লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ও বামেদের ভবিষ্যৎ:- দ্বিতীয় পর্ব-

সদ্যসমাপ্ত 2019 সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে বলা যায় বিজেপি ও তার সহযোগী দল ছাড়া, মোটের উপর সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির ফলাফল খারাপ হয়েছে। শুধুমাত্র ওড়িষ্যাতে নবীন পট্টনায়েক, অন্ধ্রপ্রদেশে ওয়াই এস আর কংগ্রেস, এছাড়া দক্ষিণ ভারতের দুএকটি দল ভালো ফল করেছে, যারা মোদী ম্যাজিক থেকে নিজের রাজ্যকে রক্ষা করতে পেরেছে। ইউপিএ ও এনডিএ বাদে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলি যেমন- তেলেগু দেশম, নাগা ফ্রন্ট, আম আদমি পার্টি, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (CPI), CPIM প্রভৃতি দল মিলে মোট 98 টি লোকসভা আসনে জয়লাভ করে।

এপ্রসঙ্গে উল্লেখ্য এবারের নির্বাচনে বামেদের ব্যাপক ভরাডুবি লক্ষ্য করা যায়। CPIM- 3 টি ও CPI- 2 টি আসনে জয়যুক্ত হয়! বাম শক্তিগুলির রাজ্যভিত্তিক ফলাফল লক্ষ্য করলে দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গে- 0, ত্রিপুরা- 0, কেরলে- 1, ও তামিলনাড়ুতে- 4 টি আসনে জয়লাভ করেছে। অর্থাৎ বামেদের প্রধানশক্তি পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও কেরলে বামেদের কার্যত শূন্য হস্তে ফিরতে হয়েছে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে বামেদের এরূপ বিপর্যয় আগে কখনও দেখা যায়নি! এই নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে- ‘ভারতবর্ষে আর বামপন্থার অস্তিত্ব থাকবে তো’? এখন বহু কর্পোরেট মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা বলছেন- ভারতবর্ষের রাজনীতি থেকে বামপন্থা চিরতরে মুছে গেল! (কর্পোরেট সংস্থাগুলি কার্যত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে) প্রকৃতপক্ষে এটা স্বীকার করতেই হবে বর্তমান ভারতবর্ষে বামপন্থা নিজের অস্তিত্বের সংগ্রামে লিপ্ত!

এখন অনেক বাম বিরোধীরা এতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। অনেকের মতে মৌলবাদ তোষণকারী বামেদের পতন হয়েছে ভালোই হয়েছে। ঐতিহাসিক আঙ্গিকে দেখলে বলতে হয় বামেদের ভুলের কোন শেষ নেই- কম্পিউটারের কালো হাত গুড়িয়ে দাও, ইংরেজি তুলে দাও, জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে না দেওয়া, পরমাণু চুক্তি প্রসঙ্গে ইউপিএ-1 থেকে সমর্থন প্রত্যাহার ইত্যাদি…। শুধু তাই নয় বামেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁরা মৌলবাদীদের তোষণ করে এবং সাম্প্রতিক সময়ে 370 ধারা তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে বামেদের যে অবস্থান প্রকৃতপক্ষে এটি তাঁদের ‘কফিনে শেষ পেরেক পোঁতার শামিল’!

বামেদের এই সমস্ত নীতিগত সমস্যা রয়েছে এবং এই ভুল কর্মকান্ডের ফলে বামেরা আজ ধিকৃত ও জনবিচ্ছিন্ন! যাঁরা বামেদের পতনে দুহাত তুলে নাচছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলি এখন তর্কের খাতিরে ধরলাম বামেদের চিরতরে শলীল সমাধি সম্পন্ন হল- তাহলে কি আপামর ভারতবাসীর মঙ্গল সাধিত হবে? দেশের যত সমস্যা তা কি দূরীভূত হবে? দেশের খেটে খাওয়া, গরীব প্রান্তিক মানুষের জীবন যন্ত্রণা কি কমবে? ভারত কি বিশ্বের দরবারে আরও মর্যাদার সঙ্গে নিজের অবস্থান শক্ত করবে? সর্বাধিক বড় প্রশ্ন বাম চিন্তাচেতনা ও বামশক্তি ছাড়া ভারতবর্ষ তথা উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে?

