সংবাদ প্রকাশে “আদিবাসী” শব্দ ব্যবহারে বাংলাদেশ সরকারের যত চুলকানী

সম্প্রতি সংবাদপত্রে “Indigenous” বা “আদিবাসী” শব্দ ব্যাবহার করায় “দ্যা ডেইলি স্টার” পত্রিকার বান্দরবান জেলার প্রতিনিধি(সাংবাদিক) সঞ্জয় কুমার বড়ুয়াকে আসামী করে একটি মামলার আবেদন করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট(আমলি) আদালতে মামলার আবেদন করা হয়েছে। ( http://www.banglatribune.com/country/news/531377/‘আদিবাসী’-শব্দ-ব্যবহার-করায়-সাংবাদিকের-বিরূদ্ধে?fbclid=IwAR2PrQpBOy-p3Gd8AMaJclPHFcRm5Z-x5gO7apH0daiT8bMNixXy9_at37U )

খাগড়াছড়ি পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো.মাছুম রানা এই আবেদন করেন। “থ্রী ইনডিজেনাস ভিলেস ফেইস ল্যান্ড গ্র্যাভিং” এই শিরোনামে সঞ্জয় কুমার বড়ুয়া “ডেইলি স্টার” পত্রিকায় ২৮ জুলাই একটি সংবাদ প্রকাশ করেন এবং সংবাদ প্রকাশে “ইনডিজেনাস” বা “আদিবাসী” শব্দ ব্যাবহার করায় সঞ্জয় কুমার বড়ুয়ার বিরুদ্ধে মূলত মামলার আবেদন করা হয়েছে। এসব কিছু ব্যাক্তি স্বীদ্ধান্ত থেকে উদ্ভব হচ্ছে না, উদ্ভব হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ইন্দন থেকে, সরকারী আমলাতন্ত্রের ইন্দন থেকে। কারণ বাংলাদেশ সরকার মনেপ্রাণে আদিবাসী বান্ধব নয়। যার কারণে দেশের ৪৫টির অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে আত্মপরিচয় লুকিয়ে দেয়া হয়েছে। সরকার আদিবাসীদের আত্মপরিচয়কে জোরপূর্বক হত্যা করে কখনো বানানো হয়েছে “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী” আবার কখনো “উপজাতি”!!! যা আদিবাসীদের অস্তিত্ব সংরক্ষনের স্বার্থে বৃহৎ প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাড়িয়েছে বাংলাদেশ সরকারের এই একমূখী আদিবাসী বিদ্বেষী স্বীদ্ধান্ত।

