বাঙালির শরীরতত্ব

বাঙালির মত “শরীর সচেতন” পৃথিবীতে আর কোন জাতি থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু আমার জানা নেই। সাধারণত কুশলাদি হচ্ছে, হাই হ্যালো কিন্তু বাঙালিদের কুশলাদি আরো গভীর!

‘কেমন আছো’ বলার পরিবর্তে তারা বলবে:

শুকনা পাতলা গড়নের মানুষ দেখলেই  ‘আরে তুমি/আপনি তো আরো শুকিয়ে গেছেন বা তুমি এত শুকনা কেনো, খাও না?’
আর স্থূলকায় মানুষ দেখলে ঠিক তার বিপরীত ‘আরে তুমি তো আরো মোটা হয়ে গেছো’

শাহবাগ আন্দোলনের সময় একই দিনে দুই তিনটা কর্মসূচিতে অংশগ্রহন করতাম। তো সকালে প্রেস ক্লাবের সামনে যে ব্যক্তি দু:খ কষ্টে বুকটা ফাইট্টা যায় মার্কা কন্ঠে বলেছিলো ‘আহারে তুমি তো শুকিয়ে গেছো’ সেই একই ব্যক্তি তিন ঘন্টা পরে টিএসসির কর্মসূচিতে ওই একই কথা! আরো দুই ঘন্টা পরে যখন শাহবাগে জমায়েত ওই একই ব্যক্তি আরো করুন সুরে বললো ‘আরে তুমিতো আরো শুকিয়ে গেছো’ তো মানুষ আসলে ঘন্টায় ঘন্টায় শুকায়? তখন একটু হাসি দিয়ে তাদের এড়িয়ে যেতাম। আমি একজন স্বাস্থবান মানুষ, আমার কোথাও কোন সমস্যা নেই, রোগ নেই, আমার শরীর নিয়ে আমার কোন সুখ বা দু:খ নেই, একদম নরমাল। কিন্তু মানবতাবাদী, দরদী বাঙালির অন্যের শরীর নিয়ে অনেক সমস্যা!

দীর্ঘদিন বিদেশে আছি, এই শুকনা-মোটা কুশলাদির অভিজ্ঞতা এখানে হয়নি, মানে বিদেশিদের কাছ থেকে হয়নি। বিশ্বাস করেন একবারের জন্যও না, কিন্তু বাঙালিরা এখানেও থেমে নেই! তাই ভাবছিলাম তাহলে বাঙালিদের এই রোগ এর উৎপত্তি কোথা থেকে?

সেটার আগে যেটা জানা জরুরি সেটা হচ্ছে কেন এইরকম প্রশ্ন অস্বস্তিকর এবং অসভ্যতা:

১. যারা নিজের শরীর নিয়ে চিন্তা বিমুখ: একজন ব্যক্তি শুকনা হোক কিংবা মোটা, সে হয়তো সেটা নিয়ে কোনদিন চিন্তাই করেনি, সে তার শরীর নিয়ে সন্তুষ্ট। কিন্তু “শরীর সচেতন” বাঙালিদের একই প্রশ্ন শুনতে শুনতে সে ক্লান্ত তাই এইরকম প্রশ্ন বা মন্তব্য ব্যক্তির জন্য অস্বস্তিকর এবং বিরক্তিকর।

২. যারা শরীর নিয়ে চিন্তা করে:

ক. একজন মোটা ব্যক্তি যখন নিজের শরীর নিয়ে সন্তুষ্ট না, সে দিনে মিনিমাম পাঁচবার একই মন্তব্য শোনে, ‘তুমি তো আরো মোটা হয়ে গেছো’ তার জন্য আপনাদের এই কুশলাদি একরকম ট্রমা! আপনার এই বাল ফালানো প্রশ্নে তার কোন উপকার হচ্ছে না।  আর মানুষ মোটা মানেই যে সে অনেক খায় তা না, শরীরের বিভিন্নরকম ক্রিয়া-প্রক্রিয়া আছে তার কারনে ওজন কমে বা বাড়ে। তাই আপনি যে মানবতার দূত হয়ে উপদেশ মাড়াইতে আসেন যে ‘কম খাও, ডায়েট করো’ সেটা আপনার বলদামী। ব্যক্তি যদি তার শরীর নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে সে বেশি খাবে নাকি কম!
খ. হ্যাংলা পাতলাদের দেখলে ওই মানবতাবাদী গোষ্ঠী ‘খাওয়া-দাওয়া করার মূল্যবান পরামর্শ’ দেন, অনেক কাছের প্রেম পিরিতের মানুষরা আবার ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করবে ‘গাজা টাজা খাও নাকি’?
আপনারা পড়াশুনা করেন নয়তো গুগল করেন!

আসলে বিষয়টা কি? হয়তো অনেকে বলবে, আমরা আসলেই ভালোবাসার সাথেই এই প্রশ্নগুলো বা এই মন্তব্যগুলি করি। সম্পূর্ণ দ্বিমত, এইধরনের মনোভাব আসে আমাদের ‘খোঁচাখুঁচি’ মানসিকতা থেকে, হতাশা থেকে।

আমাদের প্রতিদিনকার জীবনে অনেক সমস্যা, ছোট্ট গরিব দেশ, অধিক জনসংখ্যা ইত্যাদি এবং হতাশা আমাদের প্রতিদিনকার সংঙ্গী। তাই একজন স্থূলকায় মানুষ দেখলেই তারে একটু হতাশ করার মাধ্যমে, গুতা দেবার মাধ্যমে বাঙালি শান্তি পায়, সুখ পায়, কারণ আমাদের সুখ শান্তির মাধ্যম কম (এইজন্য বলি এলকোহল লিগালাইজ করতে, যাই হোক সেটা অন্য আলোচনা)

তো এইটাকে বলা হয় ‘বডি শেমিং’ মানে কারও দেহের আকার, আয়তন বা ওজন নিয়ে সেসকল সমালোচনা বা মন্তব্য যাতে ব্যক্তি অপমানিত বোধ করেন। সেটা আপনার দরদী কন্ঠে হোক কিংবা আক্রমনাত্বক কন্ঠে হোক, এটা ‘বডি শেমিং’ এর অন্তর্ভুক্ত।

এই মানসিকতা প্রতিক্রিয়াশীল, প্রগতিশীল, আরো যত শীল আছে, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, বয়স্ক, তরুণ, গ্রাম্য, শহুরে  সকল গোষ্ঠী করে।

তাদের জন্য একটি স্লোগান ‘আপনার হতাশার কারণ আমি বুঝি’

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

36 + = 43