১৮৬: মুতার যুদ্ধ-৩: নবীর মোজেজা – পরাজয় ও পলায়ন!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

ইসলাম বিশ্বাসী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা ‘মুতা যুদ্ধের’ আলোচনা কালে যে ঘটনা-টি প্রায় সব ক্ষেত্রেই উদ্ধৃত করেন তা হলো, এই যুদ্ধের প্রাক্কালে স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর এক “মোজেজা (অলৌকিকত্ব) প্রদর্শন।” নবী মুহাম্মদের নবুয়তের প্রমাণ হিসাবে তাঁরা এই ঘটনার বর্ণনা বিভিন্নভাবে পাঠক-শ্রোতার উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করেন। বাস্তবিকই, ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসের প্রায় সকল মুসলিম ঐতিহাসিকই তাঁদের নিজ নিজ পূর্ণাঙ্গ ‘সিরাত গ্রন্থে’ বিভিন্নভাবে এই ঘটনার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। অন্যদিকে, তাঁরা এই যুদ্ধের আলোচনা কালে যা সবচেয়ে কম উদ্ধৃত করেন তা হলো, এই যুদ্ধে নবী মুহাম্মদের ‘চরম পরাজয়’ ও তার অনুসারীদের অত্যন্ত বিপর্যস্ত অবস্থায় পলায়নের ইতিহাস। বস্তুতই, ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসে মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) ‘সিরাত গ্রন্থ’ ও পরবর্তীতে আল-তাবারীর (৮৩৯ -৯২৩ সাল) ইসলামের ইতিহাস সংকলন গ্রন্থে, এ বিষয়ের আলোচনা অত্যন্ত যৎসামান্য। সে কারণেই আদি উৎসে মুসলিম ঐতিহাসিকদের আর এক দিকপাল, “কিতাব আল-মাগাজি” গ্রন্থের লেখক আল-ওয়াকিদির (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ) বর্ণনার আলোকপাত ব্যতিরেকে ‘মুতা যুদ্ধে’ উপস্থিত মুহাম্মদ অনুসারীদের চরম দুরবস্থার সঠিক ধারণা পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ! বিভিন্ন উৎসের রেফারেন্সে আল-ওয়াকিদি এ বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন।

চরম পরাজয় ও পলায়ন:

ইসলামের ইতিহাসে ‘মুতা যুদ্ধ’ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওহুদ যুদ্ধের (মার্চ ২৩, ৬২৫ সাল) চরম ব্যর্থতার পর মুহাম্মদের নবী জীবনের ‘চরম পরাজয়ের’ আর এক উপখ্যান হলো এই যুদ্ধ! এই যুদ্ধে মুহাম্মদ হারিয়েছিলেন তাঁর দুই জন প্রিয় মানুষ-কে। প্রথম জন, পালিত পুত্র ‘যায়েদ বিন হারিথা’; আর অন্যজন, তাঁর চাচাতো ভাই ‘জাফর ইবনে আবু-তালিব’। এই যুদ্ধে জাফরের মৃত্যু সংবাদ শোনার পর মুহাম্মদ কীরূপে স্বজন-হারানোর ব্যথায় ব্যথিত হয়েছিলেন ও একের পর এক মুহাম্মদের নিযুক্ত তিন সেনাপতি: যায়েদ বিন হারিথা, ‘জাফর বিন আবু-তালিব ও আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহার নিহত হওয়ার পর, খালিদ বিন আল-ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুহাম্মদ অনুসারীরা কীরূপে পশ্চাদপসরণ করেছিলেন; তার আংশিক আলোচনা গত পর্বে করা হয়েছে।

ইবনে ইশাকের বর্ণনা (আল-তাবারীর বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ): [1] [2]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ১৮৫) পর:

‘ডান পাশের নেতৃত্বে ছিল কুতবা বিন কাতাদা আল-উধরি, যে মালিক বিন যাফিলা-কে [আল তাবারী: ‘সম্মিলিত আরব বাহিনীর দলনেতা’] আক্রমণ ও হত্যা করে। —

আল্লাহর নবীর সৈন্যদের আগমনের খবর শোনার পর হাদাস নামক স্থানের বানু ঘানম (B. Ghanm) গোত্রের এক মহিলা গণৎকার তার লোকদের বলে: [3]

“সতর্ক করি আমি তোমাদের উদ্ধত সেই লোকদের ব্যাপারে
দৃষ্টি যাদের সদা বৈরিতায়।
চালিত করে যারা তাদের ঘোড়াগুলো সারিবদ্ধভাবে
আর ঝরায় রক্ত অঢেল পর্যাপ্ততায়।”

(I warn you of a proud people
Who are hostile in their gaze.
They lead their horses in single file
And shed turgid blood.)