একটি জাতির পূর্ণাঙ্গ স্বকীয় অস্তিত্ব থাকা সত্বেও কিভাবে বাঃসরকার আদিবাসী পরিচয় বাধ্যতামূলক উৎখাত করে “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী” বা “উপজাতি” পরিচয় আদিবাসীদের উপরে চাপিয়ে দেয়(?) প্রশ্ন সাপেক্ষ। তাছারা আদিবাসীদের পরিচয় ঠিক করে দেয়ার উনি(বাঃ সরকার) কে??? বাংলাদেশ সরকারের আদিবাসীদের উপর এহেন দৃষ্টিভঙ্গী কী গণতন্ত্র বিরোধী ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করা নয়!!?? একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে আদিবাসীরা কেন তাদের স্বাতন্ত্র পরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারবে না(?) কেন আদিবাসীরা তাদের নিজ পরিচয়ে বাঁচতে পারবে না??? ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করা গণতান্ত্রিক নামধারী বাংলাদেশ আজ অবদি “সংবিধানে” আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়নি। সবকিছুতেই গণতন্ত্রের নামে অগণতান্ত্রিক চর্চায় আদিবাসীদের রাখা হয়েছে অধিকারহীন ও স্বাধীনতা বঞ্চিত করে। এখনো পাহাড়ে আদিবাসীদের চরম আতংক ও ভয়ের নাম হয়ে আছে “সেনাবাহিনী” ও “সেটেলার বাঙালী” শব্দ দুটি। তার কারণ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সমতল তথা পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের উপর যেসব নৃসংশ হত্যাকান্ড, নিপীড়ন, নির্যাতন, শোষন, বঞ্চনা চালানো হয়েছিলো তার সবটাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ৮০’র দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ করা সেটেলার বাঙালী কতৃক। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর আদিবাসীরা রাষ্ট্র কতৃক নিপীড়ন, নির্যাতনের শিকার। আদৌ পর্যন্ত আদিবাসীরা তার বাইরে নয়। বর্তমানেও বিভিন্ন আঙ্গিকে সেনাবাহিনী ও সেটেলার বাঙালী কতৃক আদিবাসীদের  উপর নির্যাতন,নিপীড়নের তাপমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর নৃসংশভাবে হত্যার শিকার হচ্ছে অগনিত আদিবাসী নারী ও শিশু, কখনো সেনাবাহিনী কতৃক আবার কখনো সেটেলার বাঙালী কতৃক। এসবের কোন বিচার হয়না, সম্পূর্ণ বিচার বহিঃর্ভূত! আর এসবের প্রতিবাদ করতে গেলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ কতৃক আদিবাসীদের চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দীর্ঘ দুই যুগের অধিক রক্তক্ষয়ী স্বশত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তথসময়ের ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(আদিবাসীদের পক্ষে) মধ্য “পার্বত্য চুক্তি” স্বাক্ষরিত হয়। যে চুক্তির মধ্য নীহিত ছিলো আদিবাসীদের স্বাধীনভাবে মৌলিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। কিন্তু আদিবাসীদের সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল, বাস্তবরূপের সন্ধান পাওয়া গেলনা। আজ ২২টি বছরের অতিক্রান্তেও সরকার “পার্বত্য চুক্তি”র মৌলিক ধারাগুলোর একটিও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেনি। উল্টো একের পর এক আদিবাসী স্বার্থ ও চুক্তি পরিপন্থী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলেছে বাংলাদেশের বর্বর আওয়ামীলীগ সরকার।

এদেশে(বাংলাদেশে) সত্যর জয় হয়না, জয় হয় মিথ্যার! কারণ বাংলাদেশ সত্য বলা ন্যায়ের পক্ষে নয়। সত্য বলা এবং স্বীকার করার সাহস বাংলাদেশের নেই। সঞ্জয় কুমার বড়ুয়া সত্য লিখতে গিয়ে হয়ে গেলেন সংবিধান বিরোধী আসামী, যার কারণে তাকে মামলা খেতে হলো সোনার বাংলা গড়ার কারিগর মো. মাছুম রানাদের হাতে!!!

সম্প্রতি কাশ্মিরী ইস্যুতেও বাংলাদেশের বেশ কিছু কত্তর মানবতাবাদী নাক, কান, গলা সবকিছুই ফাটাচ্ছেন। কাশ্মিরীদের জন্য বাংলাদেশের মানবতা একেবারে উঠলে পরার মতন। যে মানবতার কোন অভাব নেই। এর আগেও আমরা দেশের কত্তর মানবতা দেখেছি রোহিঙ্গা ইস্যুতে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সেনা শাসন বহাল এবং রাষ্ট্রীয় হীন দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে,  প্রতিনিয়ত যে কেননা কোনভাবে আদিবাসীদের নির্যাতন, নিপীড়ন করা হচ্ছে তার দিকে দৃষ্টিপাত করে বা ক’জনই!!! কাশ্মীর আর পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্য পার্থক্যর সমীকরন কোথায়??? কাশ্মীরের জন্য যদি নাক, কান, গলা ফাটিয়ে ফেলা সম্ভব হয় তবে বাংলাদেশের একটি অংশ “পার্বত্য চট্টগ্রামের” জন্য কেন নয়!!!???

পরিশেষে, ভাই সঞ্জয় কুমার আপনি সত্য তুলে ধরতে পারবেন না। সত্য তুলে ধরেছেন তো আপনাকে এভাবে মামলা খেতে হবে, মামলায় কাজ না হলে হামলা খেতে হবে। এই বর্বর দেশে সত্য বলা মহাপাপ। আমি যে এই লেখাগুলো লিখছি, ভয় হয় আমারও। না জানি কখন যে আমাকেও রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমা লাগিয়ে দিয়ে মামলা খেতে হয়, হামলা খেতে হয়। তবে ভয়ে বা অন্যায়ের স্বার্থে বসে থাকার সময় এখন নেই। কলম চলবে সদা সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের সন্ধানে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1