জীবনে দুটি সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে

তুষার পাতের সাথে ঝড়ো হওয়া, সামনের দিকে তাকালেই মুখের উপর সুচের মতো তুষারের আঘাত এসে লাগছে, মুখ তুলে সামনের দিকে তাকানোর উপায় নেই, কালো রঙের শীতের পুরু জ্যাকেট, মাথায় উলের টুপি তুষারে আচ্ছাদিত হয়ে সাদা রং ধারণ করেছে, সদারত্যালিয়া স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে ট্রেনে উঠে পরলেই এই তুষার ঝড়ের প্রকোপ থেকে মুক্তি পাবো। এক ঘণ্টা নাগাদ শহরে পৌঁছে যাবো ততক্ষণে তুষার ঝড়ের প্রকোপটা হয়তো কিছুটা কমবে, ট্রেন ছেড়ে দিতে আরও মিনিট পনেরো বাকী, ট্রেনের কামরায় উঠেই গুটিসুটি হয়ে সিটের উপর বসে গায়ের উপর তুষার গুলো ঝেড়ে নিচ্ছি, জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাতেই মনে হচ্ছে উঁচু উঁচু পাইন আর ওক গাছগুলো তুষারের ভারে শত বছরের বৃদ্ধের মতো খোলা আকাশের নীচে দাড়িয়ে আছে, যৌবন ফিরে পেতে বেশ কয়েকটা মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে, গাছ হয়ে জন্মালেই হয়তো ভালো হতো, শত বছর আয়ু পেয়েও প্রতি বছর গ্রীষ্ম কালে নতুন যৌবন ফিরে পেতাম। দু একজন করে ট্রেনের যাত্রী বাড়ছে, বন্ধ দরজাটা বাইরে থেকে বোতাম টেপা মাত্রই খুলে যাচ্ছে আবার একটু পর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কেউ একজন খুবই পরিচিত বলেই তো মনে হচ্ছে ঠিক পাশ কাটিয়ে সামনের সিটে জায়গা নিলো, গলায় মাফলার জড়ানো মাথায় টুপি পরিহিত অবস্থায় তাকে দেখেই মনের অজান্তেই বুকের এককোণে এক অজানা স্বর্গীয় অনুভূতি আমাকে কোথায় যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে , আমি কি তাকে সত্যি চিনতে পেরেছি? হবে হয়তো, সে কিন্তু হাতের বইটার দিকেই মনোযোগ দিয়ে রেখেছে, আমাকে দেখলে তার মনের ভেতর কিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে তা জানা নাই, আমার ধারণা যদি সঠিক হয়ে থাকে তবে নিশ্চিত ভাবেই বলতে পারি আজ অনেকগুলো বছর পর তাকে দেখছি, মাথার টুপিটা সরিয়ে নিতেই সোনালী চুলের ঝুটি দুটো ঘাড়ের উপর এলিয়ে পড়তেই মনের ভেতর সেই অজানা স্বর্গীয় অনুভূতিটা আবারও আনচান করে উঠলো। এভাবে এতগুলো বছর পর হঠাত্ করেই ট্রেনের কামরায় দেখা হবে ঠিক এ রকম একটা পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না, আকাশ পাতাল কতকিছু যে একসাথে ভাবনার সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে যার কুল আর কিনারা কোথায় জানা নাই, সময় পেরিয়ে যাচ্ছে ট্রেনটাও কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেড়ে দেবে তবে কি আমি নেমে যাবো, অজানা স্বর্গীয় অনুভূতিটা একটু একটু করে কষ্টে রূপ নিচ্ছে, ভয় হচ্ছে এই কষ্টটা আবার সইবার মত ক্ষমতা আমার অবশিষ্ট আছে তো? কিছুক্ষণ পর পর বার