তারা তার কথা শুনে লাখম গোত্রের লোকদের কাছ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে। পরবর্তীতে হাদাস এক বৃহৎ ও সমৃদ্ধশালী উপজাতি হিসাবে পরিগণিত হয়। আর হাদাসের বানু থালাবা (B. Tha’laba) গোত্রের লোকেরা, যারা ঐ দিন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের অবস্থা গুরুত্বহীন হয়ে পরে। খালিদ তার লোকদের নিয়ে পলায়ন করার পর গৃহ- অভিমুখে যাত্রা শুরু করে।’

আল-ওয়াকিদির বিস্তারিত বর্ণনা: [4]

‘নাফি বিন থাবিত <ইয়াহিয়া বিন আববাদ হইতে <তার পিতা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে যা বলেছেন তা হলো, তিনি বলেছেন:
সৈন্যদের একজন ছিল বানু মুররা গোত্রের। তাকে কেউ একজন এসে বলে, “নিশ্চিতই লোকেরা বলে যে খালিদ মুশরিকদের কাছ থেকে পলায়ন করেছে।” জবাবে সে বলে, “না, আল্লাহর কসম, ঘটনাটি সে রকম ছিল না! যখন ইবনে রাওয়াহা-কে হত্যা করা হয়, আমি ব্যানারটির দিকে দৃষ্টিপাত করি, সেটি মাটিতে পরে ছিল। আর মুসলমানরা মুশরিকদের সাথে মিশে গিয়েছিল। অতঃপর আমি ব্যানার-টি খালিদের হাতে দেখি, ও তখন সে পশ্চাদপসরণ করছিল। পরাজিত হওয়ার পর আমরা তাকে অনুসরণ করি।”

মুহাম্মদ বিন সালিহ <একজন বেদুইন <তার পিতা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে বলেছেন, তিনি বলেছেন:
যখন ইবনে রাওয়াহা-কে হত্যা করা হয়, মুসলমানরা তখন পরাজিত। আমি জীবনে যেখানে যত খারাপ পরাজয় দেখেছি, এটি ছিল তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। অতঃপর, সত্যিই মুসলমানরা পশ্চাদপসরণ করে। আনসারদের এক লোক, যার নাম ছিল থাবিত বিন আকরাম সম্মুখে অগ্রসর হয়। সে ব্যানার-টি নেয় ও উচ্চস্বরে আনসারদের ডাকতে থাকে। লোকেরা চতুর্দিক থেকে তার কাছে সমবেত হওয়া শুরু করে। কিন্তু তাদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। অতঃপর সে বলে, “ভাইসব, আমার কাছে এসো।” তারা তার কাছে এসে জড়ো হয়।’

তিনি বলেছেন: ‘অতঃপর থাবিত খালিদের দিকে দৃষ্টিপাত করে ও বলে, “আবু সুলায়েমান, ব্যানার-টি ধরো।” সে জবাবে বলে, “না, আমি এটি নেব না। কারণ, এর জন্য আপনিই বেশী উপযুক্ত। আপনি বয়সে প্রবীণ ও বদর যুদ্ধের এক প্রত্যক্ষদর্শী।” থাবিত বলে, “এটি নাও, আল্লাহর কসম, তুমি ছাড়া অন্য কারও জন্য আমি এটি নিয়ে আসি নাই। তাই খালিদ সেটি গ্রহণ করে ও কিছু সময় পর্যন্ত তা বহন করে। মুশরিকরা তাকে আক্রমণ করা শুরু করে ও সে নিজেকে দৃঢ়পদ রাখে যতক্ষণে না মুশরিকরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পরে। অতঃপর সে তার সঙ্গীদের নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালায় ও তাদের দলের একটি-কে সে ছত্রভঙ্গ। অতঃপর, তাদের দলের বহু লোক তার ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়, কিন্তু মুসলমানরা সংঘবদ্ধভাবে থাকে ও তা প্রতিহত করে তাদের পলায়নের পথ পরিষ্কার করে।’

