অলৌকিক ভাষা জ্ঞান এবং তারপর

নদীর তীরে প্রাকসন্ধ্যায় বসে সূর্য ডোবা দেখছিলাম। এমন সময় কে যেন বললো
– দাদা আমারে উঠতে একটু সাহায্য করবেন?
ডানে বামে পেছনে তাকিয়ে সামনে কোন মানুষ দেখলাম না। দূরে পাল তুলে নৌকোগুলো এদিক ওদিক যাচ্ছে। কে বললো কথাটা! ক্ষণিক পরে আবার একই শব্দ
– আরে দাদা আমি! আপনার সামনেই! নদীর খাড়া কাপ ভেঙে উঠতে পারছি না!
সামনে একটা গরু ছাড়া কিছু দেখলাম না। গরুর পেছনে কি মানুষ আছে? না তাও নেই! দাঁড়ালাম এবার। নাহ! চেষ্টা করছে গরুটি উঠতে কিন্তু নদী ভাঙনে উঁচু ভিটির কারণে উঠতে পারছে না। গরুটাকে উঠতে সাহায্য করলাম একটু। ওর রশি ধরে জোরে টান দিতেই উঠতে পারলো গরুটা। আবার আগের গলাতে শুনলাম
– ধন্যবাদ দাদা উঠতে হেলপ করাতে!
আরে গরু কথা বলছে নাকি? ওর মুখওতো নড়তে দেখলাম না! তাহলে কে কথা বলছে! অথচ কাছাকাছি কোন মানুষ নেই।
:
সূর্য প্রায় ডুবে গেল। তাই উঠলাম আমি। হাঁটছি একাকি বাড়ির দিকে। বাড়ি পৌঁছতেই মা বললো
– হাঁসগুলো এখনো বাড়ি ফেরেনি। একটু খালের পাড় দেখতো সেখানে আছে কিনা?
খালের ঘাটে বা আশপাশে কোন কোন হাঁসের ডাক বা চিহ্ন পেলাম না। তাই পুকুরের পাড় ডিঙিয়ে ধান ক্ষেতের কাছে যেতেই সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে সম্মিলিত আওয়াজ শুনতে পেলাম
– স্যার আমরা সবাই এখানে। জালে আটকা পড়েছি।
হাতের মোবাইল জ্বালিয়ে আলোর প্রক্ষেপণে দেখতে পেলাম বীজ ধানের চারার জন্য দেয়া রক্ষণ জালে আটকা পড়েছে আমাদের প্রায় ২৪-টা হাঁসের সবগুলোই। দুয়েকটা যাও মুক্ত আছে, তাও সাথের হাঁসদের পাশে দাঁড়িয়ে সমবেতনা জানাচ্ছে আটকে পড়া সাথীদের। জালের কাছে গিয়ে জাল উঁচু করাতে প্রায় সবাই মুক্ত হয়ে আমার পায়ের কাছে এসে দাঁড়ালো। সম্মিলিতভাবে বলে উঠলো
– আপনাকে ধন্যবাদ স্যার!
আজ হলো কি! কে আমার কানের কাছে এসে এমনসব কথা বলছে। পাশে কোন মানুষ নেই। তাহলে প্রাকসন্ধ্যার গরুর মত হাঁসগুলো কথা বলছে কি?
:
রাতে ভাল ঘুম হলোনা। কে যেন ঘুমের ঘোরে এলো সামনে। বললো
– এখন থেকে সব প্রাণির কথা শুনতে পাবি তুই। যতদিন তাদের হেলপ করবি আর কাউকে বলবি না এ রহস্যের কথা, ততদিন সব কথা ষ্পষ্টভাবে শুনবি।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে আগের রাত আর দিনের কথা সব ভুল গেলাম। স্কুলে যেতে বাঁশের সাঁকোর কাছে একত্রিত হলাম সব বন্ধুরা। একটু যেতেই পথে একটা কাক উড়ে বসলো সাঁকোর বাঁশের উপর। সুষ্পষ্ট ভাষায় বললো
– স্কুলে যেওনা, আজ মার খাবে।
সাঁকো পার হয়ে বন্ধুদের বললাম
– চল আজ স্কুলে না যাই?
– কেন?
