তেঁতুল তত্ত্ব – প্যাভলভের ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং তত্ত্ব।

মানুষ জন্ম থেকে শিখছে । প্রতিদিন প্রতিনিয়ত শিখছে । এ শিখন ( Learning) নতুন অর্জন বা বিদ্যমান জ্ঞান, আচার , দক্ষতা,মান বা পছন্দগুলো পরিবর্তন করার প্রক্রিয়া। এই শেখার দক্ষতা মানুষ অর্জন করে তাৎক্ষনিক অভিজ্ঞতা, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অথবা বার বার অভিজ্ঞতা গ্রহণের মাধ্যমে । এভাবেই শিখন(Learning) হয় । এটা স্কুল কিংবা মাদ্রাসার পাঠ দানের শিক্ষার সাথে গুলিয়ে ফেললে হবে না ।

লক্ষ্য করে দেখবেন আকাশে যখন বিদ্যুৎ চমকায় ।তখন আকাশের বিদ্যুৎ চমকানোর তীব্র আলো আমাদের চোখে পরলে আমাদের চোখ আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যায়। এটা মানুষের স্বভাব ।এটা মানুষকে শেখাতে হয় না ।কিন্তু বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে সাথে এর গর্জনের শব্দ হওয়ায় এখন আমরা বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে সাথে আমরা ভয় পাই ।এই ভয়টা গর্জনের শব্দ থেকে বিদ্যুৎ চমকানোয় পরিণত হয়েছে । প্যাভলভের ভাষায় তা অনুবর্তীত হয়েছে ।বিদ্যুৎ চমকালে চোখের পাতা বন্ধ হওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।আবার অন্য ক্ষেত্রে বাজের শব্দে ভয় পাওয়া একটিও একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ।এখন বিদ্যুৎ চমকালে মানুষ ভয় পায় এখানে প্রতিক্রিয়া অনুবর্তীত হয়েছে ।

এই অনুবর্তীত প্রতিক্রিয়ার উপর বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেন একজন রাশিয়ান ফিজিউলজিষ্ট আইভান প্যাভলভ।তিনি ১৯০৪ সালে এই গবেষণার জন্য নোবেল পুরুষকার পান । তিনি বলেন , “অনুবর্তীত প্রতিক্রিয়ার সাহায্যে সব রকমের শিখন ( Learning) পদ্ধতির ব্যাখ্যা করা সম্ভব”। তার এই মতবাদের সমর্থন করে আমেরিকান অন্যতম মনোবিজ্ঞানী ওয়াটসন।

 

এটা বোঝার জন্য আমাদের জানা উচিত অনুবর্তীত প্রতিক্রিয়া ( Conditioning Response) কি? প্যালভব এই অনুবর্তীত প্রতিক্রিয়া পরীক্ষার জন্য একটি ক্ষুধার্থ কুকুরকে পরীক্ষাগারে নিয়ে আসেন এবং তার সামনে খাবার দেন । তিনি লক্ষ্য করেন কুকুরের মুখ দিয়ে লালা বের হচ্ছে । এটাই স্বাভাবিক একটি কুকুর খাবার দেখলেই তার মুখ দিয়ে লালা ঝরবে । প্যাভলভ আড়াল থেকে লালা ক্ষরণের পরিমাণ লক্ষ্য করতে থাকলেন । লালা ঝরা হলও কুকুরের জন্য একটি ন্যাচারাল রেসপন্স। পরদিন কুকুরকে খাবার দেবার পূর্বে একটি ঘণ্টা বাজাতে থাকেন । খাবার দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত অনেক সময় ঘণ্টা বাজানোর পরে কুকুরের সামনে খাবার দেওয়া হয় ।এই একই বিষয় ঘণ্টা বাজানো এবং তারপর খাবার দেওয়া এই ঘটনাটি বেশ কিছুদিন কুকুরের উপর পূনরাবর্তীভাবে করা হচ্ছিল । তারপর দেখা গেল খাবার দেওয়ার পূর্বে কুকুরের ঘণ্টা বাজানোর সময়ই কুকুরের লালা ক্ষরণ হচ্ছে । এই লালা ক্ষরণ যেটি ছিল খাবার দেখা মাত্রই কুকুরের একটি ন্যাচারাল রেসপন্স তা এখন একটি কৃত্রিম উদ্দীপক ঘণ্টা দেখলেই হচ্ছে ।এখন কুকুরের লালা ক্ষরণ স্বাভাবিক উদ্দীপকের(খাবার) এর সাথে কৃত্রিম উদ্দীপকের (ঘণ্টা) এর একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ।স্বাভাবিক উদ্দীপকের থেকে কৃত্রিম উদ্দীপকের এই প্রক্রিয়ার সঞ্চালনকে বলে কন্ডিশনিং । যে প্রাণীর ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে তাকে বলে কন্ডিশন এ্যানিমেল ।অর্থাৎ প্যাভলভ তার পরীক্ষার মাধ্যমে এটা দেখালেন যে , স্বাভাবিক উদ্দীপক প্রয়োগ করার মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় কিন্তু সেই স্বাভাবিক উদ্দীপকের সংগে সংগে যদি কোন বিকল্প উদ্দীপককে বার বার উপস্থাপন করা হয় তাহলে কিছুদিন পরে ঐ বিকল্প উদ্দীপকটি প্রয়োগ করে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা যাবে । এটাকে বলে কন্ডিশন রিফ্লেক্স।অনুবর্তীত প্রতিক্রিয়া পাওয়ার সঠিক পদ্ধতি হলও স্বাভাবিক উদ্দীপকের সাথে ২-৩ সেকেন্ডের মধ্যে কৃত্রিম/বিকল্প উদ্দীপককে সামনে দিতে হবে । প্যাভলভ তার পরীক্ষায় খাবারকে সব সময় স্বাভাবিক উদ্দীপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন । অন্যদিকে কোন কিছু দেখা শোনা বা ঘ্রাণকে তিনি কৃত্রিম উদ্দীপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন ।