আপনি বামেদের পচ্ছন্দ বা অপচ্ছন্দ করতে পারেন কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে বামেদের গুরুত্ব অস্বীকার করতে পারবেন না। ভারতবর্ষের নির্বাচনী রাজনীতিতে বামেরা সেভাবে সফল না হলেও বৌদ্ধিক ক্ষেত্রে বামেদের বিরাট অবদান রয়েছে। দেশের যত বড় বড় বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী প্রধানত বাম মনোভাবাপন্ন। তাঁদের এই বামচিন্তা চেতনার ফলেই ভারতবর্ষ এক ধর্মনিরপেক্ষ, গণতন্ত্রে পরিণত হয়েছে এবং এখনও ধর্মান্ধ রাষ্ট্রে (হিন্দু রাষ্ট্রে) পরিণত হয়নি। বামেদের বিরুদ্ধে মুসলিম মৌলবাদী তোষণের অভিযোগ রয়েছে যা অনেকাংশেই সত্য, এগুলি তাঁদের আদর্শকে ক্ষতবিক্ষত করে তাই এই ঘৃণ্য নীতি থেকে বামেদের বেরিয়ে আসা আশুপ্রয়োজন! আসলে বামেরা মনে করে সংখ্যালঘু মৌলবাদের সাপেক্ষে সংখ্যাগুরু মৌলবাদ অধিক ভয়াবহ। সংখ্যালঘুদের প্রতি দায়বদ্ধতা ও তোষণের মধ্যে পার্থক্য খুবই সুক্ষ যা অনেক সময় বামেরা বুঝতে পারে না! তাই তাঁরা কিঞ্চিত সংখ্যালঘুদের প্রতি মমত্ববোধ দেখাতে গিয়ে অনেকাংশেই সংখ্যালঘু মৌলবাদের সমর্থন করে ফেলে, যা কখনোই কাম্য নয়!

তবে শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এটা বলতেই হয় সংখ্যাগুরু হিন্দুত্ববাদী চিন্তাচেতনা প্রসার রোধের ক্ষেত্রে বামেদের ভূমিকা অনস্বীকার্য! সেইসঙ্গে ভারতের অর্থনীতিতে সম্পদের সমবন্টন ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন, আধুনিক ভারতবর্ষকে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই বামচিন্তা চেতনায় প্রভাবিত হয়ে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু ভারতকে- ‘সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র’ হিসাবে সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। (‘ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনাতে’ এগুলি উল্লেখ করা হয়েছে, 1976 সালের 42 তম সংবিধান সংশোধনীতে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’, ‘সমাজতান্ত্রিক’ ও ‘অখণ্ডতা’ শব্দ গুলি যুক্ত করা হয়। তবে উল্লেখ্য আগে থেকেই সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক চরিত্র ছিল তবে এই 42 তম সংশোধনীতে তা আরও স্পষ্ট করে লিখিত আকারে যুক্ত করা হয় এবং নাগরিকদের কিছু ‘মৌলিক কর্তব্য’ যুক্ত করা হয়, তাই একে ‘Mini Constitution’ ও বলা হয়।) ভারতবর্ষ এতদিন সেই আদর্শেই বেড়ে উঠেছিল এখন দ্রুত অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। ভারতবর্ষের রাজনীতিতে বামেরা অনেকটা ‘সেফটি ভাল্বের’ মতো কাজ করে। কারণ বামেরা না থাকলে দেশ সম্পূর্ণ ধর্ম রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়বে এবং এই বিষাক্ত ধর্ম রাজনীতির বিষে আপামর জনসাধারণ ছটফট করছে ও তাঁর ভয়ংকর পরিণতির ফল ভোগ করবে!

