ধর্মনিরপেক্ষতা ও বর্তমান বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের সংবিধানের চারটি মূলনীতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা অন্যতম। জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্বারা এই আদর্শ ধারণ করেছিলেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের খুব নিকটে দাঁড়িয়ে আমরা। স্বাধীনতার এতোটি বছর পার করার পরও মনে হচ্ছে  ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশেরে স্বপ্ন যেন অধরাই থেকে যাবে। খুব দ্রুত এই ভঙ্গুর  পরিস্থিতির উন্নতি আশা করা যায় না।

 

তথাকতিত ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের নেতা-কর্মীদের মুখে  ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি থাকলেও কার্যত ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে পদতলে আশ্রয় দিয়ে ক্ষমতার আসনে নির্বাকভাবে বসে আছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার এই পন্থা বাংলাদেশে অনেক পুরনো। বর্তমান সরকার একই পথের পথিক। ধর্মনিরপেক্ষতা, এই মূলনীতিটির নিয়ে বর্তমান আওয়ামীলিগ সরকারের অবস্থান দূয়াষাপূর্ণ ।  ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও, ঢালাওভাবে এই নিয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করার পরও সংবিধানের বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম ও রাষ্টধর্ম ইসলাম এর সংশোধন তো ধুরে থাক এই ব্যাপারে তাদের অবস্থান নিশ্চুপ। আওয়ামীলিগের সহযোগী বাম রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, একই। তাছাড়া সরকারের বাইরের বাম ঘরনার রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো বক্তব্য এই বিষয়ে পাওয়া যায় না। রাজনৈতিক দলের বাইরে যারা মনে করেন বিষয় দুটি সংবিধানে থাকা উচিৎ নয়, তাদের দেখে মনে হয় সংবিধান থেকে বিষয় দুটি বাদ পড়বে না বলে তাঁরা এইরকম তাঁরা ধরেই নিয়েছে। বাকিদের দেখে মনে হয়, এই রকমই তো থাকা উচিৎ।  সরকার ধর্মীয় রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে জামাতকে রাজনীতির মূল মঞ্চের বাইরে পাঠালেও, এই ব্যাপারে সরকারের অবস্থান জামাত  পর্যন্তই সিমাবদ্ব রইলো।

ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ এই ছবিটির মত কাগুজে ও কাল্পনিক

এখনো বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত ইসলামিক রাজনৈতিক দল হলো ১০টি৷ জামাত নিষিদ্ব হলেও জামাতের নীতির  সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ  এই রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে কোনো কথা শুনা যায় না। নিবন্ধিত দলগুলোর বাইরে সারাদেশে আরো শতাধিক ইসলামি রাজনৈতিক দল আছে৷ দেশজুড়ে এদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাছাড়া দেশের সর্বত্র হওয়া ওয়াজ মাহফিলে হুজুরদের মুখে  ইসলামিক বাংলাদেশের কথা হরহামেশাই শুনা যায়। বিষয়টিকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলা হয় যেন, এইটা প্রতিটি মুসলমানের ইমানি দায়িত্ব। তাদেরকে এর জন্য এর জন্য লড়াই করারও আহ্ববান জানানো হয়। ওয়াজ মাহফিলে হুজুরদের উসকানি মূলক বক্তব্য সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে। এই সকল রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক দল ও হুজুরদের কল্যানে দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ ইসলামিক বাংলাদেশ বিষয়টি সম্পর্কে না বুঝেই এই  মতাদর্শে বিশ্বাস করে। সাধারণ মানুষ ভুল পথে পরিচালিত হয়। ফলে আমরা দেখি দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির অবনতি।

সরকারের এই বিষয়ে নিশ্চুপ ভূমিকার ফলে,  দেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও হিজবুত তাওহিদের মতো দলের উত্তান লক্ষ্য করা যায়। গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে  ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩০৩ আসনে প্রতিদন্দিতা করে। নির্বাচনে, আওয়ামী লীগ নেত্রত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সজ্ঞে থাকা তরীকত ফেডারেশন ও অংশগ্রহণ করে। শুধু ইসলাম নয় অন্যান্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈকি দলও আছে বাংলাদেশে৷ যেমন, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু জোট৷ ৫০টি হিন্দু রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সমন্বয়ে আছে বাংলাদেশ জনতা পার্টি বা বিজেপি৷

পঞ্চদশ সংশোধনীর পর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হলেও বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলতে হলে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো আছে তার সমাধান খোঁজা অতীব জরুরী। বিসমিল্লাহ আর রাষ্ট্র ধর্মের মাঝখানে পড়ে থাকা সেক্যুলারিজম দেশের ইসলাম ধর্ম অনুসারী ছাড়া অন্য ধর্ম অনুসারী ও কোনো ধর্ম অনুসরন না করা জনসংখ্যাকে সমাজের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিনত করে রেখেছে। ধর্মকে ব্যবহার করে এই রাজনীতি, সরকারের নিশ্চুপতা, ধর্মীয় দলগুলোর প্রভাব আর হুজুরদের বয়ানের কল্যাণে ইসলামিক বাংলাদেশ ও সাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে।  এর  থেকে সহজে মুক্তি মিলবে বলে মনে হয় না।

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 1