– আজ ক্লাসে মার খেতে হবে!
আমার কথা শুনে হাসলো সবাই। ঠোঁট উল্টে বললো
– ওরে বাবা, যেন কত বড় গণক ঠাকুর। কেন মারবে শুনি!
ক্লাসে ঢুকতেই ব্লাকবোর্ডে কি সব অশ্লীল লেখা দেখলাম। পাশে অন্য ক্লাসের কটা মেয়ের নাম লেখা। ঘন্টা পড়তেই অংকের কড়া রশীদ স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। প্রথমেই জানতে চাইলেন কে বোর্ডে এসব কথা লিখেছে? কেউ স্বীকার করলো না। দপ্তরি ডেকে জোড়া বেত আনালেন দুটো। সবাইর পিঠে গণশাস্তি হিসেবে দশটা করে বেত্রাঘাত। ক্লাসে আর কোন পড়া হলোনা। শাস্তি দিতেই ক্লাস শেষ হলো।
ফেরার পথে আবার সাঁকোর বাঁশে সেই কাকের দেখা। ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বললো
– কইলাম না স্কুলে যাইও না, মাইর খাইবা? খাইলা তো!
:
সন্ধ্যায় বাজারে বন্ধুরা ধরলো ঐ বোর্ডে তুই লেখছিস, না হইলে কিভাবে কইলি মাইর খামু সবাই! যতই আমি না বলি ততই তারা বলে, লেখার বিষয়টা আমি আগেই জানতাম, না হলে মারের কথা জানলাম কিভাবে!
সকালে স্কুলে যেতে টিয়া পাখির ফোকড় দেখে রাখলাম কটা। ফিরতি পথে উঁচু গাছে উঠে ছানা পাড়তে হবে, তারপর কথা শেখাবো টিয়া পাখির ছানাকে। কিন্তু পথে দুটো্ গুবরে শালিক বললো
– টিয়া পাখির ছানা ধরোনা, ওখানে সাপ আছে।
বন্ধু জয়নাল সফিক নিরঞ্জন আমার কথা শুনলো না। এক মিনিটে বানরের মত লাফিয়ে উঠে গেল গাছে। যেইনা ফোঁকড়ে হাত ঢুকালো ছানা ধরতে, ছানার বদলে ওরা হাত রাখলো সাপের মাথায়। সাপ এসেছে ছানা খেতে। সফিক জয়নাল ছোবল খেয়ে আর নিরঞ্জন ছোবল না খেয়ে সাপ দেখেই নেমে এলো গাছ থেকে। দুজনের গেঞ্জি খুলে শক্ত করে হাত বাঁধলাম সফিক জয়নালের। বিকেলে ওঝা এসে ভাঙা বোতলের কাঁচ দিয়ে হাত কেচে কেচে ডোর দিয়ে কালো রক্ত ঝড়ালো লিটার পরিমান। নানাবিধ টোটকা পাতা ছাতা খাওয়ানোর পর সুস্থ্য হলো দুজনেই। কিন্তু হাঁটে হাঁড়ি ভেঙে দিলো ওরা। মানে আমি সব কথা আগাম বলতে পারি। এলাকায় রটে গেল আমি এক বিশাল গণক! আগাম বলতে পারি সব নাড়ির খবর!
:
ধান কাটার মৌসুম। নতুন জেগে ওঠা চরে ধান কাটতে যাবে আমাদের এলাকার লোকজন নৌকো বোঝাই করে। চরের জমি নিয়ে সদরের লোকজনের সাথে ঝগড়া বিবাদ দীর্ঘদিনের। তারা দাবী করছে জমি তাদের। আমাদের এলাকার লোকজন দাবী করছে জমি এ এলাকার। সুতরাং ধান কাটার সিজনে দুই পক্ষ তাদের শক্তি প্রদর্শন করে লাঠিয়ালের মাধ্যমে। ঢাল সরকি বল্লমের যুদ্ধে যারা জয়লাভ করে ধান তারাই কেটে নেয়। বিগত ৪/৫ বছরে এমনটাই হয়ে আসছে। আমাদের জমি ঐ চরে জাগলেও মূলত গন্ডগোলের ভয়ে আমাদের বাড়ির কেউ ওখানে যায়না। তবে আবু ব্যাপারীরা অনেক লাঠিয়াল ও ধান কাটার কিষাণ নিয়ে প্রতিবছর চরে যায়। কোন বছর পুরো কোন বছর আংশিক ধান কেটে আনে তারা। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছি। অন্তত ৭/৮টা নৌকা ভরে লাঠিয়াল আর কিষাণরা যাচ্ছে ধান কাটতে। কিন্তু নদীর তীরে কাদা মাটিতে দাঁড়ানো বক বললো
– চরে যেওনা, সেখানে মানুষ মরবে!