বর্তমানে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বা প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে মাঝে মাঝে মন্দির দর্শনের যে রাজনীতি করতে দেখা যায়, বিশেষজ্ঞদের মতে তা ‘সফট হিন্দুত্বের’ লাইন কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে এর ফলে হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি আরও শক্তিশালী হয়েছে। আসলে হিন্দুত্ববাদীরা ‘হার্ড লাইন’ হিন্দুত্ব ছেড়ে কেন সফট হিন্দুত্বকে বাছতে যাবে? বরং এর ফলে কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ ভোট ব্যাঙ্ক বহু অংশে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাই দেশের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার্থে বামেদের শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে ফিরে আসা আশুপ্রয়োজন।

এরপর প্রশ্ন হল বামেরা না থাকলে মানুষের প্রতিনিয়ত জীবন যন্ত্রণা, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকের ফসলের দাম, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাগুলির বিকেন্দ্রীকরণ, জল, জঙ্গল, ভূমি ও আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা নিয়ে কারা কথা বলবে? রেল, বিমান, খনি প্রভৃতি রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাগুলিকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে আদানি, আম্বানিদের বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে! অন্যদিকে সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবন যন্ত্রণা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোদীর উন্নয়ন মানে রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থা গুলিকে বিক্রি অথবা দুর্বল করে দাও ও নিজের পুঁজিপতি বন্ধুদের মধ্যে তা বিলিয়ে দাও। বিএসএনএল কে তুলে দাও জিওকে সুযোগ দাও। তা প্রশ্ন হল বিএসএনএলে যে হাজার হাজার কর্মচারীরা কাজ করে তাদের ভবিষ্যতের কি হবে? তাঁদের পরিবারের জীবন নির্বাহ হবে কি করে? সরকার এ বিষয়গুলি কি ভেবে দেখেছে? প্রশ্ন করা যাবে না প্রশ্ন ও প্রতিবাদ করলেই মাওবাদী, ‘ইউএপিএ’ এর মতো ‘কালা আইন’ পাশ করে সরকার যাকে ইচ্ছা ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা দিতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়াতে আধার সংযুক্তি ইত্যাদির মাধ্যমে সরকার দেশের গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে! অর্থাৎ ধীরে ধীরে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তাই চারিদিকে শুধু শান্তি আর সমৃদ্ধি বিরাজ করছে কোথাও কোন সমস্যা নেই? সমস্যা হল প্রতি বছর কোটি কোটি ছেলে বেকার হচ্ছে কেন; এটা নিয়ে প্রশ্ন করলেই সমস্যা? না খেতে পেয়ে মানুষ কেন মারা যাচ্ছে, বিনা চিকিৎসায় কেন মানুষ মারা যাচ্ছে, দেশে কেন ধর্মীয় বিদ্বেষ বাড়ছে এগুলি নিয়ে প্রশ্ন করলেই যত সমস্যা? সমস্যা হল সরকার কেন সাধারণ মানুষের কথা না ভেবে পুঁজিপতিদের দলদাসে পরিণত হচ্ছে; প্রশ্ন করলেই কেন শুনতে হবে মাওবাদী, দেশদ্রোহী, সন্ত্রাসবাদী?

এখন অনেকে বলবেন পুঁজিছাড়া দেশ চলবে কি করে? তাদের উদ্দেশ্যে বলি বর্তমান পৃথিবীতে পুঁজির অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মুক্ত অর্থনীতির বিরাট ভূমিকা রয়েছে। মুক্ত অর্থনীতির মূল কথা হল পুঁজি থেকে আরো পুঁজির সৃষ্টি এবং এভাবেই দেশের জিডিপি বৃদ্ধি এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন। এখন প্রশ্ন হল পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পেল দেশের সম্পদ বৃদ্ধি পেল সবই ঠিক আছে কিন্তু প্রশ্ন হল দেশের প্রান্তিক মানুষেরা এর ফলে কি পেল? তাঁদের জীবন যাত্রার মান কতটা উন্নত হল?

