লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ও বামেদের ভবিষ্যৎ:- তৃতীয় পর্ব-

বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে জনমানসে যে প্রশ্নটি সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপিত হচ্ছে তা হল- ‘বামেরা কি পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতীয় রাজনীতিতে পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ফিরে আসতে পারবে’? এর পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয় সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ অশান্ত 2019 সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই নির্বাচনে- তৃণমূল কংগ্রেস- 22 টি, বিজেপি-18 টি, বাম- 0 টি, ও কংগ্রেস- 2 টি আসনে জয়লাভ করে। শতাংশের নিরিখে দেখতে গেলে এই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস- 43.28%, বিজেপি- 40.23%, বাম- 6.28% ও কংগ্রেস- 5.61% ভোট লাভ করে। অর্থাৎ, এই নির্বাচনে এটি সুস্পষ্ট যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপি একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসাবে উঠে আসছে। এখন প্রশ্ন হল 5 বছর আগে ও কি এই রকম পরিস্থিতি ছিল?

2014 সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ওই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস- 34 টি, বিজেপি- 2 টি, বাম- 2 টি ও কংগ্রেস- 4 টি আসনে জয় লাভ করেছিল। 2014 সালের লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে 2019 সালে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটের হার 3.48% বৃদ্ধি পেয়েছে ও আসন সংখ্যা 12 টি হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে বিজেপির ভোট 22.25% ও 16 টি লোকসভা আসন বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে বামেদের ক্ষেত্রে 16.72% ভোট হ্রাস প্রাপ্ত হয় ও অন্যদিকে 2 টি আসন ও বামেদের হাতছাড়া হয়। কংগ্রেসের ক্ষেত্রে দেখা যায় 4.09% ভোট ও 2 টি আসন হ্রাস প্রাপ্ত হয়। তাই সামগ্রিকভাবে এই নির্বাচনে এটি সুস্পষ্ট যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সর্বাধিক বেশি লাভবান হয়েছে। আসলে যে বাংলায় বিজেপির কোন অস্তিত্ব ছিল না সেখানে বিজেপির এই উল্কাগতিতে উত্থান সত্যিই চমকপ্রদ। এখন প্রশ্ন হল পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই বিরাট উত্থানের কারণ কি?

 

এর উত্তর পেতে গেলে কিছুটা ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে হবে। ঐতিহাসিক আঙ্গিকে বলতে হয় 2009-2010 সময় পর্বে বাম সরকারের শেষ পর্ব আসন্ন। তৎকালীন বামফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কৃষি থেকে শিল্পের দিকে জোর দিয়েছিলেন, তাঁর সরকারের ঘোষিত নীতি ছিল ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’। আসলে তিনি মনে করতেন প্রতিবছর এত শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান শুধু কৃষির দ্বারা সম্ভব নয়; তাই তিনি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে শিল্পে জোর দিয়েছিলেন। সাধারণত যা হয় কোন কার্যক্ষেত্রে সকলে সম্মত হন না; তেমনি সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামে ও কিছু মানুষ জমি দিতে অস্বীকার করে এবং এই কিছু মানুষকেই বিপথে চালিত করে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা ব্যানার্জি একে রাজনৈতিক ইসু হিসাবে ব্যবহার করে।

মিডিয়ার ঢক্কানিনাদ ‘চৌত্রিশ বছরের বাম সরকারের অপশাসন’ শুনতে শুনতে মানুষ তখন তিতিবিরক্ত! তবে এথেকেই প্রমাণিত হয় সেই আমলে গণতন্ত্র কতটা প্রতিষ্ঠিত ছিল, যে সংবাদপত্র ও মিডিয়াতে ক্রমাগত সরকারের সমালোচনা করা যেত। সেই সময়ে মমতা ব্যানার্জি কথায় কথায় বন্ধ ডাকতেন ও কুড়ি দিনের অধিক দূর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে বন্ধ করে সিঙ্গুর থেকে টাটাকে বিতাড়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অথচ আজ সরকারি কর্মচারীরা বন্ধ ডাকলে মমতা ব্যানার্জি তা কঠিন হস্তে দমন করার কথা বলেন! নিজের অতীত ইতিহাস দেখেছেন কি? নিন্দুকেরা বলেন সেই আমলে তিনি কুকুর মারা গেলেও বন্ধ ডাকতেন! আজ মিডিয়া ও বিরোধীদের কি সেই স্বাধীনতা রয়েছে?

