জলদাস গাঁ : The Untold Story ! Part-98

আপন বড় ভাইর জন্যে যখন মেয়ে দেখতে গেলাম আমরা সকল ভাইবোন একত্রে, তখন সম্ভবত ৩য় শ্রেণিতে পড়ি আমি। অনেক দুরে গাঁয়ের মেয়ে দেখতে গিয়েও, ঘটনাক্রমে আমাদের নৌকো যে নদীর ঘাটে ভিড়লো, তার অদুরেই অনেক মেয়ের সাথে আমার ফিউচার ‘ভাবী’ও নদীতে সাঁতার কাটছিলো। ঘরে গিয়ে ওঠার পর বাড়ির লোকেরা ডেকে নদী থেকে তুলে নিলো তাকে, যা চোখে পড়লো আ্মার বোনদেরও। মেয়ে দেখার পর প্রায় সবই পছন্দ হলো আমার মা + ভাইবোনদের, কেবল আপত্তি উঠলো, মেয়ে নদীতে সাঁতরায় ছেলেদের মত। ছোট হলেও আমিও এটাকে +পয়েন্ট হিসেবে বললাম সবাইকে, কারণ আমিও ছিলাম নদী পাগল এবং আমাদের বাড়িও ছিল নদী লাগোয়া। অবশেষে বিয়ে হলো ঐ ঝানু সাঁতারু ভাবীর সাথে এবং এর ফল পেলো সবাই একদিন অত্যন্ত দৃঢ়রূপে।
:
একবার এক দ্বীপ থেকে অন্যদ্বীপে যেতে মেঘনায় আকস্মিক কালবোশেখিতে উল্টে গেল আমাদের নৌকো। ভাবীর কোলে তখন তার ২-বছরের ১ম কন্যা ‘নীলাক্ষি’ । আমার মাসহ প্রায় ১৫/১৬ জন ছিলাম ঐ নৌকোতে। প্রবল বাতাস, ঝড়, বিদ্যুৎ ঝলকানি, বড় বড় শিলাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাসে চারদিক অন্ধকার হলো রাতের মতই। নৌকার ভাঙা ছইটা কিভাবে যেন ধরতে পারলাম আমি। পাশেই বড় ঢেউতে ভাসতে দেখে মাকেও টেনে আনলাম ছই ধরতে কিশোর সাহসিকতায়। কিন্তু ২-বছরের নীলাক্ষি’সহ ভাবীকে হারালাম আমরা। মা কেবল তার বউ আর নীলাক্ষি’কে খুঁজতে ছই ছেড়ে এদিক ওদিক সাঁতরে বেড়াতে লাগলো সারাক্ষণ কিন্তু আমাকে নিষেধ করলো ছই ছাড়তে। প্রতিবেশি কুলসুম তার কোলের শিশু ভেসে যাওয়া ‘কালাম’কে হাতড়াতে আমাকে পাগলপ্রায় হয়ে ঠেসে ধরলো জলতলে। উন্মাদিনির মতো বললো, আমার কালাম কই? তাকে এনে দে তুই! কিন্তু কিভাবে এক ভেসে যাওয়া শিশুকে এনে দেব বুঝতে পারিনা এ জলযুদ্ধে কিশোর আমি। আমার মা এসে আমাকে উদ্ধার করে শিশু হারানো মা কুলসুম থেকে।
:
প্রায় দুঘণ্টা পর প্রবল বৃষ্টি আর ঝড় কিছুটা কমলে অদূরে, ভাবীকে প্রবল পাহাড়সম ঢেউয়ে ডুবতে আর ভাসতে দেখি আমরা। ছই ছেড়ে মা আর আমি সাঁতরে যাই ভাবীর কাছে। বিস্ময়করভাবে তখনো তার কোলে ২-বছরের ‘নীলাক্ষি’ এবং সে তখনো শাড়িপরা। মা আর আমি ভাবীকে ‘নীলাক্ষি’সহ টেনে নিয়ে আসি ছইয়ের কাছে। ততক্ষণে ঝড় থামাতে, অন্ধকার স্বচ্ছ হওয়াতে ৩/৪-টা জেলে নৌকো এগিয়ে এলো আমাদের উদ্ধারে।
:
নৌকা থেকে নদীতীরে দরিদ্র জেলেদের খড়ের কুঁড়েতে উঠতেই তাদের বউদের ভাঁজকরা সংরক্ষিত শাড়িটি পরতে দিলো মাকে, কারণ বাঁচার জন্যে মার শাড়ি সে নদীতে ছেড়ে দিয়েছিল। প্রবল শিলাবৃষ্টিতে নদীজল খুব ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, তাই প্রায় দুঘন্টা জলে ভেজার কারণে ‘নীলাক্ষি’ চেতনা হারিয়ে নীল হয়ে গিয়েছিল। সব জেলে আর জেলে-বউরা নাড়ার আগুন জ্বালিয়ে গরম করতে চাইলো আমাদের সবাইকে। নীলাক্ষিকে তাদের যত্নে রক্ষিত ‘নামাজের মছলা’টিতে পেঁচিয়ে অনেকক্ষণ আগুনে শেকলো তারা। সরিষার তেল ঘষলো তার বুকে আর পায়ে। শরীর গরম