বার আমার দৃষ্টিটা তার দিকেই আটকে যাচ্ছে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই বুঝতে পারছি সেই তুষারের ভারে শত বছরের বৃদ্ধের মতো দাড়িয়ে থাকা পাইন আর ওক গাছগুলো হয়তো আমার মনের অনুভূতিগুলো বুঝতে পেরে সহানুভূতি জানাচ্ছে, ঝড় যে আমার অন্তরেও বয়ে যাচ্ছে সেটা দেখার মতো দৃষ্টি হয়তো একমাত্র ঐ গাছগুলোরই আছে। এতগুলো বছর পার হয়ে গেছে, মনের ভেতরের জেগে ওঠা স্বর্গীয় অনুভূতির কষ্টটাকে বাড়িয়ে লাভটা কোথায় তাই ট্রেনটা ছেড়ে দিতেই সামনের সিটে উল্টো দিকে খালি জায়গাটায় বসে গেলাম অন্তত চোখাচোখির হবার সম্ভাবনাটা এখন আর নেই।
তখন সবে মাত্র এদেশে এসেছি, ভাষা শেখার জন্যে নিয়মিত ক্লাস করে যাচ্ছি শিখছিও বটে তবে চর্চাটা একেবারেই নাই বললেই চলে, আমাদের কাজের জায়গাতেই তার সাথে পরিচয় ভাষা শেখার পাশাপাশি কাজও করে যেতে হচ্ছে আর আমাকে বেশ আন্তরিকতার সাথেই টুকটাক ভাষা শিখতে সে ভীষণ রকম আগ্রহ নিয়েই সাহায্য করছে, সেই সাথে কেন যেন দিন দিন তার প্রতি দুর্বলতাটাও বেড়েই চলছে যদিও সাহস করে মুখ ফুটে কথাটি তাকে জানানো হয়নি শত হলেও বাঙালি একটি ছেলের প্রতি এক অপরূপ সুন্দরী শেতাঙ্গিনীর অনুভূতি কি হবে সেটা জানার চেষ্টা করাই বৃথা, সুইডেনের লোকজন প্রায় সবাই খুব ভালো ইংরেজি জানে আর আমার ইংরেজিতে দক্ষতা ভালই তাই ইংরেজি দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছি আর ঠিক সে কারণেই সুইডিশ ভাষার উপর চর্চাটা হয়ে উঠছে না। গ্রীষ্মের বিকেলে শহরের কেন্দ্র স্থলে কালচারাল সেন্টারের সামনে কাজের শেষে অনেকেই ধাপে ধাপে সিঁড়ির ওপর বসার মতো খোলা জায়গাতে আড্ডা দিতে ভিড় জমায়, মাঝে মধ্যে আমারও এদিকটায় আসা যাওয়া হয় বটে তবে কারুর সাথে যে খুব একটা মেলামেশা তা নয়। খোলা জায়গার এক পাশে ধাপে ধাপে সিঁড়ির ওপর বসে রোদের তাপ পোহাতে অনেক মানুষের ভিড় জমে, নিতান্ত প্রয়োজন না হলে কেউ কারুর সাথে গায়ে পরে খাজুরে আলাপ জুড়ে দেয়না, কিন্তু আমাদের মত সদ্য আগত বাংলাদেশী যুবকদের কথা ভিন্ন, সুন্দরী রমণীরা একা কোথাও বসে থাকতে দেখলেই পাশে বসে খানিক খাজুরে আলাপ জুড়ে দিলে তো আর দোষের কিছু নয়। শ্যামবর্ণা ভিনদেশী ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের প্রতি পশ্চিমাদের কৌতূহল তখনও আছে, সুযোগটা হাত ছাড়া কেইবা করতে চায়, উপরন্তু ইংরেজি ভাষা চর্চা করতে সুইডিশদের যে দুর্বলতা সেটা আমার আগেই জানা হয়ে গেছে কাজেই সেই ভরসাতেই কোন রমণীর সাথে বন্ধুত্ব করতে তো কোনই অসুবিধা হবার কথা না। এতদিন তো সাহস করে কিছুই বলিনি শুধু বন্ধুর মতই একে অপরের পাশে বসে গল্পে মেতে উঠি যদিও আজ শুক্রবার সন্ধ্যে থেকেই ছুটির দিনের শুরু তাই দুজনার তাড়া বলতে কিছুই নেই হাতে আজ অফুরন্ত সময়, পাশেই একটি বারে সামনে খোলা আকাশের