আমাদের মত জীবনের প্রথম ভোটারদের মনে হয় সারাজীবন তো শুনে এসেছি বাম বাম; একবার পরিবর্তন করেই দেখা যাক না, কি হয়? আর পলিটিক্যাল সায়েন্সে ও পড়েছি একটি সরকার বেশি দিন থাকলে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে যায় তাই একবার পরিবর্তন করেই দেখা যাক কি হয়! নিচুতলার কিছু বাম নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ থাকলে ও উপরতলার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সেরূপ ক্ষোভ ছিল না। আসলে সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম একটি উপলক্ষ মাত্র মানুষের মনে হয়েছিল 34 বছর ধরে জগদ্দল পাথরের মত যে সরকারটি রয়েছে, তাঁকে একবার পরিবর্তন করে দেখতে হবে। তাই প্রধানত এই কারণ হেতু আমাদের মত লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটে রাজ্যে 2011 সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক ‘পরিবর্তন’ সাধিত হয়!

সত্যি বলতে কি রাজনৈতিক পরিবর্তন কেমন হয় এবং এর ফলে আমাদের জীবনে কতটা প্রভাব পড়বে তা সম্পর্কে বিশেষ কোন ধারণায় ছিল না। বিজেপি, আরএসএস, মাওবাদী সকলের গোপন মদতে পশ্চিমবঙ্গে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়। সত্যি বলতে কি পরিবর্তন কাকে বলে তা 2011 সালে মমতা ব্যানার্জির ‘মা মাটি মানুষের’ সরকারের প্রতিষ্ঠার পরেই ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম! অনেক স্বপ্ন ও আশা, আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ বামেদের প্রত্যাখ্যান করে তৃণমূল কংগ্রেসকে শাসন ক্ষমতায় নিয়ে এসেছিল। কিন্তু প্রশ্ন হল মমতা ব্যানার্জির ‘মা মাটি মানুষের’ সরকার আমাদের কি দিল?

আমাদের চোখের সামনে আমাদের চেনা পশ্চিমবঙ্গ ধীরে ধীরে যেন বদলে যেতে শুরু করল। প্রথমেই আঘাত আসল বিরোধী দলগুলির উপর, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মাধ্যমে বিরোধী দলগুলিকে শেষ করার প্রয়াস, তারপর মিডিয়ার কন্ঠরোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হল, পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন এনে শুধু নিজেদের মহিমান্বিত করার প্রচেষ্টা অর্থাৎ পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার কোমর ভেঙ্গে দেওয়া হল। আসলে কথায় আছে বেশি শিখলে বেশি প্রশ্ন করবে, বেশি চাহিদার সৃষ্টি হবে তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ‘মূর্খের স্বর্গরাজ্যে’ পরিণত করা হল। তারপর দেখলাম মা, বোনেদের ধর্ষণ হলে মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে শুনতে হয় এটা সাজানো ঘটনা (পার্কস্ট্রীট ধর্ষণকান্ড, যদিও পরে প্রমাণিত হয় এটা সত্য ঘটনা ছিল), কখনো আবার শুনতে হয় তোমার স্বামী তো সিপিএম করে। কখনো আবার বলেন রাজা চলে বাজার…। কখনো দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর (মনমোহন সিং) উদ্দেশ্যে কটুবাক্য প্রয়োগ ইত্যাদি…।