ইবনে আবি সাবরা <ইশাক বিন আবদুল্লাহ হইতে < ইবনে কা’ব বিন মালিক হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে বলেছেন, তিনি বলেছেন:
‘আমার সম্প্রদায়ের একটি দল (কওম), যারা সেই সময়ে উপস্থিত ছিল, আমাকে যা বলেছে, তা হলো: যখন সে ব্যানারটি নেয় ও জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়, তখন ছিল পরাজয়। মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছিল ও মুশরিকরা তাদের অনুসরণ করছিল। কুতবা বিন আমির চিৎকার করা শুরু করেছিল এই বলে, “হে লোক সকল, যে ব্যক্তি সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে নিহত হয়, সে পিছনে থাকা নিহত হওয়া ব্যক্তির চেয়ে উত্তম।” সে তার সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে চীৎকার করে, কিন্তু কেউই তার কাছে আসে নাই। সেটি ছিল পরাজয়। তারা পরাজিত অবস্থায় ব্যানার রক্ষককে অনুসরণ করছিল।’

আততাফ বিন খালিদ আমাকে যা জানিয়েছেন, তা হলো:
‘যে সময় সন্ধ্যাকালে ইবনে রাওয়াহা-কে হত্যা করা হয়, খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ সারা রাত জেগে থাকেন। যখন পরদিন সকাল হয়, সে তার পিছনের সারীর সেনাদের সম্মুখভাগে নিয়ে আসেন, আর তার সম্মুখভাগের সেনাদের নিয়ে যান পিছনে। আর তার ডান দিকের সেনাদের নিয়ে যান বামে, আর বাম দিকের সেনাদের ডানে। তাদের অবস্থান ও ব্যানার সম্পর্কে শত্রুরা যা জানতো, এই পরিবর্তন-কে তারা শনাক্ত করতে পারে নাই। তারা বলে, “তাদের কাছে সাহায্য এসেছে!” তারা ভীত হয় ও সরে যায়, পরাজিত। তারা এত বেশী নিহত হয় যে যা আগে কখনো হয় নাই।’

মদিনায় মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া:

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনা:
(আল-ওয়াকিদি ও আল-তাবারীর বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ):

‘মুহাম্মদ বিন জাফর বিন আল-যুবায়ের <উরওয়া বিন আল-যুবায়ের এর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে যা বলেছেন, তা হলো:

যখন তারা মদিনার নিকটবর্তী হয়, আল্লাহর নবী ও মুসলমানরা তাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য সমবেত হয়। তরুণ বালকরা দৌড়ে আসে, আর আল্লাহর নবী আসেন লোকজনদের সাথে তাঁর পশুর ওপর সওয়ার হয়ে। তিনি বলেন, “বালকদের ধরো ও তাদের-কে তোমাদের সাথে নিয়ে যাও; আর জাফরের ছেলেটি-কে আমার কাছে দাও।” তারা আবদুল্লাহ বিন জাফর-কে তাঁর কাছে দেয়, আর তিনি তাকে তাঁর সামনে বসিয়ে নিয়ে আসেন। লোকেরা সেনাদের ওপর ময়লা-দ্রব্য নিক্ষেপ করা শুরু করে ও বলতে থাকে, “তোরা তো পলাতক, তোরা এসেছিস আল্লাহর রাস্তা থেকে পালিয়ে!” আল্লাহর নবী বলেন, “তার পলায়নপর ব্যক্তি নয়, বরং তারা এমন ব্যক্তি যারা আল্লাহ চাহে তো আবার যুদ্ধ করবে।”

আবদুল্লাহ বিন আবু বকর <আমির বিন আবদুল্লাহ আল যুবায়ের হইতে <আল-হারিথ বিন হিশামের মামাদের পরিবারের কিছু সদস্য হইতে <আল্লাহর নবী স্ত্রী উম্মে সালামা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে যা বলেছেন তা হলো: [5]

‘সালামা বিন হিশাম বিন আল-আস বিন আল-মুঘিরাহর স্ত্রীকে আল্লাহর নবীর স্ত্রী উম্মে সালামা জিজ্ঞাসা করেন, “কী এমন কারণ যে আল্লাহর নবীর সঙ্গে আর সকল মুসলমানদের নামাজের সময় আমি সালামা-কে দেখি না?”