হলে প্রথমেই পেটের জল বের করতে আকস্মিক বমি করে নীলাক্ষি চোখ খুললো। কুলসুমকে তার কালাম ছাড়া উদ্ধার করে পাশের ঘরে ধরে রাখলো অপর জেলেনিরা। তার কোরাসের মত বিদীর্ণ বুকফাটা কান্না শুনতে পাচ্ছিলাম আমরা নদীতীরের ঘনিয়ে আসা প্রাকসন্ধ্যায়। নৌকো ডোবার খবর পৌঁছে গিয়েছিল বাড়িতে কিভাবে যেন, তাই বাড়ি থেকে বড়ভাই ও স্বজনরা ৫/৬-টা বড় নৌকো নিয়ে উজানে খুঁজতে খুঁজতে অনেক ভাটিতে নদীতীরের এ কুঁড়েতে খুঁজে পায় আমাদের।
:
গাঁয়ে খবর রটে যায়, এক বয়স্কা নারী ও একটা শিশু ভেসে গিয়েছিল। সবাই ধরেছিল, মা আর নীলাক্ষিকে সম্ভবত হারিয়েছে আমার পরিবার। কিন্তু ঘটনাক্রমে প্রতিবেশি কুলসুমের কোলের শিশু কালাম ও তার শাশুড়িকে হারাই আমরা। রাতে বাড়ি ফেরার আগেই চলমান নৌকোতেই বলে ফেলি আমি- “বলেছিলাম না, সাঁতারু ভাবীকে বউ করে আনতে। আজ দেখলেতো তার কত গুণ? যদি দক্ষ সাঁতারু না হতো ভাবী, তো কিভাবে ২-বছরের একটা শিশুকে কোলে করে শাড়ি পরা প্রায় ২-ঘন্টা এতো বড় নদীতে প্রবল ঝড়জলে যুদ্ধ করে বেঁচে রইলো সে? কিভাবে বাঁচিয়ে রাখলো তার শিশুকে”? এটা বিস্ময়কর মনে হলো সবার কাছে যে, প্রবল ঝড়ে কিভাবে এক নারী তার সন্তানকে বুকে আগলে ভেসে রইলো এ বিশাল নদীতে?
:
আমার ঐ ভাবী এখন পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সের। এখনো ঐ দ্বীপেই থাকেন তিনি। এইতো কদিন হলো ঢাকার এক আধুনিক হাসপাতালে তার সব মেডিকেল চেকাপ করলাম। ঢাকাতে এলেও ভাললাগেনা তার ঢাকার এ ইটপাথরের জীবন বেশিদিন। আমাদের বিলাসী বারিধারার ফ্লাটেও হাঁপিয়ে ওঠেন তিনি ক’দিনেই। তাই আবার কদিন পরই ফিরে যান ঐ সাঁতারকাটা নিবিড়তার জলজীবনে। বাবার বাড়িও সেই নদীতীরেই আছে অদ্যাবধি। এখনো বেড়ান বাবার বাড়ি আর ডুবে যাওয়া সেই নদীর তীরেই। নীলাক্ষি স্বামী সন্তানসহ ঢাকাতে থাকে। নীলাক্ষির সন্তানরা আর খোদ নীলাক্ষিও বিশ্বাস করতে চায়না যে, তার মা এ বিশাল ঢেউয়ের মাঝে তাকে নিয়ে এভাবে সাঁতার কেটেছিল মেঘনার জলরাক্ষসের মাঝে একদিন। আমি স্বাক্ষি না থাকলে হয়তো আমারো বিশ্বাস হতোনা এ ঐশ্বরিক ঘটনা।
:
আমার চলমান জীবনের রপ্তরঙা ভালবাসার রাশিকৃত পুঁথিদের ভিড়ে, এখনো মেঘনার ঐ জলহনন দেখি আমি, দেখি খরস্রোতা নদী আর ঢেউ নারীর স্তনের মত ঝড়ো বাতাস, আর নববধূর শীৎকারের মত নদীর বিবসনা প্রাণহননের কোরাস। তারপরো দেহজ প্রেমের স্পর্শময়তার স্বাপ্নিক রংধনুর মত ঐ নদী আর ঐ জল আঁকড়ে থাকি আমি আমার জীবন চরাচরে। এ নদী আর আমার জীবনকে শোষক আর শাসিতের প্রেমজ শরীর মনেহয় আমার কাছে। এ যেন জীবন মুদ্রার পীত আর হলুদাভ রঙ মিশ্রিত ন্যুজতার প্রেমপ্রেমখেলা। যে খেলায় কখনো পরাজিত হই আমি, কখনো আমার নদী। তারপরো ধর্মপ্রসবিনী ধার্মিক বকেরা যেমন ধারণ করে থাকে ধর্মকে, আমিও দীর্ঘতর সঙ্গমশেষে ক্লান্তদেহজ সময়টার মত ধারণ করে বেঁচে থাকি ঐ নদীকে, যা মূলত অপাঙ্গ রজ:স্বলা নারীর মতই অপাঢ্য !
:
[এরপর জলদাস গাঁয়ের চলমান পর্ব : 99]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

85 − 79 =