নীচেই টেবিল খালি পেয়ে দুজনাতে বসে গেলাম, গল্পের ফাঁকে হঠাত করেই খুব আলতো ভাবেই সে আমার হাতের উপর নিজের হাতটা রেখে দিলো, এভাবে হয়তো অপ্রত্যাশিত কোন মুহূর্তের জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না, আবারও সেই স্বর্গীয় অনুভূতিটা আমাকে কেমন যেন অবশ করে দিচ্ছে, মনে হচ্ছে আমার উঠে দাঁড়াবার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছি, কিসের যে সেই অনুভূতি সেটা অনুধাবন করার চেষ্টা করছি হয়তো কিছু একটা পেয়েও হারাবার ভয় নয়তো? নিজেকেই হারিয়ে ফেলার ভয় আরও কত কিছুই যে আমার এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কটাকে তোলপাড় করে দিচ্ছে তা ঠিক বলে বোঝাতে পারবো না। কি কারণে হঠাত করেই এই ভিন দেশী একটি ছেলের হাত ধরা, ঝলমল বিকেলটাকে সোনালী আলোতে ভরিয়ে তোলা তার কিছুই তো তাকে জিজ্ঞাস করা হলো না, শুধু এতটুকুই বুঝতে পেরেছি যে এই এতদিনে আমরা একে অপরের অনেক কাছে চলে এসেছি, এখান থেকে ফিরে যাবার পথ নেই, আস্তে আস্তে মনে হচ্ছে এই পৃথিবীতে আমার জন্ম নেয়াটাই হয়তো তারই জন্যে, দিন দিন মনের ভেতর কেন জানি এই ধারনাটি প্রকট ভাবেই জন্ম নিচ্ছে যে আমার মতো একটা অথর্ব অকর্মণ্যের জীবনটা এত সার্থক, কেন যে এতটা সফল হয়তো ঠিক তারই জন্যে। ফ্রি মিক্সিঙের সমাজে নিজেকে যতটাই আধুনিক সাজাবার চেষ্টা করিনা কেন, চিন্তা চেতনায় বাঙালি পনাটা তো রক্তে মাংসে মিশে আছে। প্রেমের দৃষ্টি ভঙ্গিটাও সেই নিজের সংস্কৃতির বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, কারুর সাথে মেলামেশা করতে গেলেও সব ক্ষেত্রেই একটু রাখঢাক থাকে, তবে খুব যে একটা পিছিয়ে আছি তাও কিন্তু নয়, কিন্তু কি একটা অদ্ভুত বিষয় আমার আজ পর্যন্ত তাকে জিজ্ঞাস করো হলো না “কি দেখলে তুমি আমাতে”। যাক, জিজ্ঞাস না করাটাই ভালো কারণ কিছু একটা পেয়েও আবার যদি হারিয়ে ফেলি তবে এ জীবনে বেচেঁ থাকাটাই দায় হয়ে দাঁড়াবে। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের বাইরে যাওয়া আসা হচ্ছে আর কাজের জায়গাতে অনেকেই বিষয়টি জেনেও গেছে, কেউ জেনে গেলেই বা ক্ষতি কি, দুজন মানুষ একে অপরকে কাছে পেয়েছে এটাতে তো অন্যায়ের কিছু না বরং আমি বেশ আনন্দ চিত্তেই এই ভালোলাগার প্রতিটি মুহূর্ত প্রতিটি ক্ষণই অন্তর দিয়েই অনুভব করছি। এই পৃথিবীতে কাউকেই যে তার চাইতে সুন্দর মনে হয়না এ ব্যাপারে আমি সুনিশ্চিত, হয়তো সে নিজেও বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেই তার জগতে আমাকে আষ্ঠ্যেপৃষ্ঠ্যে জড়িয়ে নিচ্ছে, আমিও সেই স্বর্গীয় অনুভূতির অতলে ডুবে যাচ্ছি।
