বাংলাদেশের উপজাতিরা কি Indigenous নাকি Tribe ? আদিবাসি কারা দ্রাবিড় বাঙালি নাকি মঙ্গোলীয়রা?

বাংলাদেশের পাহাড়ি ৩-জেলায় বসবাসকারী চাকমা, মারমাসহ কয়েকটি অগ্রসর উপজাতি পাহাড়ি নিজেদের “আদিবাসি” দাবী করছে বেশ ক’বছর থেকে। এদেশের কিছু শিক্ষিত বাঙালিও বুঝে কিংবা না বুঝে উপজাতিদের “আদিবাসি” বলতে চাইছে বেআইনিভাবে। কথাটা কতটুকু যৌক্তিক আলাচনা করা যেতে পারে!

:

“আদিবাসি” কথাটির বাস্তবে কোন বিশ্বজনীন বা সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা বা রূপ নেই। জাতিসংঘের ফ্যাক্টশিটে আদিবাসিদের বৈচিত্র্যের কথা বিবেচনা করলেও, জাতিসংঘের কোন উপসংস্থাই এই শব্দটির কোন আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা প্রণয়ন করেনি। বিশ্বের আদিবাসি জনগণের অধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র ২০০৭ এর পর শব্দটি ব্যাপক পরিচিত লাভ করে।

:

বাংলাদেশের বিগত ঐতিহাসিক “পার্বত্য শান্তি চুক্তি” অনুসারে পাহাড়ের নন-বাঙালিরা নিজেদের “উপজাতি” হিসেবেই পরিচিত করেছিলেন কিংবা বলেছিলেন। যদিও এখন তারা দাবী করছে নিজেদের আদিবাসি হিসেবে। কিন্তু আমাদের উপজাতি এ জনগোষ্ঠীকে ইতিহাসের কোন সময়েই কোন ঐতিহাসিক, গবেষক বা ব্যক্তিই কখনোই “আদিবাসি” (Indigenous) বা “আদিম অদিবাসি” (Indigenous) বা “ভূমিপুত্র” (Son of the Soil) হিসেবে দাবি করেননি। যার কয়েকটি উদাহরণ নিচে দেয়া হলো-

:

১) সতীশ চন্দ্র ঘোষ ১৯০৯ সালে প্রকাশ করেন “চাকমা জাতি (জাতীয় চিত্র ও ইতিবৃত্ত)” নামক বইটি। এই বইয়ে পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতিয়দের “পাহাড়ী” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

:

২) ১৯০৬ সালে কলকাতা হতে প্রকাশিত SH হাচিনসনের “এ্যান একাউন্ট অব চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস” বইয়ে পাহাড়িদেরকে ‘ট্রাইব’ (tribe) তথা উপজাতি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে

:

৩) ১৯৬৯ সালে রাঙামাটি থেকে প্রকাশিত বিরাজমোহন দেওয়ানের “চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত” বইয়ে পাহাড়ের অধিবাসিদের “পাহাড়ী” এবং “উপজাতি” উভয় অভিধাতে-ই ভূষিত করা হয়েছে।

:

৪) শ্রী কামিনী মোহন দেওয়ান এর “পার্বত্য চট্টলের এক দীনসেবকের জীবন কাহিনী” পুস্তকে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিয়দের “পাহাড়ী” পরিচয়েই পরিচিত করানো হয়।

:

৫) বাংলা ১৩৯২ সালে কলকাতা হতে প্রকাশিত সিদ্ধার্থ চাকমার “প্রসঙ্গ: পার্বত্য চট্টগ্রাম” বইয়ে পাহাড়িদের “উপজাতি” হিসেবে অভিহিত করা হয়।

:

মানে লিখিত ইতিহাসের কোন সময়েই পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত উপজাতিয়দের স্বদেশী বা বিদেশী কিংবা উপজাতি বা বাঙালি কোন লেখকই “আদিবাসি” হিসেবে অভিহিত করেননি।

:

এখন আমাদের উপজাতিরা “জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র/২০০৭ ও আইএলও কনভেনশন-১৬৯” সম্পর্কে যে কথা বলেন, সে বিষয়ে আলোকপাত করলে, এ সংক্রান্ত সব সন্দেহ দূর করা সহজ হতে পারে। তবে বাংলাদেশ কিন্তু এ কনভেনশন-১৬৯ অনুমোদন করেনি। তাই আমাদের জন্য তা অবশ্য পালনীয় নয়। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৮৯ সালের ২৭ জুন প্রবর্তিত “আইএলও কনভেনশন-১৬৯” অদ্যাবধি মাত্র ২২-টি দেশ অনুমোদন করেছে, যদিও বিশ্বে সর্বমোট দেশের সংখ্যা ২৪৭।। এশিয়ায় একমাত্র নেপাল ছাড়া অন্য কোন দেশ এটি অনুমোদন করেনি, এমনকি ভারত ও না!

