বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পাকিস্তানি শিক্ষার্থী (পর্ব ১)

আমি যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পাকিস্তানি শিক্ষার্থী গতকাল আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে খুব আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, তোমাকে পেয়ে আমি কতোটা আনন্দিত তা বলে বোঝাতে পারবো না!
পাকিস্তানি শিক্ষার্থীকে আমি জিজ্ঞেস করি, আমরা কি পূর্ব পরিচিত? আমি স্মরণ করতে পারছি না।
তিনি বলেন, আমাদের সম্পর্ক সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই……।।

সাধারণত এই ধরণের কথা দুই শ্রেণীর মানুষ বলে থাকেন।
প্রথমত, যারা উচ্চমার্গীয় ছাগুসম্রাটের অন্তর্ভুক্ত। এবং
দ্বিতীয়ত, যারা ইতিহাস সম্বন্ধে ধারণা রাখেন।

আমি বোধ করেছিলাম, তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। কারণ দুটি। প্রথমটি, যেহেতু আমি এখন একাডেমিক (গবেষণা) লাইনে; তাই আশাও করেছিলাম, আমার আশেপাশের মানুষজনও একাডেমিক হবেন!

.png” alt=”Image result for pakistan” />
দ্বিতীয়টি, পাকিস্তানে অনেক বাঙালি আছেন, যারা বাঙলাদেশকে মনেপ্রাণে ভালোবাসেন। তাদের কয়েকজনের সাথে আমার পরিচয় হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। বাঙলাদেশের প্রতি তাদের আবেগ এবং রাজাকাদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান আমাকে মুগ্ধ করেছিল। অনেকেই হয়তো জানেন না যে, ২০১৩ সালের শাহবাগের আন্দোলনের সময় পাকিস্তানি অনেক শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, অবস্থানরত বাঙালিরা- আমাদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছিল। এবং সেই কারণে তাদের অনেক সমস্যা ও ঝামেলার মধ্য দিয়ে যেতেও হয়েছিল।

জাফর (পাকিস্তানি শিক্ষার্থী) নানা বিষয়ে চমৎকার চমৎকার কথা বলেন। যেমন- ইউরোপিয়ান সংস্কৃতি, পুঁজিবাদ এবং বর্ণবাদ প্রভৃতি। কিন্তু যখনই তিনি পাকিস্তান ও বাঙলাদেশ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন তখন তাঁর মধ্যে আমি ভয়ংকর জাতীয়তাবাদীর দুর্গন্ধ খুঁজে পাই। আমি অবাক হই, যে মানুষটি এতো কঠিন কঠিন দুর্বহ বিষয়াদি খুব সাধারণ ভাষায় প্রকাশ করতে সক্ষম, তিনি কীভাবে ‘আমার সোনার বাঙলা’কে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’কে আদর্শ ও শ্রেষ্ঠ মনে করতে পারেন!

কিন্তু, আমি আবার খুব বেশি হতাশও হতে পারি না কারণ আমার দেশে একটি গোষ্ঠী আছে যারা সংখ্যায় কোটি কোটি, তারাও ‘আমার সোনার বাঙলা’কে অস্বীকার করে।

তিনি বলেন, ইন্ডিয়ান হিন্দুরা যদি ষড়যন্ত্র না করতো তাহলে আমরা এক থাকতাম।
তার উচ্চারিত বাক্যটি রেসিজমে ভরপুর। আমি তাঁকে বলি, কিছুক্ষণ আগে বর্ণবাদ নিয়ে এতো চমৎকার চমৎকার আলোচনা করার পর আপনি ‘হিন্দু’দের ষড়যন্ত্র বলেছেন?
তিনি একটু ঘাবড়ে যান। তিনি বলেন, আমি সেটা মিন করি নি। মানে হল ইন্ডিয়ানরা।

আমি তাঁকে বলি, আপনি যে মুসলমান তার প্রমাণ কী?
জাফর খিলখিল করে হাসে। জাফর বলেন, মুসলমানদের কথাবার্তাই প্রমাণ করে তারা মুসলমান।
আমি জাফরকে বলি, লাল-নীল পানীয় পান করতে করতে নিজেকে মুসলমান দাবি করাটা হিপোক্রিসি নয় কি?
জাফর প্রতিত্তুরে বলেন, তুমি খুবই আক্রমণাত্মক। তুমি পার্সোনাল এটাক করছ।
আমি জাফরকে জিজ্ঞেস করি, আপনি কি নিজেকে মুসলমান প্রমাণ করার জন্য আমাকে নুনু দেখাবেন?
জাফর উচ্চস্বরে বলেন, ওয়াট দ্যা ফাক!
আমি তাঁকে বলি, পাকিস্তানিরা আমাদের মানুষের সাথে এমনই আচরণ করেছিল।

জাফরকে আমি আরও বলি, ধর্ম তো ব্যক্তিগত বিষয়ই, তাই না? ধর্মের ভিত্তিতে কোন দেশ হতে পারে না! এই পৃথিবী মানুষের জন্যে। আর মানুষের থেকেও যখন ধর্ম বড় হয়ে যায় তখন সমাধান নয়, বরং সমস্যার সৃষ্টি হয়।

জাফর অনেকক্ষণ চুপ থাকেন। লাল-নীল পানীয় চুমুক দেওয়ার আগে আমার চোখে দিয়ে দৃষ্টি দেন। (চলবে)

(আমাদের কথোপকথন ইংরেজিতে হয়েছিল। সম্মানসূচক হিশেবে ‘আপনি’ ব্যবহার করেছি )

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2