জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-97

কৈশোরে একবার দুরের চরের জেলেপল্লীর বাজাারে গিয়েছিলাম ইলিশ কিনতে। পুরো গ্রামে রটে গিয়েছিল, নদী-তীরবর্তী দুরের ঐ বাজারে ইলিশ খুব সস্তা। সত্যিই ১০-টাকাতে বড় ডাউশ সাইজের ইলিশ পেলাম চারটে, মানে প্রতিটি আড়াই টাকা। মাছ কিনতে-কিনতে সূর্য ঢলে গেল। তাড়াতাড়ি কলাপাতায় জিলাপি কিনে তা খেতে খেতে রওয়ানা দিলাম বাড়ির পথে। নদীর তীর-ঘেঁষে অগ্রহায়ণের শুকনো বিলের ধানক্ষেতের পথ বেয়ে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গেল মাঝপথেই। জিলাপি খাওয়া শেষ করে নদীর জলে হাত ধুরে ফিরে দেখি, আমার মাছ চারটে নিয়ে টানাটানি করছে একটা কালো বিড়াল। তাকে লাথি দিয়ে সরানোর চেষ্টা করতেই বিড়ালটি দৌঁড় দিলো ধান ক্ষেতের ভেতর। পরক্ষণেই একটা কালো কুকুরে এলো মাছ কাড়াকাড়ি করতে। এবারো কুকুরটি তার দাঁত খিচে কামড়াতে চাইলো মাছ। ভ্রান্তি মনে করে আল থেকে একটা লাঠি তুলে তাড়াতে চাইলাম কুকুরটি। কুকুরটা দৌঁড় দিয়ে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। একটা কালো গরু শুয়ে রইলো আমার পুরো পথ আগলে। এবার সত্যি গা ছমছম করলো আমার। কেন যেন মনে হলো আমার মাছ নিতে বিড়াল, কুকুর আর গরু সবই সম্ভবত “মেছো ভুত” কিংবা “মেছো পেত্নী”! আমার বন্ধুরা প্রায় সবাই এসবে বিশ্বাস করলেও, আমি কখনো করিনি। তাই গরুকে পথে শোয়া রেখেই, এক দৌঁড়ে ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে আবার মুল পথে উঠে এসে হাঁটতে থাকলাম সামনে নদীজলের আবছা আলোছায়ায়।

:

এবার অন্ধকার নদীতীরে এক লাল শাড়ী পরা বউ সামনে দাঁড়ালো আমার। সাহসে ভর করে বললাম – “কে গো তুমি? কোন বাড়ি তোমাদের”? বউ কথা বললো না! অদৃশ্য হয়ে গেল মূহূর্তে। একটু পর অনুভব করলাম, আমার মাছ ধরে কে যেন টানাটানি করছে। পিছু তাকাতেই দেখলাম, ঐ বউরূপী নারীটি। ঝাকুনি দিলাম তাকে। কিন্তু মাছ ছাড়লাম না। কারণ আগেই বন্ধুদের কাছে শুনেছিলাম, মাছ ছাড়লে মাছ খেয়ে তারা মানুষকে ধরে. ঘাড় মটকায়! তাই মাছ আঁকড়ে হাঁটতে থাকলাম আমি দ্রুততর। সামনে পেছনে বউটি বিড়াল, কুকুর, গরু, মানুষরূপে কয়েকবার এলো। কিন্তু মাছ নিতে পারলো না আমার। বাড়ির খুব কাছাকাছি এলে বড় রাস্তায় উঠতে যাবো আমি, এমন সময় রাস্তায় শুয়ে কান্না জুড়ে দিলো বউটি। এই প্রথম কথা বললো সে তার নাঁকি গলায়। ফ্যাসফ্যাসে বললো – “দুদিন থেকে না খেয়ে আছি। তোমার মাছগুলো দিয়ে যাও আমায়। খুব ক্ষুধা পেয়েছে”।

:

