ভালোবাসা এবং ব্ল্যাকমেল, নারীদের দাসত্বের জীবন।

ভালোবাসা এবং ব্ল্যাকমেল দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না। যাকে ভালোবাসা যায় তাকে কখনো ব্ল্যাকমেল করা যায় না। আর যাকে মানুষ ব্ল্যাকমেইল করে, তাকে সে মন থেকে কখনো ভালোবাসতে পারে না, এবং ভালোবাসেও না। কারণ তার জন্য তখন মনের মধ্যে এক ধরনের ক্রোধ কাজ করে, ভালোবাসা কাজ করে না।

বর্তমান সময়ে ভালোবাসার নামে এইধরনের ঘটনা অহরহ ঘটে চলছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নোংরা পুরুষরা মেয়েদেরকে ভালবাসার ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করে চলেছে।

সমাজের উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত কোন মানুষই এই ধরনের ঘটনার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ভালোবাসা এবং সরলতার সুযোগ নিয়ে ছেলেরা এই কাজগুলো বেশি করে থাকে। এবং মেয়েদের স্বাভাবিক এবং স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার হরণ করে ফেলে।

বর্তমান সময়ে প্রেমের ফাঁদে ফেলে যেভাবে ব্ল্যাকমেইল করা হয়। অডিও কলে কথা বলে সেগুলো রেকর্ডিং করে রাখা। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গিয়ে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি তুলে সেগুলো সেভ করে রাখা। এবং সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিষয়টা, তা হলো, মেয়েদের সাথে সেক্স করে সেগুলো ভিডিওতে ধারণ করে রাখা। এই কাজগুলো ছেলেরাই বেশি করে থাকে। মেয়েদের দ্বারা এই কাজগুলো করা তেমন সম্ভব হয়না। এই কাজগুলো মেয়েদের তেমন কোন উপকারেও আসে না।

ব্ল্যাকমেইল কেন করে, এবং এটার পিছনের কারণ কি? প্রথমত প্রেমে পড়া অন্যায় কিছু না, যেকোন মানুষ যেকোন বয়সে যেখানে মানুষের প্রেমে পড়তে পারে। একসাথে তারা ঘুরতে পারে, দিনের পর দিন মোবাইলে কথা বলতে পারে, দুজনের সম্মতি থাকলে সেক্স করতে পারে। এটা তেমন দোষের কিছু না।

এই ধরনের সম্পর্ক চলতে চলতে একটা সময় ধীরে ধীরে দুইজন মানুষের মধ্যে বিভিন্ন কারণে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। একসময় দুজন মানুষ নিজেদের মতো করে আলাদা হয়ে যায়, এবং নিজেদের মতো করে ভালো থাকার চেষ্টা করে। কারণ সেই ভালোবাসার মধ্যে কারোর প্রতি কারো কোন প্রকার হিংসা, ক্রোধ, অভিমান কাজ করে না।

আবার কোন কোন সম্পর্কের মধ্যে আছে কিছুটা ভিন্নতা। হয়তো ছেলেটাকে মেয়েটার আর পছন্দ হচ্ছে না, অথবা মেয়েটাকে ছেলেটার। অবশ্যই ছেলেটা যদি মেয়েটাকে ইগনোর করে সরে যায়, সেখানে মেয়েদের কিছুই করার থাকেনা, মেয়েদের নিজের কষ্টটা নিজের মধ্যে নীরবে লুকিয়ে রাখতে হয়। কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষদের ব্ল্যাকমেইল করার কোন অপশন মেয়েদের জানা নেই, এমনকি এই সমাজ সেই অপশন গুলোকে গ্রহণযোগ্য মনে করে না।

কিন্তু উল্টো সমস্যা ঘটতে থাকে মেয়েটার বেলায়।কোন কারনে মেয়েটা হয়তো ছেলেটাকে আর আগের মত ভালবাসতে পারতেছে না। অথবা ছেলেটাকে কোন কারনে আর পছন্দ হচ্ছেনা। অথবা মেয়েটা কোন প্রকার রিলেশনে থাকতে চাচ্ছেনা। অথবা ঝগড়া করে অন্য কোন ছেলের সাথে রিলেশনে জড়িয়ে গেছে। এমনও হতে পারে পরিবার থেকে সম্পর্ক মেনে না নিয়ে, অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেছে। ঘটনা যাই হয়ে থাকুক, তখন বেশিরভাগ ছেলেই মেয়েদের এইরকম সরে যাওয়ার বিষয়টা সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। তাই মেয়েদেরকে বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে, এমনকি বিভিন্ন প্রকার হুমকি, ধামকি ভয় দেখিয়ে মেয়েটার জীবনটাকে অতিষ্ঠ করে ফেলে।

তখন যদি মেয়েটার ছেলেটার সাথে রিলেশন তেমন গভীরে না যায়, অথবা তার কাছে ওইরকম ব্ল্যাকমেইল করার কোন অপশন না থাকে, তাহলে মেয়েটা প্রাথমিক অবস্থায় বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু ছেলেটার কাছে যদি মেয়েটাকে ব্ল্যাকমেইল করার বিভিন্ন অপশন থেকে থাকে, তাহলে মেয়েটাকে চরম একটা বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়। এমনকি স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকাও মেয়েটার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে।