আমাদের বাড়ি সংলগ্ন রহিমউল্লাহও যাচ্ছে ধান কাটতে কিষাণ হিসেবে। যে ধান সে কাটতে পারবে তার অর্ধেক তাকে দেয়া হবে পারিশ্রমিক হিসেবে, বাকিটা আবু বেপারীর। জানি সবাইকে যেতে না বললে বাঁধা দিলে লাঠিয়াল রাজ আবু বেপারী ভীষণ খ্যাপা খেপবে আমার ওপর, তাই রহিমউল্লাহকে একটু দূরে ডেকে বললাম
– তুমি যাইওনা ধান কাটতে, মানুষ মরবে ওখানে। প্রথম হেসে উড়ালেও তাকে সাপের কথা, ক্লাসে বেত খাওয়ার কথা বলাতে ভয় পেল সে। নৌকোতে রাখা তার পান্তাভাত না নিয়েই গোপনে সটকে পড়লো সে। অন্যরা ছেড়ে দিলো নৌকা তাকে না পেয়ে। বিকেলে আবু ব্যাপারীর দল ফিরে এলো কোন ধান না নিয়েই। বরং ৩-জন নিহত হয়েছে এ পক্ষের। যাদের লাশ নাকি ইট বেঁধে নদীর স্রোতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তাই লাশও পাওয়া যাবেনা কখনো।
:
এর মধ্যে রাতে চুরি হলো আবু বেপারীর ঘর। ধনী মানুষ আবু বেপারী। অনেক জোত জমির মালিক। রাতে সিঁদ কেটে চোর ঘরে ঢুকে তার স্টিল আলমারী খুলে নগদ অন্তত ত্রিশ হাজার টাকা আর ৮/১০ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছে। আর কিছুতে হাত দেয়নি চোরেরা। দুপুরে বাজারে ধরে আনা হলো ২-চোর। হাড় জিড়জিড়ে লিকলিকে চেহারা ২ চোরের। গ্রামে কলা কচু সুপারি চুরে করে ওরা পেটের টানে। গাবের লাঠি দিয়ে প্রচন্ড মার দিলেন আবু বেপারীর প্রধান সাগরেদ ধনাই মোল্লা। তাতেও চুরির কথা স্বীকার করলোনা চোরেরা। তাই এবার বাঁশ ডলার আয়োজন। ধনাই মোল্লার আস্ফালন বাজারে
– বাঁশ ডলা দিলেই চোরের হর হর করে বলে দেবে চুরির কথা।
নতুন কাঁচা বাঁশ কেটে আনা হলো। চোরেরা বার বার কাকুতি মিনতে করে বলছে যে, তারা চুরি করেনি।
বাজারের গাছের ডালে টিয়া পাখির বাসা। তারা সমস্বরে বলে উঠলো
– চুরি করেছে ধনাই মোল্লা নিজে। অপর পারের মহিষ কাটার চরে ধনাই মোল্লার শ্যালিকার কাছে জমা আছে টাকা আর সোনা।
আমি বললাম – ঐ চরে পাঠালো কিভাবে সে?
লাল ঝুটির বুড়ো টিয়া বললো
– ওর ভায়রা রাতে ছিল চুরির সময়। নৌকো নিয়ে এসেছিল সে, রাতেই টাকা আর স্বর্ণ নিয়ে চলে গেছে ওপারে।
:
বাঁশ ডলার আগে চলে এলাম বাড়িতে। মাকে খুলে বললাম চুরির সব কথা। কেবল আমি কিভাবে টিয়াপাখির মাধ্যমে জানলাম সেটা বললাম না মাকে। মা বললো
– যদি মিথ্যে হয় এ কথা, তবে ধনাই মোল্লা আবু বেপারী ছাড়বে না তোকে বা আমাকে।
দৃঢ়তায় বললাম
– মিথ্যা হবেনা মা!
