পৃথিবীর বিখ্যাত কবি, হেনরিক হাইনের কবিতা সামগ্রী – অনুবাদ, হুমায়ুন আজাদ এবং অন্যান্য।

—- ফুলেরা জানতো যদি

ফুলেরা জানতো যদি আমার হৃদয়
ক্ষতবিক্ষত কতোখানি,
অঝোরে ঝরতো তাদের চোখের জল
আমার কষ্ট আপন কষ্ট মানি ।
নাইটিংগেল আর শ্যামারা জানতো যদি
আমার কষ্ট কতোখানি-কতোদুর,
তাহলে তাদের গলায় উঠতো বেজে
আরো ব হু বেশী আনন্দদায়ক সুর ।
সোনালী তারারা দেখতো কখনো যদি
আমার কষ্টের অশ্রুজলের দাগ,
তাহলে তাদের স্থান থেকে নেমে এসে
জানাতো আমাকে সান্ত্বনা ও অনুরাগ ।
তবে তারা কেউ বুঝতে পারেনা তা-
একজন,শুধু একজন,জানে আমার কষ্ট কতো;
আমার হৃদয় ছিনিয়ে নিয়েছে যে
ভাংগার জন্য-বারবার অবিরত ।

—- ভাগ্য এক রূপজীবী

ভাগ্য এক রূপজীবী
সে কখনো থাকে না স্থির;
কপালে চুলের স্পর্শ দিয়ে
পালায় সহসা চুমু খেয়ে।
দুর্ভাগ্য চলে বিপরীতে
ভালোবেসে কাছে টেনে বলে,
তার কোনো তাড়া নেই
বিছানায় বসে থাকে
তোমার পাশে।

—- তুমি হাতখানি রাখো

প্রিয়তমা, তুমি হাতখানি রাখো আমার গুমোট বুকে।
শুনতে পাচ্ছো শব্দ? কে যেনো হাতুড়ি ঠুকে চলছে?
সেখানে এক মিস্ত্রি থাকে,যে বানিয়ে চলেছে
এক শবাধার ।
কার জন্যে জানো?—– আমার, আমার ।
উল্লাসে বিদ্বেষে নিরন্তর সে হাতুড়ি
ঠুকছে দুই হাতে,
কিছুতে ঘুমোতে পারছিনা আমি,
দিনে কিংবা রাতে।
মিস্ত্রি, দ্রুত করো, তুমি কাজ
শেষ করো তাড়াতাড়ি,
যাতে আমি অবশেষে শান্তিতে ঘুম যেতে পারি।

—- আমার অশ্রু

আমার অশ্রু এবং কষ্টরাশি থেকে
ফুটে উঠে ফুল থরে থরে অফুরান,
এবং আমার দীর্ঘশ্বাসে
বিকশিত হয় নাইটিংগেলের গান ।
বালিকা, আমাকে যদি তুমি ভালোবাসো,
তোমার জন্য সে ফুল আনবো আমি—
এবং এখানে তোমার দ্বারের কাছে
নাইটিংগেলেরা গান গাবে দিবাযামি ।

—- আহ! আবার সেই চোখগুলো

আহ! আবার সেই চোখগুলো,
যা আমায় ভালোবেসে ডাকতো।
এবং ফের সুমধুর করত
আমার জীবন।
সেই কণ্ঠস্বরও এসেছে আবার,
যা আমি ভালোবেসে শুনতাম।
শুধু আমি সেই আমি নই,
রূপান্তরিত হয়ে ফিরেছি ঘরে।
দুধসাদা সেই বাহুডোর
আমাকে করতো দৃঢ় আলিঙ্গন,
এখনো আমি আছি তার হৃদয়ের মাঝে,
আছি অনুভূতিতে, ভগ্নহৃদয়, নিষ্প্রাণ।

—- পুরানো গোলাপ
একটা গোলাপকুঁড়ি ছিল
যার জন্য উদ্ভাসিত এ হৃদয়;
বেড়ে ওঠে সে অপরূপ পুষ্প।
সে ছিলো আশ্চর্য গোলাপ,
আর আমি চেয়েছি তাকে ছিন্ন করতে।
সে জানত, আমার আদরের বিনিময়ে
কাঁটা বিঁধিয়ে দিতে।
এখন সে যেখানে ক্ষত করে, ছিন্নভিন্ন করে
বৃষ্টি আর বাতাসে ভেসে আঘাত করে—
প্রিয়তম হাইনরিশ এখন,
প্রণয়ভরে সে আসে আমার মুখোমুখি।
হাইনরিশ সামনে, হাইনরিশ পেছনে
শুনতে যেন সুমধুর শোনায়।
এই গায়ে বিঁধেছে তোমার কাঁটা,
এটা কী তোমার ধারালো চিবুক!
উপরের লোমগুলো বেজায় শক্ত,
যা তোমার থুতনিকে করে অলংকৃত-
আশ্রমে যাও, ওহে প্রিয় শিশু
অথবা মুণ্ডন করবে তোমায়।

—- আমি যখন তোমার দিকে তাকাই

আমি যখন তোমার চোখের দিকে তাকাই
বিলীন হয়ে যায় আমার যত দুঃখ-কষ্ট;
আমি যখন তোমার মুখে চুমু খাই,
আমি তখন হয়ে উঠি পুরোপুরি সুস্থ।
আমি যখন তোমার বুকে চেঁপে থাকি
স্বর্গীয় লিপ্সা নামে আমার উপর;
যখন তুমি বল : আমি তোমায় ভালোবাসি
মর্মভেদী কান্না আসে আমার।

—- শীতল হৃদয়ের বিমর্ষ অনুভূতি

শীতল হৃদয়ের বিমর্ষ অনুভূতি
বিষণ্নতায় অসাড় পৃথিবীকে দেখি,
হেমন্তের শেষেও, একবিন্দু শিশির
মৃত এই অঞ্চলকে রাখে ঢেকে।
বাতাস শিষ দেয়, এদিক ওদিক ছোটে
লাল পাতা, যা ঝরে পড়ে দীর্ঘশ্বাসের মতো,
বাষ্পায়িত কেশহীন ভূমি,
এখন আসবে অতি অপ্রত্যাশিত বৃষ্টি।

—- স্বপ্নদ্রষ্টা

আমি স্বপ্নে দেখলাম কি শোকার্ত চোখে তাকিয়ে আছে চাঁদ
কি অদ্ভুত করুণ চাকচিক্য হীন ভাবে জ্বলছে নক্ষত্ররাশি
আমাকে নিয়ে যাও সেই শহরে যেখানে সুদর্শনাদের বাস,
সহস্র মাইল দূরে অন্ধকার থেকে আলোর ঝর্ণাধারায়।স্বপ্নশেষে আজ আমি তার ঘরের দুয়ারে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে
আমার ওষ্ঠে সেই পাথর ছুঁয়েছি যে পাথরের সিঁড়িবেয়ে
তার চঞ্চল চরণ দুখানি নৃত্যের ছন্দে উপরে উঠেছে
আর মসৃণ সান্ধ্য পোশাকের ঝালর স্পর্শ করেছে।শীতের হিমেল রাত ছিল দীর্ঘ শান্ত আর মৌনতায় ভরা
রাতের বাতাস ছিল মৌন, যেন হিমগিরির শীতল পাথর
জানালায় ফিকে আলোয় চোখেপড়ে ফ্যাকাসে মুখশ্রী,
চৌকাঠে হেলান দিয়ে চাঁদ ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক আগেই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

71 − = 61