প্যাভলভের এই প্রক্রিয়ার প্রধান কিছু শর্ত রয়েছে । গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো যদি না থাকতো তা হলে কোনভাবেই এই পরীক্ষা সম্ভব ছিল না ।তার শর্তগুলো ছিল এমন , যে উদ্দীপকের অনুবর্তন করতে হবে সেটি অপর স্বাভাবিক উদ্দীপকের পূর্বে স্থাপন করতে হবে । এই অনুবর্তীত উদ্দীপকের সংগে সংগে পরের অর্থাৎ কৃত্রিম উদ্দীপককে উপস্থাপন করতে হবে । কৃত্রিম উদ্দীপক স্বাভাবিক উদ্দীপকের চেয়ে বেশী শক্তিশালী হওয়ার দরকার।এক্ষেত্রে খাবারের চেয়ে খাবারের চেয়ে ঘণ্টাকে বেশী শক্তিশালী হতে হয়েছে ।যা না থাকলে অনুবর্তনই সম্ভব হতো না যতক্ষণ না এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হচ্ছে অর্থাৎ অনুবর্তন না হচ্ছে ততক্ষণ প্রথম এবং দ্বিতীয় উদ্দীপককে পরপর উপস্থাপন করতেই হবে ।এটাই হলও প্যাভলভের অনুবর্তিত প্রক্রিয়া বা কন্ডিশনিং রেসপন্স ।

 

পাঠকরা নিশ্চয়ই আমার বক্তব্য বুঝতে পেরেছেন । আমার এই দীর্ঘ আলোচনার কারণ রয়েছে । বাংলাদেশের শফি হুজুরের তেঁতুল সমাচার নিয়ে কে না জানে । উনি বলেছেন নারী হল তেঁতুলের মতো , এদের দেখলেই মানুষের মুখ দিয়ে লালা ঝরে। ধরে নিলাম নারীকে দেখলে শফি হুজুরের মুখ দিয়ে লালা ঝরে । তাহলে তেঁতুল হলও স্বাভাবিক উদ্দীপক। আর লালা ঝরানোর জন্য উনি নারীদের কৃত্রিম উদ্দীপক হিসেবে গ্রহন করে নিয়েছেন । এখন মমিনদের লালা মুছার জন্য সব সময় টিস্যু পেপার পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়েতে হয়।ওনার দোষ তো কিছু না, এটাই হয়তোবা মোমিনরা বলবেন কিন্তু এতক্ষণ আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝালাম যে,মানুষ যে কোন স্বাভাবিক উদ্দীপক মাধমে যে প্রতিক্রিয়া হয় তা কৃত্রিম উদ্দীপকের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করতে পারে । আপনি সকল নারীকে আপনার মা কিংবা বোনের অথবা শুধুই মানুষ বলে কল্পনা করুন । দেখবেন আপনার আর লালা ঝরবে না ।মানুষের কাছে লালা ঝরার স্বাভাবিক উদ্দীপক হল তেঁতুল কিন্তু মোমিনরা দেখি প্যাভলভ এর ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং থিউরি মেনে নারীদের কৃত্রিম উদ্দীপক হিসেবে গ্রহণ করেছে। অবশ্যই এটা স্বাভাবিক মানুষের চিন্তা চেতনা হতে পারে না । কুরুচিপূর্ণ মোমিনদেরই এরকম লিখন (Learning ) গ্রহণ করেছেন । এটা সাধারণ শিক্ষা দিয়ে পরিবর্তন লম্ভব না ।অভিজ্ঞতা কিন্তু মানুষের মস্তকে জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করলে এটা পরিবর্তন করা সম্ভব না । সাইকোলজি স্টাডি কিন্তু এমনই বলে । কিন্তু মুসলিমদের মধ্যে দেখি স্বাভাবিক উদ্দীপক তেঁতুলের সাথে নারীকে কৃত্রিম উদ্দীপক হিসেবে উপস্থাপন করে সমানে লালা ঝড়িয়ে আনন্দ পাচ্ছে । এখন পরিবর্তন করা সম্ভব কি ? অবশ্যই তবে তা আপনার অভিজ্ঞতা অর্জনের আয়োজন পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু  যদি সব সময় ৪ বিবাহ , দাসী সেক্স , ৭২ হুর জ্ঞান হয় তা হলে আপনি তো নারীকে তেঁতুলের সাথে তুলনা করবেন । এটা তো প্রমাণ করেছে প্যাভলভের ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং তত্ত্ব। আশা করি সাইকোলজি নিয়ে বিস্তারিত পড়াশুনা করবেন । তাহলে আমার লেখা পড়ে নতুন বোধের উদয় হবে ।

 

জ্যাক পিটার।
২৩/০৯/২০১৯

 

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 9 = 12