বাস্তব অভিজ্ঞতায় আমরা কি দেখি- এই পুঁজির শোষণে মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত এবং জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। বর্তমান দিনে বিভিন্ন কলকারখানায়, অফিসে 12 ঘন্টা কাজ প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়। শ্রমিকদের স্বার্থে 8 ঘন্টা কাজের দাবিতে যে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল তাঁর উদ্দেশ্য আজ বহু অংশে লঙ্ঘিত হচ্ছে। ‘ধান্দার ধনতন্ত্র’ শ্রমিকের রক্ত মাংসকে পুঁজি করেই বেড়ে উঠেছে, তাই শ্রমিকের জীবনের অধিকারগুলি আজ বহু অংশে লঙ্ঘিত হচ্ছে। মার্কসীয় দর্শন অনুযায়ী একজন সুস্থির মানুষের জীবন হওয়া উচিত 8 ঘন্টা কাজ, 8 ঘন্টা অবসর ও 8 ঘন্টা বিনোদন। তবেই একজন মানুষ সুস্থভাবে তাঁর দেশ, সমাজ, সভ্যতা সম্পর্কে চিন্তা করতে পারবে! অথচ আধুনিক যুগে আমরা কি দেখি?

মনে হয় আমরা শিল্প বিপ্লবের আদিম সময়ে এসে উপস্থিত হয়েছি যেখানে পুঁজির শাসনই শেষ কথা। এই পুঁজিবাদী অর্থনীতি মানুষের জীবনের বেঁচে থাকার নূন্যতম অধিকারটুকু কেড়ে নিচ্ছে। কাজের সময়ের কোন বাধ্যবাধকতা নেই 12-14 ঘন্টা কাজ হামেশাই লক্ষ্য করা যায়, নূন্যতম মজুরি ও দেওয়া হয় না, সেইসঙ্গে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে ও এগুলির ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তথ্যপ্রযুক্তির মত ক্ষেত্রে তো ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। মালিকের হাতে অধিকার তুলে দেওয়া হচ্ছে যখন ইচ্ছা শ্রমিক নিয়োগ করতে পারবে ও যখন ইচ্ছা ছাঁটাই করতে পারবে অর্থাৎ কাজের কোন নিরাপত্তা নেই। এই কাজের নিরাপত্তা না থাকার কারণেই মানুষ খরচা করতে ভয় পাচ্ছে যার জন্য এই মন্দা দেখা যাচ্ছে। কাজের নিরাপত্তা না থাকায় মানুষের জীবনে শান্তি নেই, মানুষ এখন তীব্রভাবে অসুখী!

সাম্প্রতিক 2019 সালের ওয়াল্ড হ্যাপিনেস ইনডেক্সে বিশ্বের 156 টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান- 140 তম। এমনকি প্রতিবেশী পাকিস্তানের স্থান- 67 তম, এছাড়া এই ইনডেক্সে বাংলাদেশ- 125, চীন- 93, শ্রীলঙ্কা- 130, নেপাল- 100 ও ভুটানের মতো ছোট দেশের স্থান- 95 দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ ভুটানের মত দেশের অধিবাসীরা ভারতীয়দের সাপেক্ষে অনেক সুখী রয়েছে। (এখানে উল্লেখ্য এই ইনডেক্স সমাজ, অর্থীনীতি, পরিবেশ, বাকস্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে তৈরি হয়।) তাহলে প্রশ্ন হল ধান্দার ধনতন্ত্র মানুষে জীবনের কি উন্নয়ন ঘটিয়েছে? এটাই কি পুঁজিবাদী ধনতন্ত্রের উন্নয়ন? সমস্ত তথ্য প্রযুক্তি ও বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থায় কর্মরত মানুষদের কাছে আমার প্রশ্ন আপনারা কি এইরকম শ্রমনীতি, পুঁজির শাসন মেনে নিতে চান?

