ধর্ম-অধর্ম (১) : মুসলিম মনস্তত্ত্ব

একজন মানুষ কী কী বিশ্বাস ধারণ করবেন আর কোন কোন বিশ্বাস ছুঁড়ে দিবেন আবর্জনায়, তা তার ব্যক্তি জীবনের ব্যাপার। কিন্তু কোন বিশ্বাসের জের ধরে কোন মানুষ যখন হিংস্রতা বা ’ভায়োলেন্সের’ দিকে ধাবিত হয় বা অনুপ্রাণিত হয়, তখন সেই বিশ্বাসের সমালোচনা করা খুব জরুরী।

ঢাকায় পুলিসের ওপর আবারও বোমা হামলা হওয়া এবং এর দায় আই এস কর্তৃক সগর্বে ঘোষিত হওয়া আমাদের নাগরিক জীবনকে রীতিমত আতংকিত করেছে। একই সাথে পুরো ব্যাপারটি এই রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্যে হুমকিস্বরূপ আর রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি চপেটাঘাত!

আজকের ভিকটিম পুলিস, কালকে বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠানের অতিথি (যেমনটি আফগানিস্তানে সমসাময়িক ঘটে গেল), আরেকদিন গানের কনসার্ট, কোন একদিন শহীদ মিনারের দিকে যাওয়া প্রভাতফেরী, সমস্ত কিছু ভেসে যেতে পারে নিরীহ মানুষের বুকের তাজা রক্তে! অবশ্য এরই মধ্যে স্বাধীন বাংলার মাটি  ধর্মভিত্তিক অশুভ শক্তির হামলায় রক্তাক্ত হয়েছে বহুবার। সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে (লেখক/প্রকাশক/বুদ্ধিজীবী) লক্ষ্য করে চালানো বহু হত্যাযজ্ঞ, রমনা বটমূলের নৃশংস বোমা হামলার দগদগে স্মৃতি (১৪ এপ্রিল,২০০১), ৬৪ জেলায় একযোগে বোমা হামলার তান্ডব (১৭ আগস্ট, ২০০৫), হলি আর্টিজানের বর্বর হত্যাযজ্ঞ (১-২ জুলাই, ২০১৬) কোন কিছুই ভুলে যাওয়ার নয়।

২০১৯ সালে এসে এই বাংলায় আবারও ধর্মভিত্তিক অশুভ শক্তির উত্থানের চেষ্টা! কীভাবে রুখবে বাংলাদেশ? সবচেয়ে বড় দু:খের কথা, এইসব কাপুরুষোচিত ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তারা তো আমাদেরই ছেলেমেয়ে, ভাই-বোন, পরিজন! অথচ এই আমরাই আবার ”ব্রেইন ওয়াশ” এর ওপর দায় চাপাই! ঠিক আছে, তাহলে বুকে হাত রেখে বলুন, “ব্রেইন ওয়াশ” টা হচ্ছে কী কী উপাদান দিয়ে?

ধর্মের পিঠ বাঁচাতে গিয়ে উৎসাহী আমজনতা “ভুল ব্যাখ্যা” শব্দ দুটি ব্যবহার করে থাকে, অর্থাৎ ধর্মগ্রন্থের বাণীর ভুল ব্যাখ্যার কারণে তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিছু মানুষ এমন সন্ত্রাসকর্ম করে থাকে! কিন্তু পরিতাপের ব্যাপার হচ্ছে, মাওলানারা যখন বিশাল জনসমাগমে উচ্চ শব্দের মাইক্রোফোন ব্যবহার করে (যেমন: ওয়াজ মাহফিলে) জেহাদের ডাক দেয়, কথিত যুদ্ধের জন্যে যুবকদেরকে আহ্বান করে, তখন কিন্তু সেইসব মজলিসে একজন মানুষকেও পাওয়া যায় না, যিনি এর প্রতিবাদ করে বলবেন, “ভুল ব্যাখ্যা” কেন করছেন? উল্টো, ইহুদী-নাসারার ধ্বংস কামনা করে যখন বক্তৃতা দেয়া হয়, প্রতিটি মানুষ তার ঈমাণী দায়িত্ব মনে করে গগনবিদারী চিৎকারে ”আমিন আমিন” বলে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয় এইসব সাম্রদায়িক বক্তব্যের। জনাব, কোথায় থাকে তখন “ভুল ব্যাখ্যার” গল্প?

