সেনা শাসনে পাহাড় চরম বিবর্ণ

পাহাড় আর আগের মত নেই।শ্বাসরূদ্ধকর থেকে অতি শ্বাসরূদ্ধকর পরিবেশে এখন পরিপূর্ণ পাহাড়।বিবর্ণ থেকে চরম বিবর্ণ করা হয়েছে পাহাড়ের বাস্তবতাকে।দিন দিন চরম অনিশ্চয়তার ঝুুকিতে দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় মানুষদের।প্রতিটা মুহুর্থে সেখানে প্রসারিত হচ্ছে সেনা শাসন, ভূমি আগ্রাসন, নিপীড়ন, নির্যাতন, নারী ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যা সহ নানাবিধ মানবতাবিরোধী কর্মকান্ড যা পাহাড়ের মানুষদের জন্য অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিসরের প্রতিবন্ধকতা ও অভিশাপ হয়ে দাড়িয়েছে।

কার বা কাদের দ্ধারা অব্যাহত রয়েছে এসব মানবতাবিরোধী কর্মকান্ড? রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী এবং বহিরাগত সেটেলার বাঙালী!

১.রাষ্ট্র(বাংলাদেশ)

রাষ্ট্রের কথা যদি বলি তাহলে প্রথমত বলতে হয় বাংলাদেশ নামের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে দারুণভাবে পাহাড় বিদ্ধেষী।পাহাড় বিদ্ধেষী রাষ্ট্র যে কতটা পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় মানুষদের প্রতিকূলে অবস্থান করতে পারে সেটা বোধয় আর কারোর দ্ধিতীয়বার ভাবতে হবে না।পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো যে তাদের স্বাতন্ত্র পরিচয় আদিবাসী হিসেবে বেঁচে থাকবে সেটাও এখন রাষ্ট্রের কাছে বন্দি।রাষ্ট্রের প্রতিটা স্বীদ্ধান্তে ব্যাপক বিদ্যমান থাকে পাহাড়ের প্রতি পাহাড়ের আদিবাসীদের প্রতি হীন দৃষ্টিভঙ্গী! পাহাড় বা পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের একটা অংশ হলেও সেখানে নেই কোন স্বাধীন অধিকারের বিন্দুমাত্র রূপরেখা! নেই কেন সার্বভৌমত্বের অধিকার! নেই কোন সাংবিধানিক অধিকা! নেই কোন গণতান্ত্রিক অধিকার! নেই কোন রাজনৈতিক অধিকার! নেই কোন অর্থনৈতিক অধিকার! নেই কোন সামাজিক অধিকার এবং নেই কোন ধর্মীয় অধিকার!!! এসব অধিকার পাহার থেকে পাহাড়ের আদিবাসী মানুষদের কাছ থেকে রাষ্ট্র তার প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গীতে খুব সহজ সরলভাবে কেড়ে নিচ্ছে।রাষ্ট্র কখনো পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের নামে জোরপূর্বকভাবে দখল করে নিচ্ছে পাহাড়ের জায়গা জমি আবার কখনো নাম মাত্র মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে।পাহাড়ের পাহাড়ী আদিবাসীদের জায়গা জমি এভাবে জোরপূর্বকভাবে দখল করা হলে আদিবাসীরা যাবে কোথায়? হ্যাঁ, এটা আমাদের ভাবনা কিন্তু রাষ্ট্র কিংবা সরকারের নয়।রাষ্ট্র মোটেও পাহাড় এবং পাহাড়ের আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নের কথা ভাবেনা। পাহাড়ের মানুষদের দুর্বিষহ জীবনপ্রণালী নিয়ে ভাবেনা। তার প্রমাণ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু নিজেই দিয়ে গেছেন আদিবাসীদের প্রাণপ্রিয় বিপ্লবী নেতা এম,এন লারমা ও আদিবাসীদের উদ্দেশ্য করে দেওয়া গণপরিষদ তথা রাঙ্গামাটি সফরকালীন ভাষণে।