বাজারের এক কোনে গিয়ে মা ডেকে আনালেন আবু বেপারীকে। খুলে বললেন চুরির বিস্তারিত বর্ণনা। এও বললেন বাঁশ ডলা দেয়ার আগে যেন ধনাই মোল্লার ভায়রার ঘর চেক করা হয়।
:
কথা মনে ধরলো আবু বেপারীর। তিনি চোরের শাস্তি স্থগিত রেখে নৌকায় উঠলেন ওপার যেতে, ধনাইকেও সাথে নিলেন। আবু বেপারীর অনুরোধে আমি ও মাও গেলাম সাথে। নৌকা ঘাটে ভিড়তেই দেখতে পেলো ধনাই মোল্লার ভায়রা ছিদ্দিকুল্লাহ। সে কাল বিলম্ব না করে এক দৌঁড়ে চলে গেল নিজে কুঁড়েতে। সবাই নামতে নামতে ভোঁ দৌঁড় দিলো একটা পুটুলিহাতে। দৌঁড়ে বরাবরই প্রথম ছিলাম আমি। আমিসহ এলাকার ৫/৬ জনে দৌঁড়ে ধরে ফেললাম ছিদ্দিকুল্লাহকে। একজনে ছিনিয়ে নিলো তার পোটলা। এর মধ্যে আবু বেপারীও এসে গেছে কাছে। পুটুলি খুলে দেখা গেল চুরি যাওয়া টাকা আর স্বর্ণালংকার সবই উপস্থিত। ছিদ্দিকুল্লাহ আর ধনাই মোল্লাহর মুখ তখন ছাই!
:
ক্রমে রাষ্ট্র হয়ে গেল যে, আমি যেন কিভাবে “বাতেনি” জ্ঞান অর্জন করেছি। সব খবর বলতে পারি আগাম এবং তা সত্যি হয়। স্কুলে যাওয়া, ঘর থেকে বের হওয়া মুশকিল হলো আমার জন্য। কারণ মানুষের সমস্যার অন্ত নেই। তাই বিবিধ সমস্যা নিয়ে আসতে থাকলো তারা ক্রমাগত আমার বাড়িতে। আমার স্কুলের প্রধান শিক্ষকের নবম শ্রেণি পড়ুয়া একমাত্র কন্যা শয্যাশায়ী হলো। তার সারা শরীর ব্যথা। রোগ ধরতে পারেনা কেউ। শহরে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছিল ২-বার। কিন্তু রোগ ধরতে পারছেনা ডাক্তার। একদিন আমাদের বাথানের লালচে গরুটা বললো
– ওর ক্যান্সার হইছে। আর মাত্র ১-মাস আয়ু আছে। বাঁচবেনা ১-মাসের বেশি।
স্যারকে একদিন গোপনে বললাম তার মেয়ের ক্যান্সার হওয়ার কথা। স্যারের মন খারাপ হলো খুব। তারপরো তিনি আশা ছাড়লেন না। একদিন লঞ্চে করে ঢাকা নিয়ে গেলেন মেয়ের সুচিকিৎসায়। প্রবীণ অভিজ্ঞ ডাক্তার ক্লোনোসকপি করে পাকস্থলীর ভেতর কি একটা পেলেন। তা অপসারণের পর পুরো সুস্থ হলো মেয়েটি। আবার স্কুলে আসা শুরু করলো। মৃত্যুর কথা মিথ্যে প্রমাণিত হলো। একদিন স্কুলে স্যারের রুমে ডাকলেন তিনি আমাকে। বললেন
– কিভাবে আমি তার মেয়ের ক্যান্সারের কথা আর ৩০ দিন আয়ুর কথা বললাম!
উপায়ান্তর না দেখে গরুর কথা বললাম আমি। সেই রাতে কে বা কারা রাতের আঁধারে হত্যা করলো গরুটিকে। আর আমি হারিয়ে ফেললাম আমার বাতেনি জ্ঞান তথা পশু পাখিদের কথাবার্তা বোঝার অলৌকিক ক্ষমতা।
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 55 = 56