সারের দাম বাড়ছে কেন প্রশ্ন করলে শুনতে হয় মাওবাদী (শিলাদিত্য চৌধুরি), মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে কার্টুন (অম্বিকেশ মহাপাত্র) আঁকলে তাঁকে জেলের ঘাঁনি টানতে হয়। এটাই হচ্ছে সংবিধানের রক্ষাকর্তী মমতা ব্যানার্জির গণতন্ত্রের সংজ্ঞা!আমাদের সুস্থ সাংস্কৃতির পীঠস্থান পশ্চিমবঙ্গ ধীরে ধীরে গুন্ডা, বদমাশ ও ধর্মান্ধদের আখড়ায় পরিণত হতে থাকে। চাকরির নিয়োগ বন্ধ, সুষ্ঠভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ, নিন্দুকেরা বলেন এই সরকারের আমলে ঘুস ছাড়া চাকরি হয় না! আসলে সারদা, নারদার পর কি নিয়ে ভোটে লড়বে? তাই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া গুলিই একমাত্র ভরসা। বেকার যুবকরা তাই কাজ না পেয়ে তার দলের মাসলম্যানে পরিণত হয়। এরা পরবর্তীকালে চপ শিল্প, ঢপ শিল্প, তোলাবাজি শিল্প, বম শিল্পের প্রধান কারিগর হয়ে ওঠে। ক্লাবগুলিকে অর্থসাহায্যের মাধ্যমে দলদাসে পরিণত করা হয় এরা নির্বাচনে শাসকদলের পক্ষে ব্যাপক হিংসা সংগঠিত করে, এটিই হচ্ছে মমতা ব্যানার্জির গণতন্ত্রের নিদর্শন!

তবে মমতা ব্যানার্জি তাঁর শাসনে সর্বাধিক ভয়ংকর যে কাজটি করেছেন তা হল সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ জাগিয়ে তোলা। তিনি একক ভাবে মোল্লা মোয়াজ্জেমদের ভাতার ব্যবস্থা করেন। এই ঘৃণ্য রাজনীতির ফলে ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে এই চেতনা জাগ্রত হয় তাহলে পুরোহিত ও পাদ্রিরা কি দোষ করল? এরপর শুধুমাত্র মুসলিম মহিলাদের সাইকেল প্রদান করা শুরু হল যদিও পরবর্তীকালে সকলকে সাইকেল প্রদান করা হয় কিন্তু এই ধর্মের নামে সুড়সুড়ি দেওয়ার যে বিষাক্ত রাজনীতি তা ধীরে ধীরে সমাজকে বিভক্ত করতে থাকে। এরপর দেখা গেল মহরমের জন্য দূর্গাপুজোর বিসর্জন পিছিয়ে দেওয়া। কখনো ঈদের নামাজে রেড রোডে অংশগ্রহণ। কবরস্থান ও মসজিদ উন্নয়নের নামে অর্থপ্রদান অর্থাৎ সমাজে ঘৃণ্য ধর্মান্ধ রাজনীতির প্রসারের মূল কারিগর হলেন মমতা ব্যানার্জি! যদিও পরবর্তীকালে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদীদের চাপে পড়ে মন্দির নির্মাণ ও শ্মশান উন্নয়নের নামে সরকার টাকা খরচ করতে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে পুজো মন্ডপে 25 হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। তারসঙ্গে মেলা, খেলা, উৎসব নিয়ে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে কিন্তু বেকারদের চাকরির বেলায় টাকা থাকে না! কোন স্থায়ী চাকরি নেই সব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এটাই মমতা ব্যানার্জি উন্নয়ন?