সে জবাবে বলে, “আল্লাহর কসম, সে বাহিরে আসতে পারে না। যখনই সে বাহিরে বের হয়, লোকেরা তাকে চিৎকার করে বলে, “তুই পলাতক! তুই আল্লাহর রাস্তা থেকে পালিয়ে এসেছিস!” তাই সে বাহিরে বের হয় না, ঘরেই বসে থাকে।’ [6]

নবী মুহাম্মদের মোজেজা!

আল-তাবারীর বর্ণনা:
(মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ও আল-ওয়াকিদির বর্ণনা, আল-তাবারীর বর্ণনারই অনুরূপ):

‘—-তারা প্রস্থান করার কিছুকাল পর, আল্লাহর নবী মিম্বারে আরোহণ করেন (আল-ওয়াকিদি: ‘যখন লোকেরা মুতায় মিলিত হয়, আল্লাহর নবী মদিনায় মিম্বারে ওঠে বসেন ও তাঁর ও আল-শাম এর মধ্যবর্তী সমস্ত ঘটনা তাঁর কাছে প্রকাশিত হয় ও তিনি যুদ্ধক্ষেত্র নিরীক্ষণ করেন’)। তিনি জামাতে প্রার্থনার আহ্বানের আদেশ জারী করেন। লোকেরা আল্লাহর নবীর কথা শোনার জন্য সমবেত হয়।

তিনি বলেন, “সৌভাগ্যে পৌঁছার এক দরজা (A gate to good fortune)! সৌভাগ্যে পৌঁছার এক দরজা! সৌভাগ্যে পৌঁছার এক দরজা! আমি তোমাদের কাছে সৈন্যদের খবর নিয়ে এসেছি। তারা রওনা হয়ে শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে। যায়েদ শহীদ হিসাবে মৃত্যুবরণ করেছে।” – তিনি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। “অতঃপর জাফর ব্যানারটি গ্রহণ করেছে ও শত্রুদের আক্রমণ করেছে, যতক্ষণে না সে শহিদ হিসাবে মৃত্যুবরণ করেছে।” – তিনি সাক্ষ্য দেন যে সে শাহাদাত বরণ করছে, ও তিনি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। “অতঃপর আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা ব্যানারটি গ্রহণ করেছে ও শহীদ হিসাবে মৃত্যুবরণ করার পূর্ব পর্যন্ত দৃঢ়পদে অবস্থান করেছে।” – তিনি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

“অতঃপর খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ ব্যানারটি গ্রহণ করেছে: সে সেনাপ্রধানদের একজন নয়, কিন্তু সে সত্যিকার এক সেনাপতি হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করেছে।” অতঃপর আল্লাহর নবী বলেন, “হে আল্লাহ, সে হলো তোমার তরবারির একটি, তুমি তাকে সাহায্য করো।” সেই দিনের পর থেকে, খালিদের নাম দেওয়া হয় “আল্লাহর তরবারি (The Sword of God)।” অতঃপর আল্লাহর নবী বলেন, “তাড়াতাড়ি যাও ও তোমার ভাইদের শক্তি বৃদ্ধি করো। কেউ যেন পিছনে না থাকে!” তাই তারা যুদ্ধের নিমিত্তে পায়ে হেঁটে ও পশুর পিঠে চড়ে উভয়ভাবে সম্মুখে অগ্রসর হয়। সেটি ছিল প্রচণ্ড গরমের সময়।’

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

>>> ইসলামের ইতিহাসের প্রাপ্তিসাধ্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হলো মুহাম্মদের স্ব-রচিত জবানবন্দি ‘কুরআন।’ তাঁর এই জবানবন্দির পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি (পর্ব: ২৩-২৫), মুহাম্মদ তাঁর সমগ্র নবী জীবনে কুরাইশ ও অন্যান্য অবিশ্বাসীদের বারংবার আহ্বান ও চ্যালেঞ্জ স্বত্বেও “তাঁদের সম্মুখে” তাঁর নবুয়তের সপক্ষে একটি মোজেজাও হাজির করতে পারেন নাই! অথচ, তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে তাঁর গুণমুগ্ধ অনুসারীরা তাঁর নামে হাজারও অলৌকিকত্বের কিচ্ছা রটনা করেছেন। যেমন করে আজকের যুগের পীর-ফকির-কামেল-গুরু-বাবাজীদের অনুসারীরা তাঁদের নিজ নিজ ‘গুরুর’ মহিমা ও অলৌকিকত্ব প্রদর্শনের সাক্ষ্যদান করেন ও তার প্রচার ও প্রসার ঘটান। ওপরে বর্ণিত মুহাম্মদের ‘মোজেজার কিচ্ছা’ তারই এক উদাহরণ মাত্র। [7]