অথচ পুঁজিপতিদের ধান্দাবাজ মিডিয়া হাউস গুলি উদগ্র কন্ঠে ঘোষণা করছে দেশের সার্বিক উন্নয়ন তখনই সম্পন্ন হবে যখন দেশে সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ ও পুঁজির প্রসার ঘটবে। যেন সংস্কার ও বেসরকারিকরণ করলেই সমস্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব। তা প্রশ্ন হল শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মত মৌলিক চাহিদাগুলির পরিষেবা ও যদি সমস্তই বেসরকারিকরণ করে দেওয়া হয় তাহলে দেশের জনসাধারণ কি এই নূন্যতম পরিষেবাগুলি পাবে? শিক্ষার যদি সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ হয় তাহলে আমার মত নিম্নবিত্ত বাড়ির সন্তানরা কি শিক্ষা অর্জন করতে পারত? সাধারণ মানুষের পক্ষে কি সম্ভব লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা করানো? লাভজনক শিল্প সংস্থাগুলিকে বেসরকারিকরণের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষগুলির যে কাজের নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তা কতটা যৌক্তিক? আসলে ব্যাক্তিগত ভাবে সংবাদ সংস্থার সঙ্গে কিছুদিন যুক্ত থাকার ফলে জানি এরাও কর্পোরেট সংস্থাগুলির তুলনায় কোন অংশে কম নয়, এরাও তার কর্মচারীদের কি পরিমাণ শোষণ করে, তা না দেখলে বোঝা যায় না। এই সংবাদ মাধ্যমগুলি ধান্দার ধনতন্ত্রের যোগ্য উত্তরসুরি! তাই এরা শ্রমজীবী, নিপীড়িত মানুষের কথা বলবে সেটাই আকাশ কুসুম কল্পনা মাত্র। যারা সামান্য বিজ্ঞাপনের জন্য নিজেদের চরিত্র বিক্রি করে দেয়, তেমন মিডিয়া হাউস ও সাংবাদিককুল মানুষের কথা বলবে, গণতন্ত্রের কথা বলবে, শ্রমজীবী মানুষের জীবন যন্ত্রণা নিয়ে কথা বলবে এ আশা করাই বৃথা! তাই এরা এই পুঁজিবাদী অর্থনীতির উদগ্র সমর্থক।

বস্তুত মোদীর শাসনে এই পুঁজির শাসন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নির্মমভাবে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটছে! সাম্প্রতিক অক্সফোমের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় দেশের 1% মানুষের হাতে দেশের মোট সম্পদের 73% কুক্ষিগত রয়েছে। অন্যদিকে NSSO এর রিপোর্ট অনুযায়ী গত 45 বছরে সর্বাধিক 6.1% বেকারত্ব দেখা যাচ্ছে। গত মোদী জামানায় 5 বছরে মোট 10 কোটি বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনীতিতে তীব্র মন্দার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে। চারিদিকে গাড়ি, বিস্কুট ইত্যাদি শিল্পে ছাঁটায় দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ছয় বছরে সর্বনিম্ন 5% এ নেমে এসেছে। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন মোদী সরকারের আমলে জিডিপি নির্ণয়ের পদ্ধতি পরিবর্তন করা হয়েছে এর ফলে বৃদ্ধি বেশি দেখানো হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে ভারতের বৃদ্ধির হার 2.5 – 3% তাই প্রকৃতপক্ষে দেশের অর্থিক অবস্থা খুবই সঙ্কটজনক অবস্থা দিয়ে যাচ্ছে! আসলে হিন্দু মুসলমান রাজনীতি, গোরক্ষা, ইন্টারনেট মহাভারতের আমলে ছিল, গোমূত্র পান করলে ক্যান্সার ঠিক হয়ে যাবে এরকম চিন্তাভাবনা থেকে কি দেশ চলে? দেশ চালানো কোন ক্লাব চালানো নয় এই সত্যটি মোদী সরকারকে বুঝতে হবে।