বাস্তবতা হচ্ছে, যে কোন উপায়ে প্রকৃত সত্যকে চেপে রাখার নিরন্তর প্রয়াস মুসলিম বিশ্বে সদা বিরাজমান। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে ইসলাম রক্ষার কথিত দায়িত্ব নেয়া মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনগুলি কখনোই সরাসরি আই এস এর বিরুদ্ধে কিংবা তালেবানদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে রাজপথে নেমে আসে নি! এর মানে দাঁড়াচ্ছে, কোথাও কোনো ভুল নেই, নেই কোন কথিত ”ভুল ব্যাখ্যা”।

আমরা কিছু তথ্য উপাত্ত মিলিয়ে দেখতে পারি।

আফগানিস্তান ভিত্তিক ইসলামিক জঙ্গী সংগঠন তথা তালেবানদের সাথে জিহাদি যুদ্ধে যোগ দিতে মাত্র ১০/১২ টি দেশ থেকে বিদেশী যোদ্ধাদের সমাগম ঘটেছিল। আফগানিস্তানে এই যোগদান করার যে হার আমরা দেখেছি, তার থেকে প্রায় ১৩ গুণ বেশি বিদেশী যোদ্ধা ১১০ টি দেশ থেকে যোগদান করতে এসেছিল ইরাক-সিরিয়ার ইসলামিক জঙ্গী সংগঠন আই এস এ।(তথ্যসূত্র: বিবিসি নিউজ, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯/ ডিসেম্বর ১৮, ২০১৮, long war journal)

কেন বিদেশী মুসলিম যোদ্ধার হিড়িক পড়ে গেল ইরাক-সিরিয়ায়?

[সুনান আবু দাঊদ : ৩য় খণ্ড, হাদীস নম্বর ২৪৭৫]

সৌদি কর্তৃক ইয়েমেন আগ্রাসন অবশ্য হাদীসকে অনুসরণ করে নয়, বরং অর্থনৈতিক বিবেচনায় চলছে ইয়েমেন এর ওপর আগ্রাসন।  কিন্তু সিরিয়ায় প্রচুর জেহাদী যোদ্ধা বা ধর্মযোদ্ধার উপস্থিতি ধর্ম দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত।  ১১০ টি রাষ্ট্র থেকে প্রায় ৪০ হাজার বিদেশী মুসলিম যোদ্ধা ছুটে গেছে ইরাক-সিরিয়ায়।বুঝা যাচ্ছে বিষয়টা? বুঝতে পারা যাচ্ছে কে দিয়ে রেখেছে নির্দেশ? অসমাপ্ত তাণ্ডব কারা কীভাবে করবে? সেই নির্দেশনা অনুসরণ করলে কী পাওয়া যাবে পরজনমে, এমন সবকিছুই স্পষ্ট করে বলা আছে শান্তির ধর্ম ইসলামে।

এদিকে শান্তির সেইসব বার্তায় উড়ে গেছে ”ইয়েজেদী” নামের এথনিক জাতিগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, যারা কি-না বসবাস করতো ইরাকের সিনজার প্রদেশে । সেবার সমস্ত সিনজার প্রদেশ জুড়ে একের পর এক হত্যাযজ্ঞ চালায় ISIS, ঠিক যেমন ১৪০০ বছর আগের ইসলামের অনুসারীরা অভিযান পরিচালনা করতো বিভিন্ন গোত্রের ওপর। ১৪০০ বছর আগের শ্যাডো আমরা দেখতে পেয়েছি এখানে। বহু ইয়াজিদী নারীকে বাধ্য করা হয়েছে যৌনদাসী হতে, ”গনিমতের মাল” আর কি! ৪০,০০০ হাজারের বেশি ইয়েজিদী মানুষ জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নেয় সিনজার পর্বতে। তারপর কী হল?

২০১৪ সালের ৫ আগস্ট ইরাকি হেলিকপ্টার সেখানে খাদ্যসামগ্রী দিতে শুরু করে, এর দুদিন পর জরুরীভাবে যোগ দেয় প্রয়োজনীয় ত্রানসামগ্রীসহ আমেরিকান হেলিকপ্টার। এভাবেই ইসলামিক খেলাফত কায়েম এর উদ্ভট বাসনার ভিকটিম হতে থাকে এক একটি জনপদ!

এরপরের ঘটনা মোটামুটি সবার জানা। একের পর এক ’এয়ার স্ট্রাইক’ করা হয় ISIS যোদ্ধাদেরকে লক্ষ্য করে। দুর্গমতা, দূরত্ব বিবেচনায় বছরের বিভিন্ন সময়জুড়ে আমেরিকা, রাশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন কোয়ালিশন, এমনকি কিছু মুসলিম রাষ্ট্র কর্তৃক গঠিত বিভিন্ন কোয়ালিশন ISIS তাণ্ডব দমন করতে সচেষ্ট হয়। বছরের পর বছর ধরে চলা এইসব সামরিক অভিযান, সে এক লম্বা সময়ের চলমান ইতিহাস।

এদিকে এইসব যুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেছে তাদেরকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ব্ল্যাক মেইল করার জন্যে আছে পর্যাপ্ত কোরানের বাণী! একটা উদাহরণ দেয়া যাক : (সূরা আনফাল: আয়াত ১৫-১৬)

