প্রাণী হত্যা মানবিক, নাকি অমানবিক।

এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বয়স লক্ষ কোটি বছর। লক্ষ-কোটি গ্যালাক্সির মধ্যে আমরাও একটি গ্যালাক্সিতে বসবাস করি, আমাদের গ্যালাক্সির নাম মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি। আর সেই গ্যালাক্সির মধ্যেই আমাদের সৌরজগতের বসবাস, সৌরজগতের অসংখ্য গ্রহের মধ্যে আমাদের পৃথিবীও একটা গ্রহ। বিজ্ঞানীদের ধারণা পৃথিবীর মতো অন্যান্য গ্রহের মধ্যেও প্রাণের বসবাস থাকতে পারে, বিজ্ঞান যাদের নাম দিয়েছে এলিয়েন।

মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছে বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে, যাকে সহজ বাংলায় মহাবিস্ফোরণ বলা হয়। আর সেটা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে আমাদের এই পৃথিবী সহ সবকিছুর। প্রথমে এই পৃথিবীতে প্রাণের বসবাস ছিলো না। পৃথিবীটা ছিল অগ্নিগিরির মত, আগুনের লাভা। ধীরে ধীরে সেই অগ্নিগিরির তেজস্ক্রিয়া কমতে কমতে পৃথিবী শান্ত হতে থাকে। সে আগুনের লাভা ধীরে ধীরে পানি পাথরে রূপান্তরিত হয়। আর ধীরে ধীরে আমাদের পৃথিবী নামক গ্রহ সৃষ্টি হতে শুরু করে, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার সৌন্দর্য, আস্তে আস্তে জন্মাতে থাকে উদ্ভিদ সহ অন্য সবকিছুর।

পৃথিবীর সকল প্রাণের উৎপত্তি হয়েছে পানি থেকে। এক সময় পানির মধ্যে বিভিন্ন পোকামাকড়ের সৃষ্টি হতে থাকে। আস্তে আস্তে পানির থেকে বিবর্তিত হতে হতে তারা উপরে আসতে শুরু করে। তারপর তারা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনা একদিন দুই দিনের নয়, এক বছর দুই বছরের নয়, ১০০ বছর ২০০ বছরের নয়, প্রাণীজগতের এই বিবর্তন হতে সময় লেগেছে লক্ষ-কোটি বছর।

সেই বিবর্তনের পথ ধরেই আজকের এই মানব জাতির সৃষ্টি, মানব জাতির বিবর্তন হয়েছে খুব দ্রুত। তাই মানবজাতি এই পৃথিবীটাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পেরেছে। আর নিজের ইচ্ছামত সাজিয়েছে এই পৃথিবীটাকে। মানুষ বর্তমানে এই পৃথিবীর মালিক, পৃথিবীর এক ইঞ্চি জায়গাও মানুষের মালিকানার বাইরে নেই।

বন জঙ্গল, পাহাড় পর্বত, নদী সমুদ্র, সবকিছুই মানুষের নিয়ন্ত্রণে, এমনকি মানুষের নিয়ন্ত্রণে মানুষ ব্যতীত অন্য সকল প্রাণী জগতের প্রাণীরাও। মানুষ একসময় বনে-জঙ্গলে ফলমূল খেয়ে বেঁচে থাকত, ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রকারের সুস্বাদু মাংস খাওয়া শুরু করে, মানুষের খাদ্যাভ্যাসে আসে পরিবর্তন। মাছ মাংস মানুষের পছন্দের খাবারের তালিকায় সবার উপরে চলে আসে।

আর তাতেই শুরু হয় প্রাণী জগতের প্রতি মানুষের এক নিষ্ঠুর খেলার শুভ সূচনা। ধীরে ধীরে প্রাণীজগতের দুর্বল প্রাণীদের মানুষ নিজেদের খাদ্যের তালিকা আনতে শুরু করে। তাদের মধ্যে ছিলো গরু ছাগল হাঁস মুরগি শূকর বিভিন্ন প্রকারের মাছ ইত্যাদি। তারা দুর্বল, তারা মানুষকে আক্রমণ করতে পারে না, তাদের মধ্যে কোন বিষক্রিয়া নেই।

মানুষ তাদেরকে পালতে শুরু করে। তাদের জন্য খামার তৈরি করে, তাদের জন্য পুকুর খনন করে। তাদেরকে দিয়ে ব্যবসা করা শুরু করে। যাদের খাওয়া যায় না, যারা মানুষের চেয়েও বেশি শক্তিশালী তাদেরকে করেছে বন্দী। খাঁচার মধ্যে বন্দী থেকে তাদের জীবন নিষ্ঠুরভাবে কাটে। তাদেরকে জন্য তৈরি করেছে চিড়িয়াখানা। আর যারা বিষাক্ত, যারা মানুষকে হত্যা করতে পারে, তাদেরকে মানুষ নিজেরাই হত্যা করতে শুরু করেছে।