তাই স্বাভাবিক ভাবেই এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ হিন্দুদের মনেও সাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ ঘটতে থাকে এবং তারা বিজেপির মতো হিন্দুত্ববাদী দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাঁদের মনে হয় তৃণমূল মানেই মুসলমানদের দল আর বিজেপি মানেই হিন্দুদের দল। এই অবর্ণনীয় সাম্প্রদায়িক ঘৃণা এবারের লোকসভা নির্বাচনে ব্যাপক ভাবে প্রচার করা হয়। তৃণমূল কংগ্রেস মুসলমান প্রধান অঞ্চলে গিয়ে এটা প্রচার করতে থাকে যে বিজেপির হাত থেকে একমাত্র রক্ষা করতে পারে তৃণমূল কংগ্রেস তাই তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দাও। অন্যদিকে বিজেপি প্রচার করতে থাকে পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্তান হতে রক্ষা করতে হলে বিজেপিকে ভোট দাও। কার্যত এই লোকসভা নির্বাচনে হিন্দু মুসলমানের ভিত্তিতে যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ হয় তাঁর ফলেই এই অভাবনীয় ফলাফল দেখা যায়। লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি মুসলমানদের উদ্দেশ্যে এও বলেন যে ‘গরু দুধ দেয়’ তাঁদের লাথি খেতে তিনি প্রস্তুত। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর চোখে মুসলমানরা গরুর সমতুল্য। তাই মুসলমানদের অনুরোধ আপনারা বিষয়টি ভেবে দেখেছেন কি? মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আপনাদের কি পরিমাণ নীচে নামিয়ে এনেছেন এবং সাম্প্রদায়িকতার বিপদের মধ্যে ফেলেছেন? আসলে তাঁর এই জঘন্য তোষণ নীতির কারণে পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে কালিয়াচক, আসানসোল, ধূলাগোড় প্রভৃতি স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখা যায়! এটাই মনে হয় ‘মা মাটি মানুষের’ সরকারের উন্নয়ন!

লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের দিকে লক্ষ্য রাখলে বলা যায় ধর্মান্ধতা অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও এটি একমাত্র বিষয় নয়। এছাড়াও অনেকে মনে করেন যেহেতু কেন্দ্রে বিজেপি সরকার রয়েছে তাই তৃণমূল কংগ্রেসকে একমাত্র রুখতে পারে বিজেপি, আবার অনেকে মনে করেন তৃণমূলের গুন্ডাবাহিনীকে উপযুক্ত জবাব দিতে পারে একমাত্র বিজেপি। সেইসঙ্গে বামেদের মান্ধতার আমলের প্রচার কৌশল, সোশ্যাল মিডিয়াতে এক্টিভ না থাকা, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বকে তুলে আনতে না পারা, বৃদ্ধতন্ত্রের চর্চা ইত্যাদি বামেদের বিরুদ্ধে গেছে এবং বহু বাম মনোভাবাপন্ন মানুষ তৃণমূলের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিজেপিকে সমর্থন করেছে। তবে এই লোকসভা নির্বাচনে জনগণ এটা সুস্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছে সাম্প্রদায়িকতা, ঘৃণা, অন্ধত্ব ও ঔদ্ধত্য দিয়ে চিরকাল মানুষকে বোকা বানিয়ে রাখা যাবে না, মানুষ সুযোগ পেলে ঠিকই তাঁর হিসাব নেবে! এখন প্রশ্ন হল আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে কি হবে?

রাজ্য রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয় তৃণমূল কংগ্রেসের জঘন্য রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। বিশেষত যেখানে বিজেপির 5-10% ভোট ব্যাঙ্ক ছিল সেখানে এই ভোট প্রায় 40% অতিক্রম করেছে, তাই আগামী দিনে বিজেপি আরও শক্তিশালী হয়ে রাজ্যে ক্ষমতা গ্রহণের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল এই বিজেপি সরকার এলে জনগণের কি লাভ হবে? প্রথমেই যেটা বলতে চাই নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার কোন ভালো কাজ করেনি এমন নয় যেমন- নোট বাতিল, জিএসটি, তিন তালাক তুলে দেওয়া, 370 ধারা বিলুপ্তি ইত্যাদি কিন্তু এই সিদ্ধান্ত গুলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার অভাব লক্ষ্য করা যায়। মোদী সরকার বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে, এমন কিছু কাজ যেমন- তিন তালাক বাতিল, 370 ধারা বিলুপ্তি এগুলি হয়তো মোদী সরকার ছাড়া অন্য কেউ করতে পারতো না। তবে এগুলির সম্পর্কে বলতে হয় তিন তালাককের ক্ষেত্রে সিভিল মামলাকে যেভাবে ক্রিমিনাল করা হয়েছে তা রীতিমতো চিন্তার বিষয়, কারণ অতীতে দেখা গেছে 498 (বধূ নির্যাতন) এর মত আইনের দুঃব্যবহারের যথেষ্ট প্রমাণ আছে, তাই এই আইনের অপব্যবহার হবে না তা কে বলতে পারে? তাই সরকারকে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যদিকে 370 ধারা তুলে দেওয়া হয়েছে ঠিক আছে কিন্তু এখনো সেখানে যেভাবে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তা রীতিমতো অমানবিক এবং এই পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়া প্রয়োজন। তবে এটা উল্লেখ্য এই সরকার বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়েছে, তেমনি এই সরকারের কাছে আর একটি অনুরোধ রইল সংবিধানের 44 নম্বর ধারায় উল্লেখিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform civil code) চালু করা। কারণ এক দেশ, এক সংবিধান এবং প্রতিটি ধর্ম, জাতির জন্য একই দেওয়ানি বিধি চালু করা প্রয়োজন, আর এটি মোদী সরকারের পক্ষেই চালু করা সর্বাধিক সুবিধাজনক।

