প্রেমে ব্যর্থতা, প্রেমময় অনুভূতির একাকী জীবন। 

মানুষ বড়ই অদ্ভুত প্রাণী। পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা অন্য একজন মানুষকে নিয়ে খেলা করে। মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা খুব দ্রুতই স্বপ্ন দেখে, আর দ্রুতই স্বপ্নগুলো ভেঙে যায়। মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা দুঃখ পেলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, আনন্দে হাউমাউ করে হেসে ওঠে।

মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে আমিও সুখী। কুকুর হয়ে জন্ম নিলেও দুঃখ থাকতো না, খুশি হতাম। আনন্দে আমি পুলকিত হই, হেসে উঠি। দুঃখে আমিও কান্না করি। বেশিরভাগ মানুষই তাদের জীবন অতিবাহিত করে নানান দুঃখ-কষ্টে, আর দুঃখ কষ্টের মাঝেই তারা সুখ খুঁজে পায়। মানুষ হিসেবে আমাদের জানার নির্দিষ্ট কোন সীমাবদ্ধতা নেই, আমরা চাইলেই অনেক কিছু জানতে পারি, তবে চাইলেই অনেক কিছু করতে পারিনা, আমরা চাইলেই ভালোবেসে কোনো মানুষকে সারা জীবন আঁকড়ে ধরে পারে রাখতে পারিনা, তবে চাইলেই দশতলা বিল্ডিং থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে মরে যেতে পারি।

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তার জগতে আসে পরিবর্তন, মানুষ বেশিদিন এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকে না, এই পৃথিবীর বয়স লক্ষ কোটি বছর, আর একটা মানুষ বেঁচে থাকে ৭০-৮০ বছর, আমাদের সবাইকে একদিন মরতে হবে, জন্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যায়।

পৃথিবীর সব মানুষই প্রেমে পড়ে, যে কখনো এই সুন্দর পৃথিবীটাকে তার দুচোখ দিয়ে দেখেনি, যে কখনো মুখ দিয়ে কথা বলতে পারেনি, যে কখনো তার পা দিয়ে হাটতে পারেনি, যে কখনো তার হাত দিয়ে কিছু ছুঁয়ে দেখেনি, সেই প্রতিবন্ধী মানুষগুলো প্রেমে পড়ে। প্রেমের নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই, মানুষ যেকোনো সময় যেকোনো মানুষের প্রেমে পড়তে পারে, প্রেমের কোন বর্ণ নেই, একজন সুন্দর মানুষ ও একজন কালো মানুষের প্রেমে পড়তে পারে, একজন শিক্ষিত অশিক্ষিত একজনের প্রেমে পড়তে পারে, একজন ধনী আরেকজন গরিবের প্রেমে পড়তে পারে।

প্রেমের অনুভূতি পৃথিবীর ভয়ংকরতম অনুভূতিগুলোর একটি, প্রেমে পড়লে পৃথিবীটাকে মনে হয় তুচ্ছ, আর ভালোবাসার মানুষটাকে মনে হয় পৃথিবী। প্রেমে পড়লে অনেক বুদ্ধিমান মানুষও বোকায় পরিণত হয়ে যায়, উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করে, জ্ঞানী মানুষরাও নির্বোধের মত আচরণ করে, প্রেমের অনুভূতি মারাত্মক ভয়াবহ। মানুষ যত প্রেমের গভীরে যায়, ততোই অন্ধ হয়ে পড়ে, তার কথা বলা চলাফেরা খাওয়া-দাওয়া সবকিছুতেই আসে পরিবর্তন। ভালোবাসার মানুষের সাথে সম্পর্ক ভালো থাকলেই সে আনন্দে পুলকিত হতে থাকে, সম্পর্ক একটু খারাপ হলেই শুরু হয় ভিন্ন এক অধ্যায়ের, রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, সবসময় চুপচাপ থাকতে হয়, কোন কাজে মন বসে না।

মানুষ একাএকা প্রেমে পড়তে পারে, তবে একাএকা প্রেম ভালোবাসা হয় না। একাএকা প্রেমে পড়ার অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। দুজন মানুষ মিলেমিশে প্রেম করলেই সেই প্রেমের অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। যদি সত্যিকারের ভালোবাসা হয়ে থাকে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে ভুলা কষ্টকর হয়ে যায়, অনেক সময় ভুলে থাকা সম্ভবই হয় না।

বেশিরভাগ প্রেমের গল্পই এই ব্যর্থতার চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। পারিবারিক সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, ধর্মের সীমাবদ্ধতা, এই সমস্যাগুলোই প্রেমের ক্ষেত্রে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অনেক সময় জোর করে মেয়েরকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়, এবং মেয়েকে ভুলে যাওয়ার জন্য ছেলের প্রতি চাপ সৃষ্টি করা। এই সমস্যাগুলো পরিবার দ্বারাই হয়ে থাকে। অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝির জন্য সম্পর্কগুলো ভেঙে পড়ে, একজন আরেকজনকে বোঝার চেষ্টা করে না, বা যেটা বুঝাতে চায় সেটা না বুঝে উল্টো বুঝে, অথবা প্রচুর সন্দেহ প্রবন হয়ে থাকে। বর্তমানে প্রেমের সম্পর্কগুলো ভেঙে পড়ার এটাই অন্যতম কারণ।