:

২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে আদিবাসি বিষয়ক যে ঘোষণাপত্র তৈরি হয়, তাতে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। অর্থাৎ তারা এ কনভেনশন মানেনা, যেমন মানেনা বাংলাদেশ এবং ভারত।

:

আসলে এটি বেশ জটিল কোন দেশের সার্বভৌমত্বের জন্যে। আইএলও কনভেনশন-১৬৯ এর মূল প্রতিপাদ্য অনুযায়ী কোন অঞ্চলের উপজাতি জনগোষ্ঠীই ঐ অঞ্চলের আদিবাসী হলে, এই জনগোষ্ঠীকে দেশের মূল জনগোষ্ঠী হতে “আলাদা” হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আদিবাসিরা বসবাস করছে এমন জমির মধ্যে কোন সরকারি জমি বা খাস জমি থাকতে পারবে না। এই জনগোষ্ঠীর বাইরের কেউ এই জমির মালিক হতে পারবে না। এমনকি রাষ্ট্র কর্তৃক কোন খনিজ, গ্যাস বা প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের প্রয়োজনে তা উত্তোলন করা যাবে কিনা তার মতামত দেবে আদিবাসিরা। এমনকি আদিবাসি জনগোষ্ঠীকে দেশের সংবিধান অনুযায়ী কোন শাস্তি দেয়া যাবেনা। তাদেরকে অপরাধের শাস্তিস্বরূপ দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী জেলে ঢোকানোর পরিবর্তে, তাদের নিজ নিজ গোষ্ঠীর প্রচলিত নিয়মে শাস্তি প্রদান করতে হবে। যেমন ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে ৪টা মুরগি প্রদান ধর্ষিতার পরিবারকে! (হা হা হা!)!

:

সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর যৌক্তিক স্বার্থ রক্ষা কিংবা তাদের অনুরোধ বা অনুমতি ছাড়া অথবা তারা রাজি না থাকলে রাষ্ট্র কর্তৃক ঐ অঞ্চলে কোন ধরনের সামরিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবেনা। মানে সেনাবাহিনি থাকতে পারবে না ঐ অঞ্চলে। ঘোষণাপত্র অনুসারে আদিবাসি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, স্বতন্ত্র তথা “স্বায়ত্তশাসন” দিতে হবে। এমনকি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি তারা মনে করে যে, তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে থাকবেনা বা ভারতেও যোগ দেবেনা, তবে তারা “স্বাধীন রাষ্ট্র” স্থাপন করতে পারবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রে থাকলেও, তারা যে অঞ্চলে বাস করে, সেই অঞ্চলের ভূমির মালিকানা বাংলাদেশে সরকারের হবেনা এবং সে অঞ্চলে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনি তথা সেনারা কোন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেনা।

:

সার্বিক বিবেচনায় সংবিধান ও রাষ্ট্রের স্বার্থের বিপক্ষে যাচ্ছে বলেই পৃথিবীর অনেক দেশই “আইএলও কনভেনশন-১৬৯” অনুমোদন করেনি। যেমন করেনি ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের প্রতিবেশি ভারতে ৭০৫-টি স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী থাকলেও, ভারত নিজের দেশে ‘আদিবাসী’ কনসেপ্ট” স্বীকার করেনা। তাই ভারত আইএলও কনভেনশন-১৬৯ অনুমোদন করেনি। বরং কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড জাতিসংঘের ২০০৭ সালের ঘোষণাপত্রের বিপক্ষে ভোট দেয়। আইএলও কনভেনশন-১৬৯ এবং জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র-২০০৭ অনুমোদন না করে বাংলদেশকে বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী দেশের কাতারে নিজেকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে।

:

