মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর পাঠ

 

বাংলার ইতিহাসে, নিঃসন্দেহে, ৭১’এর মুক্তিযুদ্ধ সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। নয় মাসের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের, তবে ৭১ এর ঐ নয় মাসের পঠভূমি অনেক দীর্ঘসময় ধরেই রচিত হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করার অবকাশ নেই।

এবং এই দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক কম হয় নি। এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়, এবং এই তর্ক হওয়াটা অত্যন্ত ভালো একটা দিক। কিন্তু, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা এই মহান স্বাধীনতার যুদ্ধের নির্মোহ, নিরাবেগ, নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনায় সফল হতে পারি নি। বিভিন্ন দল-মতের চশমায় ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে প্রকৃত ইতিহাস বরাবরই চাপা পড়ে গেছে।

‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ গ্রন্থটি এই ধারা বহির্ভূত বলে দাবী করার অধিকার রাখে। এটি তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী ও সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর ভাষ্য। এখানে আলোচকদের মধ্যে- মঈদুল হাসান প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ছিলেন, তাঁর ‘মূলধারা ৭১’ নামে সুপরিচিত একটি বইও আছে, এ কে খন্দকার মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান সেনাপতি ছিলেন এবং এস আর মীর্জা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গঠিত যুব শিবিরের মহাপরিচালক ছিলেন।
বইটি গতানুগতিক ধারার কোন সাক্ষাতকার নয়, তিনজন প্রত্যক্ষদর্শীর কথোপকথন, যেখানে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বক্ষণ থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বর্ণনা।

আলোচনার শুরুটা হয়েছে অসহযোগ আন্দোলন দিয়ে, যার পরই এসেছে বহুল বিতর্কিত স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গ। এই অংশে আলোচকত্রয় অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দক্ষতার সাথে ঘটনার বিশ্লেষণ করেছেন এবং হৃদয়গ্রাহী একটা সিদ্ধান্তে এসেছেন। এরপর এসেছে সশস্ত্র লড়াইয়ের কথা যার পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীর মনস্তত্ত্বও অবধারিতভাবে ঢুকে পরেছে। এরপর যথাক্রমে আলোচিত হয়েছে পাকিস্তান ফেরত সেনা প্রসঙ্গ, যুব শিবির প্রসঙ্গ, গেরিলা তৎপরতা প্রসঙ্গ, যৌথ সামরিক নেতৃত্ব প্রসঙ্গ, অন্যান্য যেসব বাহিনী সমরে লড়ছিল তাদের প্রসঙ্গও।

সর্বশেষ দুটি প্রসঙ্গ- মুজিব বাহিনী এবং স্বাধীনতার পরবর্তী বাংলাদেশ- খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানেও আলোচকত্রয় তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, যেগুল আমাদের আজকের দৈনন্দিন রাজনৈতিক জীবনেও প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। এটা এজন্যই খুব গুরুত্বপূর্ন যে, আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব ওবং মুজিব বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংকট কতটা দূরবস্থার সৃষ্টি করেছিল তা স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হওয়ায়।

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রচিত গ্রন্থের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তথাপি এই বইটি আমাদের স্বাধীকার আন্দোলনের ইতিহাসের পাঠে অনন্য একটি সংযোজন। আলোচনার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন, আলোচকগণ এক্ষেত্রে নিজের দলমত বিশ্বাসকে চেপে রেখে যথাসাধ্য নিরাবেগ, নির্মোহ, নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা করেছেন, বলে আমি বিশ্বাস করি। তবে এই গ্রন্থের কলেবরটা আরেকটু বিস্তৃত হলে বোধহয় ভালো হতো।

সর্বশেষ মঈদুল হাসানের সর্বশেষ মন্তব্য দিয়ে শেষ করছি, “… মানুষ এখন মুক্তিযুদ্ধের সত্য কথাগুলো জানতে চায়। দলীয় রাজনীতির প্রচার মতবাদের অস্ত্র হিসেবে নয়, সত্যকথা, প্রকৃত ঘটনাটা, পক্ষপাতিত্বহীনভাবেই তাদের বলা উচিৎ, যতে সমাজে ঠিক ও বেঠিক, ভালো ও মন্দ প্রশ্নে কতগুলো স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারে। তার মধ্য দিয়েই কিন্তু সমাজটাকে, বহুধারায় বিভক্ত সমাজকে একত্র করা যাবে।”

অবশ্য পাঠ্য বইটি প্রকাশ করায় ‘প্রথমা প্রকাশন’কে ধন্যবাদ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 4 =