মোদী সরকারের বহু উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব থাকলেও মুদ্রার অন্য পিঠটিও দেখা খুবই প্রয়োজন। মোদী সরকারের আলোর দিকের তুলনায় ক্ষেত্র বিশেষে অন্ধকার দিকটি বড় বেশি লক্ষ্য করা যায়। ইতিহাস লেখার সময় এখনও আসেনি কিন্তু মোদী সরকারের নিয়ে যখন ইতিহাস লেখা হবে তখন এটি নিশ্চিয় উল্লেখিত হবে এটি এমন একটি সরকার যে অনায়াসে বহু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল কিন্তু অর্থনীতি ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষার্থে এক চরম ব্যর্থ সরকার! মোদী সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচনা হল- এই সরকার চরম ফ্যাসিস্ট চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী, সেই সঙ্গে গোরক্ষার ও বিভিন্ন ধর্ম রক্ষার নামে যে উন্মাদনা এই সরকারের সময়ে দেখা গেছে তা অতীতে আর কোন সরকারের সময় অনুভূত হয়নি। গোমূত্র থেকে ক্যান্সারের ওষুধ তৈরি হয়, গরু অক্সিজেন প্রদান করে, গণেশের মাথা প্লাস্টিক সার্জারির উদাহরণ, মহাভারতের যুগে ইন্টারনেট ছিল, বেদের যুগে বিমান ছিল, সবকিছু বেদ থেকে আবিষ্কার হয়েছে এমন মন্তব্যে বিশ্বব্যাপী ভারতের মর্যাদা ভূলুন্ঠিত হয়েছে এবং আমরা হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছি! সেইসঙ্গে যেভাবে মিডিয়ার কন্ঠরোধ করা হচ্ছে ও বিচার ব্যবস্থা ও স্বশাসিত সংস্থাগুলির অধিকার খর্ব করার চেষ্টা চলছে তা ফ্যাসিস্ট শাসনের নামান্তর!

