অভিশপ্ত আশির্বাদ

ফেসবুক তথা সামাজিক গণমাধ্যম আর পলিথিন দুটোই মানব সভ্যতার সমান দরকারি, সকলের প্রয়োজন মেটায় কিন্তু অতীব নিকৃষ্ট আবিষ্কার। একটা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং ক্ষতির প্রভাব সুদূরপ্রসারী, আর একটা সামাজিক দূষণের দায়ে অভিযুক্ত। ফেসবুক হলো দুইপাশে ধারালো এমন মিছরির ছুরি যে লগ ইন এবং আউটের সময় কাটবে কিন্তু ব্যথার বদলে আপনি আরাম পাবেন। এমন অভিশপ্ত আশির্বাদ বর্তমান সময়ে খুব অল্পই আছে। দুনিয়ার অন্যদেশে ফেসবুক কত জনপ্রিয় জানা নাই, বাঙালিদের যদি কেউ যে এই বস্তু কোরবানি করতে পারে তাহলে তাকে নিঃসন্দেহে মহাপুরুষের পদক এবং সার্টিফিকেট দেয়া যেতে পারে। যেমন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কোন ফেসবুক আইডি, পেইজ নাই কিতু তবুও তার ফ্যান ফলোয়ারের অভাব নাই এবং মহাপুরুষ হিসেবেও যথেষ্ট প্রভাবশালী। কিন্তু আমার মত অঘাচণ্ডী যারে কেউ চেনে না কিন্তু লেখক হওয়ার জন্য মাঠে অবতীর্ণ তার জন্য ফেসবুক যোগাযোগের বিরাট গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কোন প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে যাওয়া লাগছে না, বই বাঁধাইয়ের খরচ নেই, প্রকাশককে একগাদা টাকা দিয়ে তার ব্যবসা বাড়ানোর কোন দায় নেই, সম্পাদকের কলমের খোঁচায় লেখা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা নেই, প্রচারণার দরকার নেই। মোট কথা একটা এলাহি কাণ্ড কারখানা। আমি এই মুহুর্তে লিখলাম, পোস্ট করলাম, কারো ভালো লাগল, সে দুইটা কমেন্ট করল, পাঁচজন লাইক দিলো, দুইটা শেয়ার, বাহ কী আনন্দ, কত মজার!

অন্যদিকে ফেসবুক মূর্খ বান্দরের হাতে লাঠি তুলে দিয়েছে, বান্দর এখন ফেসবুকে যখন তখন ছাতুর হাড়িতে বাড়ি লাগায়, যেখানে সেখানে ঘৃণা উগরে দেয়। ফেসবুকের এক খাপো শুয়োরাশ্চর্যকে নিয়ে পোস্ট, কমেন্ট করার কারণে মুরিদের রিপোর্টের সোদনে এই পর্যন্ত চার বার ব্লক খেয়ে গেলাম। ব্লকের মধ্যেই জন্মদিন চলে গেল, দুই জন যদিও বা জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন তাদেরকে তবুও তাদেরকে মেসেজের রিপ্লাই দিতে পারিনি। এই সময়ের মধ্যেই এক বিগশট বন্ধুর সন্তানের আগমন ঘটেছে। আমার লিস্টের অনেকেই ছবিসহ শুভেচ্ছা পোস্ট দিয়েছে আর আমার ফাও খাওয়া ভিতু মন ভাবতে লাগল, এই রে আমি মনে হয় তার ওয়েল উইশার লিস্ট থেকে বাদ পড়ে গেলাম!

যাবতীয় যোগাযোগ, প্রেম থেকে ব্যবসা সবকিছুই এখন ফেসবুকের পাতায় সম্পন্ন করা সম্ভব। ফেসবুক তো এখন ভার্চুয়াল ধর্মচর্চা কেন্দ্র, কারো উপর প্রতিশোধ নেয়ার উৎকৃষ্ট মাধ্যম, নেতাদের উদ্দেশ্যে কর্মীদের তৈলমর্দনের তেলাধার। মূর্খ বান্দর সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধান্ত নেয় কাকে আজ তেল দেবে আর কার পাছায় তৈলাক্ত বাঁশ ভরে দেবে। ধর্মীয়, জাতিগত, জাতীয়তাবাদী ঘৃণা উগরে দেবার চমৎকার জায়গা এখানে। যে যাই লিখুক না কেন তার পক্ষে বিপক্ষে কিছু ব্রেইনলেস স্পাইনাল কর্ড জুটে যাবে এখানে। দেশে ইতিমধ্যে নাসিরনগরের মত একাধিক ঘটনা ঘটে গেছে এই ফেসবুকের মাধ্যমেই। অপেক্ষা করেন, ভবিষ্যতেও আরও ঘটবে।

ফেসবুক তথা অনলাইন জগতে এখন নতুন এক ধর্মের আবির্ভাব হয়েছে সবার অলক্ষ্যে। সেই ধর্মের নাম ডাটাইজম। আপনি বাস্তবে যে ধর্মেরই অনুসারী হন না কেন অনলাইনে লগইন করার সাথে সাথে আপনি ডাটাইজম ধর্মে দিক্ষা নিয়ে নিলেন। আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করবে আলফা গডের মত বিগডাটা। এই ধর্মের ঈশ্বরও পুরোপুরি অদৃশ্য এবং আপনি নিয়ন্ত্রিত হবেন অলগারিদমের গাণিতিক সূত্রে। অনলাইনে আপনি কী খোঁজেন সেই হিস্ট্রি বিগডাটা তার তথ্য ভাণ্ডারে সংরক্ষণ করে এবং সেই অনুযায়ী আপনার সাথে ব্যবহার করে। পূর্বে আমাদের অভাব, অভিযোগ, প্রত্যাশা মিথের ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতাম এবং সেগুলো সাধারণত কোনদিনই পূরণ হতো না। সেই ঈশ্বর বাস করত স্বর্গে, মেঘের আড়ালে। বর্তমানে মানুষ তাদের অভাব, অভিযোগ, প্রত্যাশা জানাচ্ছে ফেসবুকে, টুইটারে, ব্লগে আর ডাটাইজম ধর্মের ঈশ্বর বিগডাটা বাস করে আইক্লাউডে, গুগল ক্লাউডে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 + = 17