হটাও রোহিঙ্গা, বাঁচাও দেশ

কিছুক্ষণ আগে আমাকে ‘হটাও রোহিঙ্গা, বাঁচাও দেশ’ নামে দুটি গ্রুপে যুক্ত করা হয়। আমি গ্রুপের নাম দেখে রীতিমত থতমত খেয়ে যাই এবং সেই গ্রুপের লেখা ও মন্তব্য পড়ে দুঃখ প্রকাশ করি। সেখানের প্রায় প্রতিটি ব্যক্তিই সংখ্যাগরিষ্ঠের দলে অর্থাৎ মুসলমান। দুই বছর পূর্বে এরাই মানবতা নিয়ে অনেক উচ্চস্বরে চিৎকার করছিল। যখন মুসলমানদের দ্বারা ভিন্ন ধর্মালম্বী আক্রান্ত হয় তখন কখনই মানবতা শব্দটি ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর দ্বারা মুসলমান আক্রান্ত হলেই দুঃখ কষ্ট বেদনার সাথে সাথে বলে ‘মুসলমানদের জন্য কি মানবতা নেই’! আমি এই শ্রেণির কথিত মানবতা সংরক্ষণ গোষ্ঠীর প্রতি ধিক্কার জানাই।

মানবতা কখনও সিলেক্টিভ হতে পারে না। মানবতা কোন নির্দিষ্ট দল গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। যেমন- আপনি আওয়ামীলীগার হলে বিএনপির কর্মীর মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ করবেন এবং আপনি বিএনপি হলে আওয়ামী লীগারের মৃত্যুতে সুখবোধ করবেন এবং নিজেদের সুবিধা ও ক্ষমতা রক্ষার জন্যে অন্যান্য জঙ্গি মতাদর্শের দল-সংগঠনকে ব্যবহার করে ভিন্ন মতাদর্শকে নিশ্চুপ করে দিবেন তা হতে পারে না।

আপনি কট্টর মুসলমান বলে নাস্তিক ও সমকামীদের হত্যা করাকে সমর্থন জানাবেন আবার নিজ মতাদর্শের মানুষের মৃত্যুতে মানবতা মানবতা বলে কান্না করবেন তা হতে পারে না। আপনি মুসলমান বলে সারাদিন ইহুদীদের ধ্বংসের স্বপ্ন দেখবেন, মালাউন কা বাচ্চা কাভি নেহি আচ্ছা বলে হিন্দু নিধন করবেন, বৌদ্ধদের নাম ব্যবহার করে গর্দভ জনগোষ্ঠীকে উসকে দিবেন আর আপনাদের সাথে কেউ নিপীড়ন, অত্যাচার চালালেই যদি আপনার কথিত মানবতা জেগে ওঠে তাহলে বুঝে নিবেন আপনি একটা হারামজাদা, শয়তান, দ্বিচারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। যতদিন নিজের ভিতরের পশুত্বকে হত্যা না করতে পারবেন, ততদিন আপনি বিষাক্ত প্রাণী হিশেবেই চিহ্নিত হবেন।

Image result for রোহিঙ্গা

 

বাঙলাদেশের ইতিহাসে সবচে’ উৎকৃষ্ট মানবতার নিদর্শন ছিল রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়াটা। যদিও রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান হর্তাকর্তাদের নানা ধরণের লোভ ছিল, পুরষ্কার প্রাপ্তির স্বপ্নে বিভোর ছিল। তারপরও এক্ষেত্রে রাষ্ট্র চমৎকার ভূমিকা পালন করেছিল। আর আরেকদলের লোভ ছিল রোহিঙ্গা নারীদের দাসী হিশেবে রাখার। অনেক ধর্মান্ধই সেই চেষ্টা চালিয়েছিল। মুসলমানদের খুব দ্রুত ম্যানিপুলেট বা নিপূণভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। কারণ অশিক্ষা। এবং অশিক্ষার কারণেই রোহিঙ্গারা এতো দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তার জীবনে প্রতি সপ্তাহে ৯২টি শিশু উপহার দিয়ে যাচ্ছে।পৃথিবীর  অধিকাংশ মুসলমান দেশেই শিক্ষার অভাব। অশিক্ষা ও কুশিক্ষায় মুসলমানেরা বেড়ে উঠেছে। আমাদের দেশেও হাজার হাজার মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এর জলজ্যান্ত উদাহরণ। এখন হয়তো আরও অনেকেই নানাভাবে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করতে চাইছে। এবং তারা হচ্ছেও বটে। কিন্তু তার এই মানে নয় যে ‘হটাও রোহিঙ্গা বাঁচাও দেশ’ এমন চিন্তাধারা মানবিক ও যুক্তিযুক্ত।

