ভর্তুকি দিলে বিদ্যুতের দাম কম থাকে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কাজ করলে তার কাজে বা উৎপাদনে গতি আসে। তার আয় বাড়ে, সক্ষমতা বাড়ে। কিন্তু এই খাত যদি বেসরকারিকরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে তাহলে আবার এই সুবিধাটা নষ্ট হয়। বেসরকারিকরণ মানেই অধিক মূল্য। আর প্রান্তিক মানুষের আরো চাপের মধ্যে পড়া।

গত এক দশকে বাংলাদেশকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নানাভাবে চাপ দিয়ে আসছে, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি শূণ্যে নামিয়ে আনতে। সরকার সেই মোতাবেক বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে ক্রমাগত। দাতা সংস্থার আরেকটা দাবি ছিল, এই খাতকে বেসরকারি খাতে দেয়া। সরকার সেই কাজটাও করছে। ১৯৯৬ সালে যখন ব্যক্তি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয় তখন সরকারের নীতি ছিল, ব্যক্তি খাতে মোট উৎপাদনের শতকরা ২৫ ভাগের বেশি হবে না। কিন্তু বর্তমানে ব্যক্তি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে মোট উৎপাদনের শতকরা ৬০ ভাগের কাছাকাছি। বিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক সবগুলো উদ্যোগই সরকারি খাতের বিপক্ষে যাচ্ছে। সরকারি সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে। কমছে তার উৎপাদন ক্ষমতা।

সরকার যে বিদ্যুৎ খাতকে পুরোপুরি বেসরকারি করে দিতে চায় এটা স্পষ্ট হয়েছে ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৬ নং ইউনিটটি সারানো সংশ্লিষ্ট জটিলতা থেকে। ঘোড়াশালের ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৬ নং ইউনিটটি বন্ধ আছে ১৮ জুলাই ২০১০ থেকে। এ কেন্দ্রের আরো দুটি ইউনিট এখন বন্ধ। রাশিয়ান কোম্পানি টেকনোপ্রম এক্সপোর্ট এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করে।

প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকা ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৬ নং ইউনিটটি আজো চালু হয়নি। দায়িত্বরতদের অবহেলায় নষ্ট হওয়া এ কেন্দ্রটি সারানোর জন্য গত বছর দরপত্রে অংশ নেয়া টেকনোপ্রম এক্সপোর্ট ২৭ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি অর্থ দাবি করেছে। বাংলাদেশি টাকায় যা ২৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি। একই দরপত্রে অংশ নেয়া ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্বাতী এনার্জি দাবি করেছে ৭০ মিলিয়ন ডলার।

টেকনোপ্রম এক্সপোর্টকে দিয়ে ২৫০ কোটি টাকা খরচ করে ঘোড়াশালের ৬ নং ইউনিটটি সারানো হলে ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। এতে প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুতের স্থাপন ব্যয় পড়ত ১ কোটি ২০ লাখ টাকার কাছাকাছি। কিন্তু সরকার এ দরপত্র ভণ্ডুল করে দিয়েছে। সরকার বেসরকারি খাতে ভাড়াভিত্তিক নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যাতে কিনা প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুতে স্থাপন ব্যয় কোনোক্রমেই ৮ কোটি টাকার কম নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটা ১০ কোটি টাকারও বেশি। এর বাইরে অন্যান্য ব্যয় তো আছেই।

এই গেল রেন্টালের বর্তমান হালচাল ও তার পরিণতির হিসাব নিকাশ। এবার আসি আমাদের ফর্মুলায়। আসলে কি করা যেত। কি করলে এই খাত এখন একটা স্থির অবস্থায় পৌঁছাতে পারতো। একটি স্বচ্ছ হিসেব করে দেখা যাক। সরকারের মেয়াদের শুরুতে অর্থাৎ ১ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ৮৮২ মেগাওয়াট। উৎপাদন ক্ষমতা ছিল সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এ পর্যায়ে এসে প্রায় সাড়ে ৪ বছর পর গত ২৭ জুন, ২০১৩ বিদ্যুতের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট। উৎপাদন ক্ষমতা এখন ৮ হাজার ৫৬৫ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।