এই হচ্ছে মানব জাতির বর্তমান অবস্থা। এই নির্মম ভয়াবহ সত্যতা আমরা জেনে শুনেও চোখ মুখ বন্ধ করে বসে আছি, তবে সবাই একই কাজ করতেছে তা কিন্তু ঠিক না। এই পৃথিবীতে কোটি কোটি নিরামিষভোজী আছে, যারা প্রাণী জগতের সকল প্রাণীকে ভালোবেসে হত্যা করে খায় না, এমনকি অন্যদেরকেউ উৎসাহ দিচ্ছে না খাওয়ার।

কিন্তু আপনি আমি একবারও কি ভেবে দেখেছি? একটা মানুষের সামনে অন্য একটা মানুষকে জবাই করা কতটা অমানবিক? বাবা মায়ের সামনে তার সন্তানদের হত্যা করা কতটা অমানবিক? ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের রেখে দিয়ে তার বাবাকে অথবা মাকে ধরে নিয়ে হত্যা করা কতটা অমানবিক? অবশ্য মানুষের বাচ্চা দেখার জন্য অনেক মানুষ পাওয়া যাবে, মানুষের বাচ্চাদের বন্দি করলে তার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য অসংখ্য মানুষের বাচ্চা পাওয়া যায়।

কিন্তু পশুপাখিদের বেলায়ও কি একই ঘটনা ঘটে? অবশ্যই আপনি আমি বড় গলায় বলতে পারি তারা তো মানুষ না, তাদের আবার কিসের কষ্ট, কিন্তু না সেটা ভুল, জীবন সবার সমান, পশুপাখি এবং মানুষের জীবনের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই, দুটোই সমান জীবন। মানুষের মতো তারাও কষ্ট পায়, তারাও আঘাত পায়। তাদের অনুভূতি আছে।

একবার চিন্তা করেন দেখুন তো, এক জায়গায় দশজন মানুষকে বন্দি করে রাখা হয়েছে, ধীরে ধীরে একজন একজন করে সেখান থেকে বের করে এনে জবাই করা হচ্ছে। এবং বন্দী থাকা অন্য মানুষগুলো সেটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতেছে। এমনকি তারা জেনে গেছে কিছুক্ষণ পরে তাদেরকেও হত্যা করা হবে। তখন তাদের মনের অবস্থাটা কি হবে? আর হ্যাঁ ঠিক একইকাজ আমরা গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগির সহ প্রাণী জগতের প্রাণীদের মধ্যে যাদেরকে খাওয়া যায় তাদের সাথে করে আসতেছি।

আমরা একটা গরুর সামনে অন্য একটা গরুকে জবাই করতেছি। একটা শূকরের সামনে অন্য একটা শুকর কে। একটা মুরগির সামনে অন্য একটা মুরগিকে। হয়তো মানুষ হিসেবে আমরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রানী দাবি করতে পারি, কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের কোন চিহ্ন মানুষের মধ্যে নেই। বরঞ্চ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ নিকৃষ্ট কাজগুলোই মানুষরাই করে থাকে। মানুষ মানুষকে হত্যা করে, মানুষেরা পশু পাখিদের হত্যা করে, মানুষই ধর্ষণ করে, মানুষই চুরি করে, দুর্নীতি করে, একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের সম্পদ লুটেপুটে খায়। মানুষরা প্রতিনিয়ত একের পর এক মিথ্যা কথা বলে থাকে, তারপরেও আমরা বলে থাকি মানুষই শ্রেষ্ঠ জীব। আর শুকর, কুকুর নিকৃষ্ট জীব।

অনেকেই নিরামিষভোজীদের কটাক্ষ করে কথা বলে। উদ্ভিদের প্রাণ আছে, তাহলে তোমরা কেন তাদেরকে হত্যা করে খাও? উদ্ভিদের প্রাণ আছে তা ঠিক, এটা আবিষ্কার করেছেন, জগদীশচন্দ্র বসু। কিন্তু উদ্ভিদের প্রাণ আর পশু পাখির প্রানের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। উদ্ভিদের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমটা নেই, তারা ব্যথা অনুভব করতে পারে না, তাদেরকে কাটলে রক্ত বের হয় না, একটা গাছকে কাটলে অন্য একটা গাছ কষ্ট পায় না, তাই উদ্ভিদের সাথে প্রাণীদের মিলানো নিতান্ত হাস্যকর।

সকল প্রকার হত্যায় অমানবিক এবং অন্যায়। একটা মানুষকে হত্যা করা যেমন অন্যায়, গরু, ছাগল, মাছ, শূকর এগুলো হত্যা করাও অন্যায়। মানুষরা তাদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে, অন্যায় কাজকে ন্যায় বানিয়ে ফেলেছে, অমানবিক কাজকে করে ফেলেছে মানবিক।

তাই এই অমানবিক, অন্যায় কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখুন, নিরামিষভোজীদের সমর্থন করুন, নিজে নিরামিষভোজী না হলেও অন্যদেরকে নিয়ে হাসাহাসি করবেন না, মনে রাখবেন এই পৃথিবী শুধু মানুষের না। প্রাণী জগতের সবার এই পৃথীবিতে সমানভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তারাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ, যারা সকল প্রাণীকে সমানভাবে ভালোবাসে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

20 + = 30