পুরুষতন্ত্র বনাম নারীর অধিকার।

অধিকাংশ পুরুষই নিজের থেকে বয়সে ছোট মেয়েদেরকে বিয়ে করতে পছন্দ করে। যেন সেই মেয়ের উপর নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারে। ছেলেদের পরিবারের সদস্যরাও একই কাজ করে, ছেলের জন্য অল্প বয়সী মেয়ে খুঁজে আনে, এমনকি অধিক শিক্ষিত মেয়েদেরকে তারা পছন্দ করেনা। ছেলের থেকে বেশি শিক্ষিত হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না, এমনকি চাকরি-বাকরি করা মেয়েরাও তাদের পছন্দের বাইরে থাকে।

পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, এমনকি পুরুষতান্ত্রিক এই বিশ্ব উঠেপড়ে লেগেছে নারীদের বন্দি করার জন্য। নারীদের বেশি শিক্ষিত হওয়া যাবে না, নারীদের বেশি চালাক হওয়া যাবে না, নারীদের বেশি বন্ধুবান্ধব থাকা যাবে না, নারীরা যখন তখন ঘর থেকে বের হতে পারবে না, নারীরা কারো সাথে প্রেম করতে পারবে না, নারীরা বিয়ের আগে কারো সাথে সেক্স করতে পারবে না, নারীকে তার ভার্জিনিটি রক্ষা করে চলতে হবে। এগুলো নিতান্তই হাস্যকর চিন্তাভাবনা।

এই সবকিছুই সুকৌশলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। আর পুরুষ হয়ে উঠেছে মুক্ত আকাশের উড়ন্ত পাখির মত। পুরুষ চাইলে যেকোন সময় যেকোন জায়গায় যেতে পারবে, পুরুষ চাইলে একাধিক প্রেম করতে পারবে, চাইলে যারতার সাথে সেক্স করতে পারবে, পুরুষ চাইলে বিয়ের পরে নারীর গায়ে হাত তুলতে পারবে, পুরুষ চাইলে বিয়ের পর একটা নারীকে নিজের যৌনবস্তু বানিয়ে ফেলতে পারবে। যখন ইচ্ছে তখন তার সাথে সেক্স করতে পারবে। তখন আর মেয়ের ইচ্ছার কোন মূল্য থাকেনা ছেলেদের কাছে, এমনকি পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছেও। পুরুষ চাইলে একের অধিক বিয়েও করতে পারে, যে বিষয়টা নারীর জন্য কল্পনারও অতীত।

শক্তিমানরা বরাবরই তাদের শক্তি প্রদর্শন করে চলেছে। মানবজাতির মধ্যে পুরুষই তাদের বাহুর শক্তি দিয়ে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতেছে হাজার বছর ধরে। পুরুষ নারীকে বন্দী করেছে সবদিক থেকে, কেড়ে নিয়েছে তাদের স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। পৃথিবীর বেশির ভাগ রাজনীতিবিদই পুরুষ। পৃথিবীর বেশির ভাগ সম্পদশালী মানুষই পুরুষ, পুরুষরা পুরো পৃথিবীটা নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছে, আর নারীদের ঘরে বন্দি করে দিয়েছে, পুরুষরাই হয়ে উঠেছে নারীদের স্রষ্টা।

তোর মা ফকিন্নি, এই কথাটার মধ্যে বাংলার নারীদের এক গভীর বেদনাদায়ক সত্য লুকিয়ে আছে। আসলেই আমাদের সমাজের নারীরা ফকিন্নি। কেননা বাংলার নারীরা কখনোই সম্পদের মালিক হতে পারে না। বরঞ্চ তারা হয়ে উঠে সম্পদ, কখনো বাবার, কখনো স্বামীর, কখনো ভাইয়ের, কখনো ছেলের। আর সেই সম্পত্তিকে পুরুষরা নিজের ইচ্ছে মত ব্যবহার করে। নারীকে করে তোলে একধরনের ভোগ্যপণ্য।

নারীরাই বন্দীদশার জন্য কোন ভাবেই নারীরা দায়ী নয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের বন্দি করেছে, এটার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সমাজ, এবং রাষ্ট্র। নারীকে বন্ধি করার জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ধর্মটাকে কাজে লাগিয়েছে। পৃথিবীর প্রথাগত সকল ধর্মই নারীদের বন্দি করেছে, হিন্দুরা বন্দী করেছে শাঁখা-সিঁদুর দিয়ে। তবে মুসলমানদের বন্দী করার ধরণটা সবচেয়ে ভয়াবহ এবং মারাত্মক। আর সেটা হলো বোরকা নামক কালো কাপড়।

তাই নারীদের এই বন্দিদশা থেকে বের হওয়ার জন্য আগে প্রথাগত ধর্মকে ছুড়ে ফেলতে হবে, ভেঙ্গে ফেলতে হবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সকল অবকাঠামো, পড়ালেখা শিখে নারীদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। বিয়ে করা, বাচ্চা জন্ম দেওয়া একান্তই নারীর নিজের ইচ্ছে, নারীর শরীর নারীর অধিকার।

দুঃখজনক হলেও সত্য, পৃথিবীর কোন পিতাই চায়না তার কন্যা দিনের পর দিন তার স্বামীর হাতে নির্যাতিত হোক। আবার সেই পিতারাই নিজ কন্যাকে স্বাবলম্বী না করে পর পুরুষের হাতে তুলে দেয়। তাদের নির্যাতিত হতে বাধ্য করে। এই ধরনের পিতারাই তার কন্যাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।

নারী, পুরুষ সবাই মানুষ, সবারই সমানভাবে বাঁচার অধিকার আছে। তাই নারীকে তার নিজের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষরা কখনোই নারীদের অধিকার নারীদের হাতে তুলে দিবে না। সম্পদের সুষম বন্টন, কর্মক্ষেত্রের নারী-পুরুষ সহাবস্থান, এমনকি সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের থেকে যেগুলো হরণ করে নিয়েছে, সেগুলো ফিরিয়ে আনার নামেই সমানাধিকার।

আমাদের বুঝতে হবে ছোট্ট একটা দুধের শিশুকে ধর্ষণ করা পুরুষের পক্ষেই সম্ভব। তাই নারীদের উচিত পুরুষের মত না হয়ে, মানুষের মত নিজেকে তৈরি করা। পুরুষ হওয়ার মধ্যে কোন গৌরব নেই, এটা লজ্জার, মানুষ হওয়ার মধ্যেই গৌরব।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

56 + = 65