ইসলামের ইতিহাসের ‘সংখ্যা তত্ত্ব’:

আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে (পর্ব: ১৮৪): ‘মুতা যুদ্ধে’ মুহাম্মদ অনুসারীদের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার; আর তাদের আক্রমণ প্রতিহত করার নিমিত্তে জড়ো হয়েছিল হিরাক্লিয়াসের প্রায় ১০০,০০০ গ্রীক সৈন্য ও মালিক বিন যাফিলার নেতৃত্বে সম্মিলিত আরব বাহিনীর আরও প্রায় ১০০,০০০ লোক; মোট দুই লক্ষ সশস্ত্র সৈন্য। অর্থাৎ প্রতি একজন মুসলমান সৈন্যের বিপক্ষে ৬৬ জন সশস্ত্র প্রতিপক্ষ। আর তা ছিল সম্মুখ যুদ্ধ! রাতের অন্ধকারের ঘুমন্ত জনপদের ওপর মুহাম্মদ অনুসারীদের অতর্কিত আক্রমণের কোন ঘটনা নয়। তা সত্বেও, অধিকাংশ মহাম্মদ অনুসারী নিরাপদে পলায়ন করতে সমর্থ হয়েছিলেন!

প্রশ্ন হলো: যদি এই সংখ্যাটি সত্য হয়, তবে

“সম্মুখ যুদ্ধে দুই লক্ষ সশস্ত্র মানুষের আক্রমণের শিকার হয়ে তিন হাজার মানুষের অধিকাংশই জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা কতটুক?”

সংক্ষেপে:

আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় যা অত্যন্ত সুস্পষ্ট তা হলো, ‘মুতা যুদ্ধে’:
১) মুহাম্মদের চরম পরাজয়,
২) তাঁর অনুসারীদের চরম বিপর্যস্ত অবস্থা ও প্রাণ ভয়ে পলায়ন, ও
৩) মদিনায় প্রত্যাবর্তনের পর এইসব অনুসারীদের প্রতি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা মুসলমানদের চরম তাচ্ছিল্য, আর মুহাম্মদের সমবেদনা!

আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আমরা যে সত্যের সন্ধান পাই তা হলো: লক্ষ্য অর্জনে যখনই কোন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখনই মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ তাঁর নেতৃত্ব পুনঃ-প্রতিষ্ঠা ও তাঁর অনুসারীদের মনোবল চাঙ্গা করার প্রয়োজনে “বিভিন্ন অজুহাতে” অবিশ্বাসী জনপদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছিলেন। যার উদাহরণ আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি: ওহুদ যুদ্ধের চরম পরাজয়ের পর অতর্কিত ‘বনি নাদির গোত্র হামলা ও উচ্ছেদ’, খন্দক যুদ্ধের চরম বিপর্যয়ের পর ‘বানু কুরাইজা গণহত্যা’, হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তির ব্যর্থতার পর অতর্কিত ‘খায়বারের ইহুদি জনপদের ওপর হামলা’; ইত্যাদি উপাখ্যানের বর্ণনায়। অতঃপর মুতা যুদ্ধে আবারও চরম ব্যর্থতা!

নেতৃত্ব পুনঃ-প্রতিষ্ঠা ও অনুসারীদের মনোবল চাঙ্গা করার প্রয়োজনে অতঃপর মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ কোন অবিশ্বাসী জনপদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছিলেন? কী অজুহাতে?