তা ছাড়া বঙ থেকে বাংলা নামক ভূমির যদি আদিবাসি কেউ থাকে, তবে কি তারা চাকমা বা মারমা নামক ২০০-৩০০ বছর আগে বার্মা থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর কেউ হবে? নাকি খৃষ্টের জন্মের ২০০/৩০০ বছর আগে থেকে বসবাস করা এ জনপদের দ্রাবিড় নৃগোষ্ঠী হবে? চলুন এক নজরে দেখে আসি এ জনপদের আদিবাসি কারা হতে পারে তাদের চিত্র! এ জনপদে ৪র্থ শতক হতে গুপ্ত যুগ, গুপ্ত পরবর্তী যুগ, পাল, সেন আমলে বাংলার বিভিন্ন জনপদের পরিচয় মেলে। পাণিনি ও কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বাঙালির গৌড়ের পরিচয় মেলে। হর্ষবর্ধনের শিলালিপিতেও গৌড়ের পরিচয় মেলে। ৭ম শতকে গৌড়রাজ শশাংকের রাজধানী ছিল বাংলার কর্ণসুবর্ণতে। গৌড় বলতে সমগ্র বাংলাকে বোঝাতো। বঙ্গ রাজ্য ছিল বর্তমান বাংলাদেশের পুর্বে। এখানে যে জাতি বাস করতো তাদের “বঙ্গ” নামে ডাকা হতো। গঙ্গা ও ভাগিরর্থীর মাঝের অংশ ছিল এ বঙ্গ। প্রাচীন শিলালিপিতে বিক্রমপুর ও নাব্য নামে বাঙালির দুটো জনপদ ছিল। বঙ্গ থেকে বাঙালি জাতির উৎপত্তি। পুন্ড্রনগরে বাঙালি বসবাস করতো। চীনা ভ্রমণকারী ইৎসিংয়ের মতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের নাম তখন ছিল হরিকেল। সিলেট, কুমিল্লাৈ নিয়ে গঠিত সমতট ও হরিকেলে বাঙালি জনপদ ছিল। এ ছাড়া বাঙালির অপর জনপদ ছিল বরেন্দ্র, তাম্রলিপি, চন্দ্রদ্বীপ ইত্যাদি। গ্রীক বীর আলেকজান্ডার যে গঙ্গারিডির কথা বলেছেন তা মূলত আজকের বৃহৎ বঙ্গ। সম্রাট অশোকের শাসনামলে পুন্ড্রনগরের পরিচয় মেলে, যেখানে বাঙালি নরগোষ্ঠী বসবাস করতো। বাঙালি শশাংক ৬০৬ খ্রীস্টাব্দে কর্ণসুবর্ণে তার রাজধানী স্থাপন করেন। শশাংকের রাজ্য পূর্বে কামরূপ তথা আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। হিওয়েন সাং শশাংকে শৈব তথা বৌদ্ধ বিদ্বেষী বলে অভিহিত করেছেন। পাল বংশ ৭৫০ থেকে ১১৬১ পর্যন্ত বৃহৎ বাংলা শাসন করেন। ১১৬২-১২০৩ পর্যন্ত সেন শাসকরা বাংলা শাসন করেন। এরপর শুরু হয় বাংলায় মুসলিম শাসন। এ অঞ্চলের মানুষ ছিল নিষাদ, কোল্, ভিল্, মুন্ডা, সাঁওতাল প্রভৃতি দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর। বাঙালি মূলত অস্ট্রিক দ্রাবিড়। হোসেন শাহী আমলে (১৪৯৩-১৫৩৮) বাংলার পূর্ব সীমা ছিল কামরূপ, কামতা ও ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম। তখন এ রাজ্য বাস করতো তামাটে বাঙালি জাতি, যারা রচনা করেছিলত চর্যাপদ।

:

এসব জেনে কিংবা না জেনে যারা আমাদের ৩-জেলার উপজাতিদের “আদিবাসি” বলতে চায়, নি:সন্দেহে তারা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করছে। সুতরাং বাংলাদেশের সুনাগরিকদের অনুরোধ করবো, কোন কিছু বলার আগে, পোস্ট দেয়ার আগে বিষয়টি জানুন, বুঝুন তারপর কথা বলুন। আপনি কি চান বাংলাদেশেরই ৩-জেলাতে বাংলাদেশের কোন খনিজ সম্পদ বাংলাদেশ সরকার তুলতে পারবেনা! বাংলাদেশ সেনারা অবস্থান করতে পারবেনা! ওখানের কোন ভূমিতে বাঙালিরা বসবাস করতে পারবেনা! এমনকি কথিত “আদিবাসি”রা কোন অপরাধ করলে তার বিচার আমাদের সংবিধান অনুসারে করা যাবেনা, তা করতে হবে চাকমা বা মারমাদের লোকাল আইনে! এবং তারা ৩-জেলাকে বাংলাদেশ থেকে আলাদা করতে চাইলেও, বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ সেনারা বসে বসে আঙুল চুষবে! কিছু বলতে পারবে না! এবং এই হচ্ছে “আইএলও কনভেনশন-১৬৯” এবং “জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র-২০০৭”!

:

সুতরাং সাধু সাবধান। আগে জানুন, বুঝুন, চিন্তা করুন তারপর কথা বলুন।

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1