এখন অনেকে বলবেন নির্বাচনে মোদীর জয়ের ফলে এই প্রশ্নগুলি তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি সমস্ত বিষয়কে নির্বাচনের আঙ্গিকে দেখা ঠিক নয়। নির্বাচনে জিতেছে মানেই যে দেশের বাস্তবতা পরিবর্তন হয়ে গেছে তেমন নয়। সত্য, মিথ্যা হয়ে গেছে এমন ও নয়, সত্য ঠিকই আছে উপযুক্ত সময় হলে তা তীব্রভাবে প্রকাশ ঘটবে, যা বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে। দেশের রাজনীতিতে দেখা গেছে বহু যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনে হেরে গেছে আবার বহু অযোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়যুক্ত হয়েছে। তাই নির্বাচনের আঙ্গিকে ইতিহাস বিশ্লেষণ করা ঠিক নয়। এই কারণেই অনেক বিশ্ববরেণ্য ব্যাক্তিত্ব গণতন্ত্রকে ‘মূর্খের শাসন’ বলে অভিহিত করেছেন!

এখন প্রশ্ন হল এই জিডিপি বৃদ্ধির ফলে দেশের প্রান্তিক মানুষের কি লাভ হবে? অর্থনীতিতে দেখা গেছে এই জিডিপি বৃদ্ধির সুফল একশ্রেণীর মানুষ সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে। এর ফলে দেশে আয় বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে ‘ধনী আরও ধনী হচ্ছে, গরীব আরও গরীব হচ্ছে’। বাজার অর্থনীতি ‘চুঁইয়ে পড়ার তত্বে’ বিশ্বাসী। এই নীতি অনুসারে সম্পদ ক্রমশ উপর স্তর থেকে নিচের দিকে প্রসারিত হয়। বাজার অর্থনীতির নীতি কি আমরা বাস্তব জীবনে উপলব্ধি করি? একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যাবে। মনে করুন আপনার এলাকার এক বেকার ছেলে চাকরি পেয়েছে। মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল আয় বাড়লে ভোগের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। এই হিসাবে এই অর্থনৈতিক তত্ত্বে আশা করা হয় মানুষের ভোগের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে এবং চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। চাহিদা বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং এভাবে অর্থনীতিতে পুরো টাকা ছড়িয়ে পড়বে ও সকলের আয় বৃদ্ধি পাবে। যেমন- উক্ত ব্যক্তি কোন জামাকাপড় কিনল সেক্ষেত্রে টাকাটি কাপড় বিক্রেতার কাছে এল, কাপড় বিক্রেতা হয়ত চাল কিনল সেক্ষেত্রে টাকাটি চাল বিক্রেতার কাছে গেল, আবার চাল বিক্রেতা মাংস কিনল টাকাটি মাংস বিক্রেতার কাছে গেল এভাবে উপর থেকে নীচের স্তরে টাকার প্রসারণকে ‘চুঁইয়ে পড়ার তত্ব’ বলে।

মানব মনন বড় বিচিত্র বাস্তব অভিজ্ঞতায় আমরা কি দেখি? হয়ত অধিক ধনী মানুষ চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তিনি বাজারে গিয়ে 500 গ্রাম মাছ কিনছেন, অন্যদিকে তুলনামূলক গরীব মানুষ সেখানে 1 কেজি মাছ কিনছেন। এভাবে সম্পদ একজায়গায় কুক্ষিগত থাকে এরফলে এই তত্ত্ব ঠিকভাবে কাজ করে না বড়লোক আরও বড়লোক ও গরীব আরও গরীব হতে থাকে। অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও বাস্তবের মধ্যে বিরাট ফারাক দেখা যায়, তাই সম্পদের সুষম বন্টন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বিজেপি ও কংগ্রেসের মতো দলগুলি এবিষয়ে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না। বর্তমানে পার্লামেন্ট যেন কিছু ব্যবসায়িক পরিবার ও রাজনৈতিক পরিবারের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তাই স্বভাবতই এই বিত্তশালী পরিবারের সন্তান সন্ততিরা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি নির্ধারণ করবে এ আশা বড় দুরাশা! তাই দেশের গরীব, প্রান্তিক, খেটে খাওয়া, শ্রমজীবী মানুষের জীবন যন্ত্রণা নিয়ে কথা বলার জন্য সংসদে বামেদের উপস্থিতি একান্ত কাম্য!