দেখা যাচ্ছে উৎপাদন ক্ষমতা সাড়ে ৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন হয় সর্বোচ্চ ৬ হাজার মেগাওয়াট বা এর কিছু কম-বেশি। অর্থাৎ এ সরকারের আমলে ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির বিপরীতে উৎপাদন আসলে বেড়েছে ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৮৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রাপ্তির চুক্তি হলেও তা থেকে গড়ে পাওয়া যাচ্ছে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। ২৭ জুন রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল থেকে পাওয়া যায় ১ হাজার ৪৮৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সরকারের নতুন ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের মধ্যে রেন্টাল থেকে আসছে দেড় হাজার মেগাওয়াট আর বাকি ৭০০ মেগাওয়াট অন্যান্য খাত থেকে।

দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন ক্ষমতা ৪ হাজার মেগাওয়াট বাড়লেও বাস্তবে উৎপাদন ততটা বাড়ছে না। এর কারণটা মূলত সরকারের নীতির মধ্যেই। রেন্টাল ও কুইক রেন্টালকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে সরকার তার নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালাতে পারছে না। রেন্টাল ও কুইক রেন্টালে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির সব টাকা দিতে বাধ্য থাকায় সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছে না। ২৭ জুন জ্বালানি সঙ্কটের কারণে ৯৯১ মেগাওয়াট এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ১ হাজার ৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল। এর বাইরে ৩৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সিস্টেম লস ও অন্যান্য কারণে পাওয়া যায়নি। পিডিবির এই হিসেবের বাইরেও কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে। মেরামত হচ্ছে না বলে এগুলোকে এখন আর গোনায় ধরা হচ্ছে না।

এ হিসেবে দেখা যায় উৎপাদন ক্ষমতার তুলনায় উৎপাদনে ঘাটতি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে রেন্টাল থেকে ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। বাকিটা যাচ্ছে সরকারের ঘাড়ের ওপর দিয়ে। সরকার রেন্টাল থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেতে নিজের ২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। বাতিলের খাতায় রেখেছে আরো ৮০০ মেগাওয়াটের মতো। বিশেষজ্ঞ হিসেব অনুযায়ী ১ হাজার কোটি টাকা হলেই পিডিবির পুরনো কেন্দ্রগুলো মেরামত করে পাওয়া যেত প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। আর গ্যাস সরবরাহ পর্যাপ্ত হলে পাওয়া যেত আরো ৭০০ মেগাওয়াট।

গ্যাস সরবরাহে সরকার বেসরকারি খাতকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু পিডিবিকে এক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হলেই লাভ বেশি। পরিসংখ্যান বলে, সরকারি খাতের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটে খরচ পড়ে ২ টাকা ৯০ পয়সা। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে এ খরচ গড়ে ৪ টাকা ৮০ পয়সা। যেমন রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আর পি সি এল) মালিকানাধীন ময়মনসিংহ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে উৎপাদন ব্যয় পড়ে সাড়ে পাঁচ টাকারও বেশি। এ হিসেবে সরকারের উচিত ছিল যে কোনো মূল্যে পিডিবির বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু সরকার তাতে আগ্রহী নয়।

সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ২ হাজার মেগাওয়াট। এখন ঘাটতি আড়াই হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। অর্থাৎ এত ঢাক ঢোল আসলে আমাদের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটায়নি। বরং রেন্টালের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিহীন করা হয়েছে। লুটপাট করেছে সরকার সংশ্লিষ্ট কিছু লোক। তাদের মুনাফা বেড়েছে। আর বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে এখন বিদ্যুৎ বিল দিতে গিয়ে। এখানেই থামছে না তারা। রেন্টালকে দীর্ঘমেয়াদি করা হচ্ছে আরো লুটপাট করার জন্য। বিদ্যুতে সরকারি খাতকে এভাবে তারা ধ্বংস করেছে। রেন্টালের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারীরা জাতির যে ক্ষতিসাধন করেছে, সেজন্য তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোটা আজ দেশপ্রেমিকদের কর্তব্য।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২০ thoughts on “রেন্টালের সাতকাহন

  1. এ সম্পর্কিত এই লেখাটা পড়ে
    এ সম্পর্কিত এই লেখাটা পড়ে দেখতে পারেন, যা প্রায় এক বছর আগে লেখা হয়েছিল…
    “বিপর্যস্ত জ্বালানী খাত, সমাধান কেবলই বিকল্প জ্বালানী :: অমিত সম্ভাবনার জিওথার্মাল এনার্জি”
    http://www.mongoldhoni.net/alternative-energy-is-the-ultimate-solution-and-huge-prospects-of-geothermal-energy-in-bangladesh/