সেইসঙ্গে রয়েছে পুঁজিপতিদের দালালি ও চরম দক্ষিণপন্থী নীতি নির্ধারণ। তাই এই সরকার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চরম ভাবে ব্যার্থ। এই সরকারের সময় ইতিহাসে সর্বাধিক বেশি বেকারত্ব অনুভূত হচ্ছে। দেশের জিডিপি 5% এর নিচে অবস্থান করছে প্রকৃতপক্ষে 2-3% এর কাছাকাছি অবস্থান করছে। একের পর এক সরকারি সংস্থাগুলিকে বেসরকারিকরণ করার চেষ্টা হচ্ছে এবং প্রাইভেট কোম্পানি গুলিকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। মোদীর নীতি হল বিএসএনএল, এয়ার ইন্ডিয়া, রেল ইত্যাদিকে বেসরকারিকরণ কর এবং আদানি, আম্বানিদের দেশের সম্পদ বিক্রি করে দাও! সরকার জনগণের থেকে বেশি পুঁজিপতি স্বার্থ সুরক্ষিত করতে ব্যস্ত। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার নতুন ‘মোটর ভেইক্যাল এক্ট’ পাশ করেছে এই আইন অনুসারে সরকার দাবি করছে দুর্ঘটনা রোকার জন্যই এই শক্ত আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইন অনুসারে আগে যেখানে কেউ হেলমেট না পরে বাইক চালালে 100 টাকা ফাইন হতো সেখানে এখন 1,000 টাকা ফাইন হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এই আইনের ফলে কারোর 10,000 বা কারোর 1 লক্ষ থেকে 2 লক্ষ টাকা পর্যন্ত ফাইন নেওয়া হচ্ছে। আসলে দেশের অর্থনীতিকে ডুবিয়ে দিয়ে এখন লুঠেরাদের সরকারে পরিণত হয়েছে। একদিকে যখন কর্পোরেটদের কোটি কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হচ্ছে ও দেশে তীব্র বেকারত্ব তখন এইরকম লুঠের, সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে। তাই বিজেপির রাজনীতি মানেই হিন্দু মুসলমান, পাকিস্তান, দেশভক্তি, প্রশ্ন করলেই দেশদ্রোহী ইত্যাদির নামে মানুষকে বোকা বানানো হচ্ছে! আজ সেই সমস্ত বিজেপি ও মোদী ভক্তদের কাছে অনুরোধ একটু ভেবে দেখবেন এই সরকার আপনার আমার পেটে দুমুঠো অন্ন তুলে দেবে কি? এই সরকার আমাদের দুঃখ দুর্দশা নিয়ে চিন্তিত কি? এই সরকার কি আমাদের সুশাসন দেবে? এই সরকার কি দেশে আচ্ছে দিন আনতে পারবে?

তাই কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস ও কেন্দ্রের বিজেপি সরকার একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ, তাই সাধারণ মানুষের এদের কাছ থেকে শান্তি নেই! তাহলে সাধারণ মানুষের পরিত্রাণের উপায় কি? ঠিক এই জায়গাতেই বামেদের গুরুত্ব ক্রমবর্ধমান। কারণ একমাত্র বামেরাই পারে দেশকে বিষাক্ত ধর্ম রাজনীতি থেকে রক্ষা করতে, একমাত্র বামেরাই পারে কৃষক, মজদুর, বেকার যুবক যুবতীদের চোখের জল মুছতে। তাই সাধারণ গরীব খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষের জীবন যন্ত্রণা নিয়ে কথা বলতে, দেশে সুস্থ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও মুক্তচেতনা বৃদ্ধি করতে বামেরা অপরিহার্য!

অনেক মনে করছেন বামেরা আবার ফিরবে কি করে? তাদের উদ্দেশ্যে বলি ইতিমধ্যে মানুষের মধ্যে দ্রুত এই চেতনা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কানপাতলেই শোনা যায় মানুষেরা বলছে- যে গত 34 বছরে রাজ্যে আর কিছুই না থাক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল ও শান্তি ছিল এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের পক্ষে বামেরাই একমাত্র কথা বলে। তাই শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে বামেরা ফিরে আসা খুবই জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হল বামেরা কি এত সহজে ফিরে আসতে পারবে? তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি না তৃণমূল কংগ্রেস মানুষের মধ্যে যে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিষ বপন করেছে তা এত দ্রুত যাওয়ার নয়, পরিবর্তিতে বিজেপি তা আরও কিছুটা বৃদ্ধি করেছে তাই আগামী দিনে হিন্দু মুসলমানের ভিত্তিতে ভোট হলে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির আরও কিছুটা লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই জনগণের কাছে প্রশ্ন আপনারা কি হিন্দু মুসলমানের ভিত্তিতে ভোট দিতে চান? না কাজের অধিকার, খাদ্যের অধিকার, জীবন জীবিকা নির্বাহের অধিকারের ভিত্তিতে আপনার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করতে চান?