প্রসঙ্গক্রমে, ছোট্ট একটা ঘটনা টেনে আনি। প্রায় ১৪০০ বছর আগে সংঘটিত বদরের যুদ্ধকে ঘিরে চমকপ্রদ নানা ঘটনা জড়িয়ে আছে। বদরের যুদ্ধের আগের রাতে অপেক্ষাকৃত নিম্বভূমিতে অবস্থান নেয়া প্রতিপক্ষ কোরাইশদের খাবার পানি আটকে দিয়েছিলেন নবী করীম।উত্তপ্ত মরুর বুকে পানি ছাড়া এক রাত্রি এবং সকাল-দুপুর কাটানো প্রতিপক্ষের সংখ্যা যতই হোক, সঙ্গত কারণেই পানিশূণ্যতায় শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়াই নিয়তি। উঁচু অঞ্চলে অবস্থান নেয়া নবীর দলবল কূপের পানি আটকে রাখার এই কৌশলকে অবলম্বন করার কারণে ১:৩ অনুপাতের অসম যুদ্ধে কোরাইশদের বিশাল বাহিনীরে বিরুদ্ধ্বে তথা কাফের-মুশরিকদের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো অবিশ্বাস্য জয় লাভ করেছিলেন দয়াল নবী। এর সাথে আরেকটা বিষয় মনে করিয়ে দিই: বদরের ময়দানে নবী কর্তৃক পানি আটকের রাখার কৌশলটাই কি পরবর্তীতে ইয়াজিদ মঞ্চস্থ করেছিল কারবালার প্রান্তরে? নবীর নাতনীর ওপরে?

যা হোক, বদরের সেই যুদ্ধে নবী করীমের দল তিনটি পতাকা ধারণ করেছিল, তার মধ্যে একটি সাদা রঙের আর দুটি কালো রঙের পতাকা। কালো রঙের পতাকাদুটির একটি ছিল হযরত আলীর হাতে এবং অপরটি ছিল হযরত কাব এর হাতে (রেফারেন্স: দ্যা ব্যাটেল অব দ্যা প্রফেট, ইবনে কাথির, পৃষ্ঠা: ১৫, নিচের ইংরেজিতে অনুবাদ করা লিখাটি ছবিটি দ্রষ্টব্য)। ইসলামের সেই প্রথম জয়ের পতাকার রঙদুটিই আজকে ধারণ করেছে আল কায়েদা, বোকো হারাম, আল শাবাব, ISIS. সেজন্যই ইসলামিক এই কট্টরপন্থী জঙ্গী সংগঠনগুলি পতাকার মূল রংটিতে কা‌লো রঙের অাধিক্যের পাশাপাশি ছোঁয়া রেখেছে কিছু সাদা রঙ। পুরো ব্যাপারটার মাস্টারমাইন্ড যেই হোক, অনুসরণ করা হয়েছে ইসলামের অলিগলির প্রতিটি বিশুদ্ধ ইতিহাস।

এদিকে, এইসব ধর্মযুদ্ধে কেউ অংশগ্রহণ করতে পারুক কিংবা না পারুক, প্রতিটি মুসলিম মনস্তত্ত্বকে ঠিকই উসকে দিচ্ছে ১৪০০ বছরের পুরনো কোরানেরই বেশ কিছু বাণী, উদাহরণ দেয়া যাক : (সূরা তওবা: আয়াত ২৯)


এরপরও মুসলিম বিশ্ব কী করে বলে যে, ”ধর্ম রক্ষার নামে সন্ত্রাস কর্মের স্থান নেই ইসলামে”!

কোরান যদি হয় বিশ্ব মানবতার পথপ্রদর্শক, কোরান যদি হয় “কমপ্লিট কোড অব লাইফ”, তাহলে কোরানের এসব বাণী অমুক সময়ের জন্যে প্রযোজ্য, তমুক মানুষের জন্যে বলা- এ ধরণের বক্তব্য কেবলই ছলচাতুরী! আমরা দেখতে পাচ্ছি, ছলচাতুরী করে-করে ভেতরে-ভেতরে ঠিকই গড়ে ‍উঠছে অতিকায় হিংস্র দানব, যে দানবের কাছে মানুষের পরিচয় আর “মানুষ” থাকছে না, বিভাজিত হয়েছে বহু ভাগে, যেমন: কাফের, মুশরিক, ইহুদী, নাসারা, মুরতাদ, নাস্তিক আরও কত কি! মানবিকবোধকে পাশ কাটিয়ে মানুষে মানুষে যে জঘণ্য বিদ্বেষ পোষণ করছে ধর্মের বাণী, সেখানে আপনি কি-না আবার সমালোচনা করলেই অভিযোগ আর অভিমানের সুরে বলছেন, “ইসলাম বিদ্বেষী”!

এই যখন অবস্থা, তখন বাংলাদেশের হর্তাকর্তারা ধর্ম ব্যবসায় যে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে দিনের পর দিন, তা থেকে সামগ্রিকভাবে ভাল কিছু উঠে আসার কি কোন সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাচ্ছি?

এখনো সময় আছে, বিপর্যয় নেমে আসার আগেই দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মকে কেবলমাত্র আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান আর মানবিক বোধের শিক্ষাদান নিশ্চিত করা জরুরী, অন্যথায় বাংলাদেশ পুলিসের ওপর এই যে একাধিকবার হামলা তথা রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রের ওপর হামলা এবং এর ফলশ্রুতিতে যে ভয়াবহ হিংস্র দানবের পুনরুত্থান আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা অ্যামাজনের আগুনের চেয়েও ভয়ংকরভাবে পুড়িয়ে দিবে এই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of