  2. তথ্য দিয়ে অনেক কিছুই প্রমান
    তথ্য দিয়ে অনেক কিছুই প্রমান করলেন আনিস ভাই!!
    তবে মানুষ বা ভোক্তাই বলতে পারে কি সুফল বা কুফল তাঁরা পাচ্ছে,
    দেখেন ঘোড়া কাউকে নিয়ে গেলও দোষ, খালি হাটাইলেও দোষ, এই হচ্ছে বাঙ্গালী/
    এতদিন কষ্ট করছি তাই ভাল? আজ একটা সমাধান করছে বলেই সব দোষ সরকারের?
    একটু নৈতিকতা বোধ থেকে মুল্যায়ন করুণ!!

  3. এসব রেন্টাল-ফেন্টালের মত
    এসব রেন্টাল-ফেন্টালের মত ধান্ধাবাজি করেও বিদ্যুতের সমস্যার কোন সমাধান হয় নাই। কিন্তু ধান্ধাবাজি আর কমিশন বাণিজ্য ঠিকই হয়েছে। সরকার যখন ক্ষমতায় আরোহন করে, তখন প্রধান সমস্যা ছিল বিদ্যুত। সেই বিদ্যুত সমস্যার স্থায়ী কোন সমাধানই হয় নাই।

    সরকারের গঠনমুলক সমালোচনা করলে সরকার সমর্থিত অনলাইন গালিবাজ বাহিনী আবার বলে এসব বলে যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় বাঁধা দিচ্ছি। আমরা নাকি সুশীল ছাগু। বামরা এসব বলে সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে। তাদেরকে বলি, ভাল কথা! তা ভাইজানেরা সরকারের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেগুলোর জবাব দিন। নাকি বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগ যারা করে, তারা হাসিনার আওয়ামীলীগের সমালোচনা করতে পারেনা। এটা বাহাত্তরের সংবিধানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে!

    1. সরকারের কাজ শুধু
      সরকারের কাজ শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা না। সবগুলো কাজই তাকে করতে হবে। অবশ্য সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজটা করতে পারলেও তো হতো। সেখানেও তো আপোস ছাড়া কিছু দেখি না।

  4. আজ রাত ০৯ টায় বাংলাদেশ
    আজ রাত ০৯ টায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড করেছে।
    সর্বকালের সর্বোচ্চ ৬৫৭৬ মেগাওয়াট উৎপাদনের রেকর্ড করেছে!!
    কুইক রেন্টাল ছাড়াকি এইটা সম্ভব ছিল?
    [আমি তথাকথিত সুশীল না, সাধারণ বাঙ্গালী অর্জনে উৎসব করি!!]

  5. বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই রেকর্ড
    বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই রেকর্ড করতে সরকারের গচ্চার হিসাবটা দেখলেন না? দেখবেন কেমনে? মোহর মেরে দেয়া হয়েছে তো!

    1. কারও দিকে সন্দেহের তীর ছুড়ার
      কারও দিকে সন্দেহের তীর ছুড়ার আগে নিজেরটা নিরাপদ কিনা ভেবে দেখা উচিৎ…
      যদি যুক্তি দিতে চান তবে ব্যক্তিগত আক্রমন কইরেন না!! ধন্যবাদ :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

  6. কুইক রেন্টাল কোন সুফল বয়ে
    কুইক রেন্টাল কোন সুফল বয়ে আনতে পারে না, সেটা এর শর্তসমুহ খেয়াল করলেই বুঝা যায়। বিদ্যুৎ আমাদের দরকার অবশ্যই এবং সরকার কুইক রেন্টালের পেছনে যেই পরিমাণ অর্থের হরিলুট চালিয়েছে তা দিয়ে স্থায়ীভাবে বিদ্যুৎ সমস্যার অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব ছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন, তাহলে কেন এই কুইক রেন্টাল প্রীতি? উত্তর খুব সোজা। লুটপাট।

  7. কুই রেন্টাল বিদ্যুৎ খাতের
    কুই রেন্টাল বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই খাতকে বেসরকারি ও বিদেশীকরণ করেছে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

37 − 33 =