ছেলে মেয়েদের নির্দিষ্ট একটা সময়ে মনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঢুকতে থাকে। তখন তারা বুঝতে পারে না কি করবে, তারা বুঝতে পারে না কি করলে তাদের ভাল হবে, কারন কার সাথে সে সারাজীবন কাটাবে, কে তাকে মন থেকে ভালবাসবে, তখন তাদের মন থাকে উড়নচন্ডির মত, তাদের স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে, ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে গভীর স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেতে ইচ্ছে করে, তারা তখন জোসনার স্বপ্ন দেখে, বৃষ্টির স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখে কুয়াশার, স্বপ্ন দেখে নক্ষত্রের গাঢ় অন্ধকার রাত। তারা বাস করে তখন স্বপ্নের জগতে, যে জগত বাস্তবের জগত থেকে পুরোপুরি আলাদা। একটা সময় পার হওয়ার পরেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর স্বপ্নগুলো থাকেনা। ছেলেমেয়েদের মধ্যে ম্যাচিউরিটি চলে আসে, তখন তারা যে স্বপ্নগুলো দেখে সেগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে।

মানুষ যা চায় তাই পায় না, শুধু মানুষ নয় পৃথিবীর কোন প্রাণী যা চায় তা পায় না, গরু ছাগল হাঁস মুরগি, কেউ চায় না তাকে কেউ জবাই করুক, তারপর রান্না করে খেয়ে ফেলুক, তারপরেও মানুষরা তাদের জবাই করে হত্যা করে খায়। ঠিক কোন মানুষই আত্মহত্যা করে মৃত্যুবরণ করতে চায়না, কিন্তু একটা সময় আসে তখন বেঁচে থাকা তার জন্য নিরর্থক হয়ে ওঠে, তখন সে আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ পথ বেছে নেয়। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়, সেটার সবচেয়ে বড় কারণ ভুল বোঝাবুঝি, একজন মানুষ যেটা বুঝাতে চাচ্ছে অপরজন সেটা বুঝতে চাচ্ছে না, ভুল বুঝে দূরে সরে যাচ্ছে, ভুল বোঝাবুঝির কারণে ঝগড়া হচ্ছে, ভুল বোঝাবুঝির কারণে সংসার ভেঙে যাচ্ছে, ভুল বোঝাবুঝির কারণে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তারপর মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, অনেকেই সেই সময় ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, জীবন থেকে নিজেকে মুছে ফেলার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।

মানুষ একা বাস করতে পারে না, তবুও মানুষকে একাই বাস করতে হয়, মানুষকে তৈরি করতে হয় নিজের একটি জগত, যে জগতে অন্য কোন মানুষকে সে জায়গা দিবে না, অন্য কোন মানুষ চেষ্টা করলেও সেই জগতে ঢুকতে পারবে না। মানুষকে একা বাঁচতে হয়, একাই মরতে হয়, একাই স্বপ্ন দেখতে হয়, আর একা একাই ধীরে ধীরে সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হয়। এই পৃথিবীতে আমরা সবাই একা, শুধু আমরা একা না থাকার ভান করে থাকি প্রতিনিয়ত, আমরা মানুষকে বুঝাতে চাই আমরা একা না, আমাদের কষ্ট গুলো খুব যত্ন করে নিজের মনের গভীরে রেখে দিতে চাই। কাউকে সেটা বুঝতে দিই না। পৃথিবীর সব মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই একটা করে গভীর দুঃখের সমুদ্র থাকে, মাঝে মাঝে সেই দুঃখের সমুদ্র আনন্দে পুলকিত হয়, আবার দিন শেষে গভীর বেদনায় ভরে ওঠে।

তাই সবসময় নিজের মনকে স্থির রাখতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে, ভালবাসলে ভালোবাসার মানুষকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে, তাকে সময় দিতে হবে, যদি সে একেবারেই থাকতে না চায় তাকে ছেড়ে দিতে হবে, পশু পাখিকে খাঁচায় খাঁচায় বন্দী করে রাখা যায়, মানুষকেও বন্দী করে রাখা যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়কে কখনো বন্দি করে রাখা যায় না। যে যাবার সে চলে যাবে, যে থাকার সে বারবার গিয়েও ফিরে আসবে, এইতো ভালোবাসা এইতো জীবন।

সাহাবউদ্দিন মাহমুদ
ব্লগার – অনলাইন এক্টিভিস্ট

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 23 = 27