এবার সাহস পেলাম আর মনটাও জলে মত গলে গেল আমার বউরূপী পেত্নীর দিকে তাকিয়ে। বললাম – “নে তবে, যা নিয়ে যা, বলে ৪-টা মাছই ছুঁড়ে দিলাম বউটির দিকে হাওয়ায়। ওমা! খপ করে একসাথেই চারটা মাছ মুখে নিলো হাওয়া থেকেই বউটি। বললাম – “এবার যা, আমার কোন ক্ষতি করার চেষ্টা করলে, বউগিরি ছুটিয়ে দেব তোর রে পেত্নী”। বউটি এবার নিজ-রূপে দৌঁড়ে এলো আমার সামনে। বললো – “দাদা তোমার কোন ক্ষতি করবো না আমি। বরং উপকার করবো মাছ ৪-টা দেয়ার কারণে। এ নারকেলটা নিয়ে যাও। এটা খেওনা, চারা করো। এটা এনেছি আমি জীনদের শহর থেকে। এটা লাগালেই ৪-বছরে নারকেল হবে। এবং এতো হবে যে, তা গুণে কুলকিনারা করতে পারবেনা তুমি”। নারকেলটা পায়ের কাছে রেখে চলে গেলে বউরূপী পেত্নীটি।

:

ঘরে ফিরতে রাত নটা বাজলো। মা বললো – “কই তোর মাছ রে ডুগডুগি”? নারকেলটা মায়ের হাতে দিয়ে বললাম – “এই নাও মাছের বদলে নারকেল”!

পুকুর ঘাটে ঝুনা নারকিলটি ভিজিয়ে রাখলে কদিনেই চারা বের হলো তার। খুব যত্নে বাড়ি সংলগ্ন রাস্তায় লাগালাম চারাটি। নিয়মিত সার আর জল দিলাম। এবং আমাকেসহ সবাইকে বিস্মিত করে ৪-বছরের ছোট চারা গাছটিতে মাটি ছুঁয়ে অনেক নারকেল ধরলো। সত্যি গুণে শেষ করতে পারলাম না কত সবুজরঙা নারকেল ধরলো ৪-বছরের গাছটিতে। মা শহরের স্টুডিও থেকে একদিন ক্যামেরাম্যান ডেকে আনালেন গাছের ছবি তুলতে। এবং নারকেলসহ ছবিতুলে তা টানিয়ে রাখলেন আমাদের বসার ঘরে।

:

খবর পেয়ে কৃষি অফিসের লোক এলো কৃষি প্রদর্শনীতে তারা তুলে নেবে এ গাছ। বিনিময়ে আমাকে দেবে “এত্তোগুলো টাকা”। কিন্তু টাকার চেয়ে গাছটাকে ভাল লাগতো আমার খুব। তাই রাজি হলাম না তাদের কথাতে। কিন্তু ৪/৫-দিন পর আর গাছটি পেলাম না আমি। রাতে কে বা কারা আমার ঘরের অদুরে লাগানো গাছটি রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়েছে। গাছটি হারিয়ে অনেক কাঁদলাম আমি। কিন্তু ঐ গাছটির আর কোন সন্ধান পাইনি। অনেক বছর পর ঢাকা ভার্সিটেতে পড়ার সময় বিশেষ প্রয়োজনে লাইব্রেরিতে একদিন ১৫/১৬ বছরের পুরনো খবরের কাগজ খুঁজতে গিয়ে একটা পেপারে চোখ আটকে গেলো আমার।

:

ঢাকার খামার বাড়িতে কৃষি প্রদর্শনীতে ১ম পুরস্কার পেয়েছে একটা ছোট নারিকেল গাছ, যাতে ধরেছে অগণিত নারিকেল। এ খামারের জার্মপ্লাজম সেন্টারের প্রধান কৃষিবিদ নিজ গবেষণায় আবিস্কার করেছে নাকি এ নারকেল গাছটি। এ নারকেল গাছ তার ৪-বছরের গবেষণার ফসল। ১৬-বছরের আগের পুরণো পত্রিকায় ছবিসহ সংবাদটি দেখে লালচে ধুসর হওয়া পত্রিকাটি বুকে লাগাতে চাইলাম আমি। ঢাবির আর্কাইভ শাখার বুড়ো লাইব্রেরিয়ান বললো – “পুরনো পত্রিকা খয়ে যাবে, বুকে লাগানো যাবেনা বাবা!

:

[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 98]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 70 = 72