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল-ওয়াকিদির বর্ণনার অতিরিক্ত বিশেষ অংশটির মূল ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করছি। মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ও আল-তাবারীর রেফারেন্স: বিনা-মূল্যে ডাউন-লোড লিংক তথ্য-সূত্র [1] [2]]:

The added narratives of Al waqidi: [4]

‘Nāfi‛ b. Thābit related to me from Yaḥyā b. ‛Abbād from his father that a man from the [Page 763] Banū Murra was with the soldiers, and someone said to him, “Surely the people say that Khālid fled from the polytheists.” He replied, “No, by God, that was not so! When Ibn Rawāḥa was killed, I looked at the banner and it had fallen, and the Muslims were blended with the polytheists. Then I saw the banner in the hand of Khālid, and he was withdrawing. We followed him when there was defeat.”
Muḥammad b. Sāliḥ related to me from one of the Bedouin from his father, who said: When Ibn Rawāḥa was killed, the Muslims were defeated and it was the worst defeat I ever saw anywhere. Then, indeed, the Muslims withdrew. A man from the Anṣār named Thābit b. Arqam approached. He took the banner and began to shout at the Anṣār, and the people began to return to him from every direction, but they were few. Then he says, “Come to me, O people!” And they gathered to him. He said: Then Thābit looked at Khālid and said, “Abū Sulaymān, take the banner.” He replied, “No I will not take it, for you are more deserving of it. You are a man who has seniority, and you witnessed Badr.” Thābit said, “Take it, O man, for by God, I did not take it except for you.” So Khālid took it and carried it for a while. The polytheists began to attack him, and he stood firm until the polytheists wavered. Then, he attacked with his companions and he broke up one of their groups. Then many men from them surprised him, but the Muslims banded together and they made clear their return.
Ibn Abī Sabra related to me from Isḥāq b. ‛Abdullah from Ibn Ka‛b b. Mālik, who said: A group of my people (qawm) who attended at that time related to me, saying: When he took the banner and was exposed with the people (nās), there was defeat. The Muslims were killed and the polytheists followed them. Quţba b. ‛Āmir began to shout, “O people, the man who is killed going forward is better than the man who is killed from behind.” He shouted at his companions but none came to him. It was defeat. They followed the keeper of the banner in defeat. —-
‛Aṭṭāf b. Khālid related to me, saying: When Ibn Rawāhā was killed in the evening, Khālid b. al-Walīd stayed up the night, and when the next day dawned he had made the rear guard his front and his front his rear guard. And his right became his left, and his left, his right. And the enemy did not recognize what they knew of their banners and their positions. They said, “Help has come to them!” And they were frightened, and withdrew, defeated. They were killed as never before.’——-

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:
[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, সম্পাদনা: ইবনে হিশাম, ইংরেজি অনুবাদ: A. GUILLAUME; ISBN 0-19-636033-1; পৃষ্ঠা ৫৩৫-৫৪০
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী, ভলুউম ৮; ইংরেজী অনুবাদ: Michael Fishbein, ISBN 0-7914-3150—9 (pbk), পৃষ্ঠা ১৫৮-১৬০
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21292&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[3] Ibid: আল-তাবারী নোট নম্বর ৬৭৫: “হাদাস ছিল বানু লাখম গোত্রের এক শাখা, যারা বাইজেনটাইন সম্রাটের অধীনস্থ সিরিয়ায় বসতি স্থাপন করে।”

[4] অনুরূপ বর্ণনা: আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ খৃষ্টাব্দ); ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৭৬১-৭৬৬; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; ISBN: 978-0-415-86485-5 (pbk); পৃষ্ঠা ৩৭৫-৩৭৬
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-

[5] Ibid: আল-তাবারী নোট নম্বর ৬৭৭: ‘আল-হারিথ বিন হিশাম বিন আল-মুঘিরাহ আল-মাখযুমি ছিলেন মক্কার এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবারের সদস্য, যিনি বদর ও ওহুদ যুদ্ধে পৌত্তলিক-মুশরিকদের পক্ষে যুদ্ধ করেন। তিনি ছিলেন আল্লাহর নবীর স্ত্রী উম্মে সালামা বিনতে আল-মুঘিরাহর ভাইয়ের ছেলে (Nephew)। ‘মক্কা বিজয়’ সময়ে তিনি ইসলামে দীক্ষিত হোন।’

[6] Ibid: আল-তাবারী নোট নম্বর ৬৭৮: ‘অর্থাৎ, তাঁর ভাইয়ের ছেলের স্ত্রীকে। উম্মে সালামা ছিলেন আল-মুঘিরাহর কন্যা।’

[7] নবী মুহাম্মদের মোজেজা তত্ত্ব (পর্ব: ২৩-২৫):
https://drive.google.com/file/d/0BwbIXqxRzoBOejFmTXhTdk5zNDA/view

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

27 − = 25