মানুষকে চিন্তা করতে হবে তাঁরা কি চান? তবে এটা বলতে চাই যারা ভাবছেন বামপন্থা শেষ তাঁরা দিবা স্বপ্ন দেখছেন, কারণ তৃণমূল কংগ্রেসের দেওয়াল লিখন সুস্পষ্ট। তৃণমূল কংগ্রেস দুর্বল হলেই বামেরা ব্যাপকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। আর বামপন্থা লড়াইয়ের পন্থা, লড়াই করেই নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে হবে। আর বামপন্থীরা সেই লড়াইয়ে সংগ্রামে ফিরছেন দেখে ভালো লাগল। সাম্প্রতিক সময়ে বামেদের ছাত্র সংগঠনগুলি- ‘নতুন শিল্পের দাবিতে, কাটমানির বিরুদ্ধে, কাজের দাবিতে, কম খরচে পড়াশোনার সুযোগ পেতে’ সিঙ্গুর থেকে নবান্ন পর্যন্ত এক অভিযান সম্পন্ন করে কিন্তু মমতা ব্যানার্জির ফ্যাসিস্ট সরকার এই ছাত্রযুবদের কথা না শুনে পুলিশ দিয়ে বর্বরোচিত আক্রমণ করে। এই নির্লজ্জ ফ্যাসিস্ট সরকারকে ধিক্কার জানাই! যে ভাত দিতে পারে না সে কি করে লাঠি পেটা করে? কাজের দাবিতে ছাত্ররা আন্দোলন করলে তাদের গুন্ডা ও পুলিশের লাঠি দিয়ে দমন পীড়ন করে, এমন জঘন্য, বর্বর সরকারকে ধিক্কার জানাই! এই আক্রমণে 60 জনের অধিক ছাত্র আহত হয়েছে এবং গুরুতর আহত হয়েছেন 5 জন। সরকার দমন করার চেষ্টা করছে কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী ছাত্রছাত্রীদের এই দাবি দাওয়া এভাবে দমন করা যায় না। সেই সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের রক্তিম অভিনন্দন জানাই; যারা স্রোতের প্রতিকূলে নিজের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন!

ছাত্র ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই আপনাদের রক্ত ব্যার্থ যাবে না, কথায় আছে- ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’! আপনাদের এই রাস্তার সংগ্রামই আগামী দিনের পথ দেখাবে! তাই এই ছাত্র যুবরাই আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতীয় রাজনীতিকে পথ দেখাবে। কারণ পশ্চিমবঙ্গই পারে বামশক্তিকে সংগঠিত করতে ও দেশের রাজনীতিকে সঠিক দিশা দেখাতে। প্রায় 7% বলে ভয় পেয়ো না, পৃথিবীতে অনেক সময় জাগ্রত বিবেকের মানুষের সংখ্যা কমই হয় কিন্তু দিনের শেষে তাঁরাই জয়যুক্ত হয়! এই লড়াই ও সংগ্রামের মধ্যেই আমাদের আগামীর পথ প্রশস্ত হবে। ইতিহাস সাক্ষী থাকবে যখন সমস্ত কিছুই অন্ধত্ব ও সংকীর্ণতায় আবদ্ধ হয়েছিল তখন কিছু সাহসী তরুণ প্রজন্মের মানুষরা ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে দাড়িয়ে, মানবতা ও পেটের দাবীতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল! ইতিহাস সাক্ষী এই সংগ্রাম বৃথা যায় না, এরাই ইতিহাস সৃষ্টি করে!

তথ্যসূত্র:-

1. উইকিপিডিয়া।

2. The Hindu.
https://www.thehindu.com/opinion/editorial/futile-fines-on-traffic-violation-penalties/article29402364.ece

3. The hindu.
https://www.thehindu.com/news/national/other-states/police-students-clash-in-kolkata-many-hurt/article29412684.ece

4. The Hindu.
https://www.thehindu.com/business/Economy/retail-inflation-inches-up-to-10-month-high-of-321-in-august/article29400771.ece

——————————সমাপ্ত————————–

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 3 = 5