মুসলমানেরা যতোই চিৎকার করে বলবে কোরআনে বিজ্ঞান আছে, ততোই তারা দুনিয়ার সব মানুষের কাছে আহাম্মক হিশেবে চিহ্নিত হবে। যাদের ধর্ম নিয়ে সংশয় আছে, তারাই মূলত ধর্মে বিজ্ঞান খুঁজে। কোরআনের প্রতিটি শব্দে, বাক্যে, পৃষ্ঠায় বিজ্ঞান উপচে পরলেও কোন মুসলমান বিজ্ঞানী হতে পারে না। আর সেই কোরআন পড়েই নাকি ইহুদী, খ্রিষ্টান, নাস্তিকেরা দুনিয়ার সকল কিছু আবিষ্কার করেছে। মুসলমানদের সবচে’ বড় ও আসল শত্রু হচ্ছে মুসলমানেরাই। নিজেদের অক্ষমতা ঢাকার জন্যে মুসলমানেরা যে-সকল কুযুক্তি ও ধর্মের অপব্যাখা এবং প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে থাকে তাতে মূলত তারাই ধর্মের জন্য ক্ষতিকর। মানবজাতির কল্যাণে অন্তরায়। অথচ দোষ দিয়ে থাকে ইহুদি ও নাস্তিকদের। নাস্তিকেরা আছে বলেই পৃথিবীতে এখনো মানবতা স্বার্থপরতায় বিভক্ত হয় নি, যে-দিন এই পৃথিবীতে একজনও অবিশ্বাসী ও প্রথাবৈরাগী না থাকবে, ওই দিন থেকে মানবতা দলে দলে, গোত্রে গোত্রে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যাবে।

রোহিঙ্গা হিন্দু, খ্রিষ্টান ও মুসলমান। সর্বপ্রথম তারা মানুষ এবং তাদের জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়া আমাদের কাজ। বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের কাজ। যতদিন না পর্যন্ত মায়ানমার তাদের ভুলত্রুটি শুধরে না নিবে, ততদিন রোহিঙ্গারা আমাদের দায়িত্ব। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি শক্তিশালী হওয়া খুবই জরুরী। যতদিন না পর্যন্ত সবাইকে তুষ্ট করার অভ্যাসটা বাঙলাদেশ ছাড়বে না, ততদিন পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশ থেকে শুরু করে আমেরিকা, ইউরোপ আমাদের ব্যবহার করেই যাবে। ধর্মান্ধ কিংবা জাতীয়তাবাদীরা যতোই অশিক্ষিতের মতন আচরণ করুক না কেনো; আমরা মানবিক, মানবতা প্রদর্শন করাই আমাদের আসল পরিচয়। হয়তো অনেক রোহিঙ্গা অপরাধের সাথে যুক্ত হয়েছে কিন্তু তার অর্থ এই না যে সবাই অপরাধী এবং তাদেরকে হটালেই দেশ বিশুদ্ধ হয়ে যাবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “হটাও রোহিঙ্গা, বাঁচাও দেশ

  1. খুব সুন্দর করে বলেছেন, যারা বোঝার তারা যে কেন বুঝতে পারছেনা সেটাই এখানে বোঝার বিষয়। মূলত কথাতো এটা একদম সত্য যে মুসলমানেরাই মুসলমানদের আসল শত্রু অন্য কেউ নয়। মুসলমানরা শুধু শুধু ইহুদী নাসারা, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধদের দোষারোপ করে থাকে। শুধু তাই নয় একারণেই তারা আজও বলতে পারেনা সমস্ত পৃথিবীতে কেউ একজন সহী মুসলমান আছে। কারো কাছে কেউ সহী মুসলমান না। বাকিটা লিখে জানাবো দেখি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

80 − = 76