২.সেনাবাহিনী

সেনাবাহিনী পাহাড়ের একটি আতংকের নাম।সেনাবাহিনী নাম শুনলেই এখন পাহাড়ের আদিবাসীদের চোখে আতংকের জল গড়িয়ে পরে।প্রাণভয়ে পালাতে থাকে বনে জঙ্গলে।কতটা হিংস্র হলে এমন আতংকের মালিক হওয়া যায়!? পাঠকরা নিজগুণে উপলব্ধি করে নিবেন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌমত্ব ক্ষমতাকে পুঁজি হিসেবে ব্যাবহার করে সেনাবাহিনীরা পাহাড়ে অন্যায় অত্যাচার সংঘটিত করে। পাহাড়ে উড়ে এসে জুরে বসা সেটেলার বাঙালী কতৃক আদিবাসীদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলার মূল উৎস হচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পূর্ববর্তী সময় হতে বর্তমান পর্যন্ত যেসমস্ত সাম্প্রদায়িক হামলার মধ্য দিয়ে সেটেলার বাঙালীরা আদিবাসীদের উপর গণহত্যা চালিয়েছিলো তার প্রধান শক্তি ছিলো সেনাবাহিনী! বর্তমানেও পাহাড়ে সেনা শাসনের একচুল পরিমান ঘাতটি নেই। নারী ধর্ষণ থেকে শুরু করে সব ধরনের অপকর্মে সেনাবাহিনীর অংশদারিত্ব বিদ্যমান।বর্তমান সময়ের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা সম্পর্কে যদি বলি তার ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনীর অপভূমিকা প্রথমে চলে আসে। অবৈধ অস্ত্রের নামে পাহাড়ের আদিবাসীদের ব্যাপক হয়রানি! সন্ত্রাসীর সাইনবোর্ড নিরীহ আদিবাসীদের গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার করে জেলবন্দি করা! নিরীহ আদিবাসী ছাত্র ও নিরীহ আদিবাসীদের ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে হত্যা করা! সেনাক্যাম্প স্থাপনের নামে আদিবাসীদের জায়গা দখল করা হচ্ছে সেনাবাহিনীর রাষ্ট্রীয় ও সার্বভৌমত্ব আইনের ক্ষমতা হয়ে দাড়িয়েছে। কোন প্রতিবাদ করা যাবেনা! সম্পূর্ণ বিচার বহিঃর্ভূত থাকতে হবে এসব অন্যায়। প্রতিবাদ করতে গেলেও আদিবাসীদের হতে হবে রাষ্ট্রদ্রোহী, দেশদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী।————-

৩.অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করা সেটেলার বাঙালী

৭০/৮০’র দশকে এরশাদ ও জিয়া আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করা সেটেলার বাঙালী কতৃক দখলদারিত্বের মধ্য দিয়ে আদিবাসীরা বাপ দাদা চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি হারিয়েছেই কিন্তু নির্যাতন নিপীড়নের স্বীকারও কম হয়নি, যা বর্তমানেও চলমান। সেটেলার বাঙালী কতৃক সাম্প্রদায়িক হামলার স্বীকার হওয়ার ফলে জীবন হারিয়েছে হাজার হাজার আদিবাসী ভূমিপূত্র।অপরদিকে সেটেলার বাঙালী কতৃক আদিবাসী নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনার রয়েছে ব্যাপক পরিসংখ্যান।

-রাষ্ট্রীয় হীনচিন্তা, প্রতিক্রিয়াশীল চেতনা, অগণতান্ত্রিক পথচলা, সেনাবাহিনী ও সেটেলার বাঙালীদের পর্যাপ্ত নিপীড়ন নির্যাতনে পাহাড়ের আদিবাসীরা বর্তমানে সম্পূর্ণ অস্তিত্ব হারানোর পথে।বিশেষ করে সেনা শাসন নামের ভয়ংকর আতংক আদিবাসীদের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার দীপ্ত স্বপ্নকে কুড়ে কুড়ে চিবিয়ে খাওয়া হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সবমিলিয়ে পাহাড় বিবর্ণের চরম আকার ধারন করে আছে বর্তমানে।

পরিশেষে বলতে চাই, অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অবৈধ সেনা শাসন অতিসত্বর উত্তোরন করে “পার্বত্য চুক্তি”র মৌলিক ধারা মোতাবেক আদিবাসীদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হোক। ভালো থাকুক আমার পাহাড়। ভালো থাকুক বাংলাদেশ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 5 =