ছেলেরা যেভাবে ব্ল্যাকমেইল করে এবং ব্ল্যাকমেইল এর কৌশল গুলো যেরকম হয়ে থাকে। মেয়েটার বাড়ির আশেপাশে এসে মেয়েটাকে বিরক্ত করা, রাস্তাঘাটে, ইস্কুলে, কলেজে একা পেয়ে মেয়েটার গায়ে হাত তোলা, এমনকি অনেক সময় এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, যদিও এসিড নিক্ষেপের ঘটনাটা এখন অনেকটাই কমে গেছে।

আবার মেয়েটার ফ্রেন্ড সার্কেলদের মধ্যে তাদের বিভিন্ন অন্তরঙ্গ ছবি এবং ভিডিও শেয়ার করা। মেয়েটার নামে ফেক আইডি খুলে সেখানে আজেবাজে জিনিস শেয়ার করা। মেয়েটার পরিবার এবং আত্মীয় স্বজনের মাঝে ছবি এবং ভিডিও গুলো শেয়ার করে দেওয়া। সবচেয়ে মারাত্মক যে বিষয়টা সেটা হলো অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিওগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া।

পুরুষতান্ত্রিক ছেলেদের এই ধরনের কাজ গুলোর মধ্য দিয়ে, বেশিরভাগ মেয়েদেরকে দীর্ঘমেয়াদি ডিপ্রেশনে থাকতে হয়। যদি মেয়েটা সাহসী না হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে অনেক মেয়ে আত্মহত্যার মত ভয়াবহ পথ বেছে নেয়।

এই ধরনের ঘটনার থেকে মেয়েদের বাচার উপায় উপায় কি? উপায় অবশ্যই আছে। প্রেম করার ক্ষেত্রে সচেতনতা অবলম্বন করা, ভালোবাসা বেশি গভীরে না গেলে সেক্সুয়াল বিষয়ে আলোচনা না করা, বেশি বিশ্বস্ত না হলে সরাসরি ভিডিও কলে সেক্স না করা, কোথাও ঘুরতে গিয়ে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি তুলতে না দেওয়া, সেক্স করার সময় ভিডিও করতে দেওয়ার তো কোন প্রশ্নই আসে না। কারন যে আপনাকে মন থেকে ভালোবাসে, সে কখনোই আপনার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি তোলা, অথবা ভিডিও করার চেষ্টা করবে না।

ভালোবাসা এবং ব্লাকমেইল দুটো আলাদা বিষয়। তাই মেয়েদের উচিত এই ধরনের ছেলেদের থেকে দূরে থাকা। যদি আবেগের বশবর্তী হয়ে ছেলেটার প্রতি বেশি জড়িয়ে গেলে, যথাসাধ্য চেষ্টা করা এইসব ছবি তোলা, ভিডিও করা থেকে বিরত থাকা। এবং এইসব মুহূর্তে নিজেকে সক্রিয়ভাবে উপস্থাপন করা, দরকার প্রয়োজনে ঝগড়া করে সেখান থেকে সরে আসা।

যখন নারীরা দেখতে পায় ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, বিভিন্ন যৌন হয়রানি, নারীদের উপর বিভিন্ন অত্যাচার, দিনের পর দিন কোন পুরুষ দ্বারা কোন নারী ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছে। তখন অনেক নারীই মনে করে নারী হয়ে জন্ম নেওয়াটাই নারীদের সবচেয়ে বড় অপরাধ।

কিন্তু না, নারী হয়ে জন্ম নেওয়া কোনো অপরাধ নয়, তবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী হয়ে বেড়ে ওটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ। পৃথিবীর সব শিশুই মানুষ হয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে। আর ধীরে ধীরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সেই মানুষ থেকে নারীদের আলাদা করে ফেলে।

আর নারীরা হারিয়ে ফেলে ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। পুরুষ তার বাহুর শক্তি দিয়ে হাজার বছর ধরে নারীদের দমন করে এসেছে। যতদিন নারীবিদ্বেষী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থাকবে, ততদিন নারীরা এই পৃথিবীতে মানুষ হয়ে বাঁচতে পারবে না। নারীদের বাঁচতে হবে পুরুষের দাসত্বের শিকার হয়ে।

তাই নারীদের মানুষ হিসেবে বাঁচার জন্য সবার আগে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে ফেলতে হবে। নারীকে বের হতে হবে ঘর থেকে। নারীকে ছুঁড়ে ফেলতে হবে বোরকা নামক কালো অন্ধকার কাপড়। নারীকে ছুঁড়ে ফেলতে হবে শাঁখা সিঁদুর। নারীকে অর্জন করতে হবে সম্পদের সুষম বন্টন এবং সমান অধিকার। নারীদের সক্রিয় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, কোনোভাবেই পুরুষের দাসত্বের শিকার হওয়া যাবে না।

তবেই পৃথিবীর নারীরা পাবে মুক্তি, পৃথিবী হবে সুন্দর। অন্তত ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে, প্রেমের ফাঁদে ফেলে মেয়েদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষরা কখনোই পাবে না।

তাই নারী আপনাকে বলছি, সবার আগে নিজের অধিকার। নিজে সচেতন হোন, অন্য নারীকে সচেতন করার চেষ্টা করুন। সাহস করে কথা বলুন, নিজের পায়ে দাঁড়ান, ভেঙ্গে ফেলুন পুরুষতান্ত্রিক দাসত্বের শিকল।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + = 11