অথচ কঠোর বাস্তবতা হল এবারের সংসদে বামপন্থীরা প্রায় অস্তিত্বহীন। বামেদের এই অস্তিত্বহীনতা পুঁজির কারবারিদের তাদের অনুকূলে আইন প্রণয়ন করতে সুবিধা প্রদান করবে। তাহলে প্রশ্ন হল বামেদের এই অবস্থার কি পরিবর্তন ঘটবে? নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুসারে প্রতিটি ক্রিয়ার সমান এবং বিপরীত মুখি প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এখন সর্বাগ্রে প্রয়োজন কোন জিনিসের অভাব অনুভূত হওয়া, কথায় আছে- ‘অভাব হল আবিষ্কারের জননী’। তাই একদিকে যখন কর্পোরেট ও হিন্দুত্ববাদী সরকার ক্ষমতায় আসবে তখন স্বাভাবিক ভাবেই কর্মের সমস্যা, মানুষের জীবন যন্ত্রণা বৃদ্ধি পাবে। তখন মানুষের মধ্যে চেতনা জাগ্রত হবে এবং এই পরিপ্রেক্ষিতে স্বাভাবিক ভাবেই বামপন্থার প্রতি মানুষের আকর্ষণ বৃদ্ধি পাবে। তবে বামেদের চিরাচরিত কৌশল, বস্তাপচা শ্লোগান, ঐতিহাসিক ভুলের নীতি, বৃদ্ধতন্ত্রের চর্চা, সুবিধাবাদী অবস্থান এগুলিকে সরাতে হবে; যুব নেতৃত্বকে সামনের সারিতে আনতে হবে এবং ঠাণ্ডা ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামের রাজনীতি করতে হবে তবেই বামপন্থার প্রসার ঘটবে।

বামেদের দিক থেকে আশার কথা হল শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কানাইয়া কুমার, অনির্বাণ, শেহলা রসিদ, উমর খালিদের মত তরুণ প্রজন্মের বাম নেতৃত্ব উঠে আসছে এবং এই JNU কেন্দ্রিক ছাত্রনেতারা আগামী দিনে দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং বামপন্থার দ্রুত প্রসার ঘটাবে, এটা আশা করাই যায়। তাই বামপন্থা শেষ একথা বলার সময় এখনও আসেনি বরং বলা ভালো আগামী দিনে বামেরা আবার পূর্ণশক্তি সঞ্চয় করে সংসদীয় রাজনীতিতে ফিরে আসবে এটাই বাস্তবতা। এতে দেশের ও দশের মঙ্গল। যদিও এরজন্য বামেদের এখনও বহু পথ চলার বাকি রয়েছে।

নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হবে বামেদের যা ভরাডুবি তাঁতে কেরলা, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতে বাম শক্তির শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। কেরালাতে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর পরিবর্তন হয় তাই রাজ্য সরকারের পরিবর্তন হতেই পারে, তবে এরূপ বিপর্যয় আশাকরা যায় নি। অন্যদিকে ত্রিপুরাতে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত বাম শক্তি বিজেপির ব্যাপক সন্ত্রাসের কারণে নির্বাচন সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেনি, তাছাড়া ত্রিপুরার মতো ছোট রাজ্যের ফলাফল দেশের রাজনীতিতে খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল একদা বামেদের শক্ত ঘাঁটি পশ্চিমবঙ্গে বামেরা কি কখনও প্রসঙ্গিক হয়ে হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে?

চলবে…

তথ্যসূত্র:-

1. উইকিপিডিয়া।

2. The Hindu.
https://www.thehindu.com/business/Economy/indias-gdp-growth-slows-to-5-in-april-june/article29301252.ece

3. ইন্টারনেট ও বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যসূত্র।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 − 12 =