দিন মাস ক্ষণ পেরিয়ে যাচ্ছে, তার সম্পর্কে শুধু এতটুকুই জেনেছি যে বেশ কবছর যাবত তার বর্তমান ছেলে বন্ধুর সাথে সংসার করার পর আমার সাথে পরিচয়ে জীবনটাকে নতুন ভাবে খুঁজে পেয়েছে, তিন বছরের একটি ছেলে সন্তানও আছে, তাতে কি আমার সেই স্বর্গীয় অনুভূতির কোথাও কোন কমতি পরেছে বলে মনে হচ্ছে না বরং আমি সেই স্বর্গীয় অনুভূতির অতলেই হারিয়ে যাচ্ছি।
ছয়মাস পর সে একাই গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে পনেরো দিনের জন্যে দেশের বাইরে চলে গেল, কথা ছিল ফিরে আসার দিন এয়ারপোর্ট থেকে তাকে রিসিভ করবো, সে এলো ঠিকই কিন্তু কথা হলো মাত্র পাঁচ মিনিট, খুবই বিষণ্ণ লাগছিল তাকে, কিছু খেতে কোথাও নিয়ে যেতে চাইলাম উত্তরে সে বললো না আজ থাক, আমাকে শুধু এতটুকুই জানালো :- “তুমি আমাকে এক দুর্বল মুহূর্তে মানসিক ভাবে সহযোগিতা করার জন্যে তোমাকে অন্তর থেকেই ধন্যবাদ, আমার ছেলে বন্ধুটি এখন আমাকে বুঝতে পেরেছে, আমাকে নিতে সে একটু পরেই এয়ার পোর্টে আসছে তুমি বরং বাসায় চলে যাও কাল কথা হবে।” সেই স্বর্গীয় অনুভূতির অতলে ডুবে যাওয়া আমি কোথায় দাড়াব? আমি কি আবার উঠে আসতে পারবো?
আজ ঠিক বিশটি বছর পর তার সাথে আবার এই ট্রেনের কামরায় দেখা, এভাবেই যে জীবনের দুটি সময়ের মুখোমুখি দাড়াতে হবে তা কোনদিন কল্পনা করিনি, ট্রেনটি এর মাঝেই দুটো স্টেশন ফেলে এসেছে হয়তো দু একটা স্টেশন পরেই সে নেমে যাবে আমাকে যেতে হবে অনেক দুরের পথ।
শহরের স্টেশনে ট্রেনটি পৌঁছে গেল আর হঠাত্ কাঁধের উপর একটি হাতের ছোঁয়াতে পেছন ফিরে তাকাতেই সে বলে বলে উঠলো :- “কেমন আছো, তোমাকে আগেই দেখেছি, বদলাও নাই এতটুকু, তা আমাকে দেখেই উল্টো দিকে ফিরে বসেছ, কথা বলতে চাওনি বুঝি?”
উত্তরে বললাম, নাহ এমনি, তা তোমার দিনকাল কেমন কাটছে? একাই আছ নাকি সঙ্গী সাথী কেউ আছে?
উত্তরে সে জানালো এয়ারপোর্টে তার ছেলে বন্ধুটি তাকে নিতে এসেছিল বটে তবে সেই দিনটাই ছিল তাদের দাম্পত্য জীবনের শেষ দিন আর তারপর থেকেই সে একাই আছে আর ভালো আছে। অনেক অনুরোধ করেছিল কোথাও বসে একটু কফি পান করি যদি হাতে সময় থাকে।
সত্যি আমার হাতে সময় একদমই ছিল না কারণ আমার স্ত্রী শহরে আমার জন্যে অপেক্ষায় আছে, আজ আমাদের শপিং করার কথা।
সেই স্বর্গীয় অনুভূতি আমাকে আজও জাগিয়ে তুলেছে, জাগিয়ে রেখেছে ঠিকই তবে ভিন্ন সুরে।
ট্রেন থেকে নেমে যেতেই মনে হচ্ছিলো পেছন থেকে একটা করুণ কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে, একবার পেছন দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকে দেখার চেষ্টা করেছিলাম বটে কিন্তু প্লাটফর্মে অসংখ্য মানুষের ভিড়ে সেই চাপা কান্নার আওয়াজটা হারিয়ে যাচ্ছে, মানুষের ভিড়ে আমার বহুদিনের পুরনো এক অতীত আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল, তার চলে যাওয়াটা জীবনের এক অজানা স্বর্গীয় অনুভূতিকে চিতায় উঠিয়ে দিয়ে গেল।
— মাহবুব আরিফ কিন্তু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

27 − 22 =